সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে মূল্যায়নের আশা না থাকলে ভাল

মনসুর উল করিম

মঙ্গলবার , ৭ মে, ২০১৯ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ
42



এটা আপনার ২৭তম প্রদর্শনী। এর প্রস্তুতি সর্ম্পকে একটু বলুন-
একদিন ফেসবুকে চিত্রভাষা আর্ট গ্যালারির আয়োজনে বাচ্চাদের একটা ছবির প্রদর্শনীর ভিডিও ক্লিপ দেখি। গ্যালারিটা মইনুর। মইনুল আলম আমার ছাত্র। ছাত্র-শিক্ষক সর্ম্পক আজকাল এমনটা কল্পনা করা যায় না। তার সাথে
আমার যোগাযোগ আত্মিক, ভালোবাসার। তো, তার কাছে ইচ্ছে প্রকাশ করলাম আমার ছোট সিরিজ কাজগুলো দিয়ে একটা প্রদর্শনী করা যায় কী না। সে-ও সানন্দে রাজি হলো। ছোট ক্যানভাস, ছোট ছোট ফ্রেম এভাবে প্রস্তুতি শুরু হলো। দীর্ঘ সময় ধরে আমার চিত্রের যে সারফেস , সেটা ক্যানভাস। অন্য কোনো সারফেসের উপর ছবি আঁকিনি। আমার নিজের কাছে বাইরের যে কাগজগুলো আছে ওগুলোকে কাজে লাগাই। একটা হ্যান্ড মেইড পেপারের অর্ধেক শিটে, চার ভাগের এক ভাগ শিটে করা কাজও রয়েছে এবার। সর্বসাকুল্যে পঁচিশটার মতো ছবি এঁকেছি । এর মধ্যে বাছাই করে বিশটার মতো ছবি মইনুর কাছে পাঠিয়ে দিলাম। প্রদর্শনীতে যে-ছবিগুলো যাচ্ছে এগুলোর সাথে সচরাচর যারা আমার নিয়মিত দর্শক, ছবির মাধ্যমে চেনে তারা চেনা সুরে আগের সেই সঙ্গতিতে এবার খুঁজে পাবে না।

মেঠোপথের গান – এই শিরোনামটি কেন বেছে নিলেন?

এবারের কাজগুলোকে বলছি মেঠোপথের গান। যদিও বলা হচ্ছে গান, গান বলতে যে বিষয়টি আসে, শব্দের সাথে কথার সাথে সুরের একটি সমন্বয় এবং যে সুর বেশী আলোড়িত হয় গানের মধ্যে। আমি ছবিগুলোর ভেতর গানকে একটি বন্ধন হিসেবে দেখছি। এই সময় যে চিন্তাগুলো কাজ করেছে, সেগুলোকে প্রভাবিত করে বন্ধন তৈরি করার চেষ্টা করছি।
গ্রামের মধ্যে যখন হাঁটি, দেখি একটা গাছের সাথে আরেকটা গাছ আছে, বড় গাছের সাথে একটা লতাগাছ প্যাঁচিয়ে বড় হচ্ছে, দুটো গাছের চরিত্র দু’ধরনের, কিন্তু এর মধ্যে একটা বন্ধন তৈরি হয়ে যাচ্ছে। একটা গাছ আরেকটা গাছকে ক্ষতি করছে না, নষ্ট করছে না, ভেঙ্গে ফেলছে না, মিলেমিশে সব এক হয়ে যাচ্ছে। এমন একটা অনুপ্রেরণা কাজ করেছে।

বিষয়বস্তু বা আঙ্গিকগতভাবে এবারের ছবিগুলোর বিশেষত্ব কি?

এবারের ছবিগুলোতে আমি যে রেখাগুলো ব্যবহার করেছি, সচরাচর আমার আগের ছবিগুলোতে এই ধরনের রেখা ব্যবহার করিনি। বা এইভাবে এই কম্পোজিশনে ব্যবহার করিনি। অনেক সরাসরি রং ব্যবহার করেছি। আগের কাজের মধ্যে সরাসরি রং ব্যবহার করলেও একটা রং এর সাথে আরেকটা রং এর সামঞ্জস্য রেখে রং-টা ব্যবহার করতাম। এবার সেটা করেছি অন্যভাবে; লালের জন্য যতটা আয়োজন, নীলের জন্যও ততটাই, সবুজের জন্যও একই । ক্যানভাসের সমস্ত জুড়ে সবাই যেন মিলেমিশে কথা বলতে পারে সেই পরিসরটি রাখার চেষ্টা করেছি। ফর্মকেও বেশী গুরুত্ব দিয়েছি। বৃত্তাকার ফর্ম, কিউবিক ফর্ম কোনো কোনো জায়গায় হয়তো ভাঙ্গা ফর্ম। পুরো ক্যানভাস জুড়েই রং ও ফর্ম নিয়ে খেলেছি। এগুলোই এবারের ছবিগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য। মানুষ যদি নিজেকে ভাঙ্গতে না পারে আর সেই ভাঙ্গাগুলোকে যদি আবার সে একত্রিত করতে না পারে তাহলে তো হল না। একই সাথে মনে রাখতে হবে ভাঙ্গার সাহসটা তখনই করা উচিৎ যখন সে সেটা আবার জোড়া দিতে পারবে, অর্থৎ একটা কম্পোজিশন আমি তখনই নষ্ট করব, একটা রেখাকে তখনই ভাঙ্গব, যখন সেটাকে আমি চাইলে তার কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারব, নতুন করে অর্থপূর্ণ করে গড়ে তুলতে পারব।

চট্টগ্রাম ছেড়ে এখন রাজবাড়িতে থাকছেন, বুনন নামে ওখানে একটি আর্টস্পেস দিয়েছেন, এখনকার জীবন-যাপন ও ভাবনা নিয়ে যদি কিছু বলেন –

চট্টগ্রামে দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর জীবনযাপন করেছি। আজ প্রায় তিন বছর হল স্থায়ীভাবে রাজবাড়িতে বসবাস করছি। শৈশব-কৈশোরের যে অনুভূতি নিয়ে বেড়ে উঠেছিলাম, এখন গিয়ে দেখছি তার কোনোটাই এর মধ্যে আমি পাচ্ছি না। গত পঞ্চাশ ষাট বছরের মধ্যে একটা আমূল পরিবর্তন সমাজের মধ্যে এসেছে। সামাজিক পরিবর্তন যেমন, ধর্মীয় পরিবর্তনটাও মানুষকে এখন প্রচন্ড প্রভাবিত করছে। আর রাজনৈতিক অস্থিরতা তো আছেই। এই পরিবর্তনগুলো আমাকে নস্টালজিক করে। একটা শক্তিশালী বোধের সঞ্চার করে। কখনো কখনো এলোমেলো কি যেন একটা কাজ করে। এখন যে ছবিগুলো আঁকছি ওই এলোমেলো চিন্তার প্রভাবই সবচেয়ে বেশী, শুধু এলোমেলো বিষয়ই কিন্তু সৃজনশীল কাজ হয় না। যতই আবেগপ্রবণ হয়ে রং ঢালি না কেন, আঁকিবুঁকি করি না কেন, যতই যা কিছু করি না কেন এগুলোকে সমন্বিত করে যতক্ষণ এলোমেলো বোধগুলোকে কাজে লাগিয়ে একটা নিয়মের মধ্যে না আনছি ততখক্ষণ পর্যন্ত সেটা কোনো সৃজনশীল বিষয় কিংবা আর্টপিস নয়। রাজবাড়িতে আসার পর এই বোধটা আমার ভিতর অভাবনীয়ভাবে কাজ করছে। এখনতো আমি বিচ্ছিন্ন, সম্পূর্ণভাবে একা। সাহায্য পাচ্ছি না, কারও কাজ দেখতে পাচ্ছি না, কারও দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছি না, অর্থাৎ যা করছি সব বড় বেশী নিজস্ব। সবকিছুই একটা নিজস্ব চিন্তা ও মাত্রা মাথায় রেখে কাজ করতে হচ্ছে। এ সময়ের কাজগুলো সে মাত্রারই ফসল।
এখন আমি যেখানে অবস্থান করছি সেটা নিজের মতো করে সাজিয়েছি, নিজস্ব গ্যালারিতে ছবি ডিসপ্লে করা আছে। একদিকে ছাত্রাবস্থার কাজগুলো, একদিকে চট্টগ্রামে থাকাকালীন কাজের সামান্য অংশ, চিন্তার বিভিন্ন বাঁকের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ছবি ডিসপ্লে করার চেষ্টা করেছি। দর্শকের বোঝার সুবিধার জন্য এবং অনেকখানি নিজের বোঝার জন্য, আমার মন কখন কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে।

এ দেশে শিল্পের যথার্থ মূল্যায়ন হয় বলে কি মনে করেন?

প্রকৃত অর্থে জীবন ধারণের পদে পদেই দেখা যাবে শ্রম ও সততার খুব একটা মূল্য দেয়া হয় না, এটা শুধু সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেই নয়, সব ক্ষেত্রে। দীর্ঘ বছর ধরে আমি ছবি আঁকি, ভাল হচ্ছে কি খারাপ হচ্ছে তা নিয়ে মোটেই ভাবিত নই, এটা বলবে সময়। সৃজনশীলতাকে একেকটা সময় একেকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। আগেই বলেছি প্রত্যেকটা জিনিস পরিবর্তনশীল, এই মূল্যায়নও তাই। মূল্যায়ন কখনও ইতিবাচক, কখনও নেতিবাচক। ছাত্রাবস্থায় যখন শিল্পচর্চা শুরু করেছিলাম প্রকৃতি, মানুষের উপর নির্ভর করে ছবি আঁকতাম। মানুষের অবয়ব, প্রকৃতি হুবহু আঁকার চেষ্টা করেছি। সময়, পারিপার্শ্বিকতা পরিবর্তনের সাথে সাথে নিছক ড্রয়িং এর ভেতর অভিজ্ঞতা সঞ্চারিত হতে থাকল। টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতাগুলো একটা সময়ে সমন্বিত হয়ে নতুন রূপ ধারণ করেছে। মূল্যায়নের আশা না করা সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে এটাই একটা বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিৎ বলে মনে করি।

মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট একটা বড় ভূমিকা রাখে, এ বিষয়ে আপনার মত কি?

সিন্ডিকেটতো সবসময়ই ছিল। একটা সিন্ডিকেটের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজন পাশাপাশি আরও অনেক সিন্ডিকেট। আমাদের এখানকার দৃশ্যপটটা এমন নয়। এখানে সিন্ডিকেটের কারণে জাতি হিসেবে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি।

শিল্পকলায় গুরু-শিষ্যের সম্পর্ককে কীভাবে দেখেন?
সমকালে মানুষ তার জীবনবোধ নানাভাবে প্রকাশ করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নানা আঙ্গিকে তাদের শিক্ষাদান করে। একই বিষয়ে পুঁথিগত ধারণা এক হলেও প্রকাশের ধরণ ভিন্ন, অর্থবোধও ভিন্ন। সৃজনশীল শিক্ষার বহু পুরাতন সময় থেকে এ-অঞ্চলে ঘরানা শিক্ষার প্রচলন আছে। যার প্রেক্ষিতে আঞ্চলিক রীতিনীতি ধ্যানধারণার প্রভাব আমরা দেখে থাকি, কিন্তু বর্তমানে শিক্ষাপদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিক হওয়াতে ব্যক্তি প্রভাব শক্তিশালী হওয়ার পরেও স্থানিক পরিমন্ডল বিবর্জিত। তাই মনে করি গুরু শিষ্যের তালিম পরম্পরা সৃষ্টি করে। আশা করি বিষয়টি বোধগম্যতার দাবি বহন করে।

গুরু হিসেবে কাউকে পেয়েছেন?

প্রকৃতিকে, আমার এই মাটিকে। এরা সব দীক্ষাগুরু। আর তা সময়,পরিবেশ, চাহিদার সাথে পরিবর্তিত হয়েছে বারবার।

ভবিষ্যৎ কাজের পরিকল্পনা কি?

বড় ধরনের কোনো পরিকল্পনা নেই, তত্ত্বকথায় বিশ্বাসী নই। তবে সুন্দরের প্রতি শৈশবকাল থেকে মনে জাগ্রত করা বিশ্বাস নিয়ে বাকি পথ পাড়ি দিতে চাই।

x