সুরক্ষা আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় জাহাজ শিল্পের প্রসার ঘটবে

বৃহস্পতিবার , ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:৩১ পূর্বাহ্ণ
51

গত চার বছরে বাংলাদেশী পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা ৬৩ থেকে নেমে এসেছে ৩৮-এ। কমেছে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহন বাবদ আয়ও। সর্বশেষ অর্থবছরে মোট ফ্রেইট চার্জের মাত্র ১৫ শতাংশ ধরতে পেরেছেন দেশের সমুদ্রগামী জাহাজ মালিকেরা। খাতটির সুরক্ষায় এ-সংক্রান্ত আইনের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রীসভা। খসড়া অনুযায়ী, সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ৫০ শতাংশ পণ্য পরিবহন করতে পারবে বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজ। বর্তমানে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। পত্রিকান্তরে গত ২৮ জানুয়ারি এ খবর প্রকাশিত হয়। খবরে বলা হয় গত ২৮ জানুয়ারি তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার নিয়মিত বৈঠকে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (সুরক্ষা) আইন ২০১৯-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। সবিচালয়ে এ নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি বলেন, এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজের মাধ্যমে ৪০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নতুন আইনে এটা ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। আইনের বিধান লঙ্ঘন করে কোন পণ্য পরিবহন করা হলে ৫ লাখ টাকার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করা ছিল না। যদি শিপিং করপোরেশন পর্যাপ্ত জাহাজের ব্যবস্থা করতে না পারে, তা হলে অন্য জাহাজ দিয়ে পণ্য আনার সুযোগ রয়েছে। বাণিজ্যের ৫০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা আছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্য সচিব বলেন, অবশ্যই প্রথমে বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজ ব্যবহার করতে হবে। এরপর যদি প্রয়োজন হয়, তবে অন্য প্রতিষ্ঠানের জাহাজ ব্যবহার করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে নিবন্ধিত জাহাজগুলোকে বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজ বলা হয়। এদিকে, নীতিসহায়তার অভাবে সমুদ্রগামী জাহাজ শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আমদানির ওপর ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহারের পর নতুন জাহাজ আমদানি করেননি স্থানীয়রা। পাশাপাশি করপোরেট করসহ অন্যান্য, ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে না ওঠায় পুরোনো জাহাজ প্রতিস্থাপন করেননি তারা। ফলে কমে গেছে জাহাজের সংখ্যা। সেই সঙ্গে ফ্রেইট চার্জ বাবদ আয়ও। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ (ওশান গোয়িং কার্গো) কমে যাওয়ায় তা ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। রফতানি পণ্যের অর্ধেকের বেশি এক সময় স্থানীয় জাহাজগুলো পরিবহন করলেও কমেছে তাও। মূলত বৈশ্বিক বাণিজ্যে মন্দা, জাহাজ আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক), ৫ শতাংশ এটিভি ও ৩৫ শতাংশ হারে করপোরেট করের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগের পর রিটার্ন না পাওয়ায় ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন বন্ধ করে জাহাজ ব্যবসা থেকে সরে আসছেন অনেকে।
বাংলাদেশের পণ্য আমদানি-রফতানি বহুলাংশে জাহাজ তথা সমুদ্র পরিবহন নির্ভর। এদেশের আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সমুদ্রপথই মূলত ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের চেয়ে বিদেশী জাহাজগুলোর প্রাধান্য বেশি। ফলে জাহাজ ভাড়া বা ফ্রেইট চার্জ বাবদ প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অর্থ বাইরে চলে যাচ্ছে। এন বি আরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি-রফতানির বিপরীতে ফ্রেইট চার্জ বাবদ দেশের ব্যবসায়ীরা ব্যয় করেছেন ৭৭০ কোটি ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যা ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে বাংলাদেশী জাহাজগুলো।
বিদেশী পতাকাবাহী জাহাজগুলো নিয়ে গেছে অবশিষ্ট ৫৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট টাকার ৮৫ শতাংশই। বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে বিপুল পরিমাণ এ অর্থ বিদেশে চলে যেতে হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে দেশীয় জাহাজের সংখ্যা ছিল ৬৩টি। ২০১৭ সালে তা ৩৮টিতে দাঁড়ায়। এসব থেকে বলা যেতে পারে বেশ কয়েক বছরে দেশীয় জাহাজের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী জাহাজ কমে আসার মূল কারণ হলো প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তার অভাব। আগের এ সম্পর্কিত অধ্যাদেশে বৈদেশিক বাণিজ্যে মাত্র ৪০ ভাগ পণ্য দেশীয় জাহাজে পরিবহনে বাধ্যতামূলক ছিল। বাকি ৬০ ভাগ পণ্য বিদেশী জাহাজে পরিবহন করা যেত। এসুযোগে পণ্য পরিবহনে বিদেশী জাহাজের আধিপত্য থাকায় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা হারিয়েছে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে সম্প্রতি দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সুরক্ষা দিতে সরকার আইন সংশোধন করেছে। এ ক্ষেত্রে দেশীয় জাহাজে পণ্য পরিবহনের হিস্যা ৫০ ভাগে উন্নীত এবং কোনো বিধি অমান্য করলে ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে ‘বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (সুরক্ষা) আইন, ২০১৯ ’এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আলোচ্য আইনটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় জাহাজ শিল্পের প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
মাঝে সরকারি কিছু পদক্ষেপে আমাদের সমুদ্রগ্রামী জাহাজ শিল্পে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল স্থানীয় শিল্পটিতে। এর মধ্যে একটি হলো, ১৯৯৪ সালে এনবিআর কর্তৃক তিন হাজার টনের বেশি (ডেডওয়েট টনেজ বা ডিডব্লিউটি) ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ আমদানির ওপর ভ্যাট অব্যাহতি। ২০১২ সাল পর্যন্ত এ সুবিধা কার্যকর ছিল। কিন্তু অব্যবহিত পরের অর্থবছর থেকে এ সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়। শুধু তা নয় জাহাজ আমদানি বা উৎপাদন পর্যায়ে যুক্ত হয় ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর। ফলে জাহাজ ব্যবসায় ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তার ওপর এর সঙ্গে যোগ হয় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার নেতিবাচক প্রভাব। কয়েক বছর ধরে মন্দার কারণে পরিবহন ভাড়া কমলেও জাহাজ পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। বস্তুত: সরকারি প্রণোদনার প্রত্যাহার ও মন্দা দুই মিলে জাহাজ ব্যবসার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে দেশীয় উদ্যোক্তারা। এর ফলে বিশেষ করে ২০১২ সালের পর থেকে সমুদ্রগামী পতাকাবাহী জাহাজের আমদানি ও নিবন্ধন নেননি স্থানীয় জাহাজ ব্যবসায়ীরা। তবে গত বছর থেকে জাহাজ আমদানিতে ভ্যাট ও কর ছাড়ের প্রণোদনা দেয়ায় ফের গতি পায় এই ব্যবসা। এরই মধ্যে এনবি আরের শর্ত সাপেক্ষে আমদানির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বহরে যোগ হয়েছে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকটি জাহাজ। আমদানি পর্যায়ে রয়েছে আরো কয়েকটি। সংশোধিত আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে দেশীয় জাহাজের ৫০ ভাগ হিস্যা নিশ্চিত হলে স্থানীয় শিল্পে যেমন গতি আসবে তেমনি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। এতে পরোক্ষভাবে লাভবান হবে রাষ্ট্র।

x