সু-নাগরিকতা অর্জনই শিক্ষা

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ৪ আগস্ট, ২০১৮ at ৯:১৫ পূর্বাহ্ণ
95

একটি উদাহরণ দিয়েই শুরু করতে চাই– ‘বঙ্কিম চন্দ্র ছিলেন বাঙালিদের মধ্যে প্রথম গ্র্যাজুয়েট। কিন্তু অবাক করা বিষয় তিনি বিএ ফেল করেছিলেন। দুর্ভাগ্য তিনি ফেল করেছিলেন বাংলায়। তাঁকে গ্রেস দিয়ে পাস করানো হয়েছিল। অথচ তাঁর বাংলা পড়ে আমরা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করি। আমরা উঠতে বসতে তার বাংলায় ফেল করি। তাহলে প্রশ্ন পরীক্ষায় এঙামিনার কে ছিলেন? এক্সামিনার ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। মজার ব্যাপার হল বঙ্কিম ছিলেন ফেলের মধ্যে আবার ফার্স্ট। এভাবে বাঙালি গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে তিনি প্রথম গ্র্যাজুয়েট হওয়ার গৌরব লাভ করেন।’

বঙ্কিম চন্দ্র’র মত একজন প্রতিভা সম্পন্ন মানুষ কেন এমন ফলাফল করলেন? বাংলা ছিল তখন দারুণ সংস্কৃত ঘেষা। সেই সংস্কৃতের কঠিন ও দুরহ বিষয়গুলো তার পক্ষে মুখস্ত করা ছিল কঠিন। এখানে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও আলোকিত মানুষ চাইআন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার লিখেছেন এভাবে, ‘যে বাংলা পরীক্ষায় ‘বঙ্কিমচন্দ্র ফেল করেছিলেন সেই পরীক্ষার প্রশ্ন বের হয়েছিল কলকাতার সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায়। আমিও সেই প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়ার জন্য আদাজল খেয়ে চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কিছুতেই ১০০এর মধ্যে ১৬ নম্বরের বেশি উত্তর করতে পারিনি।’

মুখস্ত বিদ্যা শুধু একটি মুখস্ত জাতি উপহার দিয়েছে তা নয় বরং কালের পর কাল জাতিকে পিছিয়ে দিচ্ছেও। সত্যিকার অর্থে এর বেশি আর কিছু দিতে পারেনি। সময়ের প্রয়োজনে তাই এই বিদ্যার অবসান দরকার। একটি সৃজনশীল জাতি পাওয়ার জন্য, সৃজনশীল পৃথিবী সৃষ্টির জন্য দরকার মেধা, মননে উদয়মান এক ঝাঁক শিক্ষার্থী যাদের দ্বারা এই পৃথিবী আলোর মুখ দেখবে। আমাদের এই মুখস্ত বিদ্যায় যে জাতি পাচ্ছি তাদের কপাল সর্ম্পকে বলতে গিয়ে বরীন্দ্রনাথ দুঃখ করে বললেন, ‘যে ছাত্র পকেটে করে নকল নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢোকে তাকে তোমরা হল থেকে খেদিয়ে দাও আর যে মগজের ভেতর চুরি করে নিয়ে ঢোকে তাকে তোমরা শ্রেষ্ঠ ছাত্রের সম্মান দাও, এ কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা।’

রবীন্দ্রনাথের এই দুঃখ মাখা বক্তব্য আমাদের যত হতাশার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় আমাদের জীবনের বোধকে আমরা শিখতে পারি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, পারিবারিক ব্যবস্থায় শিশুকে তার মত চলার পথ শেখানো হয় না। এই প্রসঙ্গে একটি ছোট কাহিনী বলি, ‘চীনের একটি প্রদেশে সব সময় শুধু খরা আর দুর্ভিক্ষ লেগে থাকত। আর তাদের এমন সময়ে বিশ্বের নানা দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ সাহায্য আসত এবং তারা আবার খেয়ে পরে বাঁচার চেষ্টা করত। এদের একজন বললেন এভাবে দুর্ভিক্ষ আর খরায় আমরা বার বার পড়ব আর সাহায্য নিয়ে বাঁচব তা হয় না। এবার আমাদের দুর্ভিক্ষের কারণ ও তা থেকে উত্তরণের উপায় বের করতে হবে। তাহলে আর এমন অবস্থা আমাদের হবে না। একদিন সত্যিকার অর্থে তা করা হল এবং সেই অঞ্চলে আর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।’

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আজ তেমন দুর্ভিক্ষ চলছে আমাদের এই দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচার জন্য পথ বের করতে হবে। আমাদের ভাবতে হবে জাতিকে একটি সুন্দর অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য আধুনিক চিন্তার মানুষ তৈরি করতে হবে। আমাদের সব আছে এই থাকাটা সুন্দর করার জন্য প্রয়োজন একদল আদর্শ মানুষ তৈরি করা সেখানে আমরা অনেক দূর পিছিয়ে আছি। মে মাসের ৫ তারিখে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী হিলারী আমাদের দেশে এসেছিলেন, তিনি তরুণদের নিয়ে একটি প্রোগ্রাম করেন। সেখানে বাংলাদেশের এক তরুণ ডিভি ভিসা বন্ধ করা প্রসঙ্গে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি সাবেক রাষ্ট্রদূত মর্জিনাকে এর উত্তর দেয়ার জন্য বলেন। রাষ্ট্রদূত উত্তরে বলেন ‘যে দেশে চট্টগ্রাম বন্দরের মত একটি বন্দর আছে সে দেশের ছেলেরা কেন অন্য দেশে চাকরি করতে যাবে?’

আমাদের শিক্ষার আজ যে দুরবস্থা চলছে তা উত্তরণ সময়ের দাবি। এখানে খরা ধরেছে সব শেষ হওয়ার আগেই প্রতিষেধক দেয়া দরকার।

প্রত্যেক শিশুর ছোটবেলায় নানা স্বপ্ন থাকে, শখ থাকে জীবনে অনেক বড় হওয়ার ইচ্ছা থাকে অনেক দূর যাওয়ার। সেই ইচ্ছার বাস্তবায়নে কার্যকর শিক্ষা সংস্কার জরুরি।

গতানুগতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে, প্রচলিত ধ্যানধারণা বাদ দিতে হবে তাহলে কেবল এই অবস্থা থেকে আমরা এগিয়ে যেতে পারব। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সেই রকম নতুন কিছু না থাকার কারণে ছোটবেলার শিশুর সেই স্বপ্নগুলো বিবর্ণ হয়ে যায়। শুধু পড়ালেখা একজন শিশুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে অধিকতর সবকিছু নয়। একের পর এক ক্লাস, বই, শিক্ষক পরিবর্তনের মাধ্যমে দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের যে অবস্থা চলতে থাকে একজন শিশুর প্রকৃত বৃদ্ধিতে তা যথেষ্ট বাধা দেয়।

আমাদের স্কুলকলেজ বা উচ্চতর শিক্ষা একজন শিশুকে শুধু মাত্র ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার তাগাদা দেয় কিন্তু এ কথা ভুলে যায় যে, দৈহিকভাবে বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষার্থীর মধ্যে মানসিক বৃদ্ধিও কাজ করে। এই দেশ কী তাহলে শুধু মানুষকে ডাক্তার বানাতে শিখাবে? কেন, আরো অনেক পেশা তো আছে সেই সব পেশায় যাবে না কেন? শিক্ষার্থীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক বা প্রচলিত পদ্ধতিতে আমাদের তেমন কোন অবস্থা নাই। শিশু হতে পারে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ভাল বক্তা, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, আইনজীবি বা রাজনৈতিক। যে যেভাবে বেড়ে উঠতে চায় তাকে সেভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ দিতে হবে তাহলে প্রতিটি ক্ষেত্রে শূণ্যতার হাত থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারব।

একটি প্রাচীন প্রবাদ আছে, ‘তুমি যদি কাউকে ১ কেজি মাছ দাও তাহলে তার ১ দিনের আহারের ব্যবস্থা করলে, আর যদি কাউকে মাছ ধরতে শিখিয়ে দাও তাহলে তুমি তার সারা জীবনের খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে।’ শিক্ষা হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদী একটি সাধনার বিষয়। এখানে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা সংস্কারক আর সমাজ সংস্কারকদের দরকার শিশুকে মাছ ধরতে শিক্ষা দেয়া।

আমি প্রায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রোগামে বলি ‘শিক্ষা একটি গাছের মত যা একবার লাগালে তা হতে ফুল, ফল আর অঙিজেন পাওয়া যাবে সারা জীবন।’ এই বৃক্ষের কোন শেষ নাই। ফরাসী একটি গল্প আছে এমন, ‘ফরাসি রাজা রাজ্যের এক লোককে বললেন তুমি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাঁটবে আর যতটুকু হেঁটে যেতে পারবে সবটুকু জায়গার মালিক হবে তুমি। লোকটি হেঁটে অনেক দূর গেলেন কিন্তু সমস্যা হল সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে লোকটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।’

সম্পদ এসেও না পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু শিক্ষা যেটুকু নিবে সেইটুকুই থাকবে। শিক্ষার কোন ধ্বংস নাই। ভাল শিক্ষা গ্রহণের দাবি চিরকাল থেকে যাবে। শিশুকে তার চারপাশ থেকে শিক্ষা নেয়ার বিষয়ে তাগাদা দিতে হবে, বন্দিশালার মত শুধু পাঠ্য বইয়ের উপর তাকে ধরিয়ে রাখলে চলবে না। এই প্রসঙ্গে আমি নিজের একটি গল্প বলিআমি ছোটকাল থেকে বেশ বই পোকা ছিলাম। তখন মোটা মোটা হরলাল রায়ের ব্যাকরণ বই ছিল সেই বইয়ের উপর গল্প বই খুলে পড়তাম যাতে বড়রা বুঝতে না পারে। একদিন আমি ধরা পড়ে গেলাম। মায়ের কাছে বিচার গেল যে, আমি স্কুলের পড়া না পড়ে গল্প বই পড়ছি। মা আমার পড়ালেখা জানেন না, কিন্তু কঠিন। সহজভাবে উত্তর দিলেন কি পড়ছে আমি জানি না, সে পড়ার টেবিলে আছে এবং বই পড়ছে এটা আমার কাছে আসল বিষয়। রক্ষা পেলাম। এখন বুঝি মা পড়ালেখা না জানলেও পড়ছি এটা উনার কাছে অনেক মূল্যবান। তাই শিশুদের পড়তে দিবেন, সেটা অজানা কিছু। তাদের ভিতরে জট খোলার জন্য পড়া অতি জরুরি। পড়িত বিষয়ের উপর তাকে বলতে দিবেন, শুধু নিজে তাকে শুনাবেন না, তার বিষয়ে আপনি নিজেও শুনবেন। দেখবেন সে অসাধারণ কিছু বানিয়ে বানিয়ে বলছে। এখান থেকে তার দৃষ্টিভঙ্গি বাড়তে থাকবে।

আজকের লেখার শুরুটা ঠিক কোন স্থান থেকে হবে এটা ভাবতে গিয়ে বিষয়টা এভাবে শুরু করতে চাচ্ছি। ফরাসি সম্রাট একাদশ লুইয়ের শাসনামলে এক জ্যোতিষী কর্তৃক সম্রাটের এক প্রিয়তমার মৃত্যুবিষয়ক ভবিষ্যতদ্বানী ফলে গেলে সম্রাট ক্রোধে অন্ধ হয়ে জ্যোতিষীকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ডেকে পাঠান। জ্যোতিষি উপস্থিত হলে সম্রাট তাকে বললেন, ‘তুমি তো অন্যের ভাগ্য গণনা করো। এবার বলো দেখি, তোমার ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে ? জ্যোতিষী সম্রাটের পরিকল্পনার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে বিচক্ষণতার সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘আমি দিব্যি চোখে দেখতে পাচ্ছি, আপনার মৃত্যুর তিনদিন আগে আমি মারা যাব।’

এবার সম্রাট জ্যোতিষীকে বাঁচানোর জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। কারণ সে মারা যাওয়ার তিনদিন পর তো আর সম্রাটও বেঁচে থাকতে পারবেন না। আমাদের শিক্ষা বিষয়ক যতগুলো মানুষ, রাষ্ট্র ভাবেন তাদের যদি এমন ভবিষ্যদ্বাণী দেয়া যেতো যে, সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থা না করতে পারলে তিনদিন পর আর কারো বেঁচে থাকা যাবে না। তাহলে একটি সঠিক শিক্ষানীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা পেতাম, করতে পারতোম। শিক্ষা ব্যবস্থা আর শিক্ষাকে যারা সাজাবেন তাদের কেউ আমাদের এই শিক্ষাকে গ্রহণ করেননি। তাদের সন্তানেরা বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিচ্ছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এই শিক্ষা তাদের পছন্দ না।

শ্রেণিকক্ষে আজ পাঠ্য বই ছাড়া অন্য কিছু শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রেও আমাদের উপর রয়েছে বাধ্যবাধকতা। আমরা চাইলেও পারি নানতুন কিছু শিক্ষা দিতে কারণ পাঠ্য বইয়ের এই সংক্রান্ত কিছুই নাই। একদিকে শিক্ষার্থীরা নিতে চাইবে না, অপরদিকে অভিভাবক দারুণ ক্ষেপে যাবে, পরীক্ষায় ভাল ফল পাওয়া যাবে না ইত্যাদি।

কিন্তু আগামী প্রজন্মকে সুন্দর ও সৃষ্টিশীল করার জন্য আধুনিক শিক্ষার প্রতি, আনন্দময় শিক্ষার প্রতি আমাদের অতি মাত্রায় গুরুত্ব দিতে হবে অন্যথায় কোনক্রমেই বিশ্বের সাথে আমরা তাল মিলাতে পারব না। সুতরাং শিশুকে সৃজনশীল করার জন্য আমাদের পাঠ্যক্রম সৃজনশীল করা উচিত। যারা শিশুদের নিয়ে ভাববেন তাদের সৃজনশীল হওয়া আগে চাই তাহলে প্রকৃতপক্ষে আমরা একটি সুন্দর প্রজন্ম পাব।

x