সৈয়দা খাতুন : নজরুলের  জীবনে ও জীবনীতে

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২৬ মে, ২০১৮ at ৪:০৯ পূর্বাহ্ণ
23

দেশব্যাপী পালিত হলো বিদ্রোহী কবির ১১৯ তম জন্মবার্ষিকী। এ বছর অমর একুশের বইমেলায় প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত গবেষকঅধ্যাপক গোলাম মুরশিদের নজরুলজীবনী ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত’ কবিকে শব্দে শব্দে বিশদভাবে জানার সুযোগ দিয়েছে আমাদের। ‘জন্মপরিবার ও পরিবেশ’ থেকে ‘নীরব কবি’ শীর্ষক ১০টি অধ্যায়ের সঙ্গে উপসংহার, পরিশিষ্ট, নির্বাচিত গ্রন্থ তালিকা ও নির্বাচিত নির্ঘন্টসহ মোট ৫৩৭ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থ নক্ষত্র খচিত এক চন্দ্রাতপই বটে। নীরব নজরুলের কাল থেকে এ যাবতকাল পর্যন্ত প্রখ্যাত নজরুলজীবনীকার, নজরুলস্মৃতিলেখক ও বিশিষ্ট পত্রলেখকদের প্রত্যেককে আমলে নিয়ে সবার লেখা যাচাইবাছাই করে ‘সন্দেহছাঁকনিতে ছেঁকে’ যথার্থ সত্য প্রতিষ্ঠিত করার এ এক অসাধারণ প্রয়াস।

আশার ছলনে ভুলির, (মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনী) পর থেকে জীবনীকার গোলাম মুরশিদ শাশ্বত সমাজে পরম আদৃত। কিন্তু নজরুল জীবনীতে আমাদের দীর্ঘদিনের চেনাজানা নজরুল বিষয়ে তাঁর কিছু নির্বিকার মূল্যায়ন, মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত আমাদের হতবিহ্বল করেছে। সুদূর শৈশব থেকে চেনা দুখু মিঞা মূলত ‘দুক্ষু’; দুখু নন। পরিবারে তাঁকে ‘দুক্ষু’ নামেই ডাকা হতো। এটি যেমন নতুন খবর তেমনি অভিনব তাঁর আসল নামের ইতিহাস। বস্তুত নজর আলী নামটি ভাইদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা নাম, এটি তাঁর নাম হতেই পারে। সেই সঙ্গে নজর আলী থেকে নাজিরুল এসলামের পথ বেয়ে নজরুল এসলাম এবং সবশেষে তাঁর নজরুল ইসলাম হয়ে ওঠার গল্প তিনি আমাদের শোনান। সেই সঙ্গে তাঁর শিক্ষিত ও সংস্কৃতজন হয়ে ওঠার ইতিহাস, অনুল্লেখ্য ‘নিম্নমানের এক পদ্যকার’ থেকে ‘মহান কবি’ হয়ে ওঠার ইতিহাস, আসমগ্র মুসলমান নজরুলের ধর্মনিরপেক্ষতায় উত্তীর্ণ হবার ইতিহাসের মধ্য দিয়ে গোলাম মুরশিদ নজরুলকে পরিবারপরিবেশনিরপেক্ষ এক ‘স্বগঠিত, স্বাবলম্বী, স্বাধীন ও স্বধন্য মানুষ (বলেছেন, অতিমানব বললেও খুব একটা বাড়িয়ে বলা হয় না) প্রমাণ করেছেন। খাঁটি গবেষকের নিরাসক্তিতে বাঙালির ভাবাবেগের সঙ্গে প্রবলভাবে জড়িয়ে থাকা বিষয়গুলোর প্রতি রীতিমতো কঠিন থেকেছেন তিনি। বলা হয়েছে (বইএর ফ্ল্যাপে) ‘অতিরঞ্জিত নজরুল নন, কিংবদন্তীর নজরুল ননএই গ্রন্থে নজরুলকে দেখা যাবে তাঁর সত্যিকার স্বরূপে। দেখা যাবে এক বিবর্তনশীল প্রতিভাকে, একজন রক্ত মাংসের মানুষকে।’ আমরা নিশ্চয়ই তাঁর প্রতিশ্রুত নজরুলকে দেখেছি। কিন্তু তাঁকে দেখতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে নানাভাবে সম্পৃক্ত বা তাঁর সান্নিধ্যধন্য নারীদের দেখতে গিয়ে বিপর্যস্ত বোধ করেছি কখনও কখনও। কখনও গর্বিত বোধ করিনি এমনও নয়। তবে সেক্ষেত্রে কৃতিত্বের দাবিদার ওই নারী বা নারীরা স্বয়ং; অন্য কেউ নন। আমাদের পরিসর স্বল্প; বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষ করে সৈয়দা খাতুনকে নিয়ে আমাদের আজকের গল্প।

সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে নাতিউচ্চ মানবিশিষ্ট সৈনিক নজরুল কলকাতায় ফেরার পৌনে দু’বছরের মধ্যে ‘বিদ্রোহী’র মতো কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হলেন কি করে? এ প্রশ্নের উত্তরে গোলাম মুরশিদ বলেন নজরুলের মতো অসামান্য প্রতিভার পক্ষে এমন উত্তরণের জন্য সাধারণের গড়পড়তা গৎবাঁধা পথের প্রয়োজন হয় না। ‘এঁরা দেখে শেখেন, শুনে শেখেন, পরিবেশ থেকে শেখেন, ভেবে শেখেন।’ তাছাড়া ‘সাধারণ মানুষ একটা জিনিস যেভাবে শেখে, যতোদিনে শেখে, যতোটুকু শেখেএকজন প্রতিভাবান ব্যক্তি সেভাবে, ততোদিনে অথবা ততোটুকু শেখেন না।’ কবিসাহিত্যিক এবং সাহিত্যামোদীদের আড্ডা ও আলাপচারিতা থেকে নজরুল সাহিত্যের বিষয় ও সৃজনশীলতার পথ যেমন পেয়েছেন তেমনি মুজফফর আহমদের সাহচর্যে বিশেষ করে নবযুগ পত্রিকায় কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিকতা ও রাজনীতির পাঠ পেয়েছেন। সমসময়ে ‘মোসলেম ভারত’ তাঁর সৃজনশীলতা প্রকাশে মূল্যবান ভূমিকা রেখেছিল। এ সময়টাতে নজরুলের ‘পরিচিতি ও জনপ্রিয়তার পরিধি’ প্রসারিত হয়। কিন্তু তৃতীয়বারের মতো ‘নবযুগ’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং মোসলেম ভারতের পক্ষ থেকে অর্থপ্রাপ্তি আশানুরূপ না হওয়ায় নজরুল বেকার হয়ে পড়েন। ঠিক এই সময়টিতে পাঠ্য পুস্তক ব্যবসায়ী আলী আকবর খান নজরুলকে তাঁর কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। ‘লিচুচোর’ কবিতার ব্যবসায়িক সাফল্যে প্রলুব্ধ আলী আকবর খানের একটি উদ্দেশ্যের কথা অনেকেই বলেছেন। কিন্তু তাঁর অন্যরকম আরেকটি অভিপ্রায়ের কথা পরবর্তী ঘটনার জন্য অপেক্ষিত ছিল। ‘শিকড়ছেঁড়া’ নজরুল তাঁর স্বভাবগত কারণে আলী আকবর খানের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন বিনা দ্বিধায়। ঝোঁকের মাথায় সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গায় যাওয়ার ঘটনা নজরুলের জীবনে বহুবার ঘটেছে। মুজফফর আহমদের নিষেধ সত্ত্বেও একদিন আলী আকবর খানের সঙ্গে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হন নজরুল।

নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে আলী আকবর খান সহপাঠী বীরেন্দ্র কুমারের কান্দিরপাড়াস্থ পৈতৃক বাড়িতে ওঠেন। বীরেন্দ্র কুমারের মাতা বিরজাসুন্দরীকে (পিতা: ইন্দ্রকুমার সেন গুপ্ত) তিনি মা ডাকতেন। নজরুলও তাঁকে মা সম্বোধনে জয় করে নিলেন। কুমিল্লায় কয়েকদিন কাটিয়ে শহর থেকে মাইল দশেক দূরে দৌলতপুর গ্রামের উদ্দেশ্যে চললেন নজরুল। নিস্তরঙ্গ এক গ্রামীণ পরিবেশে যাঁর আকর্ষণে নজরুল থেকে গেলেন আলী আকবর খানের দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি ছিল তাঁকে ঘিরে। ‘সামান্য লেখাপড়া জানা অসামান্য সুন্দরী’ সৈয়দা খাতুন ছিলেন আলী আকবর খানের এক বিধবা বোনের মেয়ে। নজরুল তাঁর পাতা ফাঁদে পা দিলেন। গোলাম মুরশিদ জানাচ্ছেন, নজরুলের অবস্থা তখন দুষ্মন্তের মতো: স্বপ্নো নু, মায়া নু, মতিভ্রমো নু।’ আলী আকবর খানের বাড়িটা তখন নন্দনকানন। নজরুল ভাসলেন কবিতা ও ভাবাবেগে। মাসটা বৈশাখ। রচিত হলো সাত সাতটি প্রেমের কবিতা। জ্যৈষ্ঠে কবিতায় প্রেমের সঙ্গে এলো মিলনের উচ্ছ্বাস। সৈয়দা খাতুনের নতুন নাম দিলেন কবি। ফারসি ‘নার্গিস’ ফুল তখন বঙ্গে বিরল। আলী আকবর খান তাঁর উদ্দেশ্য সাধনের পথে এগিয়ে চলেছেন দ্রুত। ৩রা আষাঢ় শুক্রবার অতিথি অভ্যাগতদের ভিড়ে গমগম করা বিয়ে বাড়ি। কান্দিরপাড় থেকে সেনগুপ্ত পরিবারও উপস্থিত। কিন্তু বিয়ের আসর ছেড়ে বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের সঙ্গে মধ্যরাতে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে দৌলতপুর ত্যাগ করেন নজরুল।

আলী আকবর খান স্বাক্ষরিত এ বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রটি স্বয়ং নজরুলের রচনা মুজফফর আহমদের এ অনুমান সমর্থন করেন গোলাম মুরশিদ। এ চিঠি বিশ্লেষণ করে তিনি নজরুল চরিত্রে ‘প্রবল হীনম্মন্যতা’ প্রমাণ করেছেন। কিন্তু কলকাতায় গিয়ে এ চিঠিকে নজরুল আলী আকবর খানের ‘জামাইবিজ্ঞাপন’ বলে অভিহিত করেন। ‘কবিবরের প্রতিবাদ’ নামে বিজলী পত্রিকায় প্রকাশিত এ চিঠিতে নজরুল বলেন, ‘….ওতে আমার নামের আগে ও পরে এত লেজুড় লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কোনো চতুষ্পদ জীবের অতগুলো লেজ থাকে না।….রবির সাথে এ খদ্যোত কবির তুলনায় আমি গভীর প্রতিবাদ করছি।’ বিয়ের আসর থেকে নজরুলের চলে যাওয়ায় যে প্রশ্নটি ওঠে তা হচ্ছে নজরুলের সঙ্গে সৈয়দা খাতুনের বিয়েটা হয়েছিল কিনা? এ নিয়ে জীবনীকারদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মুজফফর আহমদ নজরুলের বক্তব্য শুনে আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয়নি বলে মত দেন। কিন্তু তাঁর জামাতা কবি আবদুল কাদির লিখেছেন যে, বিয়ে ভেঙে যাবার দুতিন মাস পরে আলী আকবরের বড়ো ভাই কলকাতায় গিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদের দলিলে নজরুলের স্বাক্ষর নিয়ে আসেন। সেখানে মোহিতলাল মজুমদারের উপস্থিতির কথা গোলাম মুরশিদ বাতিল করেছেন। তিনি নজরুলের সঙ্গে মোহিত লালের তখনকার তিক্ত সম্পর্কের উল্লেখ করে বলেন যে উপস্থিত থাকলে মোহিত লাল সে কথা কোথাও নিশ্চয়ই উল্লেখ করতেন। কিন্তু অপর দু’জন সাক্ষীর (মঈনুদ্দীন হুসায়েন এবং ডাক্তার লুৎফর রহমান) স্বাক্ষর প্রসঙ্গে গোলাম মুরশিদ বলেন যে এঁরা সই করে থাকলে বিয়ের কাবিননামায় নজরুল সই করেছিলেন বলে ধরে নেওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে তিনি এও বলেন যে হয়তো ‘আনন্দে আত্মহারা’ কবি সই করার মুহূর্তে কাবিননামার শর্তগুলোর বিবরণ পড়ে দেখেন নি। পরে বিয়ের আসরে শর্তগুলো পড়ে শোনানো হলে নজরুল ‘ক্ষুব্ধ ও ক্ষিপ্ত’ হয়ে বিয়ের আসর ত্যাগ করেন।’ উল্লেখ্য যে কাবিননামায় নজরুলের ঘর জামাই হয়ে দৌলতপুরে নার্গিসকে নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার শর্ত ছিল।

এ ঘটনার নানা দিকের প্রতি বিশেষ করে নার্গিসের প্রতি কবির ক্রোধ, প্রণয়ভঙ্গের বেদনা বা দুলির (পরবর্তীকালে প্রমীলা) প্রতি কবির প্রেম প্রসঙ্গে বিশদভাবে এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে বিস্তর লিখেছেন গোলাম মুরশিদ। যুক্তি তর্কের নিরিখে এমনকি নজরুল চরিত্রে হীনম্মন্যতা বা নিজেকে জাহির করার প্রবণতা সম্পর্কে নির্দ্বিধায় মন্তব্য করেছেন তিনি। অথচ এ বিয়ের পেছনে আলী আকবর খানের দ্বিতীয় যে অভিসন্ধির (প্রথমটি ছিল ঘর জামাই করে প্রত্যন্ত গ্রামে বন্দী করে রেখে তাঁকে দিয়ে ফরমাস মতো লিখিয়ে নিয়ে ব্যবসায় প্রভূত লাভ করা) কথা জীবনীকারদের কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন গোলাম মুরশিদ সে সম্পর্কে কোনও মন্তব্য বা কোনও রকম ব্যাখ্যা দেননি। তিনি জীবনীকারদের কারও কারও বিনামে বরং বলেন: সৈয়দা খাতুন তাঁর ভাগ্নী হলেও আলী আকবর তাঁর প্রতি আসক্ত ছিলেন অথবা আসক্ত হয়ে পড়েন এবং নজরুলকে ঘরজামাই রেখে সেই অবৈধ সম্পর্ককেই স্থায়িত্ব দান করতে চান। রফিকুল ইসলামকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘আলী আকবর খান নার্গিস খানমকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে নিজের কাছে রাখেন এবং তাঁর বইএর ব্যবসা এবং বাড়ি নার্গিসের নামে লিখে দেন। অনেক বছর পরে তাঁর বইএর ব্যবসার একজন কর্মচারী আজিজুল হাকীমের সঙ্গে নার্গিসের বিয়ে দেন। গোলাম মুরশিদ এ প্রসঙ্গে যেটুকু না বললেই নয় তাই বলেছেন। তিনি বলেন, ‘….এ সবই অনুমান। নিশ্চয়তা দিয়ে বলার মতো তথ্য আমাদের হাতে নেই।’ অথচ আলী আকবর খানের সঙ্গে যাকে জড়ানো হলো তিনি এক অসহায় নারী এবং মাতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়তার উপরেও এ এক মর্মান্তিক আঘাত। ঔপন্যাসিক বিশ্বজিত চৌধুরী তাঁর ‘নার্গিস’ উপন্যাসে এই নারীকে প্রেমের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। জীবনীগ্রন্থে সেটা সম্ভব নয়, সমীচীনও নয়। তবু জীবনী লেখক গোলাম মুরশিদ বলেই আমরা নার্গিসের পক্ষে তাঁর যুক্তিজালের কণামাত্র পেলেও কৃতজ্ঞ বোধ করতাম।

x