সেদিন পেরেছিলাম আমরা…

মাধব দীপ

শনিবার , ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ
58

মনে আছে সেই কথা? না, আপনার বয়স যদি তিন দশকের কাছাকাছিও হয় তবু আপনার মনে থাকার কথা না। কারণ, আপনার বয়স আজ ৩০ হলে ঘটনাটি ঘটার সময় আপনার বয়স ছিলো সাত বছর। তার মানে, ঘটনাটি মনে রাখার মতো বয়স আপনার তখন ছিলো না। তবে হ্যাঁ, আপনি তা শুনে থাকতে পারেন তখন এবং পরবর্তিতে তা নিশ্চয়ই আপনার মনে গভীর দাগ কেটেছিলো। অন্তত, আমার কিশোর মনে তখন গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিলোএটা আমি হলফ করে বলতে পারি। তাই, মাঝেমাঝে ওই প্রসঙ্গটি এলে বুকের গহীনের সেই ক্ষত আজও জ্বলজ্বল করে জ্বলে ওঠে।

বলছিলামপুলিশ সদস্যদের বর্বরতার শিকার কৈশোর উত্তীর্ণ একটি মেয়ের কথা। ২৩ বছর আগের আগস্ট মাস। হ্যাঁ, আগস্ট মাসের ২৪ তারিখ ছিলো সেদিন। সালটি ছিলো ১৯৯৫।

ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে তিনটা। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিস্তব্ধতা ভেঙে মহাসড়ক দিয়ে শাঁশাঁ করে নাইট কোচ ছুটে চলছে। একটি মাত্র চায়ের দোকানে দুতিন জন ক্রেতা বসে আছে। মহাসড়কের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ১৪ বছরের এক কিশোরী। বাসের জন্য অপেক্ষায় সে। চোখেমুখে তার উদ্বেগউৎকণ্ঠা। হঠাৎ একটি পুলিশের পিকআপ এলো। পিকআপের ভিতর থেকে তিন পুলিশ লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিশোরীর দিকে। ‘কোথায় যাবে’, এমন প্রশ্ন কিশোরীকে করল এক পুলিশ। কিশোরীটি জানালদিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় তার মায়ের কাছে যাবে। ঢাকা থেকে এসেছে। ঢাকায় একটি বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতো সে। মায়ের জন্য তার প্রাণ কাঁদছে। তাই সে মায়ের কাছে যেতে চায়।

মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কিশোরীকে ওই পুলিশ সদস্যরা তাদের সঙ্গে পিকআপে তুলে নিল। কিছু দূর যাওয়ার পরই এই ভালোমানুষী চেহারার পশুগুলোর আসল রূপ উন্মোচিত হয়। রক্ষক তখন ভক্ষকের বেশে। পিকআপেই ধর্ষণের চেষ্টা। হায়েনাদের কাছ থেকে রক্ষা পেতে গাড়ি থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কিশোরীটি। আবারও তাকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নেয় তারা। স্থানীয় দশমাইলের আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিশোরীকে নিয়ে যায় তারা। সেখানে উপর্যুপরি ধর্ষণ শেষে হত্যা করে কিশোরীকে। গাড়িতে কিশোরীর দেহ তুলে নেয়। চলন্ত গাড়ি থেকেই ছুড়ে ফেলে দেয় হতভাগ্য কিশোরীর নিথর দেহ (তথ্যসূত্র: নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট)

দিনাজপুরের সেই কিশোরীর নাম ইয়াসমিন বেগম। পুলিশবেশী হায়েনার দল ইয়াসমিনকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যায়নি। মাকে দেখতে যে মেয়েটি ঢাকা থেকে ছুটে চলে এসেছিল একদম একা। ভয়ডর পেছনে ফেলে পৌঁছে গিয়েছিল মায়ের দোরগোড়ায়। কিন্তু মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া দূরের কথা, ১৪ বছরের ইয়াসমিনকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে পুলিশরূপী সেই দুর্বৃত্তরা। শুধু তাই নয়, দুনিয়া থেকেই তাকে বিদায় করে দেয় নির্মম নির্যাতন শেষে।

আজ থেকে ২৩ বছর আগে ইয়াসমিন ধর্ষণ ও খুনের ওই ঘটনায় সারা দেশ যেনো কেঁপে ওঠেছিল। সাধারণ প্রতিবাদী মানুষ নাড়িয়ে দিয়েছিলো তৎকালীন সরকারের ক্ষমতার ভিতও। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডটি তাই সর্বাধিক আলোচিত ঘটনারও একটি।

ওই ঘটনার বিস্তারে এক সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করতেই হয়। যিনি চাপের মুখেও পেশাগত দায়িত্ব সাহসের সাথে পালন করেছিলেন। সেই সাংবাদিকের নাম মতিউর রহমান। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৯৯৫ সালের ২৫ আগস্ট স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল দৈনিক উত্তরবাংলা পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমানকে জানান যে, পুলিশ সদস্যরা একটি মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। রহমান ২৬ আগস্ট নিহত মেয়েটির পরিচয় জানতে পারেন এবং এ সম্পর্কে পত্রিকায় লিখতে চান কিন্তু পুলিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিষেধ করে। সেদিন রাতে পুলিশ বাহিনী রহমানের পত্রিকার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। রহমান তাঁর প্রতিবেশীর বাসা থেকে বিদ্যুৎ ধার করে সংবাদটি প্রকাশ করেন। সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পর তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করে এবং লুটপাট করে। অঞ্চলটিতে কারফিউ জারি করা হয় এবং পুলিশ কারফিউ ভাঙা বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করলে দিনাজপুর শহরের সামু, সিরাজ, কাদেরসহ ৭ জন নিরাপরাধ ব্যক্তি নিহত হন এবং প্রায় শতাধিক মানুষ আহত হন।

পরে ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি তিনটি আদালতে ১২৩ দিন বিচার কাজ শেষে ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ আবদুল মতিন মামলার রায় ঘোষণা করেন। অতঃপর মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয় আট বছর পর, ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। মামলার অন্যতম আসামী এএসআই মইনুল হক ও কনস্টেবল আব্দুস সাত্তারকে রংপুর জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ২০০৪এর ১ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অপর আসামি পিকআপ ভ্যানচালক অমৃত লাল বর্মণকে রংপুর জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটে।

ইয়াসমিনের স্মরণে দিনাজপুরে মহিলা পরিষদ ‘ইয়াসমিন স্মৃতিস্তম্ভ’ নামে একটি মন্যুমেন্ট করা হয়েছে। কথা হচ্ছেসেদিন তো আজকের মতো ‘ব্যাঙের ছাতার মতো’ এত্তোএত্তো সংবাদপত্র ছিলো না! টেলিভিশন ছিলো না। টকশো ও এর মাত্রাতিরিক্ত টকশোজীবী ছিলেন না। রেডিও ছিলো না। অনলাইন নিউজপোর্টাল ছিলো না। এমনকি আজকের মতো এত্তোএত্তো শিক্ষিত (!) মানুষও ছিলো না। এতোসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ছিলো না। অথচ, আজ আমাদের কী নেই? কিন্তু তবু আমরা নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এককাট্টা হতে পারছি না কেনো? জেগে ওঠতে পারছি না কেনো?

আমরা এখন হরহামেশাই দেখছি নারী নির্যাতনের ভিন্নভিন্ন রূপ। পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে২০১৭ সালের প্রথম ১০ মাসে ধর্ষণসহ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৭৩৭টি। ২০১৬ সালে একই ধরনের ঘটনার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৫৩টি। সে হিসাবে এসব ঘটনা বেড়েছে ২৮৪টি। ২০১৬ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৭০৫টি, ২০১৭এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩৪টি। একইভাবে গণধর্ষণ ১৩৯ থেকে ১৯৩ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৩১ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫২টি। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের অভাব, পিতৃতন্ত্র ও বৈষম্যমূলক আইন নারী নির্যাতন বাড়ার পেছনে দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০১৬ সালে নথিভুক্ত মোট নারী নির্যাতনের মধ্যে মেয়েশিশু নির্যাতনের হার ২০ শতাংশ। মেয়েশিশুদের মধ্যে ১২১৭ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি (৬০.৬৩%) নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১৮ বছরের নিচে প্রতিদিন গড়ে ১.৭ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর মেয়েশিশু ছাড়া অন্য নারীদের ক্ষেত্রে নির্যাতনের হার ৮০ শতাংশ।

২০১৬ সালে ৫৫টি জেলায় ও ৩৭৯টি উপজেলায় নির্যাতনের শিকার নারীদের তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্রাক একটি জরিপ চালায়। নথিভুক্ত তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, মোট নির্যাতনের মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের হার ৬৭ শতাংশ, যৌন নির্যাতনের হার ১৯ শতাংশ এবং মানসিক নির্যাতনের হার ১৪ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে শারীরিক নির্যাতন এবং শিশুদের মধ্যে যৌন নির্যাতন। যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচে শিশুদের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ১.৭ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে (সূত্র: দৈনিক সমকাল, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭)

আচ্ছা, ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কী করে সেদিন দিনাজপুরসহ সারাদেশের মানুষ জেগে উঠেছিলো? সত্যি আজও তা আমাকে অবাক করে। আজ যেখানে সেইধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে হরদম, আজ যেখানে চোখের সামনে লাশ হয়ে মানুষ পড়ে থাকলেও আমরা নির্বিকার থাকছি! সেই আমরাই সেদিন কীভাবে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পেরেছিলাম, ভাবতেই অবাক লাগে! বড় বেশি লজ্জাও কি লাগে না আমাদের?

x