সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৮ at ৫:০৩ পূর্বাহ্ণ
382

সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষামূলক ভাবে ২০০৮ সাল থেকে চালু করা হয়। যা কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতি হিসাবে অধিক পরিচিত হয়েছিল। নাম পরিবর্তন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে কাজ পরিবর্তন হয়নি। শিক্ষাবিদরা এই পদ্ধতিকে শিক্ষার উন্নয়ন হিসাবে দেখছেন। একজন শিক্ষাসেবক হিসাবে আমিও এই পদ্ধতিকে স্বাগত জানাই। ২০০৭ সালের শেষ দিকে এই পদ্ধতি নিয়ে যখন বিগত সরকার কাজ শুরু করে তখন বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এই বিষয়ে আমার সাক্ষাতকার এবং যাঁরা এই পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেছেন তাদের কাছে আমার কিছু সুপারিশ ও মতামত নিয়ে লিখেছিলাম, পরবর্তী সময়ে দেখেছি আমার মতামতের কিছু বিষয় সংযোজন করা হয়েছে। আমাদের দেশে শিক্ষা সংস্কার কমিটি, মানউন্নয়ন কমিটি, পরীক্ষা সংস্কার কমিটি, শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার কমিটিসহ নানা কমিটি, নানাভাবে কাজ করছে, প্রকৃত অর্থে কাজের কাজ বলতে যা হয়েছে তাহল যিনি ক্ষমতায় গিয়েছেন তিনি তার মত করে একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করছেন এবং বোকা ও সাধারণ মানুষদের বাহাবা কুড়িয়েছেন। কার্যত সংস্কারের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে এই দেশের আপাময় জনসাধারণের কোন উপকার হয়নিসম্ভাবনাও দেখছিনা।

গতানুগতিক ধারা থেকে বের হতে না পারার কারণে আজ আমরা শিক্ষা ক্ষেত্রে যথার্থ অবস্থানে পৌঁছতে পারিনি। অব্যাহতভাবে গতানুগতিক যে ধারা চলছে তা দিয়ে কি হচ্ছে? শিক্ষিত বেকার বাড়ছে, শিক্ষা আর সার্টিফিকেট সর্বস্ব ডিগ্রীধারী একশ্রেণির বোকা তৈরী করে জাতিকে পঙ্গু করে দেয়ার যে চক্রান্ত অতীত থেকে চলছে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে তা শুধু নতুন রূপ লাভ করে। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি, সৃজনশীল প্রশ্ন ও শিক্ষা পদ্ধতি যেকোন বিবেচনায় ভাল, কিন্তু এই পদ্ধতিকে শিক্ষার্থীদের দৌড়গোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য দরকার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, দক্ষ ও যোগ্য একদল শিক্ষক, যাদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর কাছে এই পদ্ধতি পৌছে যাবে, কিন্তু বাস্তবতায় তা কোথায়? দেশের লক্ষ লক্ষ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীকে পড়ানোর জন্য কয়জন শিক্ষককে এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে? তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় এই পদ্ধতির ব্যবহার কী হল? কিছুই না। এখানেই শিক্ষার বড় সমস্যা। শিক্ষার বহুমাত্রিক এই সমস্যা নিয়ে বহু নিবন্ধ, প্রবন্ধ লিখেছিউল্লেখযোগ্য কথা বার্তা আমরা বলছি, অনেকেই বলছে কিন্ত কার্যত আমরা তার বাস্তবায়নে কতটুকু মনোসংযোগ করলামপ্রশ্ন থেকেই যায়। এতসব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করতে চাই সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি নিয়ে

সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিকে পাঁচটি সাধারণ বিষয়ে আলোচনা করা যায়এর প্রত্যেকটি ধাপ নিয়ে আজ আলোচনা করব. জ্ঞানের স্তর, নম্বর০১ . অনুধাবন দক্ষতার স্তর, নম্বর০২ . প্রয়োগ দক্ষতার স্তর, নম্বর০৩

. উচ্চতর চিন্তন দক্ষতার স্তর, নম্বর০৪ . বহুনির্বাচনী প্রশ্ন।

. জ্ঞানের স্তর :

এই স্তরটি হলো দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন স্তর বিন্যাস। কেননা, এর উদ্দেশ্য হল আগে জানাশোনা বিষয়ে কিছু বিষয় স্মরণ করা। এই স্তরে যেসকল বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে তাহলসাধারণ শব্দ ও প্রত্যয় সমূহ, পদ্ধতি, বিশেষ তথ্য, প্রক্রিয়া, নীতিমালা স্মরণ করা বা চিনতে পারা। এই অংশে প্রশ্ন হবে অতি সাধারণ। পাঠ্যপুস্তক হতে কোন কিছু জানা ও চিনতে পারার প্রক্রিয়া এটিযেমন : কী, কে, কখন, কোথায়, কী বোঝ, কাকে বলে ইত্যাদি বিষয় সমূহ। যে প্রত্যয় বা বিষয়টি লিখতে দেয়া হবে তা দৃশ্যকল্পে আলোচনা করা হয়ে থাকে। সুতরাং এই প্রক্রিয়ায় উত্তর তৈরীর ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে আলোচনা হতে উত্তর বের করা সম্ভব। যদি বলি ‘সৃজনশীল’ প্রশ্ন নিয়ে ‘কে’ আলোচনা করেছেন, ‘কখন’ করেছেন, ‘কোথায়’ করেছেন, ‘কাকে’ এই বিষয়ে বুঝিয়েছেনইত্যাাদি। দৃশ্যকল্প হতে এইসব প্রশ্নে উত্তর বের করে আনা সম্ভব।

. অনুধাবন দক্ষতার স্তর :

অনুধাবন অর্থ হল বোঝা। অনুধাবন দক্ষতার স্তর বলতে বুঝায় কোন কিছু বোঝার দক্ষতাকে। তথ্য, নীতিমালা, সূত্র, প্রয়োগ, নিয়ম, পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া ইত্যাদি বোঝার যে দক্ষতা তা হল অনুধাবন করার দক্ষতা। কেবল মাত্র একটি বিষয় বুঝতে পারলেই তার প্রয়োগপ্রক্রিয়া, সারণী, চিত্রের সাহায্যে উপস্থাপন করা সহজ হবে। বিষয়বস্তু না বুঝলে কোনমতে এই বিষয়টি উপস্থাপন করা যাবে না। এই অধ্যায়ের দৃশ্য কল্পকে সামনে নিয়ে প্রশ্ন করা হবে। দৃশ্যকল্প যদি সারণী, চার্ট, ছবি হয় তাহলে এই সবের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে-‘কী বোঝায়’তার ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। যেমন ঃ ‘ঐঙ২’ বলতে কি বোঝ? এর বিস্তারীত আলোচনা কর।

. প্রয়োগ দক্ষতার স্তর :

প্রয়োগ বলতে বোঝায় আগের অর্জিত জ্ঞান ও অনুধাবনকে নতুন পরিস্থিতিতে কিংবা অপরিচিত পরিস্থিতিতে ব্যবহার করার দক্ষতা। নিয়ম, বিধি, তত্ত্ব, পদ্ধতি, প্রত্যয়, নীতিমালা ইত্যাদি প্রয়োগ করার দক্ষতা এই বিষয়ে পরিলক্ষিত হয়। পদ্ধতির সঠিক ব্যবহার, প্রদর্শন এবং হিসাব সমূহ সঠিকভাবে করতে পারার বিষয়টিও এই পদ্ধতিতে করা সম্ভব হয়। তাই এই প্রক্রিয়ার প্রশ্ন সমূহের উত্তর পাঠ্য বইয়ে সরাসরি পাওয়া যায় না। এই প্রক্রিয়া প্রয়োগের অর্থই হল শিক্ষার্থী বিশেষ পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করবে। এখানে ৩টি বিষয়কে মূলত গুরুত্ব দেয়া হয়

০১। ‘দৃশ্যকল্পের ব্যক্তি’কেন তিনি এই কাজটি করেছেন?

০২। ‘দৃশ্যকল্পের তথ্য’অনুসন্ধান বা পরীক্ষণটি বিশেষভাবে বর্ণনা কর।

০৩। ‘দৃশ্যকল্প হতে’সুনির্দিষ্ট উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি বর্ণনা কর।

আবার এই অধ্যায়ে কোন কোন ক্ষেত্রে হিসাব নিকাশ করাকেও বোঝায়। এই ক্ষেত্রে প্রশ্নের ধরন হবে

০১। নীচের সমস্যাটি সমাধান কর।

০২। প্রদত্ত তথ্য থেকে একটি গ্রাফ বা চার্ট বা ডায়াগ্রাম তৈরী কর।

. উচ্চতর চিন্তন দক্ষতার স্তর :

দক্ষতা বলতে আমরা বুঝিবিশ্লেষণ ‘বিশেষ থেকে সাধারণ’ আবার সংশ্লেষণ-‘সাধারণ থেকে বিশেষ’বিচার বিবেচনা করার ক্ষমতা বা দক্ষতাকে বোঝায়। বিভিন্ন ধরনের একগুচ্ছ তথ্য সংগঠিত করা ও তথ্যগুলোর মধ্যে সর্ম্পক স্থাপন বা চিহ্নিত করা। বিভিন্ন বিষয় থেকে তথ্য ও ধারণা সংগ্রহ করে তা দিয়ে একটি কাঠামো বা নকশা তৈরী করা। এটি চিন্তার দক্ষতা একেবারে সবোর্চ্চ স্তর। এই অংশে শিক্ষার্থীর চিন্তন দক্ষতার মান যাচাই করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কোনটি সংশ্লেষণ, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও যাচাই করা যায় এবং বিশেষ ক্ষেত্রে এই স্তরটি ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এই অংশে বিশেষত : বিশ্লেষণ করো, যাচাই করো, মূল্যায়ন করো, বিচার করো, যথার্থতা নিরূপণ করো, পরামর্শ দাও ইত্যাদি শব্দ যোগে কাজটি হয়ে থাকে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর যুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের বিষয়টিও আসতে পারে।

. বহুনির্বাচনী প্রশ্ন :

পূর্বে মুখস্ত করার বিষয়ে বেশি জোর দেয়া হলেও সংস্কার পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীকে বেশি বেশি মূল্যায়ন করা হবে। এই স্তরে চারটি বিকল্প প্রশ্ন থাকবে। সঠিক বিকল্পকে বলা হয় সঠিক উত্তর এবং ভুল বিকল্পকে বলা হয় বিক্ষেপকসমূহ। চিন্তন দক্ষতার সকল স্তরে প্রশ্ন এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। চিন্তন দক্ষতার সকল স্তরের প্রশ্নের শতকরা হার নিম্নে উল্লেখ করা হল

জ্ঞানের স্তর ঃ ৩০% থেকে ৪০%, অনুধাবনের স্তর ঃ ৩০% থেকে ৪০%, প্রয়োগ স্তর ঃ ১০% থেকে ২০%, উচ্চতর দক্ষতার স্তরর ঃ ১০% থেকে ২০%। জ্ঞান ও অনুধাবনের স্তর থেকে ৭০% এবং প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার স্তর থেকে মোট ৩০% প্রশ্ন থাকবে। প্রচলিত ৫০% নম্বরের সংক্ষিপ্তপ্রশ্ন উত্তর ও রচনামূলক প্রশ্নের পরিবর্তে ৬০% নম্বরের সৃজনশীল প্রশ্নের প্রবর্তন হয়। ব্যবহারিক পরীক্ষা আছে এমন বিষয়ে ৪০% সৃজনশীল প্রশ্ন থাকবে। প্রতিটি সৃজনশীল প্রশ্ন হবে মৌলিক অর্থাৎ যা পূর্বে কখনও ব্যবহৃত হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ৩ ধরনের বহুনির্বাচনী প্রশ্ন থাকবে

. সাধারণ বহুনির্বাচনী প্রশ্ন :

প্রশ্নের আকারে অথবা অসম্পূর্ণ বাক্য হিসাবে দেয়া হয় যা উদ্দীপক হিসাবে কাজ করবে। এর পর থাকবে ৪টি বিকল্প উত্তর। এই প্রশ্ন গুলো সকলের কাছে সমধিক পরিচিত।

. বহুপদী সমাপ্তিসূচক প্রশ্ন :

এই ধরনের প্রশ্ন এবার নতুন। প্রশ্নের বৈচিত্র আনায়নের এই জাতীয় প্রশ্ন গুরুত্বের দাবিদার। সূচনায় ৩টি তথ্য দেয়া থাকবে। ৩টি তথ্য সর্ম্পকিত ৪টি উত্তর থেকে শিক্ষার্থী সঠিক উত্তরটি বাছাই করবে। এই ধরনের প্রশ্ন থেকে শিক্ষার্থীর উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের পথ সুগম হয়। তবে তর্বমানে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন কমিয়ে আনার বা একেবারে বাতিল করার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। ৫ম শ্রেণির জন্য ইতিমধ্যে বাদও দেয়া হয়েছে। গণিতে প্রশ্নপত্র রাখার বিষয়েও একমত হয়েছে। সব মিলিয়ে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানোর কোন চেষ্টা বাদ গেলে এই ব্যবস্থার বিনাশ আমরা চোখে দেখতে পাব। তা যে না হয়।

. অভিন্ন তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন :

একই তথ্য থেকে বিভিন্ন প্রশ্ন বের করাই এই পদ্ধতির মূল বিষয়। প্রশ্ন গুলো পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত থাকে। প্রশ্ন গুলো বহুনির্বাচনী অথবা বহুপদী সমাপ্তি সূচক হতে পারে। এই ক্ষেত্রে জ্ঞান স্তরের যাচাই করা হয় না।

পরিশেষ :

আমাদের শিক্ষা অনেকটা ‘পরহস্তে ধন’ হয়ে পড়েছে। এখানে জ্ঞানার্জন থেকে অর্থার্জন বড়। শিখানো থেকে সাটিফিকেট অনেক দামী, কাজ থেকে বেকারত্ব ফ্যাশন, শিক্ষিত বলতে পারলেই যেন গর্বিত হওয়ার কালচার সৃষ্টি হয়েছে। চাকরী করা জীবনমান উন্নয়নই যেন তীব্র প্রতিযোগিতা। বস্তুত. মুখস্ত করে, গাইড নির্ভর হয়ে ক্লাস টপকানোটা আজ শিক্ষার চালিকা শক্তি। এই ধারা থেকে বের হওয়ার জন্যে সৃজনশীল পদ্ধতি। শিক্ষার্থীর পাঠলব্ধ জ্ঞান ও অনুধাবনকে নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ এবং উপাত্ত ও ঘটনা যাচাই বাছাই করার মতো ব্যবস্থা প্রশ্নপত্রে থাকা প্রয়োজন আর এই প্রয়োজনীয়তাকে লক্ষ্য করেই সৃজনশীল পদ্ধতি। আমরা আশা করব এই পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষা সমপ্রসারণের যেই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা জাতীয় শিক্ষার উন্নয়নে শতভাগ কাজ করবে। জাতি হিসাবে অন্তত. শিক্ষিত যোগ্য হয়ে আমরা দাঁড়াতে পারব। একজন সাধারণ শিক্ষক হিসাবে এই আবেদন আমার রইল।

x