সুন্দরবনের বাঘেরা আবাসস্থল হারাচ্ছে পরিবেশ সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নিন

সোমবার , ১১ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
34

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ঝুঁকি মোড় নিতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের। জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি-এ দুইয়ের অভিঘাতে সবচেয়ে বেশি হুমকিতে আছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল সুন্দরবন। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, আগামী পাঁচ দশকের মধ্যে বাঘের আবাস যোগ্যতা হারাতে পারে ম্যানগ্রোভ বনটি। পৃথিবীর মোট বাঘের প্রায় ৬৭ শতাংশ রয়েল বেঙ্গল টাইগার উপজাতির। এসব বাঘের অধিকাংশেরই আবাসস্থল সুন্দরবন। পৃথিবীর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলগুলোর মধ্যে একমাত্র সুন্দরবনেই বাঘের উপস্থিতি দেখা যায়। ভৌগোলিক অবস্থানজনিত কারণে পৃথিবীর দীর্ঘতম ও সবচেয়ে সমৃদ্ধ ডেল্টা সিস্টেমগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে সুন্দরবন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখানকার বৃক্ষরাজি, লবণাক্ততা ও পলি প্রবাহে এরই মধ্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সুন্দরবনের অধিকাংশ এলাকার গড় উচ্চতা এক মিটারের কম। এ কারণে বনাঞ্চলটির সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতাজনিত ঝুঁকিও কম। এ কারণে বনাঞ্চলটির সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত ঝুঁকিও উচ্চমাত্রার। এ ঝুঁকির বিষয়টি নিয়েই একটি গবেষণা করেছেন বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ গবেষক। ‘কম্বাইড ইফেক্টস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সি-লেভেল রাইজ প্রজেক্ট ড্রামাটিক হ্যাবিটেট লস অব দ্য গ্লোবালে এনডেঞ্জারড বেঙ্গল টাইগার ইন বাংলাদেশ সুন্দরবনস’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি নেদারল্যান্ডসভিত্তিক জার্নাল এলসেভিয়েরে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ হয়েছে। পত্রিকান্তরে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এ খবরটি প্রকাশিত হয়েছে।
ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনও এখানে বসবাসকারী রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশের অন্যতম গর্ব। সুন্দরবন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব যে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সে ব্যাপারও নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরে দেশের পত্র-পত্রিকাগুলোতে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে এবং আলোচনাও চলছে বিস্তর। কীভাবে সুন্দরবন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে রক্ষা করা যাবে তা নিয়েও বিভিন্ন সময় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ এ ব্যাপারে এ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয় নি। সুন্দরবন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার রক্ষায় কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় দেশের গর্বের বনাঞ্চল এবং এখানে বসবাসকারী প্রাণিটির অস্তিত্ব লুপ্ত হওয়ার বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটিতে সে কথাই বলা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়েছে, যেসব দেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যেই সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যাও আবাসযোগ্য এলাকার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। ২০৭০ সালের মধ্যেই প্রাণিটির আবাসস্থল হিসেবে এ বন উপযোগিতা হারাবে। এ তথ্য আমাদের জন্য মহা-উদ্বেগজনক। সুন্দরবনকে রক্ষা করা না গেলে অপূরণীয় ক্ষতি হবে দেশের পরিবেশের। যেসব কাজ সুন্দরবন ও এর প্রাণি বৈচিত্র্য নষ্ট করে সেগুলো একেবারেই বন্ধ করে দিতে হবে। বেঙ্গল টাইগার উপ-প্রজাতির বাঘের অধিকাংশেরই আবাসস্থল সুন্দরবন। সারা পৃথিবীর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলগুলোর মধ্যে একমাত্র সুন্দরবনেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি দেখা যায়। আমাদের গর্বের এই বাঘ রক্ষা করতেই হবে। উল্লেখিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, সারা পৃথিবীতে মাত্র চার হাজার বেঙ্গল টাইগার বেঁচে আছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালের হিসেব মতে বাংলাদেশে আছে মাত্র ১০৬টি। তাও আবার ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। যে কয়টি বাঘ এখনও বেঁচে রয়েছে সেগুলো রক্ষা করতেই হবে। আর এজন্য দরকার এর সংরক্ষণের ব্যবস্থাপনা বদলানো। সুন্দরবনের বাঘের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বড় হুমকি। পাশাপাশি বড় হুমকি চোরাশিকারিদের বাঘ শিকার ও সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় শিল্পায়ন। সুন্দরবনের চারপাশে শিল্প-কারখানার চাপ বাড়ছে, নির্মাণ হচ্ছে সড়ক। একই সঙ্গে বাড়ছে চোরাশিকারিদের দাপট। এসব থেকে বাঘকে রক্ষা করতে হলে অবকাঠামো নির্মাণ পরিকল্পনা এমন নকশায় করতে হবে, যার প্রভাব সুন্দরবনে পড়বে না। সুন্দরবনের মধ্যে নৌ-চলাচল নেটওয়ার্ক যেন বাঘের জন্য ক্ষতিকর হয়ে না ওঠে সেদিকেও নজর রাখা অত্যাবশ্যক। চোরাশিকারিদের রুখতে বন রক্ষা বাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে বাঘের প্রজনন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বনের মধ্যেই বাঘ যেন পর্যাপ্ত খাবার পেতে পারে সেজন্যে কৃত্রিমভাবে হলেও হরিণের মতো খাদ্যের যোগানের বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সর্বোপরি সুন্দরবন বাঘের জন্য যাতে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। এটা করতে হলে, মানুষের কোন কর্মকাণ্ড বাঘের স্বাভাবিক জীবন প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হওয়ার মতো হলে চলবে না। লোকালয়ে মানুষের হাতে বাঘ ধরা পড়লে সেটাকে মানুষ যেন পিটিয়ে না মারে, তার জন্য সচেতনতা গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক।
সুন্দরবন সারা পৃথিবীর প্রাকৃতিক বিস্ময়গুলোর একটি এবং আমাদের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু বইয়ের মধ্যে অথবা ভিডিওর মাধ্যমে এসব সম্পর্কে জানুক, এটা আমাদের প্রার্থিত হতে পারে না। সুন্দরবন ও বাঘ রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ালে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে টিকে থাকতে সহায়তা করলে এসব প্রাণিকে বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা মোটেই অসম্ভব নয়।

x