সূর্যের আলো

আকাশ ইকবাল

বুধবার , ৩০ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ
106

যেখানে কাজ করি ওই ভবনেই বাসা ও অফিস দুটোই। তেমন একটা বাইরে যাওয়া হয় না। প্রথমে যেখানে জব শুরু করেছিলাম সেখানে আমার কাজের সময় ছিল ৩টা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। এরপর অন্য জবটার জন্য সময় দিই ১০টা থেকে ১টা। ১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত গোসল ও খাওয়া দাওয়া। রাত ৮টা থেকে একাডেমিক পড়ালেখা। এরপর কিছু সময় ফেসবুকিং আর আউটবুক নিয়ে বসা। তাহলে কি বুঝা গেল? সারা দিনই তো ওই চার দেয়ালের মধ্যেই থাকি। এমন এমন সপ্তাহ যায়, যে সপ্তাহের চার দিনই ওই ভবনেই কাটাই। জানালা দিয়ে যা দিনের আলো দেখতে পাই এতটুকুই। বাইরে ঘোরার সময় তো নেই।
সূর্যের আলো আর প্রকৃতির হাওয়া গায়ে লাগে না বললেই চলে। যত সময় যাচ্ছে তত মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ছিলাম। কিছু বিষয় নিয়ে এতো দুঃচিন্তা করছি তা আগে কখনো করিনি। দিন দিন কাজের প্রতি আর পড়ালেখার প্রতিও মনযোগ কমে যাচ্ছে। লেখালেখি করার ইচ্ছাও হারিয়ে ফেলছি। রাতে ঘুম হয় না। সকালে ঘুম থেকেও উঠতে পারি না। কোন কোন দিন ঘুম থেকে উঠতে দুপুর পার হয়ে যায়। সারাদিন চোখে ঘুম ঘুম ভাব। পড়তে বসলে অন্য চিন্তা আর লিখতে বসলে ভুল করি।
উপরের উল্লেখিত প্রবন্ধটি পেয়ে পুরোটা পড়ে নিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম কোন এক মনোচিকিৎসকের সাথে কথা বলব। যেই ভাবনা সেই কাজ। পরিচিত এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা হলো। আর আমার ধারণাই সঠিক হলো। আমি একট ডিপ্রেশনে ভুগছি। আসলে আমি স্যাডে আক্রান্ত। এটি একটা মানসিক রোগ। ভয়ঙ্করও বটে। ডাক্তার আমাকে ভিটামিন ডি সেবন আর প্রতিদিন কমপক্ষে ১ ঘন্টা রোদে ও বাইরে হাঁটার কথা বললেন।
এখন হয়তো আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, রোদের সাথে স্যাডের সম্পর্ক কি? সম্পর্ক আছে । উত্তরটা হলো ভিটামিন ডি-তে। ভিটামিন ডি-র অভাবেই কিন্তু স্যাডে আক্রান্ত হয় মানুষ। আপনারা হয়তো অনেকে জানেন, ভিটামিন ডি তৈরি হয় মানুষের ত্বকে, সূর্যের আলোয় থাকা অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে। আসলে প্রকৃতির সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্কটা কিন্তু গভীর। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করেছেন, সব ধরণের ডিপ্রেশন ও অনেক ধরনের মানসিক রোগ সারিয়ে তুলতে খোলামেলা প্রকৃতির ও সূর্যালোক ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
সূর্যের আলো ও প্রকৃতি দেখার সুযোগ না হলে মানুষের কর্মস্পৃহা কমে যায়। তাছাড়া মনের সন্তুষ্টি বলেও একটা ব্যাপার আছে, তা হ্রাস পায় দিন দিন।
চট্টগ্রাম শহরে ৬০ লক্ষ মানুষের বসবাস। আর ঢাকা শহরে প্রায় দুই কোটির কাছাকাছি। আর সারা পৃথিবীর শহরগুলোতে বাস করে ৩৭৫ কোটি মানুষ। এই মানুষগুলোর মধ্যে প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ সারা দিন পার করে দেয় কোন প্রাকৃতিক দৃশ্য বা সূর্যের আলো না দেখে। সারারাত বাসায় থেকে সকালে গাড়ি করে অফিসে। সারাদিন অফিসের ভেতর পার করে সন্ধ্যায় আবার গাড়ি নিয়ে বাসায় ঢুকে পড়ে। প্রকৃতি আর সূর্যের আলো দেখার সময় কোথায়। আবার এর মধ্যে যার যার ব্যক্তিগত কাজ নিয়ে ভাবনা চিন্তা। যার কারণে অনেক সময় দেখা যায়, অফিসের বস তার কর্মকর্তাদের সাথে কথায় কথায় রেগে যায়। খারাপ ভাষা ব্যবহার করে। তারাও সেই স্যাডে আক্রান্ত। যা অভ্যাসে পরিণত হয় এক সময়। আমাদের দেশের শিশুরাও কিন্তু এই স্যাড থেকে বাইরে নয়। শিশু শিক্ষার্থীরাও বাইরের প্রকৃতির আলো বাতাসে ঘোরার সময় পায় না। সকালে ঘুম থেকে উঠে সামান্য নান্তাপানি করে কোচিংয়ে যায়। এরপর স্কুল । স্কুল শেষে বাসায়। রাতে আবার প্রাইভেট টিচার। এরপর ঘুম। সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার আগের দিনের মতো। বাইরের প্রকৃতির ঘোরার সময় কোথায় তার? তাকেও চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকতে হয়।
প্রকৃতির সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্কটা যদি খোলামেলা ভাবে বলতে যাই তাহলে বিষয়টা হচ্ছে মানুষ পৃথিবীতে আসার সময় থেকে। অর্থাৎ বিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানুষের সৃষ্টির সময় থেকে মানুষ যথেষ্ট সময় সূর্যের আলো দেখে আর প্রকৃতিতে চলাফেরা করতো। এরপর সময়ের সাথে পৃথিবীর চেহারা পাল্টাতে পাল্টাতে আজকের এই পর্যন্ত। এতেই বোঝা যায়, সূর্য ও খোলামেলা প্রকৃতি সাথে মানসিক সম্পর্ক কতটুকু। আমাদের এই মানসিক ডিপ্রেশন বা স্যাড থেকে মুক্তি পেতে হলে অবশ্যই প্রতিদিন যথেষ্ট সময় সূর্যালোকে হাঁটা চলা উচিত।

x