‘সে এসব করে, কারণ আমার স্ত্রী কোনো চাকরি করে না’

মাধব দীপ

শনিবার , ১০ নভেম্বর, ২০১৮ at ৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ
182

প্রকৃতপক্ষে, কোনো চাকরি না করে ঘরে থেকে স্ত্রী আসলে আরামপ্রদ আর বিলাসী জীবনযাপন করে না- এরচেয়ে বড় কোনো সত্য নেই। যদি এই পরিশ্রমকে আমরা অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বিচার করতে চাই তবে যা পাবো তা কি রীতিমতো পিলে চমকানো খবর হবে না আমাদের মতো সমাজে? বিশ্বাস না হলে- দেখাই যাক না হিসেব করে!
একটি ছোট্ট কথোপকথন শেয়ার করতে চাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এই কথোপকথনমূলক পোস্টটি শেয়ার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ট্যাঁটুশিল্পী রিচেল ক্যাসেলবেরি। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর এই পোস্টটি পুরো পৃথিবীব্যাপী ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি পোস্টটিতে অল্প কিছুদিনেই লাইক পেয়েছেন ছয় লক্ষ ৪০ হাজার। শেয়ার হয়েছে তিন লাখের উপর। বলা হচ্ছে- এই পোস্টটি আরও বেশি ‘লাইক’ ও ‘শেয়ারড’ হওয়ার দাবি রাখে।
কথোপকথনটি কল্পিত। এক মনোরোগ চিকিৎসক ও এক স্বামীর মধ্যে কথাবার্তা দিয়ে এটি শুরু হয়।
চিকিৎসক: আচ্ছা বলুন তো, বেঁচে থাকার জন্য অর্থাৎ জীবন নির্বাহের জন্য আপনি কী করেন মি: রজার্স?
স্বামী: একটি ব্যাংকে একাউনটেন্ট হিসেবে চাকরি করি।
চিকিৎসক: আপনার স্ত্রী?
স্বামী: তিনি কাজ করেন না। তিনি গৃহিণী।
চিকিৎসক: আপনার পরিবারের জন্য কে সকালের নাশতা তৈরি করে?
স্বামী: আমার স্ত্রী। কারণ, সে কোনো চাকরি করে না।
চিকিৎসক: আপনার স্ত্রী কয়টায় ঘুম থেকে ওঠেন?
স্বামী: সে খুব ভোরে উঠে যায়। বাচ্চার সাথেই উঠে যায়। কারণ খুব ভোরে উঠে বাচ্চার ডায়াপার চেঞ্জ করতে হয়। বুকের দুধ খাওয়াতে হয়। একইসাথে তাঁকে পরিবারের সবার জন্য দুপুরের খাবার তৈরি করতে হয়। সকালের নাশতা হয়ে গেলে বাচ্চাদের স্কুলের জন্য প্রস্তুত করতে হয়। নাশতার পর বাচ্চাদের দাঁত ব্রাশ করাতে হয়, স্কুলের সব উপকরণ ব্যাগে ঢুকানো হয়েছে কিনা দেখতে হয় (বা ঢুকিয়ে দিতে হয়), তাদের জামা-কাপড় পরানোসহ চুল আঁচড়িয়ে দিতে হয়। এক ফাঁকে তাঁকে স্ন্যাকসও বানাতে হয়।
চিকিৎসক: আপনার সন্তানেরা কীভাবে স্কুলে যায়?
স্বামী: আমার স্ত্রী তাদেরকে স্কুলে নিয়ে যায়। কারণ, সে কোনো চাকরি করে না।
চিকিৎসক: বাচ্চাদের স্কুলে দেওয়ার পর আপনার স্ত্রী কী করেন?
স্বামী: বাইরে কোনো কাজ থাকলে সে তা করে। যেমন ধরুন, কোনো-কিছুর বিল পরিশোধ করা, সুপারমার্কেটে কোনো কেনা-কাটা করা, কাঁচা-বাজার করা। যখন বাসায় ফিরে তখন সে বাচ্চাকে দুপুরের খাবার খাওয়ায়, আবার বুকের দুধ খাওয়ায়। প্রয়োজন হলে ডায়াপার চেঞ্জ করে এবং ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে। তারপর রান্নাঘরের জিনিসপত্র গোছায়, লন্ড্রির জন্য কাপড়-চোপড় আলাদা করে বা নিজেই ধৌত করে এবং পুরো ঘর পরিষ্কার করে।…সে এসব করে, কারণ আপনি জানেন, আমার স্ত্রী কোনো চাকরি করে না।
চিকিৎসক: আচ্ছা, সন্ধ্যায় আপনি অফিস থেকে ফিরে কী করেন?
স্বামী: বিশ্রাম নেই। আর কী করবো? সারাদিন ব্যাংকে কাজ করে খুব ক্লান্ত থাকি।
চিকিৎসক: এবার বলুন তো, রাতে আপনার স্ত্রী কী করে?
স্বামী: সে রাতের খাবার প্রস্তুত করে। আমাকে এবং আমার সন্তানকে পরিবেশন করে। বাসন-কোসন ধৌত করে। কুকুরকে খাওয়ায় এবং দিনের অন্যান্য সময় যেভাবে কুকুরের খাওয়া-দাওয়ার প্রতি মনোযোগ রাখে তেমনি রাতেও কুকুরের খাওয়া এবং ঘুমের ব্যাপারটি নিশ্চিত করে। তারপর আমাদের স্কুল-গোয়িং বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক নিয়ে বসে, এসব শেষ করে তাদের মোলায়েম পাজামা পরিয়ে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে। অবশ্য এর আগে নিশ্চিত হয়ে নেয় যে, তারা ঘুমাবার আগে গরম দুধ খেয়েছে কিনা ও খাবার পর দাঁত ব্রাশ করেছে কিনা? কোলের শিশুটাকে আবার নতুন ডায়াপার পরায়, বুকের দুধ খাওয়ায়। অত:পর সে ঘুমাতে যায়। তবে ঘুমাতে গেলেও সারারাত ধরে তাঁকে বারবার উঠে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে হয়, কখনো-সখনো প্রয়োজন হলে ডায়াপার চেঞ্জ করে দিতে হয়। কারণ, আপনি জানেন, সে কোনো চাকরি করে না এবং অফিসে যাওয়ার জন্য তাঁকে বিছানা থেকে উঠতে হয়না।
-হ্যাঁ, আমরা জানি, উপরে বর্ণিত সব কাজ-ই করে থাকেন একজন নারী, একজন মা। প্রিয় পাঠক, বুঝতেই পারছেন, নারীর চাকরি না করা মানে তার অনিবার্য কাজের বহর কত লম্বা! আর সেই নারী বা মা যদি হোন কর্মজীবী? তাহলে?? ক্যাসেলবেরি তাঁর পোস্টে একজন ‘গৃহিণী’র পরিচয় তুলে ধরেছেন ‘২৪ ঘণ্টায়ই ব্যস্ত’ একজন মাল্টিএক্সপার্ট হিসেবে। তিনি লিখেছেন- “একজন গৃহিণীর সত্যিকারের পরিচয় হচ্ছে তিনি একাধারে- মা, নারী, কন্যা, এলার্ম ক্লক, কুক, মেইড, মাস্টার, বার্টেন্ডার (অ্যালকোহল তথা নানা ধরনের পানীয় পরিবেশক), বেবিসিটার (পিতা-মাতার অনুপস্থিতে যে সর্বক্ষণ বাচ্চার যত্ন নেয়), নার্স, ম্যানুয়েল ওয়ার্কার, সিকিউরিটি অফিসার, এ্যাডভাইসর, কমফোর্টার অর্থাৎ যাঁর কোনো ছুটি নেই-ভ্যাকেশন নেই-এমনকি এক মুহূর্তের বিশ্রামও নেই এমনকি যাঁর কোনো অসুখও থাকতে পারে না। একজন ‘গৃহিনীর’ দিন নেই-রাত নেই, অন ডিউটিতে থাকতে হয় সবসময়। এবং এসব কিছুর বিনিময়ে তিনি কখনো কোনো বেতন পাবেন না।…এককথায় একজন ‘গৃহিণী’ হচ্ছেন লবণের মতো যাঁর উপস্থিতিকে সর্বদাই ভুলে থাকা হয় কিন্তু অনুপস্থিতি হাড়ে-হাড়ে টের পাইয়ে দেয় সবকিছুর স্বাদহীনতা।”
-এবার, আমরা যদি আমাদের দেশের একজন নারীর, একজন কর্মজীবী মায়ের ছবি আঁকতে চাই- তবে আমি নিশ্চিত এর বাইরেও অনেক বিশেষ্য বা বিশেষণ পাবো যা দিয়ে নারীর কাজকে চিহ্নিত করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, কোনো চাকরি না করে ঘরে থেকে স্ত্রী আসলে আরামপ্রদ আর বিলাসী জীবনযাপন করে না- এরচেয়ে বড় কোনো সত্য নেই। যদি এই পরিশ্রমকে আমরা অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বিচার করতে চাই তবে যা পাবো তা কি রীতিমতো পিলে চমকানো খবর হবে না আমাদের মতো সমাজে? বিশ্বাস না হলে- দেখাই যাক না হিসেব করে!
বছরখানেক আগে আমেরিকান সমাজের ওপর করা এক গবেষণা প্রতিবেদন দেখলাম এই বিষয়ে। প্রতিবেদনটি নিয়ে ফিচার করে ডিডাব্লিউডটকম। সেখান থেকেই তুলে ধরছি। ফিচারটিতে বলা হয়েছে- ‘এক সপ্তাহে একজন চিকিৎসক ৫৬ ঘণ্টা কাজ করলে মাসে পান ১ লাখ ৫৩ হাজার মার্কিন ডলার। সেই অনুযায়ী গৃহিণীদের সপ্তাহে ৯৪ ঘণ্টা কাজের হিসেবে বছরে কত বেতন হওয়া উচিত? স্যালারি ডট কম (একটি জরিপ সংস্থা) বলছে, গৃহিণীরা ৯টা থেকে ৫টা কাজের বাইরে সপ্তাহে যে অতিরিক্ত ৫৮ ঘণ্টা খাটেন, সেটা হিসেব করলে তাদের বাড়তি বেতন হওয়া উচিত বছরে ৬৭,৪৩৬ মার্কিন ডলার। এবার আসি রান্নার হিসেবে। একজন গৃহিণীকে সপ্তাহে কমপক্ষে অন্তত ১৪ ঘণ্টা রান্না করতে হয়। ঘণ্টায় ৯ দশমিক ০৩ মার্কিন ডলার হিসেব করলে বছরে কেবল রান্নায় তাঁদের আয় হওয়া উচিত ৬,৫৭০ ডলার। এবার বলা যাক গাড়ি চালানো নিয়ে। একজন গৃহিণী সন্তানকে স্কুলে দেয়া, বাজার করাসহ বিভিন্ন কাজে সপ্তাহে ৯ ঘণ্টা গাড়ি চালান। ঘণ্টায় ১৩ দশমিক ৮৫ ডলার হিসেবে বছরে সেই কাজের পারিশ্রমিক দাঁড়ায় ৬,৪৮২ মার্কিন ডলার। উপরন্তু জরিপ বলছে- সন্তানদের পড়ালেখায় একজন মা সপ্তাহে ১০ ঘণ্টা সময় দেন। একজন শিক্ষিকার বেতন হিসেবে ঘণ্টায় ১৮ দশমিক ২৩ ডলার হিসেব করলে বছরে সেই কাজের পারিশ্রমিক দাঁড়ায় ৭,২৯০ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রে স্যালারি ডট কম যে ৬ হাজার মায়ের উপর জরিপ করেছেন, তারা জানিয়েছে সপ্তাহে গড়ে ৪০ ঘণ্টা সন্তানের যত্নে সময় দেন। ঘণ্টায় ৯ দশমিক ৬৫ ডলার করে হিসেব করলে এর জন্য তারা পারিশ্রমিক পেতে পারেন ২০ হাজার ডলার। তাছাড়া, সপ্তাহে ১০ ঘণ্টা ঘর পরিষ্কারে ব্যয় করেন গৃহিণীরা। ঘণ্টায় ৯ দশমিক ৮৮ ডলার ধরলে বছরে তা দাঁড়ায় ৫,১৩৫ ডলারে। তার উপর, সপ্তাহে ৩ ঘণ্টা যদি গৃহিণীরা বাজার-সদাইয়ে ব্যয় করেন, তাদের পারিশ্রমিক ঘণ্টায় ১০ ডলার করে ধরলে বছরে দাঁড়ায় ১,৬৯৬ ডলার। সপ্তাহে আধা ঘণ্টা করে ‘আয়-ব্যয়ের’ হিসেব রাখার কাজে সময় দেন গৃহিণীরা। ঘণ্টায় এ কাজের জন্য তাঁদের যদি ২৪ দশমিক ৯০ ডলার দেয়া হয় বছরে দিতে হবে ৬৪৭ ডলার।’
তাহলে এবার আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গৃহিণীদের স্বামী, ও পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্যেও কাজ করতে হয়। হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবেন যে- আমাদের দেশের বেশিরভাগ পরিবারে ‘স্ত্রী থাকতে স্বামীর রান্না করা’ রীতিমতো ‘ইজ্জত চলে যাওয়ার’ মতো ব্যাপার! স্বামীর টিফিন প্রস্তুত করা, অফিসে যাওয়ার সময় তার কাপড়-চোপড় প্রস্তুত রাখা/ করা এসব নারীকেই করতে হয়। বাংলাদেশের নামকরা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’ বলছে, একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২ দশমিক ১টি কাজ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ কাজের গড় সংখ্যা ২ দশমিক ৭। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের নারীদের বার্ষিক মজুরিবিহীন গৃহকাজের অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
আবারও ফিরে যাই আমেরিকায়। স্যালারি ডট কম-এর ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী- যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যেক গৃহিণী, অর্থাৎ যাঁরা চাকরি করেন না, এমন মায়েরা সপ্তাহে গড়ে ৯৪ ঘণ্টা কাজ করেন। গাড়ি চালক, মনোবিজ্ঞানী এবং অন্য অনেকের কাজের চেয়ে যা প্রায় দ্বিগুণ।
কথা হচ্ছে, ক্যাসেলবেরির সেই পোস্ট সারা পৃথিবীতে ভাইরাল হলেও এই পোস্ট কি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চিন্তার জগতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভাইরাস ঢুকিয়ে দেবে? নাকি পুরুষতন্ত্র নারীর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করতে শুরু করবে এক লহমায়? জানি না, তবে প্রত্যাশা তো করতেই পারি। অন্তত একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য, তাই না?

x