সুশাসন কোথায়

রিমঝিম আহমেদ

শনিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৮ at ৪:৫৩ পূর্বাহ্ণ
7

বাংলাদেশে যুগ যুগ ধরে নারীরা শোষিত, অবহেলিত হয়ে আসছে। একটি বৈষম্যমূলক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় দুর্বলের উপর শোষণ, অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন অবধারিত। পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক কুসংস্কার, কূপমণ্ডুকতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বেড়াজালে নারীকে সর্বদা রাখা হয়েছে অবদমিত। নারীর মেধা ও শ্রমশক্তিকে শুধুমাত্র সাংসারিক কাজেই ব্যয় করা হয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী একসময় পর্দাপ্রথার কারণে ঘরে আবদ্ধ থাকত। ঘর ছেড়ে বাইরে এলেই তাদের উপর চলত নির্যাতন ও নানারূপ নিষেধাজ্ঞা। এখানে জীবন ও সমাজ পুরুষশাসিত, রাস্তাঘাটে, হাটে বাজারে, যানবাহনে, সভাসমিতিতে সবখানেই পুরুষের প্রাধান্য। সমাজ ও দেশ গড়ার কাজে তাকে কখনো তেমনভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি। জন্ম থেকে শুরু করে জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই মেয়েদের পুরুষের চেয়ে অনেক ছোট করে দেখা হয়।

কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ ডিজিটাল হয়েছে, মানুষের গড় আয়ু আরো বেড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর পদচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাক্ষরতার হার বেড়েছে। কমেছে দরিদ্রতা। শিশু মৃত্যুহার, মাতৃত্বকালীন মৃত্যু, সর্বজনীন শিক্ষা, শিক্ষায় নারীপুরুষ বৈষম্য এসব দিক দিয়ে বাংলাদেশ নিজের অবস্থানের প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু এখনো যেটা নিশ্চিত হয়নি তা হল, আইনের শাসন। দেশের প্রচলিত আইনগুলোর সঠিক প্রয়োগ। দেশ এগিয়ে গেলেও নারীর প্রতি পুরুষের ধ্যানধারণা, আচরণ, বিশ্বাস খুব একটা পাল্টায়নি। নারীদের শোষণের বিভিন্নরূপের প্রতিফলন দেখা যায় বিয়ে, সামাজিক জীবন, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র প্রভৃতি ক্ষেত্রে। সমাজের সকল ক্ষেত্রে নারীর সম্মান ও নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন। সময়ের সাথে সাথে নির্যাতন ও সহিংসতার ধরন পাল্টেছে কিন্তু নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এক ও অভিন্ন। প্রযুক্তির ব্যবহার অপরাধকে আরও ভিন্নমাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। প্রচলিত আইনে অপরাধ দমনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও প্রতিষ্ঠিত হয়নি সুশাসন।

সারা বিশ্বের দরিদ্র ও দুস্থ মানুষদের অগ্রাধিকার দেয়া ও তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বৈশ্বিকভাবে ২০০০ সালে যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা (এমডিজি) প্রণয়ন করা হয়েছিল জাতিসংঘের মিলিনিয়াম সামিটে, তখন ১৮৯টি দেশ (বর্তমানে ১৯৩টি) এবং কমপক্ষে ২৩টি আন্তর্জাতিক সংগঠন এই সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করবে বলে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিলো। সর্বোপরি এই সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অর্জন একবারে কম নয়। সে ধারাবাহিকতায়

২০১৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদে সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) ১৭টি লক্ষ্যেমাত্রার ৫ নং হলো: জেন্ডার সমতা অর্জন এবং নারীর ক্ষমতায়ন ।

কিন্তু নারী মুক্তি বা নারীর ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব যখন নারীর জন্য একটি নিরাপদ বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি হবে এবং নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে। অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া নারী কখনোই স্বাধীন নয়। আমাদের মেয়েরা বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে। গ্রামেও মেয়েশিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নেই। পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন দ্বারা নানাভাবে যৌন হয়রানি হচ্ছে। সমপ্রতি খাগছড়ির দীঘিনালায় ঘটে যাওয়া আদিবাসী শিশু কৃত্তিকা ত্রিপুরা (পূর্ণা)’র ঘটনাটি সেই বিভৎস সহিংসতার নজির বহন করে।

সামপ্রতিক সময়ের সব শেষ পাহাড়ে ধর্ষনের ঘটনাটি কত নির্মম, কত পৈশাচিক। আমরা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারি না, খাগড়াছড়ি দীঘিনালার ৫ম শ্রে্ল্লিণর ছাত্রী কৃত্তিকা ত্রিপুরার সাথে যা ঘটেছে। শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত নয় নরপিশাচরা, ধর্ষণের পর হাত কেটে দিয়ে, গোপনাঙ্গে কাঠ গুঁজে দিয়ে হত্যা করে। প্রশ্ন জাগে মানুষ আসলে আর কতটুকু নির্মম হতে পারে ? এই নির্মম আচরণ প্রদর্শনের কারণ কী? কারণ অবশ্যই নানাবিধ। তার মধ্যে প্রধানতম কারণ হচ্ছেআইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া।

শুধু তত্ত্বগত উন্নয়ন দেখালেই হবে না। একটি দেশের উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য মানদণ্ড ঐ দেশের সুশাসন কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার উপরও নির্ভর করে। তা না হলে কেবল আরোপিত উন্নয়ন নিয়ে মেকি আনন্দে আত্মতুষ্ট থাকা যাবে, কিন্তু কাজের কাজ কিচ্ছু হবে না। রাষ্ট্রযন্ত্রকে এদিকটাও বিবেচনায় রাখতে হবে।

x