সুযোগ বেশি, তবুও পিছিয়ে কারিগরি শিক্ষা

শনিবার , ৩ আগস্ট, ২০১৯ at ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ
150

কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে দেশের ৬৪টি জেলায় ৪৪০টি সরকারি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি/টিএসসি) রয়েছে। এর বাইরে কারিগরি শিক্ষাবোর্ড অনুমোদিত এবং স্ব-অর্থায়নে পরিচালিত (বেসরকারি) কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৭০০টি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫২টি ট্রেড কোর্সে সারাদেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদানের পর বোর্ড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাপেক্ষে শিক্ষার্থীদের সনদ প্রদান করে কারিগরি শিক্ষাবোর্ড। কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের এ সনদপত্র দেশের পাশাপাশি বিশ্বের যে কোন দেশে দক্ষতাভিত্তিক চাকরিপ্রাপ্তিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। চট্টগ্রামের নাসিরাবাদস্থ বাংলাদেশ-কোরিয়া টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (বিকেটিটিসি), রাউজান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আরআইটি) সহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ট্রেড কোর্সে ভর্তির সুযোগ রয়েছে। অনেক কোর্সে বিনা ফি-তে প্রশিক্ষণের সুযোগ তো আছেই, উপরন্তু স্কলারশীপের সুযোগও রয়েছে। তবে এত সুবিধা থাকার পরও সরকারি-বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণার্থী বা শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছেনা। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্ধেক আসন শূন্য থাকছে বলে জানান রাউজান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আরআইটি)’র প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল বাতেন।
যার কারণে কারিগরি শিক্ষায় অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ বহু পিছিয়ে উল্লেখ করে আব্দুল বাতেন বলেন- অথচ কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়ার ফলে এবং কারিগরিতে শিক্ষিতের হার বৃদ্ধির কারণেই অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনসহ বিশ্বের বহু দেশ এখন উন্নত দেশের কাতারে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়- আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতের হার খুবই নগণ্য। বাংলাদেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার হার মাত্র ১৪ শতাংশ। কিন্তু জার্মানিতে এ হার ৭৩ শতাংশ, জাপানে ৬৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৬৫ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৬০ শতাংশ, চীনে ৫৫ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০ শতাংশ ও মালয়েশিয়ায় ৪৬ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে- উন্নত দেশগুলোতে দরজার একটি ছিটকিনি লাগাতে গেলেও লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ দরকার পড়ে। অর্থাৎ প্রশিক্ষিতরাই সংশ্লিষ্ট কাজটি করে থাকে। তাই সেখানে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের গুরুত্বও বেশি। কারিগরি শিক্ষার হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশেও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত, সনদধারী ও অনুমতিপ্রাপ্ত বা লাইসেন্সধারীকে দিয়ে সব ধরনের কারিগরি কাজ করানো বাধ্যতামূলক করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
পরিচিত ১৫-৩০ বছর বয়সী তরুণ সমাজকে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি যে কোন বিষয়ে একটি কারিগরি সনদ গ্রহণে উদ্বুব্ধ করতে হবে। ব্যক্তি ও সমাজ সর্বোপরি দেশ এর সুফল পাবে। কারণ, প্রশিক্ষণ বা কারিগরি শিক্ষায় সনদ ছাড়া বিদেশ গেলে যে বেতন পাওয়া যায়, প্রশিক্ষণধারী ও সনদধারী হয়ে বিদেশ গেলে এর তিনগুণ বেশি বেতন আয় করা যাবে।
কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন- বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে কারিগরি শিক্ষার আওতায় আনা গেলে দেশের বিশাল জনসংখ্যা বোঝা না হয়ে জনসম্পদে পরিণত হবে। কিন্তু কারিগরি শিক্ষায় পিছিয়ে থাকলে এই জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা যাবেনা। কারিগরি শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে সমাজের ধ্যান-ধারণা অনেকাংশে দায়ী। অধিকাংশ মানুষ মনে করেন- সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতরা অফিসার হবে। আর কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিতরা বড়জোর মিস্ত্রি হবে। এই ভুল ধারণার কারণেই কারিগরি শিক্ষায় অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা বহু পিছিয়ে আছি। আমাদের দেশে মানুষ অনেক। কিন্তু কাজের জন্য যোগ্য (স্কিলড) মানুষ পাওয়া যায় না। এক তথ্যে দেখা যায়- দেশের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ স্কিলড। আর ৯০ ভাগ মানুষ আন স্কিলড। বিদেশিরা এই সুযোগটি নিচ্ছে। বাংলাদেশের বহু প্রতিষ্ঠানে বিদেশিদের হায়ার করে আনতে হচ্ছে। প্রতিবছর বিশাল অংকের টাকা তারা আমাদের দেশ থেকে রেমিটেন্স হিসেবে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ, আমাদের দেশে স্কিলড মানুষ থাকলে এই বিশাল অংকের টাকা দেশের বাইরে চলে যেতো না। কারিগরি শিক্ষায় সচেতনতার অভাবেই আজ আমাদের এমন চিত্র। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে মনে করেন আরআরআইটি’র প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল বাতেন। এজন্য নিজে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও উদ্দীপ্ত করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে কারিগরি প্রশিক্ষণে উদ্বুব্ধ করতে হবে বলেও অভিমত আব্দুল বাতেনের।

x