সে

অলক দাশ

শুক্রবার , ২ নভেম্বর, ২০১৮ at ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ
47

আজ রোববার।
সে আসবে। আসার কথা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই আসছে।
ওর আসার সময় যত এগিয়ে আসছে হতাশার পাথরটি ততই ভারী হয়ে চেপে বসছে শংকরের মনে।
ওকে দেখেই ওদের বিষয়ে ফিচার লেখার আগ্রহটি অঙ্কুরিত হয়েছে শংকরের মধ্যে। পত্রিকায় বিষয় ভিত্তিক ফিচার লিখে শংকর। চাকরির পাশাপাশি ফ্রিল্যাঞ্চার ফিচার লেখক। ফিচারের তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনেই ওর সাথে আলাপ করতে চায় শংকর। কিন্তু এর জন্য একটি জায়গা অবশ্যই দরকার। শংকর সেই জায়গাটিই এখনো ঠিক করে উঠতে পারেনি। লোকলজ্জার ভয়। হিজড়াদের নিয়ে সবার কৌতুহলের শেষ নেই। ওদের নিয়ে মানুষের মুখে মুখে শুধুই বদনাম! শংকরেরও জায়গা ঠিক করতে না পারার পথে বড় বাধা সেই বদনাম নিজের গায়ে লেগে যাওয়ার আশংকা। সে জানে, তাকে একজন হিজড়ার সাথে আলাপ করতে দেখলে কেউ তা সহজভাবে নেবেনা। বুঝিয়ে বললে হয়ত বুঝবে। কিন্তু বুঝানোর সুযোগটা তো পেতে হবে। শংকর নিশ্চিত, কেউ সেপথে যাবেনা। যে যার চোখের দেখাটাতেই রং চড়িয়ে একান ওকান করবে।
অথচ ওকে আগ্রহের কথা জানানোর সময় জায়গা নিয়ে সমস্যায় পড়তে হতে পারে মনে হয়নি শংকরের। নিজের অফিস উত্তম জায়গা ভেবেই প্রস্তাবটি দিয়েছিল ওকে। হিজড়ারা তাদের অফিসে নিয়মিতই আসে চাঁদা নিতে। একটি দিন ওদেরই একজনের সাথে একটু সময় নিয়ে কথা বললে কী এমন অসুবিধা! মনে মনে সিদ্ধান্ত পাকাই করে ফেলেছিল, পরের সপ্তাহে সে এলে কাজটা সেরে নেবে।
কিন্তু পারেনি। এ নিয়ে টানা তিন সপ্তাহ হতে চলেছে। নিজের ভেতর থেকেই কীরকম এক বাধা পাচ্ছে। একজন স্টাফ তারই অফিসে বসে হিজড়ার সাথে আলাপ করছে, বিষয়টি সহজভাবে নাও নিতে পারেন অফিসের লোকজন।
বিকল্প ডিসি হিলের কথাও ভেবেছিল। উন্মুক্ত স্থান। প্রাতঃ আর বৈকালিক ভ্রমণকারীরা শুধু নয়, সব শ্রেণির লোকজনই এখানে আসে। আসতে বাধা নেই হিজড়াদেরও। কিন্তু সেখানেও বাধা শংকর নিজে। হিজড়ারা এমনিতে কৌতুহলের বস্তু। ওরা যেখানেই যায় জোড়ায় জোড়ায় কৌতুহলী চোখ ওদের পিছু নেয়। শংকর নিশ্চিত, হিজড়ার সাথে তাকে দেখলে চারপাশে জটলা জমে যাবে। সে খবর তার বাসায়ও চলে যেতে পারে। কত লোক আসে ডিসি হিলে, তাদের মধ্যে তার পরিচিত কেউ থাকা খুব স্বাভাবিক।
ভাবতে পারছেনা নিজের বাসার কথাও। প্রথম আক্রমণ আসবে পরিবারের সদস্যদের দিক থেকেই। আবার পরিবারের বাকি সদস্যদের জন্যও ভাল হবেনা তা। গলির লোকজন তাকে দেখবে সন্দেহের চোখে। তাদের সমালোচনার আঁচ গিয়ে লাগবে পরিবারের সদস্যদেরও গায়ে।
শেষ পর্যন্ত সুযোগটি হাতছাড়াই না হয়ে যায়! এ আশংকাটিও পেয়ে বসেছে শংকরকে। সেরকম ঘটলে তা নিজের জন্য বড় ক্ষতি হিসাবেই দেখছে শংকর। তখন হিজড়াদের জীবনযাত্রার একটি অধ্যায় অজানাই থেকে যাবে তার কাছে। শংকর জানে, তাদের এলাকা ছেড়ে একদিন চলে যাবে সে। দেখে আসছে, চাঁদা নিতে আসা হিজড়া দলে নিয়মিতই সদস্যদের সংযোজন বিয়োজন ঘটে।
ওকে দেখার আগে শংকরের কাছে হিজড়া মানেই ছিল বিরক্তি। আতংকও। সে কী ঔদ্ধত্বপূর্ণ আচরণ হিজড়াদের! সপ্তাহের প্রতি রোববার হিজড়াদের একটি দল শংকরদের অফিসে চাঁদা নিতে আসে। ওরাই এ এলাকায় চাঁদা আদায়ের জন্য এদিনটি নির্ধারণ করে নিয়েছে। চাঁদা এমনভাবে দাবি করে যেন পাওনা বা জমা টাকা নিতে এসেছে।
হিজড়াদের ভয়ংকর রূপটিও চাক্ষুষ দেখা শংকরের। ওদের চাহিদামত চাঁদার অংকের টাকা তুলে না দিলে শুরু করে নানা হাঙ্গামা। জোরে জোরে দরজা ধাক্কায়, চেয়ার-টেবিলে ধাম ধাম শব্দে থাপ্পর মারে। সমানে চলে চিৎকার চেঁচামেচি। পরনের কাপড় উপরের দিকে তুলতেও একমুহূর্ত ভাবেনা। হিজড়াদের একটি ব্যাপার অদ্ভুদ লাগে শংকরের কাছে, চাঁদা তুলতে গিয়ে কোথাও দল ভারী করার প্রয়োজন পড়লে বিশেষ কায়দায় হাততালি দেয় ওরা। হাততালির শব্দ শুনে নিকটে কোথাও থাকা অন্য হিজড়ারা ছুটে আসে। শংকরের মনে হয়, প্রশিক্ষণ ছাড়া এভাবে হাততালি দেয়া সম্ভব নয়।
শংকর তাই সদা প্রস্তুত, তাকে চাঁদা দিতে হলে তখন যেন এক মুহূর্তও দেরি না হয়ে যায়। চাঁদার ব্যাপারটি অফিসের ছেলেটিই দেখে সচরাচর। কিন্তু যেদিন অফিসের কাজে বাইরে থাকে ছেলেটি, সেসময় হিজড়ার দলটি এলে নিজের পকেট থেকে টাকাটা দিয়ে বাঁচে শংকর। সেই বিশ্রী কাণ্ডটির শিকার না হতে তাই এ সাবধানতা।
সেদিন। অফিসে কাজ করছিল শংকর। হঠাৎ কানে এসে লাগে অনেক মানুষের হইচই আর ‘ধর ধর মার মার’ শব্দ। ব্যাপার কী বুঝতে ঝুল-বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় শংকর। তাদের অফিসের চারতলা ভবনের ঝুল-বারান্দা থেকে দু’দিকে নিচের রাস্তার অনেকদূর দেখা যায়। শব্দটি রাস্তা থেকেই আসছিল। শংকর দেখে, হিজড়ারা প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে আর পেছন থেকে তাদের তাড়া করেছে শত শত লোক।
পরে বিস্তারিত জানতে পেরেছে শংকর। হিজড়াদের একটি দল গিয়েছিল এলাকার হোটেলটিতে চাঁদা তুলতে। কিন্তু ক্যাশম্যানেজার ওদের চাহিদামত টাকা দিতে রাজী নয়। হিজড়ারা যা যা করে সবই করতে থাকে। এক পর্যায়ে এক হিজড়া যায় ক্যাশবাক্স থেকে জোর করে টাকা আনতে, আরেকজন গিয়ে ম্যানেজারের অন্ডকোষ ধরে এমন জোরে চাপ দেয় ম্যানেজার ব্যথায় আর্তনাদ করে ওঠে। তখন হোটেলের স্টাফরা হিজড়াদের তাড়া করে। স্টাফদের সাথে যোগ দেয় হিজড়াদের উপর চাপা ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা এলাকার লোকজনদের একটি অংশও। শংকরের মনে হয়, সেদিন শুভবুদ্ধির কিছু লোক এগিয়ে না এলে হয়ত হিজড়াদের মধ্যে প্রাণহানিও ঘটত।
হিজড়াদের নিয়ে মনের আগের অবস্থার পরিবর্তন এখনো হয়নি শংকরের। তবে ওকে দেখার পর থেকে সমান্তরালে হিজড়াদের প্রতি সহানুভূতির একটি ক্ষীণ ধারাও বইতে শুরু করেছে শংকরের মনে। সে চমৎকার ব্যতিক্রম। পোশাকে, প্রশাধনে, আচরণে কোথাও শালীনতার ন্যূনতম বিচ্যুতিও নেই। চাঁদা নিতে এসে এক জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। অন্যরা ঝামেলা করতে চাইলে তাদের সামলায়। শারীরিক ভাষায় বুঝাতে চায়, যে টাকাটা নিচ্ছে সেটি দয়ার দান। চলে যাওয়ার সময় সবার শুভ কামনাও করে যায়।
শিক্ষা,পারিবারিক সংস্কৃতি আর নিজস্ব রুচিবোধেই অন্যদের থেকে আলাদা সে। তার বিশ্বাস, যে সৃষ্টিতে নিজের কোন হাত নেই, সেই সৃষ্টিকে মেনে না নিয়ে উপায় কী! কিন্তু আচরণ ভাল বা মন্দ করার নিয়ন্ত্রক তো প্রত্যেক মানুষ নিজেই।
জন্মগতভাবে ‘জেনেনা’ শ্রেণির হিজড়া সে। পৃথিবীতে দুই ধরনের হিজড়া রয়েছে। অকুয়া ও জেনেনা। যারা শারীরিক গঠনে পুরুষের মতো কিন্তু মানসিকভাবে নারীর স্বভাব, তাদেরকে বলা হয় অকুয়া। অন্য বৈশিষ্ট্যের সবাই ‘জেনেনা’ শ্রেণির হিজড়া। ওর মধ্যে নারী পুরুষ উভয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। বাহ্যিক শারীরিক গঠন মেয়েদের মতই। কিন্তু গলার স্বর পুরুষালী। আর ত্রুটি জননাঙ্গে।
হিজড়া পল্লীতে থাকেনা সে। তার জন্ম সচ্ছল এবং শিক্ষিত পরিবারে। নগরে নিজেদের বহুতল ভবন। পরিবারের সাথেই থাকে। চাঁদা আদায়ে সহায়তা দিতে নয়, কিছু সময় হিজড়া পল্লীর হিজড়াদের সাথে কাটানোটা তার চাকরিরই অংশ। এদেশের হিজড়াদের উন্নয়নে কর্মরত একটি বিদেশী এনজিওর চাকুরে সে। তাদের এনজিও হিজড়াদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ওর অফিসিয়াল দায়িত্ব হিজড়াদের কোথায় কী সমস্যা চিহ্নিত করে প্রতিবেদন তৈরি, যার ভিত্তিতে সমাধানের ব্যবস্থা নেয়া যায়।
এ চাকরি পাওয়াটাকে অন্তত: একটি জায়গায় তার প্রতি ঈশ্বরের দয়া হিসাবে দেখে সে। এর আগে চাকরির জন্য অনেক জায়গাতে চেষ্টা করেছে । লিখিত পরীক্ষায় টিকেছে। কিন্তু ভাইবাতে আটকে গেছে। পুরুষালি কন্ঠই বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাইবা বোর্ডের বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে তার।কোথাও সরাসরি বিনয়ের সাথে বলেছে, স্যরি! এ প্রতিষ্ঠানে আপনাদের চাকরির ব্যবস্থা নেই। কোথাও পেয়েছে অশ্লীল আচরণ। চাকরি দেবেনা,তারপরও বসিয়ে রাখত হিজড়ার শরীর বিষয়ে নিজেদের কৌতুহল মেটাতে। কী জঘণ্য সব প্রশ্ন। যেন হিজড়ারা মানুষের মধ্যে পড়েনা, তাই তাদেরকে যা ইচ্ছা বলতে বাধা নেই।
চাকরি আর হবেনা! এত কষ্ট করে সমাজবিজ্ঞানে নেয়া অনার্সটাও কোন কাজে আসবেনা! হতাশার অক্টোপাশ আস্টেপৃস্টে আঁকড়ে ধরেছিল তাকে। এ চাকরিও কপালে নেই নিশ্চিত হয়েই ভাইবা দিতে গিয়েছিল। সে নিঃসন্দিহান, এচাকরিটা পেয়েছে সেদিন ভাইবা নেয়ার সময় প্রতিষ্ঠানের প্রধান অফিসের বিদেশী বড় কর্মকর্তাটি উপস্থিত ছিলেন বিধায়। এমনটি মনে করার কারণ, সেই বিদেশী কর্মকর্তা নিজের অফিস রুমে তাকে ডেকে নিয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। একাডেমিক শিক্ষায় তার এ পর্যন্ত উঠে আসার পেছনে সংগ্রামের ইতিহাস শুনে তিনি প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন এবং সেই আলোচনার টেবিলেই তাকে সুখবরটি দিয়েছেন।
এ চাকরিতে হিজড়াদের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ আছে। তাই নিজের কাছে তা নিছকই কেবল চাকরি নয়, হিজড়াদের কল্যাণে কাজ করার ব্রত। নিজে হিজড়া বলেই জানে, একজন হিজড়া কতটা অসহায়! হিজড়ার নিজের পরিবারেও নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নেই। নিজেই সেই আগুনে নিরন্তর দগ্ধ হচ্ছে সে। কখনো কখনো এ আগুন এতটাই অসহ্য হয়ে উঠে বাড়ি ছেড়েও পালায়। বিশেষ করে আত্মীয়-স্বজন এবং পরিচিতদের নিয়ে আয়োজিত সামাজিক বা পারিবারিক কোন অনুষ্ঠানের সময়টিতে। বাসায় তার নিজের রুম আছে। ভেতর থেকে দরজায় খিল দিয়েও নিস্তার নেই। যেন চিড়িখানার প্রাণী বিশেষ সে। আগতরা তাকে দেখতে দরজা ধাক্কায়। দরজা খুললেও বিপদ, না খুললেও বিপদ। দরজা খুলে দিলে একসাথে হুড়মুড় করে অনেকজন ঢুকে পড়ে। বিস্ময়ের দৃষ্টিতে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে তাকে। কথা-বার্তায় কোন লাগাম থাকেনা। যা ইচ্ছা তা-ই বলে। সে লজ্জা পায়, বিব্রত হয়, মনকষ্টে কুঁকড়ে যায়। দরজা খুলে না দিলে তখন চলে কটূ সমালোচনা। চলতেই থাকে কথার বিষ। বাসারও কেউ কেউ চায়না ওই সময় বাসায় থাক সে। থাকলে উৎকট ঝামেলা। মুখে না বললেও আচরণে বুঝিয়ে দেয় ওরা।
যখন অসহ্য ঠেকে বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। প্রথমবার বাসা থেকে পালিয়েছিল কাউকে কিছু না বলেই। এখন মাকে বলে আসে। প্রথমবার ওর নিখোঁজে ভেঙ্গে পড়েছিল মা। সাতদিন পর যখন বাসায় ফিরে মাকে যেন চিনতেই পারছিলনা সে। সেই সাতদিন মায়ের নাওয়া-খাওয়া নেই। নির্ঘুম। মাকে বুঝিয়েছে, বাড়ীর অনুষ্ঠানের সময় সে না থাকলে তা তার নিজের জন্য এবং বাড়ীর বাকিদের জন্যও মঙ্গল। মা যুক্তি মেনে নয়, সন্তানকে রক্ষার উপায় নেই বলে বিদায় দেয়। কষ্টের ছাইচাপা আগুনে পুড়তে থাকা মা এই ভেবে সান্ত্বনা খুঁজে,সন্তান সেখানে অন্ততঃ বাসার চেয়ে কম খারাপের মধ্যে থাকবে।
হিজড়ারা সবার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের পাত্র। হিজড়াপল্লীর আশ্রিত হিজড়ারা দ্বারে দ্বারে গিয়ে চাঁদা তুলে। এজন্য তাদের দেখে সবাই বিরক্ত হয়, ঘৃণাও করে হয়ত। অথচ মানুষ ওদের বাইরেরটাই দেখে। চাকরিই হিজড়াদের প্রকৃত অবস্থা এবং অবস্থান তার চোখের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে। সেই চাঁদার টাকায় তাদের অধিকার নেই। টাকা ভাগ হয়ে চলে যায় জায়গায় জায়গায়। কোন এলাকায় কত চাঁদা উঠতে পারে সেই হিসাবও যারা হিজড়াপল্লীর হর্তাকর্তা তাদের নখদর্পণে। চাঁদার পরিমাণ কম হলে চাঁদা আদায়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের উপর চলে নির্যাতন। এত কষ্টের বিনিময়ে সাধারণ হিজড়ারা পায় কেবল থাকা-খাওয়া, পরনের কাপড় ও সস্তা প্রসাধনী সামগ্রী।
আবার সবাই জন্মগত হিজড়াও নয়, এ জঘণ্য সত্যটিও চাকরির সুবাদ জেনেছে সে। একটি অর্থলোভী চক্র অল্পবয়সী ছেলেদের কৌশলে ধরে এনে কিছু বিপথগামী শিক্ষিত ডিগ্রিধারী ডাক্তারদের দিয়ে অপারেশানের মাধ্যমে হিজড়া বানায়। এরা ‘চিন্নি’ নামে পরিচিত। চক্রটি এদের চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, পতিতাবৃত্তির মতো জঘণ্য অপরাধে জড়িত করে অর্থের পাহাড় গড়ে।
তবে আশাবাদী সে, হিজড়াদের এ দুর্দশা থাকবে না। হয়ত হিজড়াই থাকবে না। তাকে এ স্বপ্ন দেখাচ্ছে, হিজড়াদের কল্যাণে ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ। এ উদ্যোগের সুফলও মিলতে শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাচ্ছে হিজড়ারা। যদিও তা এখনো অতি নগণ্য। কিন্তু এ মুহূর্তে বড় কথা, হিজড়াদের নিয়ে যে মানসিক ও সামজিক পাথুরে বাধাগুলো রয়েছে সেগুলোর গায়ে হাতুড়ির আঘাত পড়তে শুরু করছে। সে যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, আঘাতে আঘাতে পাথুরে বাধাগুলো একদিন ভেঙে খান খান হয়ে যাবে।
হিজড়াই থাকবে না, তাকে এ স্বপ্ন দেখাচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞানই। হিজড়া শিশুকে পরিণত বয়সে পৌঁছানোর আগে উপযুক্ত চিকৎসা দিলে বেশীভাগ ক্ষেত্রেই তাকে সুস্থ করা সম্ভব। তার দৃঢ় বিশ্বাস, পারিবারিক সচেতনতামূলক প্রচারনা ও সরকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে হিজড়া অভিশাপ সম্পূর্ণভাবে নাহলেও অনেকটাই নির্মূল করা যাবে। তার জন্য দরকার পারিবারিক সচেতনতা, পারিবারিক সচেতনতা তৈরিতে হিজড়া শিশুর লক্ষণ সংক্রান্ত প্রচারণা। লক্ষণগুলো জানা থাকলে তখন পরিবার তাদের শিশুকে চিকিৎসা করানোর কথা ভাববে। এই ভেবে কখনো কখনো তার বুকের ভেতরটাও দুমড়ে মোষড়ে যায়, হয়ত তার পারিবারেরও কারো জানা ছিলনা,চিকিৎসায় হিজড়া স্বাভাবিক জীবন পেতে পারে! কিন্তু চিকিৎসাব্যয় বহনের ক্ষমতা সবার থাকে না। তাই সে চায়, হিজড়া শিশুর এ চিকিৎসাব্যয় বহন অক্ষম পরিবারগুলোর পাশে যেন সরকার ও বিত্তবানরা দাঁড়ায়।
হঠাৎ দরজায় বাড়ি দেয়ার শব্দ হল। এ শব্দ শুনতে অভ্যস্ত শংকরের কান। হিজড়ারা শংকরদের অফিসে চাাঁদা নিতে এলে ডোরবেল ব্যবহার করে না, জোরে জোরে দরজায় বাড়ি মারে।
অফিসের ছেলেটি দরজা খুলে দিতেই সে বাদে বাকীরা দমকা হাওয়ার মত ভেতরে ঢুকে অতিথির চেয়ারে বসে পড়ে। সে ধীর পায়ে ঢুকে নির্দিষ্ট জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে থাকে। এটি শংকরদের অফিস রুম। একটি বড় রুমকে থাই-গ্লাস দিয়ে শংকরদের অফিস রুম ও কম্পিউটা রুমে ভাগ করা হয়েছে। কম্পিউটারে কাজ না থাকলে অফিস রুমেই বসে শংকর। বসের জন্য আছে আলাদা রুম।
চাঁদার টাকা পকেটে নিয়ে তৈরি ছিল ছেলেটি। চাঁদা পেয়ে গেছে, আগত হিজড়াদের কাজও শেষ। এক দমকা হাওয়া হয়ে ঢুকে ছিল ওরা, বেরিয়েও গেল সেভাবে। কিন্তু বরাবরের মত কয়েক মুহূর্ত সময় নিল সে। আপনারা সবাই ভাল থাকবেন, বলে তারপর চলে গেল।
কম্পিউটার কাজ করছে শংকর। সেখান থেকে অফিসরুমে কে ঢুকল বা বের হল থাই গ্লাসের ভেতর দিয়ে অস্পষ্ট দেখা যায়। ওর উপস্থিতিতে কথা রাখতে না পারার অস্বস্তিতে ভুগছিল শংকর। সে চলে গেলে অস্বস্তির সাথে যোগ হল অপরাধবোধও। হিজড়াদের জন্য তার মনের সহানুভূতি এখনো মনের চার দেয়ালের মধ্যেই আটকে আছে। লোকলজ্জার ভয়ে সেই দেয়াল ভাঙ্গার সাহস তার নেই।

x