সেই সমাজের একজন হতভাগা শিক্ষক

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ৫ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৭ পূর্বাহ্ণ
292

শিক্ষা সুষ্ঠু সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক মৌল উপাদান। আর এই উপাদান যে সমাজে যত বেশি প্রবেশ করেছে সেই সমাজ ততবেশি উন্নয়ন, উৎপাদন ও কল্যাণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। একটি জাতির, সভ্যতার প্রধান মাপকাঠি শিক্ষা। শিক্ষাকে তাই যুগে যুগে জাতির মেরুদন্ড হিসাবে সকলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আর এই নিয়ে নানা আলোচনা দীর্ঘদিন শুনে আসছি। ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’ আধুনিক সমাজ মেনে নিচ্ছে না, এই বক্তব্যকে আধুনিক সমাজ প্রত্যাখান করছে এবং বক্তব্যটি যথার্থ নয়। প্রকৃত অর্থে ‘শিক্ষকরাই’ জাতির মেরুদণ্ড এই কথাটি যথার্থ, সময়োপযোগি ও ন্যায় সঙ্গত। তবে প্রশ্ন কোন শিক্ষক? অবশ্যই আদর্শ শিক্ষক। একজন আদর্শ শিক্ষক কেমন হবেন-তাঁর কি কি গুণাবলী থাকবে-তিনি দেখতে কেমন হবেন, নানা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন।
তাহলে প্রশ্ন একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রধান বৈশিষ্ট্য কি? শিক্ষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘শিক্ষার্থীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করবেন-শিক্ষককের মন মানস দিয়ে। আর এই কাজটি যিনি নিজ দায়িত্বে করবেন তাঁকে আদর্শ শিক্ষক বলা হবে।’ শিক্ষার্থীর প্রতিভা জাগ্রত করার এই মহান কাজটি শুধু তিনিই করতে পারেন যিনি শিল্পী। শিল্পীর মন ও মানস না থাকলে কখনও এই কাজটি করা সম্ভব নয়। অথচ শিক্ষককে বলা হয় ‘কারিগর’। একজন কারিগর আর একজন শিল্পীর তফাৎ বুঝার সময় এসে গেছে। শিক্ষক কারিগর এই কথা সনাতন। শিক্ষকরা শিল্পী এই কথাই যথার্থ-যুগোপযোগী। সুতরাং শিল্পীর বোধ ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে যিনি দায়িত্ব পালন করবেন তাঁকে বলা হবে শিক্ষক। আর যিনি এই কাজটি করতে ব্যর্থ হবেন তাকে শিক্ষার্থী গ্রহণ করবে না, প্রকৃত পক্ষে তিনি কারিগর-শিল্পী নন।
সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম-আগেও, এখনও ; বেসরকারি বেশি। বেসরকারি জন্ম সাধারণত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের উৎসাহ ও উদ্যোগে; ইদানিং অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে ব্যক্তি বিশেষের উচ্চাকাঙ্খার প্রতীক হিসাবে। এই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরণ, শিক্ষকদের নিয়োগ, শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে আগেও বিতর্ক ছিল এখনও আছে। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় এক সেমিনারে বক্তব্যে বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতের চেয়েও আমাদের শিক্ষাখাতে সিস্টেম লস বেশি। এ অবস্থা বন্ধ করতে না পারলে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ অর্থের রক্তক্ষরণ বাড়বে। শিক্ষার নামে অপ্রয়োজনীয় হওয়া সত্ত্বেও এক এক এলাকায় অসংখ্য স্কুল কলেজ গড়ে উঠছে। একটি থানায় ১৬টি কলেজ আছে অথচ প্রতি কলেজে ২০/৩০ জনের বেশী ছাত্র নাই।’ (শিক্ষাব্যবস্থা প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ)
মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের এই বক্তব্য দেশের প্রতিটি সংবাদ পত্রে ছাপানো হয়। তাঁর এই উপলব্ধি যথার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হল এই প্রতিষ্ঠান গুলো পরিচালনার সুযোগ দিল কারা? এইসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কতোটা হয়, তা ধর্তব্য নয়, বিচার্যও নয়। রুটিন থাকে, সে রুটিন মাফিক ঘন্টাও বাজে, স্কুল বসে, ছুটি হয়, শিক্ষার্থী ক্লাস টপকায়-কিন্তু সে কতোটা শিক্ষা লাভ করলো, কতোটা জ্ঞানার্জন করলো, কতটা যোগ্যতার ভিত্তিতে, তাও জিজ্ঞাস্য বটে।
ইংরেজি Education কথাটির মূল ল্যাটিন অর্থ হল,‘‘ব্যক্তির অভ্যন্তরীন সম্ভাবনাকে অগ্রসর করে নেয়া।’’ শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে শিক্ষাবিজ্ঞানীরা বলেছেন,‘Education is nothing but the gradual and harmonious development of body, soul and mind যা কিছু শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ করা হয় তাই শিক্ষা। আর শিক্ষা বলতে সু-শিক্ষাকে বুঝায়।’ শিক্ষার সংজ্ঞা যাই হোক না কেন আমাদের দেশে শিক্ষাগ্রহণ এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের আগে প্রয়োজন একটি শিক্ষানীতি। এই দেশে ব্যবসা নীতি হয়েছে, খাদ্যনীতি হয়েছে, চাকুরীনীতি হয়েছে, স্বাস্থ্যনীতি হয়েছে কিন্তু একটি জাতির মানদন্ড নির্ভর করে তার শিক্ষার উপর। দূর্ভাগ্য এই দেশে শিক্ষার কোন নীতি হয়নি, হচ্ছে না। শিক্ষা-অভিমানীরা অনেক কথা শিক্ষা সম্পর্কে বলেছেন কিন্তু সমাধান হয়নি। না হওয়ার কারণ কি? কারণ যাই হউক স্বাধীনতার ৩৮বছরে শিক্ষার জন্য কম সেমিনার হয়নি, আলোচনা হয়নি কিন্তু কাজটা কি হয়েছে ? কিছুই না, কারণ উৎঘাটন করাও যায়নি-যাবেও না।
স্বাধীন দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দেশের মধ্যে অনাদৃত। দেশের মানুষ দেশের শিক্ষার প্রতি বীতশ্রদ্ধ। এই শিক্ষার প্রতি ন্যূনতম আস্থা নাই মানুষের। বিত্তবান শ্রেণীর সন্তানরা দেশীয় আমজনতার জন্য চালু শিক্ষাব্যবস্থার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারে কাছেও নাই। বিত্তশ্রেণির সন্তানরা দেশ ছাড়ছে ভাল শিক্ষার আশায়। আবার অভিভাবক কিছুটা সঙ্গতি থাকলে দেশের মধ্যে বিদেশী অনুকরণের বা খাস বিদেশী শিক্ষাব্যবস্থা বেছে নিচ্ছেন। দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই দশা কারো অজনা নয়। তবে কেন পরিকল্পিতভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে? স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন একটি সময়োপযোগি, নান্দনিক, গ্রহণযোগ্য শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হল না? এই যে অবস্থা এর জন্য অভিভাবককে ঢালাও ভাবে দায়ী করা যাবে না। সর্বস্তরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নৈরাজ্য মানুষকে যথার্থ এক অসহায় আবর্তে ফেলেছে-যার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া এককভাবে সম্ভব নয়। এর জন্য শিক্ষক-শিক্ষা প্রশাসকরা কম দায়ী নয়।
সামগ্রিকভাবে জাতীয় শিক্ষার এই দশায় চিন্তাশীল মানুষকে বাধ্য করেছে শিক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশ্লেষণ এবং এ থেকে কার্যকর পরিত্রাণের উপায় বের করতে। এই অবস্থায় আমাদের হতাশ না হয়ে পারা যায় কি? স্বাধীনতার পর অনেক শিক্ষানীতি হয়েছে, কমিশন হয়েছে। কাজ হয়নি। শিক্ষার দিক-নিদের্শনার জন্য কমিটি বার বার রিপোর্ট দিয়েছে কিন্তু কোন কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। কেন ? বার বার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে আমাদের শাসক শ্রেণীকে। ২০০১ সালের পূর্বে আমাদের দেশীয় শিক্ষায় নকলের মহোৎসব চলছিল। বলাবাহুল্য যে, জোট সরকার এই উৎসবের মূল উৎপাটন করেছে। শিক্ষার কিছুটা প্রসারতায় মনোনিবেশ করেছিল সেই সরকার। নকল বন্ধ করার যে মানসিকতা নিয়ে সরকার কাজ করেছে একজন লেখক ও শিক্ষক হিসাবে তার প্রশংসা না করে পারছিনা। কিন্তু নকল বন্ধের মাধ্যমে শিক্ষার প্রসারতা আনায়ন সম্ভব না। জাতীয় জীবনে শিক্ষার প্রসারতা, শিক্ষার সংস্কার একটি সরকারের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না, এটি একটি জাতীর শিক্ষানীতির উপরও নির্ভরশীল। শিক্ষানীতি ব্যতিত একটি জাতির শিক্ষা ভূলুন্ঠিত হয়ে পড়ে।
মাঝে মাঝে শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন বেতন ভাতা বৃদ্ধির জন্য। এখনও আন্দোলন চলছে। আমি তাঁদের আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে চাই যে, আপনাদের যে বেতন ভাতা দেয়া হচ্ছে তা যৌক্তিক নয়। আপনাদের নিকট শ্রদ্ধার সাথে আমার প্রশ্ন এক দেশে নানা শিক্ষাব্যবস্থা-স্তর-বৈষম্য। এই বিষয়ে আপনারা আমার সাথে একমত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে-শিক্ষকদের মননে আজ জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে অর্থাজনই বড়। সাধনা, জ্ঞানচর্চা, শিক্ষাদান সবই এখন অপসৃয়মান। সাটিফিকেট সর্বস্ব উচ্চাভিলাষী ডিগ্রীধারী তৈরীতে আমাদের আয়োজন। যারফলে সরকার কথা দিয়েও কথা রাখছেননা। আমরাও আদায় করে নিতে পারছি না। সরকার বলছে শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ, তাহলে শিক্ষকদের অর্থ না দিয়ে কোন খাতে এত বরাদ্দ সরকার দিচ্ছে তাও দেখা দরকার। শিক্ষকদের পেশাগত মান বৃদ্ধির জন্য যে কাগুজে বিধান আছে, তা বাধ্যতামূলক নয় বলে ঐচ্ছিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একজন শিক্ষকের পদোন্নতি, স্কেল উত্তরণ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। অথচ এই ব্যবস্থা সুচারুরূপে পরিচালিত হলে সর্বাধুনিক শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষকদের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব সর্ম্পকে সচেতন ও সতর্কতা উভয়ই বৃদ্ধি পেতো। বর্তমানে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার মান নিম্নমুখী হওয়ার কারণ শিক্ষা সম্পর্কে অধিকাংশ শিক্ষকের নিস্পৃহতা এবং শিক্ষকতাকে মাত্রই অর্থোপার্জনের হাতিয়ার হিসাবে মনে করা। পরিতাপের বিষয় হল আজকের অনেক শিক্ষকই বি এড প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন স্কেল উত্তরনের জন্য।
শিক্ষক সমাজের বাইরের কেউ নন, সমাজ যেখানে টালমাটাল সেখানে শিক্ষক দেবদূত হবেন, এ প্রত্যাশা আমি করি না। সমাজ বলতে আমি আমাদের বাঙ্গালী সমাজকে বুঝিয়েছি। এই সমাজ বরাবরই শিক্ষককে চাওয়া পাওয়ার বাইরের বস্তু জগতের মানুষরূপে কল্পনা করেছে। আড়ম্বরহীনতার নামে শিক্ষকের ওপর দারিদ্রতা চাপানো হয়েছে। কিন্তু শিক্ষককে অলৌকিক জগতের বাসিন্দা মনে করার কোন ন্যায় সঙ্গত কারণ আমি খুঁজে পাই না। শিক্ষক সমাজের বাসিন্দা, অন্য দশজন মানুষের মত তারও জীবন যাপনের অধিকার আছে। কিন্তু আজো আমাদের সমাজ শিক্ষককে দেবদূত মনে করে সম্পূর্ণ আলাদা দেখতে চায়। এখানে সংঘর্ষ। এখানে চাহিদার সঙ্গে প্রাপ্তির রফা হচ্ছে না। আর একই কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে নিচ্ছে না। এইটুকু আমাদের শাসকদের বুঝা উচিত নয় কি?
শিক্ষকতায় মেধাবীদের না আসা এবং এলেও বেশি দিন না থাকার কারণ বিশেষণ করতে হবে। মেধাবী শিক্ষক সংকটে শিক্ষা সংকট বাড়ছে। যেহেতু শিক্ষকের অবস্থান শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে, যেহেতু শিক্ষকরা জাতির মেরুদন্ড, সেহেতু এই সনাতনী ধ্যান ধারণা বাদ দিয়ে এবং তা থেকে বের হয়ে শিক্ষকদের ন্যূনতম দাবি পূরণে সচেষ্ট হওয়ার বিধান অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। শাসক শ্রেণী যদি মনে করেন দেশের উন্নয়নের জন্য শিক্ষাকে আধুনিক, বৈজ্ঞানিক দর্শনে সাজানো দরকার-তবে তা হবে। অন্যথায় শাসক শ্রেণী যদি মনে করেন এমন না হলেও আপত্তি নেই, তবে হবে না। আধুনিক বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যাবে জাপান, মালেশিয়ার মত রাষ্ট্র শুধু আধূনিক শিক্ষার কারণে বিশ্বে তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যথায় এত অল্প সময়ে আধুনিক বিশ্বের কাছাকাছি যাওয়া সহজ ব্যাপার ছিল না।
আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কোন প্রকার নিজস্ব দেশ ও সত্তার একত্রিত রূপ দানে ব্যর্থ হচ্ছি বলে আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় ধস নেমে এসেছে। এই ধস থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়ার জন্য সর্বাজ্ঞে প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সকলের চেষ্টায় একটি সুন্দর ও সুচারু জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ এবং পরিচালনাও আজ আমাদের নিরপেক্ষ নয়।
কবির এমন হুঁশিয়ারি যারা উপলব্ধি করতে পারেন তারা অবশ্যই বুঝতে পারেন আমাদের দেশীয় শিক্ষার অস্থিরতা সম্পর্কে। কবি মনে করেন শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষানীতি ও শিক্ষাসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের আরো সচেতনতা দরকার। শিক্ষা সচেতনতা না হলে আমাদের দেশে কি পরিমাণ অস্থিরতা দেখা দিতে পারে তা বোধগম্য নয়। এই প্রসঙ্গে কবি নজরুল স্পষ্ট বলেছেন, ‘‘যদি এখনও এই রকম চলিতে থাকে, তবে বাধ্য হইয়া আরও অনেক অপ্রিয় সত্য কথা আমাদিগকে বলিতে হইবে। পবিত্রতার নামে, মঙ্গলের নামে এমন জুয়াচুরিকে প্রশ্রয় দিলে আমাদের ভবিষ্যৎ একদম ফর্সা’’। (সূত্র ঃ বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা: সংকট ও সমাধান)
আমাদের শিক্ষাব্যস্থায় আজ কালো টাকার মালিক, অশিক্ষিত, মূর্খ লোকদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। এই দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাকে সার্বজনীন তথা সকলের কাছে পৌঁছে দিতে হলে সর্বাজ্ঞে প্রয়োজন সকল মহলের নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র মনোযোগ। আর এর জন্য প্রয়োজন সর্বাজ্ঞে শিক্ষককে সন্তুষ্ট করা। কারণ একটি ঘোড়াকে আপনি পানি খাওয়ানোর জন্য নদী পর্যন্ত টেনে নিতে পারবেন কিন্তু পানি খাওয়াতে পারবেন না। আর এক্ষেত্রে সর্বাজ্ঞে প্রয়োজন অভুক্ত শিক্ষকের মুখে আহারের ব্যবস্থা করা। শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলে শিক্ষককে বঞ্চিত করার মানসিকতা দূর করা। শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত অর্থের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করে শিক্ষকের সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবে। সর্বাজ্ঞে মনে করতে হবে জাতির মেরুদণ্ড শিক্ষক যাতে আর্থিকভাবে নিশ্চিত জীবন যাপন করতে পারেন ।
আমাদের মত অর্থনৈতিকভাবে গরীব ও সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ দেশে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে একটি ন্যায়ভিত্তিক, যুগোপযোগি, আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত, অসামপ্রদায়িক, বৈষম্যহীন, জনকল্যাণমুখী ও বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন এই কাজে নিয়োজিত শিক্ষকের দিকে নজর দেয়া। কারণ একজন দক্ষ ও মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন শিক্ষক পারেন তার শিক্ষার্থীকে সময় ও আধুনিক সময়ের সাথে গড়ে তুলতে। অথচ এই জায়গায় বার বার আমরা ভুল করছি। একটি আধুনিক শিক্ষানীতি, বৈষম্যহীন শিক্ষানীতির জন্য সকলের মনোনিবেশ থাকলে শিক্ষক নিয়োগ এবং তার পরিচর্চাও হবে উপযুক্ত এতে সমগ্র শিক্ষার উন্নয়ন হবে। শিক্ষাদান একটি সৃজনশীল কর্ম এবং এই শিক্ষাদানের মানের উপরই নির্ভর করে আগামী দিনের শিক্ষিত জনসম্পদের গুণাগুণ। এজন্য সমাজের সর্বপেক্ষা প্রতিভাশালী ব্যক্তিগণকে শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে দীর্ঘদিনের অবহেলার ফলে শিক্ষকতা পেশা, বিশেষ করে বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকতা, এই আকর্ষণ ক্ষমতা নিদারুণভাবে হারিয়ে ফেলেছে। তাই আজ বেশি করে প্রয়োজন শিক্ষার সকল স্তরে উচ্চতম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আগমন। এবং শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড না ভেবে প্রথমে শিক্ষককে জাতির মেরুদণ্ড ভাবতে শেখা। কারণ একজন অদক্ষ শিক্ষক কখনও জাতির মেরুদন্ড ঠিক করতে পারে না। তাই শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাসহ শিক্ষার উন্নয়নে আধুনিক ধ্যান-ধারণার প্রয়োগ সময়ের দাবী। যে সমাজে অবহেলিত শিক্ষকের হাতে হাতকড়া পরানো হয়। কান ধরে উঠবস করানো হয় আমি সেই সমাজের একজন নিরীহ হতভাগা শিক্ষক। কিন্তু কেন? শিক্ষকতার পরিবেশ আজ সংকুচিত। শিক্ষকতার পরিবেশ দিন-আধুনিক শিক্ষক হতে চাই। কারণ আধুনিক শিক্ষক ছাড়া আধুনিক মানুষ তৈরী অসম্ভব।

Advertisement