সেপ্টেম্বর এগারোর সকাল

মাহমুদ আলম সৈকত

মঙ্গলবার , ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ
17

নাইন ইলেভেন ট্রাজেডি বা টুইন টাওয়ার হামলা’র ইতিহাস নতুন করে বলার কিছু নেই। বিশ্বের সবচে বিধ্বংসী জঙ্গী হামলা হিসেবেই স্বীকৃত। এর ভয়াবহতা নিয়ে অন্তর্জালে প্রচুর নিবন্ধ-প্রবন্ধ, ডকুমেন্টরি, ম্যুভি ছড়িয়ে আছে। সেসবেরই একটি এই লেখার উপজীব্য। মূলত একটি আলোকচিত্র। আলোকচিত্রীর নাম জেমস ন্যাচওয়ে। জেমস আমেরিকান ফটোসাংবাদিক এবং ওয়ার ফটেগ্রাফার। দক্ষিণ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, পূর্ব এবং পশ্চিম ইউরোপ, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বেশিরভাগ যুদ্ধ, বিদ্রোহ, দাঙ্গা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের লাখো আলোকচিত্র তার ক্যামেরায় বন্দী হয়েছে। যার অনেকগুলোই সাড়া জাগানো। বাগদাদে গ্রেনেড হামলায় আহত হন, অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান সেদিন। পেয়েছেন আলোকচিত্র বিশ্বের সর্বনমস্য পুরষ্কার এবং স্বীকৃতি। যার অন্যতম রবার্ট কাপা গোল্ড মেডেল (৫ বার), ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো এওয়ার্ড (২ বার), ড্যান ডেভিড প্রাইজ, হেইঞ্জ এওয়ার্ড ইত্যাদি। দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন টাইম ম্যাগাজিনের সঙ্গে।এছাড়া ম্যাগনাম ফটোজ, সেভেন্থ ফটো এজেন্সি’রও সভ্য ছিলেন জেমস।
২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ার ট্রাজেডির সময় তিনি নিউইয়র্কেই ছিলেন এবং কাজের সূত্রে টুইন টাওয়ারেই অবস্থান করছিলেন। সেপ্টেম্বরের সেই সকালটিও আর পাঁচটি সকালের মতোই ছিলো। তিনি তার ক্যামেরা এবং আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি সমেত টুইন টাওয়ারের দক্ষিণ টাওয়ারটি (সাউথ প্লাজা) সামনের একটি সড়কে শ্যুটিং ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎই ভূকম্পনের মতো অনুভব করলেন। চোখ তুলে এদিক সেদিক তাকাতেই দেখতে পেলেন উত্তর টাওয়ারটি ধোঁয়ায় ঢাকা, দক্ষিণ টাওয়ারের উপরের দিকে আগুন জ্বলছে! বাকিটা জেমসের জবানীতেই শুনি, ‘‘ প্রথম ধাক্কায় বুঝতে পারছিলাম না যে কি ঘটেছে। উত্তর টাওয়ারটি দেখতে পাচ্ছিলাম না, এতোই ধুলো আর ধোঁয়া। কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থাটা কয়েক পলকেই কেটে যায়। দ্রুত হাতে ক্যামেরা নিয়ে রাস্তা পেরোই আমি। ছবিতে যে হলিক্রসটি দেখতে পাচ্ছেন সেটি দেড় ব্লক দূরের একটি চার্চের। রাস্তা পেরুতে পেরুতে আমার মনে প্রথম যে কথাটি মনে হলো, যে এটি আল কায়েদার আক্রমণ। আমি আমাদের সমসাময়িক ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্টই ওয়াকিবহাল ছিলাম এবং আল কায়েদা বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম কেননা কিছুদিন আগেই আফগানিস্তান থেকে ফিরেছি। তো সেই ক্রসটি প্রায় দেড় ব্লক দূরের চার্চের ছাদে পোঁতা ছিল এবং আমি এটিকে কেবল আমাদের সংস্কৃতির প্রতীক হিসাবে দেখেছি, তাই আমি এটিকে ফ্রেমে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওই সময়টা ছবি তোলার মতো তেমন উজ্জ্বল ছিল না, কারণ চারদিকে ধুলো আর ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল মুহূর্তেই। ক্যামেরা রেডি করতে করতেই দেখলাম উত্তর টাওয়ারটি ভোজবাজির মতো উবে গেছে। বিশ্বাস করা শক্ত ছিল যে আমি এটি নিজের চোখে দেখছি – সমস্ত স্টিলের গার্ডার, সেসব হাজার হাজার পাউন্ড ওজনের, দেশলাই কাঠির মতো বাতাসে উড়ছে। মানুষজন হাওয়ায় ভেসে ভেসে নামছে, গড়িয়ে পড়ছে। আমার মন আক্ষরিকভাবেই স্লো মোশনে চলে গেছে যেনো। মনে হচ্ছিল সমস্ত কিছু আমার দিকে এত ধীরে ধীরে ভেসে আসছে, আর আমি ওইখানে দাঁড়িয়ে আছি অনন্তকাল ধরে। টিটি’র (টুইন টাওয়ার) সামনে আমি সেদিন একটা চলচ্চিত্রের শুটিং করছিলাম এবং ক্যামেরা রোলটি ছিলো থার্টি সিক্স ফ্রেমের। রোলে একটাই মাত্র ফ্রেম ফাঁকা ছিলো। সেই একমাত্র ফ্রেমে আমি এই ছবিটি ধারণ করি। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে আমি জায়গাটি ছেড়ে সরে আসতে শুরু করি। ততক্ষণে আমার ক্যামেরা, আমার শরীর সবই ধূসর ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়েছে। হাতে মাত্রই মিনিট খানেকের সময়…দৌড়ে পেরিয়ে আসি জায়গাটা। বিশ্বাস করুন, মিনিট খানেক দেরি হলেই আমি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়তাম।’’
‘ফোটোবক্স: দ্য এসেনশিয়াল কালেকশন অব টু ফিফটি ইমেজেস ইউ নিড টু সি’ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে এই আলোকচিত্রটি।

x