সুফী-সংগীতের পথিকৃৎ কানু ফকির

নাসির উদ্দিন হায়দার

বৃহস্পতিবার , ১০ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ
41

আলী রজা ওরফে কানু শাহ ওরফে কানু ফকির। বাংলা ভাষার অমর কবি ও সংগীতজ্ঞ। ড. অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায়ের ভাষায় বলা যায় ‘আঠার শতকের কবি আলী রজা’। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের (১৮৭১-১৯৫৩) ভাষায় আলী রজা হলেন ‘দরবেশী গ্রন্থ জ্ঞানসাগর’ এর কবি এবং পারমার্থিক সংগীত রচয়িতা। মধ্যযুগের এই ‘দরবেশ কবি’র আরেকটি বড় পরিচয় তিনি একজন উঁচু দরের সংগীতজ্ঞ ছিলেন। আলী রজা একই সাথে গৃহী ও সংসার-বিরাগী ছিলেন। তিনি জীবনের ৩৬ বছর বনজঙ্গলে আধ্যাত্মিক সাধনায় রত ছিলেন। প্রায় ২০০ বছর ধরে আলী রজার কাব্য ও গান চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশ তথা বিশ্বব্যাপী জ্ঞানপিপাসুদের কাছে অমূল্য রত্ন হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।
আলী রজা ওরফে কানু শাহ ওরফে কানু ফকির। বাংলা ভাষার অমর কবি ও সংগীতজ্ঞ। ড. অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায়ের ভাষায় বলা যায় ‘আঠার শতকের কবি আলী রজা’। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের (১৮৭১-১৯৫৩) ভাষায় আলী রজা হলেন ‘দরবেশী গ্রন্থ জ্ঞানসাগর’ এর কবি এবং পারমার্থিক সংগীত রচয়িতা। মধ্যযুগের এই ‘দরবেশ কবি’র আরেকটি বড় পরিচয় তিনি একজন উঁচু দরের সংগীতজ্ঞ ছিলেন। সাহিত্যিক ব্রজসুন্দর সান্যাল আলী রজাকে ‘মুসলমান বৈষ্ণব কবি’ হিসাবেও আখ্যায়িত করেছেন। আলী রজা একই সাথে গৃহী ও সংসার-বিরাগী ছিলেন। তিনি জীবনের ৩৬ বছর বনজঙ্গলে আধ্যাত্মিক সাধনায় রত ছিলেন। প্রায় ২০০ বছর ধরে আলী রজার কাব্য ও গান চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশ তথা বিশ্বব্যাপী জ্ঞানপিপাসুদের কাছে অমূল্য রত্ন হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।
আলী রজা ছিলেন মরমী সাধক, চট্টগ্রাম তথা বাংলায় তিনি সুফীবাদের আধ্যাত্মিক উত্তরসুরী। চট্টগ্রামে সুফীবাদ-প্রেমবাদের ধারায় সিক্ত সুফী-সংগীত ও বৈষ্ণব ভাবগীতির পথিকৃৎ রচয়িতা হলেন আলী রজা। আলী রজারই স্বার্থক উত্তরসুরী হিসাবে চিহ্নিত করা যায় কালজয়ী মরমী শিল্পী আস্কর আলী পণ্ডিত ও আবদুল গফুর হালীকে।
আশ্চর্যজনক তথ্য হলো আজ থেকে ১০৩ বছর আগে ১৯১৬ সালে (বাংলা ১৩২৪) আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সম্পাদনায় কলকতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে আলী রজার কাব্যগ্রন্থ ‘জ্ঞানসাগর’ প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্যবিশারদ কানু ফকিরের ছয়টি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। এরপর আলী রজা ওরফে কানু ফকিরকে নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন ড. অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায়, শাহেদ আলী, ড. আহমদ শরীফ, এসএম আবদুল আলীম, জামাল উদ্দিন, শামসুল আরেফীন সহ অনেকে। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৬/৬৭ সালের দিকে আলী রজার কবিতা ‘মনের মহিমা’ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠ্য ছিল।
আলী রজার জন্ম ১৭৫৯ ইংরেজি মোতাবেক ১৭ শ্রাবণ, ১১৬৫ বাংলা, ১০ রবিউস সানি, ১১৫৯ হিজরী, সোমবার। জন্মস্থান, চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ওষখাইন গ্রামে। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মতে তিনি ১১৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তবে ড. এনামুল হক তাঁর ‘মুসলিম বাংলা সাহিত্য’ গ্রন্থে কানু ফকির ৯০ বছর বয়সে ১১৪২ মঘী অর্থাৎ ১৭৮০ সালে ইন্তেকাল করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। গবেষক শামসুল আরেফীন তাঁর ‘আঠারো শতকের কবি আলী রজা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আলী রজার জন্ম ১৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দে (১১২১ মঘীর ১৭ শ্রাবণ, ১৯ শাওয়াল। আর মৃত্যু ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে (১১৯৯ মঘীর ৫ মাঘ, ১৯ শাওয়াল)। ১৭৮০ হলো আলী রজার পিতার মৃত্যু সাল।
আওলাদে আলী রজা, পীরজাদা নিজাম উদ্দিন সিদ্দিকীর দেওয়া তথ্যমতে, আলী রজার পিতার নাম মোহাম্মদ শাছি। তার পূর্বপুরুষরা খিষ্টীয় ষোল শতকের মাঝামাঝি সময়ে নদীপথে ভারতে আসেন। ১৫৮১ সালে সম্রাট আকবর ‘দীন-ই-ইলাহী’ নামে নতুন ধর্মীয় মতবাদ প্রচার করলে ধর্মভীরু আলেম ও দরবেশরা ভীত হয়ে পড়েন। তাদেরই একজন হাজী দৌলত (যিনি আলী রজার পূর্বপুরুষ) চট্টগ্রামের পটিয়ার চক্রশালায় এসে আশ্রয় নেন। আলী রজার দাদা শাহ মনুহর চক্রশালায় বাস করতেন। তার ছেলে মোহাম্মদ শাছি পরে আনোয়ারার ওষখাইন গ্রামে চলে আসেন।
৭ বছর বয়সে পিতামাতার তত্ত্বাবধানে আলী রজার জ্ঞান অর্জন শুরু হয়। আলী রজার জ্ঞান অর্জন পূর্ণতা পায় তার গুরু তথা মুর্শিদ শাহ কেয়ামদ্দিনের (র) কাছে। আলী রজার ভাষায়…
শাহা কেআমদ্দিন গুরুরূপে পঞ্চস্বর
হিন আলী রাজা কহে রূপের লহর।
(জ্ঞানসাগর-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপি নম্বর ২৬০)।
তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ‘জ্ঞানসাগর’ এর ২৮২ নম্বর পাণ্ডুলিপিতে কবির নাম আলী রজা পাওয়া যায়, ‘হীন আলী রজা কহে গুরুপদ সার/সমুদ্র সাতরে তরু শক্তি আছে কার।’ (সূত্র : আঠারো শতকের কবি আলী রজা ওরফে কানু ফকির-শামসুল আরেফীন)। তবে বর্তমানে তিনি আলী রজা ওরফে কানু ফকির নামেই খ্যাত।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ‘জ্ঞানসাগর’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘এই গ্রন্থের নাম ‘‘জ্ঞানসাগর’’। …ইহা একখানি দরবেশী গ্রন্থ। ইহার প্রায় আদ্যোপান্ত নিগূঢ় আধ্যাত্মিক কথায় পূর্ণ। সে আধ্যাত্মিকতায় আবার হিন্দু-মুসলমানী ভাবের সংমিশ্রণ দেখা যায়। গুরুপদেশ ব্যতিরেকে এরূপ গ্রন্থের মর্ম্ম পরিগ্রহ করা বা অন্যকে বুঝান সম্ভব নহে।’ (জ্ঞানসাগর, সম্পাদনা আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলকাতা, প্রকাশক শ্রীরামকমল সিংহ, ১৩২৪ বাংলা, ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ।)
সাহিত্যিক হুমায়নু আজাদের ভাষায় বলতে হয়-‘যদি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ না জন্মাতেন, তাহলে হয়তো মুসলমান কবিদের সাধনার কথা জানতে পেতাম না। তাই তিনি স্মরণীয়।’ (লাল নীল দীপাবলী বা বাংলা সাহিত্যের জীবনী)। আজ আমরাও বলতে চাই, যদি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ না জন্মাতেন, তাহলে হয়তো বাংলা সাহিত্যের অমর কবি আলী রজার খবরও আমরা পেতাম না। বলতে গেলে মধ্য ও আধুনিক যুগের কবি ও সংগীতজ্ঞ আলী রজার আবিস্কারক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদই।
আলী রজার ৩০টি গ্রন্থের হদিস পাওয়া যায়। এগুলো হলো ১. জ্ঞানসাগর ২. আগম ৩. ষটচক্রভেদ ৪. ধ্যানমালা ৫. সিরাজ কুলুপ ৬. যোগকালন্দর ৭. কাহনামা (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড) ৮. রাগতালনামা ৯. ইসলামনামা ১০. খাবনামা ১১. সৃষ্টিপত্তন ১২. হাতেম তাঈ ১৩. তাওয়াফে হেদায়েতুল এজাম ১৪. আওরাদে আছানি ১৫. ছালাতুল মোক্তাদি ১৬. রফিকুচ্ছালেকীন ১৭. কিতাবে জরুরে মুকাল্লেদ ১৮. কিতাবে তাজহিজে তাকদ্বীন ১৯. আহকামুচ্ছালাত ২০. তাওয়াফে মকবুল ও ফজায়েলে রাসুল ২১. কিতাবে ছেহেল হাদিস ও মছায়েল ২২. খোতবায়ে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা ২৩. বয়ানে শবে বরাত ও শবে ক্বদর ২৪. রাহাতুর রুহ ২৫. তারিফে রসুল ২৬. যোগ সাধন ২৭. তনের বিচার ২৮. জ্যোতিষ নামা ২৯. রাগনামা ৩০ অমরসিংহ।
বাংলা একাডেমিতে আলী রজার ‘জ্ঞানসাগর’ এর দুটি, সৃষ্টিপত্তন এর একটি, রাগতালনামা’র একটি অনুলিপিসহ মোট ছয়টি অনুলিপি বা পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জ্ঞানসাগর’ এর দুটি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে।
আলোচ্য প্রবন্ধে আলী রজার সাহিত্যিক মূল্যায়ন নয় তার সাংগীতিক প্রতিভা ও সুফীবাদ প্রচারে তার সাধনার কিঞ্চিত ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আলী রজা ওরফে কানু ফকিরের একটি বৈষ্ণব পদ উল্লেখ করছি।
বনমালী শ্যাম তোমার মুরলী জগপ্রাণ। ধু্‌॥
শুনি মুরলীর ধনি ভ্রম যায় দেব-মুনি
ত্রিভুবন হয় জরজর।
কুলবতী যত নারী গৃহবাস দিল ছাড়ি
শুনিয়া দারুণ বংশী স্বর॥
জাতি ধর্ম্ম কুল নীতি তেজি বন্ধু সব পতি
নিত্য শুনে মুরলীর গীত।
বংশী হেন শক্তি ধরে তনু রাখি প্রাণি হরে
বংশী মূলে জগতের চিত॥
যে শুনে তোমার বংশী সে বড় দেবের অংশী
প্রচারি কহিতে বাসি ভয়।
গৃহবাসে কিবা সাধ বংশী মোর প্রাণনাথ
গুরুপদে আলী রাজা কয়॥
আলী রজার বৈষ্ণব গীতে হিন্দু-মুসলমানী ভাব সংশ্লেষে আধ্যাত্মিকত পরিস্ফুট। বৈষ্ণব পদে রাধা-কৃষ্ণের লীলার বর্ণনা পাওয়া যায়। এ কারণে সাহিত্যিকরা তাকে ‘মুসলমান বৈষ্ণব কবি’ বলে সাব্যস্ত করেছেন। একজন ধর্মসাধকের সংগীতে হিন্দু-মুসলিম ভাবের সংমিশ্রণ বিরল। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে কানু ফকির ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক, সিদ্ধ পুরুষ। আধ্যাত্মিক সাধকরা ধর্মসাধনার মাধ্যমেই ধর্মেরও উর্ধ্বে উঠে যান, তারা প্রকৃতপক্ষে মানুষকে ‘মানুষ’ হওয়ার শিক্ষা দেন। তাইতো কানু ফকিরের আধ্যাত্মিক সাধনার মূলে আছে মানবতাবাদ, যেখানে ভাবের ঘরে হিন্দু-মুসলমান একাকার।
চট্টগ্রামে সুফীধারায় মরমী সংগীতের মূল পথিকৃৎ হলেন আলী রজা। তিনি লিখেছেন
গীতযন্ত্র মহা মন্ত্র বৈরাগীর কাম
তালযন্ত্র মহা মন্ত্র প্রভুর নিজ নাম।
বলতে গেলে চট্টগ্রামের গত ২০০ বছরের সুফী-সংগীত ধারা আলী রজারই সাংগীতিক উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। চট্টগ্রামের মাজার সংস্কৃতি, পীর আউলিয়ার গান কানু ফকিরের ভাবতরঙ্গে বিহ্বল।
মাইজভাণ্ডারী গানের মহত্তম রচয়িতা মৌলানা হাদীর একটি গান হলো এমন…
আহরে মন ধন (আমার) লুটিয়ে নিল মন মোহিনী
কুঞ্জবনে পুষ্প কানে নাচিল কামিনী॥
কপালে তিলকের ফোটা সীতিপাঠ হীরা কাটা
হাতে লিয়ে ফুলের জটা নাচিল চন্দ্রাননী॥
(রত্নভাণ্ডার, দ্বিতীয় খণ্ড, মৌলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরী)
মেীলানা হাদী ছিলেন ব্রিটিশ আমলের টাইটেল পাস আলেম। মাইজভাণ্ডারের মহান ধর্মসাধক সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর প্রেমে মজে একজন শামসুল উলামা গান লেখা শুরু করেছেন এবং সেই গান ধর্ম-বর্ণের ছন্দ ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে মানবতার জয়গান-এ তো সামান্য কথা নয়! এই ক্ষেত্রে আমরা সুফীবাদ-প্রেমবাদের দিশারী কানু ফকিরকে মৌলানা হাদীর ভাবগুরু তথা পূর্বসূরি হিসাবে কল্পনা করতে পারি।
মরমী সংগীতজ্ঞ আস্কর আলী পণ্ডিতের গানেও কানু ফকিরের ভাবের সন্ধান মেলে। মাইজভাণ্ডারী, মরমী গানের কিংবদন্তী রচয়িতা আবদুল গফুর হালীর গানেও কানু ফকিরের দর্শন দৃশ্যমান। যদিও আবদুল গফুর হালীর গানের উপজীব্য মাইজভাণ্ডারের পীরের মাহাত্ম্য, তথাপি গফুর হালীর গানে আলী রজা ও আস্কর আলী পণ্ডিতের গানের ভাবের রূপ পরিস্ফুট। কানু শাহ বলেন, ‘গীতযন্ত্র মহা মন্ত্র বৈরাগীর কাম/তালযন্ত্র মহা মন্ত্র প্রভুর নিজ নাম’। আস্কর আলী পণ্ডিত লিখেন…
ডালেতে লরিচরি বইও চাতকী ময় নারে
গাইলে বৈরাগীর গীত গাইও॥
আবদুল গফুর হালী লিখেছেন, ‘কাষ্টের ওপর চামড়া দিয়ে কে বানাইল ঢোল/এই ঢোলেরে কে শিখাইল আল্লাহ আল্লাহ বোল।’ (সুরের বন্ধন : আবদুল গফুর হালী, সম্পাদনা-নাসির উদ্দিন হায়দার)
তেমনি আবদুল গফুর হালীর গানে রাধা-কৃষ্ণের বিরহ প্রাণ আকুল করে…
আমার রাধা কেমন আছে বল
তারে একটা দিনও না দেখিলে রে
ঝরে আমার চোখের জল॥
বৈষ্ণব কবিদের কবিতার বিষয় হলো রাধা ও কৃষ্ণের ভালবাসা। এরা একজন চায় অপরজনকে, কিন্তু এদের মধ্যে বিপুল বাধা। এই বাধা সরাতে চেয়েছেন কবিরা। কানু ফকিরের কবিতায় সেই সন্ধান মেলে। বৈষ্ণব কবিদের মতোই কানু ফকিরের কবিতার বাহন হলো ধর্ম। স্রষ্টা সৃষ্টিক ভালবাসে, সৃষ্টিও স্রষ্টাকে। তাই উভয়ে মিলিত হতে চায়, কিন্তু পারে না। এখানে রাধা হচ্ছে সৃষ্টি বা জীবাত্মা, আর কৃষ্ণ হলো স্রষ্টা তথা পরমাত্মা। আসলে এখানে রাধা-কৃষ্ণের ছায়ায় কবি আলী রজা তার গুরু তথা মুর্শিদের চরণ-সাধনা করেন। সেই সাধনা চূড়ান্তে হয়ে উঠে স্রষ্টাকে পাবার সাধনা সাধনা।
বৈষ্ণব কবির মতোই কানু ফকিরের কবিতা ও গানে কোনটির বিষয় রাধা-কৃষ্ণের রূপ, কোনটির বিষয় দুজনের মিলন। সবসময় তো মিলন হয় না। তখন বাড়ে বিরহ ব্যথা। এই যে মিলন-বিরহ, তা কানু ফকিরের গানে আকুল হয়ে উঠে…
শ্যাম কালারে
অবিরত জ্বলেরে প্রাণ তুই শ্যামের ভাবনায় রে॥
কেহই হাসে কেহই কান্দে কেহই জপের মালা
তুই শ্যামের ভাবনা নয়, অবিরত জ্বালারে॥
অপরূপ শ্যামরূপ রূপের মনোহরা
নন্দের কানু নহেরে শ্যাম বিনন্দের ভ্রমরারে॥
কহে গুরু আলী রজা শ্যাম কর সার
পিরীত সামান্য নয় ত্রিজগত মাজার।।
আসলে কানু ফকিরের আধ্যাত্মিক চেতনাপুষ্ট কবিতা ও গান আমাদের আকুল করে তোলে। কবি শ্যাম তথা মুর্শিদের রূপকে নানা উপমায় উপস্থাপন করেছেন। কৃষ্ণ এখানে সৌন্দর্য ছড়ায়, রাধা সৌন্দর্যের দেবী হয়ে আসে। তিনি তার মুর্শিদকে সাজান রাধার রূপে।
বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতি কবিতা রচনা করতেন ব্রজবুলি ভাষায়। বিদ্যাপতির একটি পদ
যব-গোধুলী সময় বেলি।
ধনি-মন্দির বাহির ভেলি॥
নব জলধর বিজুরি রেহা
দ্বন্দ্ব পসারি গেলি॥
ধনি-অল্প বয়েসী বালা
জনু-গাঁথনি পুহপ মালা॥
কবি রাধার রূপে বর্ণনা দিচ্ছেন। রাধা খুব রূপসী, তখন গোধূলী বেলা। যখন গোধূলী বেলা, তখন রাধা ঘর থেকে বাইরে এল। সে এক অপরূপ দৃশ্য। কবি রাধার বাইরে আসার দৃশ্যকে উপমা দিয়ে বুঝিয়েছেন, বলছেন হঠাৎ যেন মেঘের কোলে বিদ্যুৎ চমকে গেল। বিদ্যাপতি বলছেন, রাধা অল্প বয়সের মেয়ে। কিন্তু কেমন মেয়ে? যেন ফুলের গাঁথা মালা।
কানু ফকিরের কবিতা আর গানের পরতে পরতে এমনই সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। কানু শাহ’র প্রেমের রাজ্যে সারাক্ষণ বাঁশি বেজে যায়, সে বাঁশিতে পাগল হয় রাধা, পাগল হই আমরা। পাগল হয় ত্রিজগত।

x