সুতির মধ্যে স্পেশাল কম থাকে

নাজমুস সাকিব রহমান

মঙ্গলবার , ৪ জুন, ২০১৯ at ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ
39

এ্যাপলো বড়ুয়া। পেশায় একজন দর্জি। নগরীর হেমসেন লেনে লুম্বিনী টেইলার্স নামে একটি দোকান আছে তার। ব্যবসা ছাড়াও তিনি জড়িয়ে আছেন কয়েকটি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে। সেসব নিয়েই তার সঙ্গে কথা বলেছেন

সাকিব : সামনেই ঈদ। এই সময় টেইলার্সগুলোতে প্রচুর কাজের চাপ থাকে। শেষ সময়ে অনেকে অর্ডার নিতে চায় না।
এ্যাপেলো : আমার এখানেও কাজের চাপ আছে। তবে আমি হেমসেন লেনে অনেকদিন। প্রায় ১৪ বছর। তাই কাস্টমারদের বেশিরভাগই আমার পরিচিত। তাদের চাইলেও ফেরাতে পারছি না। যদিও সারা বছরই কাজের চাপ থাকে, কিন্তু ঈদ বা পূজায় স্বাভাবিকভাবেই এটা অনেক বেড়ে যায়। এখন আমাদের রাত জেগে কাজ করতে হচ্ছে।
সাকিব : ক’টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে?
এ্যাপেলো : রাত আড়াইটা থেকে তিনটা পর্যন্ত।
সাকিব : আপনি যখন ১৪ বছর আগে হেমসেন লেনে এই দোকানটা করলেন, ওই সময়ের প্রতিবন্ধকতা কেমন ছিল?
এ্যাপেলো : প্রতিবন্ধকতা বলতে তেমন কিছু ছিল না। এখানকার লোকজন অনেক ভালো। পরিবেশও। তাছাড়া আমাদের বাড়িওয়ালা অনেক ভালো মানুষ। অনেক সাপোর্ট করেছেন আমাকে। সাহস দিয়েছেন। আমার এখানে যারা কাজ করছেন, তারা ১২-১৩ বছর ধরে এখানে আছেন। সে হিসেবে প্রতিবন্ধকতা তেমন ছিল না। তারপরেও ব্যবসায় অল্প কিছু প্রতিবন্ধকতা তো থাকেই। এগুলো আমি মনে রাখিনি।
সাকিব : কেন?
এ্যাপেলো : দেখুন, কিছু করতে গেলে একটু আধটু খারাপ তো থাকেই। তাছাড়া সবসময় তো ভালো কিছু করা যায় না। প্রতিবন্ধকতা থাকেই। আমারও ছিল।
সাকিব : আপনার দোকানের নাম ‘লুম্বিনী টেইলার্স’। এই লুম্বিনী শব্দটা কোথা থেকে আসছে?
এ্যাপেলো : গৌতম বুদ্ধের মা তখন গর্ভাবস্থায়। ওইসময় তার বাপের বাড়ি যেতে ইচ্ছে করলো। তিনি যাত্রা শুরু করলেন। পথিমধ্যেই লুম্বিনী নামে একটা বাগান ছিল। গৌতম বুদ্ধ ওখানেই জন্ম নেন। এটা নেপালের একটা জায়গা। এই নামটা কিন্তু একজন মুসলমান আপার দেওয়া। তিনি আমাদের কাস্টমার ছিলেন।
সাকিব : আপনার দোকানে যেসব কাস্টমার আসেন, তাদের বেশিরভাগই নারী। তাদের চাওয়াটা আপনি কীভাবে বুঝতে পারেন?
এ্যাপেলো : এটা আসলে সম্পূর্ণ কাস্টমারের ওপর। তবে আমিও বলতে চেষ্টা করি। আমাকে বলতে হয়, কাপড়টা এভাবে না, ওভাবে করলে সুন্দর হবে। তখন উনারা বলেন, আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি আপনার মতো করে দেন।
সাকিব : আপনার গ্রামের বাড়ি কই ?
এ্যাপেলো : পটিয়ার করলে। থানা পটিয়া।
সাকিব : আমি শুনেছি আপনি সেখানে সামাজিক উন্নয়নমূলক কিছু সংগঠনের সাথে জড়িত।
এ্যাপেলো : ওইখানে আমি করল মিশুক সংঘ ও করল প্রগতি সংঘ নামে দুইটা সংগঠনের সাথে আছি। আমরা রাস্তার মেরামত থেকে টিউবলের সংস্কার; এই ধরনের কিছু কাজ করি। ব্যাক্তিগতভাবেও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। আমি ছোটবেলা থেকে সংগঠন করা মানুষ। তাই অন্যদের বলতে চেষ্টা করি- নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না; সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করতে হবে।
সাকিব : না করলে?
এ্যাপেলো : না করলে মানুষকে বোঝাই। কেউ যখন খুশি হয় আমার ভালো লাগে। আমার পরিবার আমাকে কখনো খারাপ কাজের জন্য সাপোর্ট করেনি। আমি শহরেও সম্যক, বৌদ্ধ তারুণ্য সংগঠন নামে দুইটা সংগঠনের সাথে জড়িত আছি।
সাকিব : আপনার দোকানে কিসের চাহিদা বেশি?
এ্যাপেলো : গরমে সুতির কাপড়ের চাহিদা বেশি থাকে। কিন্তু এখন তো ঈদ। গরম হোক বা ঠাণ্ডা হোক, ঈদ তো স্পেশাল। সুতির মধ্যে কিন্তু স্পেশাল কম থাকে। জর্জেট, সিনথেটিক কাপড়ের মধ্যে স্পেশাল বেশি। আমাদের এখানে সারা বছর সালোয়ার কামিজের চাহিদা থাকে। তবে পূজা হচ্ছে শাড়ির মৌসুম। তখন আমাদের প্রচুর ব্লাউজ বানাতে হয়।
সাকিব : ক্লান্ত লাগে না?
এ্যাপেলো : মাঝে মাঝে লাগে। তখন একটু বেড়াই। এমনিতে আমার দোকান শুক্রবার বন্ধ থাকে। এটা কাস্টমাররা জানে।
সাকিব : লাস্ট কোথায় বেড়াতে গেছেন?
এ্যাপেলো : সেন্টমার্টিন। ওখানে ছেঁড়াদ্বীপ বলে একটা জায়গা আছে। আমি প্রথমবার গিয়েছি। খুব ভালো লেগেছে। ওখানকার পানি, পাথর এইগুলা অনেক বেশি সুন্দর। আমার ভালো লেগেছে।
সাকিব : আপনি অনেক দিন ধরে মেয়েদের কাপড় সেলাচ্ছেন। এখনকার মেয়েরা যখন আপনার দোকানে আসে, তাদের আগের জেনারশনের সাথে কী তফাৎ পান?
এ্যাপেলো : এখনকার মেয়েরা কিন্তু অনেক অ্যাডভান্স। ওরা ফেসবুক থেকে বা অন্য কোথাও কাপড়ের ডিজাইন পছন্দ হলে ওই ছবি ডাউনলোড করে রাখে। আমি যখন প্রথম দোকান শুরু করি, তখন ক্যাটলগ থাকতো।
এখন ওরা অ্যান্ডড্রয়েড সেট নিয়ে দোকানে আসে। বলে, এভাবে করে দেন। তারপর আমরা ওই ডিজাইনটা শেয়ার ইট করে নিজের ফোনে নিয়ে নিই।
সাকিব : আপনার ভবিষৎ কোনো পরিকল্পনা আছে ?
এ্যাপেলো : আমার ভবিষৎ পরিকল্পনা হচ্ছে, যখন যে পরিস্থিতে থাকবো, নিজে ভালো থাকবো। অন্যকেও ভালো রাখবো। আমি তো সবাইকে নিয়ে বড় হতে পারবো না। তাই বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন আমার কম।

x