সুরক্ষায় পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন চাই

দেশের ২ কোটি শিশু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে

বৃহস্পতিবার , ১১ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:২৮ পূর্বাহ্ণ
23

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে দেশের ১ কোটি ৯৪ লাখ শিশু। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শিশুরা বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক কাজে যুক্ত হচ্ছে এবং তাদের পরিবারগুলো শহরমুখী হচ্ছে। এছাড়া নদী ভাঙন ও বন্যার কারণে এসব শিশু বাস্তুচ্যুত হয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা হবে দ্বিগুণ। জাতিসংঘের শিশু-বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে এ খবর প্রকাশিত হয়। খবরে আরো বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ২০টি জেলা জলবায়ু পরিবর্তনের অতিঝুঁকিতে রয়েছে। সামুদ্রিক ঝড়, বন্যা, খরার মতো জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হতে পারে এসব জেলা। এর মধ্যে উপকূলীয় জেলাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর কক্সবাজার, নোয়াখালী, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, বাগেরহাট, খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা নেত্রকোনা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, নীলফামারী, গাইবান্ধা, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের শিশুদের জীবন ও ভবিষ্যৎ বেশি ঝুঁকিতে। ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হবে ১৮ বছরের নিচে ১ কোটি ৯৪ লাখ ১৯ হাজার ৮২৯ জন শিশু। এছাড়া পাঁচ বছরের নিচে ঝুঁকিতে আছে ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার ৯৭ জন শিশু। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয় বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অধিকার খর্ব করে। দুর্যোগ মৌসুমে উপকূলবাসী নানা ঝুঁকি নিয়ে ভীত-শঙ্কিত থাকে। তবে তাদের সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হয় পরিবারের শিশুদের নিয়ে। তারা খাদ্য, বস্ত্র, থাকার জায়গা, ইত্যাদি সমস্যার সবচেয়ে বেশি সম্মুখীন হয়। রোগব্যাধির শিকার হয় আরো ভয়াবহভাবে। বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কারণে যেসব মৃত্যু ঘটছে, তার ৯০ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশে এবং এসব মৃত্যুর ৮০ শতাংশই শিশু। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যতই চরম রূপধারণ করছে এবং দৃশ্যমান হচ্ছে, ততই তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে শিশু ও কিশোরদের ওপর। ইউনিসেফের উপরোক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের ১ কোটি ৯৪ লাখ শিশু বাস্তুচ্যুত হয়ে তারা শহরমুখী ও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছে।
উপরোক্ত প্রতিবেদনে আরো উঠে এসেছে যে, নদীভাঙন ও বন্যার কারণে শিশু ও তার পরিবারের সদস্যরা নিজ বাড়ি স্কুল ছেড়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেয়। অনেক শিশু ও তরুণ বিশেষ করে যাদের তেমন দক্ষতা নেই, তারা কম বেতনে হলেও বিপজ্জনক ও শোষণমূলক কাজে যুক্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেয়েরা বাল্যবিবাহের শিকার হয় বা যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে শিশুদের স্বাস্থ্য, খাদ্য ও পুষ্টিতে। এতে ব্যাহত হয় তাদের শিক্ষা।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ যে সবার শীর্ষে, এটা কম-বেশি প্রায় সকলেরই জানা। বাংলাদেশ বরাবরই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত দেশ হিসেবে চিহ্নিত। বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাস প্রতি বছরেরই সাধারণ ঘটনা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যাও ক্ষয়-ক্ষতি বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় এভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব বেড়ে যাওয়া। সিডর ও আইলার কথা আমাদের জানা আছে। দেশের উপকূলভাগ সিডর ও আইলায় তছনছ হয়ে যায়। অসংখ্য মানুষ ঘর বাড়ি, সহায়-সম্পদ হারিয়ে স্থানচ্যুত ও বিপন্ন হয়ে পড়ে। তাদের সকলকে এখনও পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আগামীতে এ ধরনের ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আরো হতে পারে; হতে পারে বন্যা, লবণাক্ততার বিস্তার, এমন কি অনাবৃষ্টি এবং খরাও। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আরো মানুষ ক্ষতির শিকার হতে পারে। উপকূলীয় কয়েক কোটি মানুষ এখনই ভয়াবহ ঝুঁকিতে আছে। একই কারণে অন্যান্য এলাকার মানুষ কম ঝুঁকিতে নেই। জলবায়ু পরিবর্তনে যেসব বিপর্যয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তার মধ্যে অন্যতম অনাবৃষ্টি, বন্যা, সাইক্লোন জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আর এগুলোতে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। কারণ শিশুরা অন্যের ওপর নির্ভরশীল। একটি পরিবার যদি কোন বিপর্যয়ের শিকার হয়, তবে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বড়দের মতো শিশুরাও। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শিশুর পরিবার ও এলাকা খারাপ পরিস্থিতিতে পড়ে। এতে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা ক্রমেই ঝুঁকিতে পড়ে। তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষা হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো সুস্পষ্ট, এটা সামঞ্জস্যহীনভাবে শিশুদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এধারা চলতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ কর্ণধার এ শিশুদের সুনাগরিক তথা ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যোগ্য করে তোলা যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করতে বিশ্বব্যাপী নানা উদ্যোগ ও আয়োজন চলছে। বাংলাদেশ ও সেই ধারার অংশীদার। তবে দৃশ্যমান কোন সুফল এখনো চোখে পড়ছে না। শিশুদের জন্য সুন্দর জীবন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বিশেষজ্ঞরা ২০২১ সালের মধ্যে সামাজিক খাতের বাজেটের ২০ শতাংশ শিশুদের পেছনে বিনিয়োগ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাছাড়া শিশু জীবনের একটি ভালো সূচনা নিশ্চিত করতে এবং প্রত্যেক শিশুকে তাদের সম্পূর্ণ ক্ষমতা অনুযায়ী গড়ে তুলতে সরকারও চিন্তা ভাবনা করছে। বিশেষ করে দুর্যোগকালীন শিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকারের বিভিন্ন দফতর বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তায় ‘এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি’ মডেল তৈরি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য প্রভাব থেকে রক্ষা করতেও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এ ব্যাপক পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং এরই সঙ্গে দুর্যোগকালীন শিশুদের সুরক্ষার ব্যাপারে জনসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।

x