সুপারনোভা বিস্ফোরণের মুখে বিরোধী দল

শঙ্কর প্রসাদ দে

বুধবার , ১৫ মে, ২০১৯ at ৫:২৯ পূর্বাহ্ণ
84

সুপারনোভা একটি দুর্দান্ত মহাজাগতিক বিস্ময়। সূর্যের চেয়ে ভারী নক্ষত্র যখন জ্বালানি হারিয়ে চুপসে যেতে তখন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। নক্ষত্রের কেন্দ্রীভূত হাইড্রোজেন ভরের সাথে আবরণের গ্যাসীয় ধূলিকণার সংঘর্ষ বিশাল আকারে বিস্ফোরণের জন্ম দেয়। বিস্ফোরিত নক্ষত্র থেকে বিচ্ছুরিত আলো পুরো গ্যালাঙিকে আলোকিত করে এমনকি দূরবর্তী গ্যালাঙি থেকে এই রশ্মি বা আলো দেখা যায়। এভাবে আমাদের মিল্কীওয়ে গ্যালাঙি থেকে অন্য গ্যালাঙির সুপারনোভা বিস্ফোরণ প্রায় ৫০ বছরে একবার অন্তত দেখা যায়। সাধারণ সূর্যের চেয়ে অনেকগুণ বড় নক্ষত্র না হলে সুপারনোভা বিস্ফোরণ হয় না। ছোটখাটো গ্রহ নক্ষত্র এমনিতেই ব্লাক হোলে হারিয়ে যায় কিন্তু বড় নক্ষত্রগুলো বিশাল আকৃতির কারণেই ব্লাক হোলে নিপতিত হবার আগে এমন মহাজাগতিক কাণ্ড ঘটে।
ভাল লাগুক আর নাই’ই লাগুক বাংলাদেশের অন্যসব রাজনৈতিক দলের সাথে তুলনা করলে অবশিষ্ট সব বিরোধীদলকে একত্রিত করলে বিএনপি’র সমান হবে না। এটাও বাস্তবতা যে বর্তমানেও বিরোধীদল বলতে বিএনপি’কে’ই বুঝায়। অবশ্য তাত্ত্বিক ও আদর্শিক ভাবে বিএনপি থেকে জামাতকে পৃথক করার সুযোগ নেই। কেন দল দুটোকে পৃথক করা যাবে না তা ভিন্ন বিতর্কের বিষয়। এদেশের বর্তমান সংকট বলুন বা বাস্তবতা বলুন এর জন্য মূলত বিএনপি-জামাতের সখ্যতাই মূলত দায়ী।
একটি রাজনৈতিক দলের মূল প্রাণশক্তি হলো জনসমর্থন। এক মহাচাতুরীপনার মধ্য দিয়ে বিএনপি’র বিশাল জনসমর্থন সৃষ্টি হয়েছিল। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত যত দোষ নন্দ ঘোষ ভারতের কাঁধে চাপানো হয়েছিল। ডাকাতি হলে ভারতের দোষ, ব্যাংক লুট হলে ভারতের দোষ, সীমান্তে চোরাচালান হলে ভারতের দোষ। চিনির দাম বাড়লে ভারতের দোষ, বৃষ্টি বেশি হলে ভারতের দোষ ইত্যাদি ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধু আর আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করতে গিয়েই এই সব মিথ্যার বেসাতি চালু করা হয়েছিল। মূল টার্গেট ছিল একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া। পাকিস্তানই সঠিক ছিল এটা প্রমাণ করা। খুব সোজা কথা ৭২ সাল থেকেই এন্টি আওয়ামী লীগ রাজনীতির শুরু। জলিল-রবকে দিয়ে শুরু। তাহেরকে ফাঁসি দিয়ে জাসদের ভারত বিরোধীতার ব্রিফকেসটি ছিনতাই করলেন জিয়াউর রহমান সাহেব। ব্রিফকেসের উপর ইসলামী সীল মেরে নাম দিলেন বিএনপি। সোজাসুজি বয়ান দিলেন, ‘মানি ইজ নো প্রব্লেম’। একাত্তরে পরাজিত সব জিন্নাহ টুপীওয়ালারা, তিয়াত্তর চুয়াত্তরের লাল পট্টী ওয়ালাদের চোখের উপর ব্রিফকেসের পিছনে পিছনে দৌড় লাগালো একাত্তরের চীনপন্থীরা, ভাসানীর চেলারা যারা, ফারাক্কা পদযাত্রার নামে মাঝ পথ থেকে ভেগেছিল। যত দলছুট আর পাকিস্তানপন্থী আর চীনাপন্থী সব জিয়ার ব্রিফকেসের চারপাশে কোরাস গাইতে গাইতে বললো রেডিও বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, রুশ-ভারতের দালালেরা ধ্বংস হোক নিপাত যাক। চাটুকারদের এহেন কাণ্ড দেখে রঙ্গীন চশমার ভেতর থেকে জিয়া নিশ্চিৎভাবে মুচকি হেসে ভেবেছিলেন টাকা নাকের ডগায় ঝুলালে এদেশে মুর্দাও চোখ নাড়ে। তেমন সোনার বাংলায় চিরস্থায়ী সিংহাসনের জন্য দু’টো ট্যাবলেট’ই যথেষ্ট। একটি হলো মুসলমানের দেশ পাকিস্তান আরেকটি হলো কচকচে টাকার বান্ডিল। শাহ আজিজ থেকে আরম্ভ করে গোলাম আজম পর্যন্ত সবাইকে নিয়ে আসা হল ফুলের মালা দিয়ে। চারিদিকে একটাই আওয়াজ মারহাবা, মারহাবা।
এরপরের ইতিহাস আরো চমকপ্রদ এবং এন্টি আওয়ামী তকমায় ভরপুর। জিয়ার পাকিস্তান প্রীতিতে বিক্ষুব্ধ জেনারেলরা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ঘুমন্ত জিয়ার শরীরে চালিয়ে দিল ডজন ডজন বুলেট। পরে বিচারের নামে যে সামারী ট্রায়াল হয়ে ফাঁসিতে ঝুলানো অফিসারদের পরিচয় বেরিয়ে এলো প্রায় সবাই মুক্তিযোদ্ধা। এরপর সাচ্চা পাকিস্তানী অফিসার জেনারেল এরশাদ জিয়ার হাত থেকে কেড়ে নিলেন পাকিস্তান মার্কা ব্রিফকেস। তিনি ব্রিফকেসের উপর আরোও একটা সিল মেরে দিলেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। ভণ্ডপীর আর কাকে বলে। কোন মুসলমান রাষ্ট্রধর্মের দাবি না করার পরও এরশাদ বললেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এজন্য বলছিলাম ’৭৫ থেকে ’৯৬ দীর্ঘ একুশ বছর এদেশে পাকিস্তান পন্থিদের জয় জয়কার। ’৯৬ থেকে ২০০১ শেখ হাসিনার শাসনকাল দেখে এরা বুঝে ফেলে ছিল, আবার ক্ষমতায় এলে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি নিশ্চিত। ’৭৫ এর হত্যাকারীদের বাঁচাতে হলে শেখের বেটিকে মেরে না ফেললে যে শেষ রক্ষা হয় না।
২১ আগস্ট ২০০৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সূর্যের চেয়েও বড় নক্ষত্রের মতো বিএনপি জ্বল জ্বল করছিল। বেগম জিয়া দম্ভোক্তি করে বললেন, পরবর্তী ৫০ বছরেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতার মুখ দেখবে না। শোনা যায় অসীম ক্ষমতাধর তারেক জিয়া সেনাবাহিনীর জেনারেলদেরও অপদস্থ করতে দ্বিধা করতেন না। বড় নক্ষত্র যেমন প্রাকৃতিক নিয়মকে উপেক্ষা করতে পারে না তেমনি তারেক জিয়া বেগম জিয়া বুঝেছিলেন অন্তিম মুহূর্ত ঠেকাতে হলে শেখ হাসিনা সহ গোটা আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেই ধ্বংস করা চাই। প্রায় সমাপ্ত কাহিনীর শুরু হল নতুনভাবে নাটকীয়ভাবে। শেখ হাসিনাকে নিজের জীবনের বিনিময়ে কর্পোরাল মাহাবুব রক্ষা করে ফেলেন। হাসলেন অন্তর্যামী এবার সত্যি সত্যি বিএনপি নামক নক্ষত্রসম দলটির মৃত্যুসময় উপস্থিত।
এই সেদিন মীর্জা ফখরুল বললেন, দশম সংসদ তথা ৫ জানুয়ারি ’১৪ নির্বাচনে বিএনপি না গিয়ে ভুল করেছে। এখন আরেক গ্রুপ বলছে একাদশ সংসদ নির্বাচনে গিয়ে বিএনপি ভুল করেছে। আবার ২২ জন জামাত নেতাকে নমিনেশন দিয়ে যে লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি করেছিল সে থেকে ঘটনা প্রবাহ ক্রমশ মৃত্যুকূপ ব্লাকহোলের দিকে ধাবিত করছে। অতি সম্প্রতি সংসদে মীর্জা ফখরুল ছাড়া বাকীরা যোগ দেওয়ায় আভাস পাওয়া যাচ্ছে দলের অভ্যন্তরে মতবিরোধ স্পষ্ট এবং দলটির জ্বালানি অর্থাৎ জন সমর্থন খুব দ্রুতই তলানীর দিকে ছুটছে।
অনেকে বলতে পারেন আমি বিএনপি জামাতকে খুব ছোট করে দেখছি। বিষয়টি মোটেও তা নয়। বুঝাতে চাইছি বিএনপি’র অভ্যন্তরে মতবিরোধ ক্রমশ বাড়ছে। ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। এরকম মতবিরোধের ফলে বিএনপির মতো বড় দলে বিস্ফোরণ হলে তা সুপারনোভা বিস্ফোরণের মতই হবে। সিপিবি, চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি এবং জাসদ, বাসদ আরো ৫০ বার ভাঙলেও বড় কোন শব্দ হবে না। কিন্তু বর্তমান ধারা বজায় থাকলে নিকট ভবিষ্যতে বিএনপিতে বিস্ফোরণ অনিবার্য এবং এমনকি কিছু ঘটলে সেটাকে সুপারনোভা বিস্ফোরণের সাথেই তুলনা করা যাবে। অন্য কিছুর সাথে নয়।
আমার অতি উৎসাহী বন্ধুরা বলেন, মুসলিম লীগের মতোই বিএনপি ক্রমশই রাজনৈতিক কৃষ্ণগহ্বরে নিপতিত হতে চলেছে। আমি অমন সরলীকরণে একমত নই। খালি চোখেই দেখা যায় এখনো এদেশে বিশাল একটা জনগোষ্ঠী আছে যারা এককথায় এ্যান্টি আওয়ামী লীগ, এন্টি ভারত। আমার বাসার বুয়া একদিন প্রশ্ন করেছিল আঙ্কেল শেখ হাসিনা নাকি হিন্দু? আমি মেয়েটির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলেছিলাম, এসব তুই বুঝবি না এবং না বুঝার জন্যই তোকে স্কুলে যেতে দেয়নি। স্কুলে তুই যেতে না পারলেও তোর ছেলে মেয়েকে পাঠাইস। মেয়েটির সাথে হয়তো জীবনে আর দেখাও হবে না। যখন হবে তখন হয়তো দেখবো বিএনপি-জামাতের রাজনীতি বিস্ফোরিত হয়েছে গগণবিদারী শব্দে। ঐ ধরনের পরিস্থিতিতে সংজ্ঞায়িত করা যাবে একমাত্র সুপারনোভা বিস্ফোরণের সাথে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক ও আইনজীবী

x