সুগন্ধিযুক্ত মুখরোচক পুদিনার বাণিজ্যিক আবাদ

লাভবান হচ্ছে কৃষক

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : সাতকানিয়া

সোমবার , ২০ মে, ২০১৯ at ৪:২৫ পূর্বাহ্ণ
159

পুদিনা এক ধরনের সুগন্ধিযুক্ত মুখরোচক গাছ। তরি-তরকারিসহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রীতে সুগন্ধি হিসেবে পুদিনা পাতা ব্যবহার করা হয়। পবিত্র রামজান মাসে হোটেল-রেষ্টুরেন্ট এবং প্রত্যেক ঘরে ঘরে ব্যাপকভাবে পুদিনা ব্যবহার করা হয়। ইফতার সামগ্রীতে পুদিনা পাতা ছাড়া যেন চলেই না। ধনী কিংবা গরীব সকলেই খাবারে একটু ভিন্ন স্বাদ যোগ করতে পুদিনা ব্যবহার করে থাকে। চাইনিজ রেষ্টুরেন্ট গুলোতে সালাত, জুস, চাটনি তৈরিতে এবং ফুড ডেকোরেশনের কাজে পুদিনার বিশেষ কদর রয়েছে। অনেক বেকারি সামগ্রীতেও পুদিনার ব্যবহার রয়েছে। এছাড়া পুদিনার রয়েছে নানা ওষুধি গুণ। ফলে বাজারে এখন পুদিনা পাতার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মূূল্যও রয়েছে ভাল। তাই কৃষকরা এখন পুদিনা আবাদে ঝুঁকে পড়ছেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে অধিক লাভ পাওয়ায় কৃষকদের মাঝে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পুদিনার আবাদ। চন্দনাইশে এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পুদিনার আবাদ করা হচ্ছে। পুদিনা পাতার আবাদ করে লাখ টাকা আয় করেছে এখানকার অনেক কৃষক। চন্দনাইশের দোহাজারীতে প্রতিদিন সকালে অন্যান্য সবজির মতো পুদিনারও পাইকারি বাজার বসে। প্রতিবছর রমজান মাসে পুদিনার চাষ এবং বিক্রিকে কেন্দ্র করে অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। পরিকল্পিতভাবে আরো ব্যাপক হারে পুদিনার আবাদ করা গেলে বিদেশে রপ্তানীর পাশাপাশি এ অঞ্চলে পিপারমেন্ট তেল উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলা যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রমতে, চন্দনাইশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৮ হেক্টর জমিতে পুদিনার চাষ হয়। বিশেষ করে দোহাজারী, হাশিমপুর, গাছবাড়িয়া, ধোপাছড়ি, কাঞ্চননগর ও চন্দনাইশ সদরের কিছু এলাকায় পুদিনার চাষ করা হয়েছে। পুদিনার অনেকগুলো জাত রয়েছে। তারমধ্যে পিপারমেন্ট, স্পিয়ার মেন্ট ও অ্যাপেল মেন্ট হলো পুদিনার সবচেয়ে উন্নত জাত। জাপানি অরিজিন হলো আমাদের দেশের আবহাওয়ার সাথে সহনশীল। এখানে একাধিক জাতের পুদিনার আবাদ হয়।
সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, উপজেলার দোহাজারী, ধোপাছড়ি, গাছবাড়িয়া, হাশিমপুর ও কাঞ্চননগর এলাকার উঁচু বিল গুলোতে ব্যাপক ভাবে পুদিনার আবাদ করা হয়েছে। এসব এলাকার কৃষকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। কেউ খেত থেকে পুদিনা তুলছেন, কেউ ছোট ছোট আঁটি বাঁধছেন। আবার কেউ আঁটি বাঁধা পুদিনা বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ খেতের আগাছা পরিষ্কারসহ নানা ধরনের পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছেন।
হাশিমপুর এলাকার পুদিনা চাষি মোঃ আকবর হোসেন জানান, পুরো এলাকার মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম পুদিনা চাষ শুরু করেন। বিগত ১২ বছর আগে তিনি ১০ গন্ডা জমিতে পুদিনা চাষ শুরু করেন। প্রথম বছরই পুদিনা বিক্রি করে বেশ লাভবান হয়েছেন। পরবর্তীতে পুদিনা চাষ আরো বাড়াতে থাকেন। পরে তাঁর দেখা দেখি এলাকার অনেক কৃষক পুদিনা চাষে ঝুঁকে পড়েন। মোঃ আকবর আরো বলেন, আমি সারা বছরই বিভিন্ন ধরনের খেত খামার নিয়ে ব্যস্ত থাকি। অন্যান্য খেত শেষ করে জমি যখন অবসর থাকে তখন পুদিনার চাষ করি। আউশের চারা রোপণ বা আমনের বীজতলা তৈরির আগে পুদিনার খেত শেষ হয়ে যায়। মাঝখানে এই স্বল্প সময়ের মধ্যে পুদিনা চাষ করে বাড়তি আয় হয়। এবছরও তিনি এক কানি জমিতে পুদিনা চাষ করেছেন। নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজারের এক পাইকারী ক্রেতার কাছে ১ লাখ ৩ হাজার টাকা দিয়ে তা বিক্রি করেছেন। ওই পাইকারী ক্রেতা শ্রমিক দিয়ে খেত থেকে পুদিনা তুলে নিয়ে যাবেন। জমির খাজনা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকসহ সব মিলিয়ে আমার ৫০ হাজার টাকার কাছাকাছি খরচ হয়েছে। আরো প্রায় ৫৩ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। তিনি জানান, আগে শুধুমাত্র রমজান মাসকে টার্গেট করে পুদিনার চাষ করতেন। এখন সারা বছর কিভাবে পুদিনা চাষ করা যায় তা চিন্তা করছেন। পাইকারী ক্রেতাদের সাথে কথা হয়েছে আমরা পুদিনা উৎপাদন করতে পারলে সারা বছরই তারা কিনে নিবেন।
একই এলাকার কৃষক আবুল বশর জানান, তিনিও রমজান মাসকে টার্গেট করে ১ কানি ৭ গন্ডা জমিতে পুদিনার আবাদ করেছেন। পুরো খেত ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন। পাইকারী ক্রেতা নিজের শ্রমিক দিয়ে খেত থেকে পুদিনা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। সার, শ্রমিক ও কীটনাশকসহ প্রায় ৫৬ হাজার টাকার মতো উৎপাদন খরচ যাবে। আর ৮০ হাজার টাকার মতো লাভ হবে। আবুল বশর আরো জানান, পুদিনা চাষ বেশ লাভজনক। আমি এবছর প্রথম চাষ করেছি। আগামীতে আরো অধিক জমিতে পুদিনা চাষ করবো। কারন পুদিনা চাষ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে বেশি লাভ পাওয়া যায়। পুদিনার পাইকারী ক্রেতারা পরামর্শ দিচ্ছেন সারা বছর পুদিনা চাষ করার জন্য। এখন চিন্তা করছি অন্যান্য সময়েও পুদিনা চাষ করা যায় কিনা।
দোহাজারীর চাগাচর এলাকার কৃষক আলী হোসেন জানান, আমি সারা বছর বিভিন্ন ধরনের মৌসুমী শাক-সবজির চাষ করি। বিগত ৭-৮ বছর ধরে রমজান মাসকে টার্গেট করে পুদিনার চাষ করে আসছি। প্রতিবছর কম বেশি লাভ হয়েছে। এবছর ৮ গন্ডা জমিতে পুদিনার চাষ করেছি। এতে প্রায় ২৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। আমরা খেত থেকে নিজেরা তুলে দোহাজারী রেলওয়ে মাঠের পাইকারী বাজারে বিক্রি করি। লাভ ক্ষতিটা বাজার দরের উপর নির্ভর করবে। কারণ রোজার প্রথম দুই দিন বাজারে প্রতি কেজি পুদিনা ১ শ’ ২০ থেকে ১ শ’ ৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। আবার তৃতীয় ও চতুর্থ রোজার দিন প্রতি কেজি ৫০-৬০ টাকায় চলে এসেছে। বাজারে দাম যত বেশি থাকবে লাভ তত বেশি হবে। তবে কেজি ৫০ টাকার নিচে বিক্রি করতে হলে লোকসান থাকবে। কারণ এবছর অতিমাত্রায় গরম থাকার কারণে পুদিনা খেতে নানা ধরনের রোগ হয়েছে। ফলে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়েছে। এতে করে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি গেছে। তিনি জানান, এলাকায় যারা ১-২ শতক করে পুদিনা চাষ করেছে তাদের খেতের পুদিনা শেষ হয়ে গেলে দাম আবার বাড়বে। তখন ভাল দামে বিক্রি করা যাবে।
একই এলাকার কৃষক আবদুল হাকিম জানান, আমি এবারে প্রথম পুদিনা চাষ করেছি। অতিমাত্রায় গরমের কারণে উৎপাদন খরচ বেশি হলেও ফলন ভাল হয়েছে। আশা করছি পুদিনা বিক্রি করে উৎপাদন খরচের দ্বিগুণ টাকা পাবো। তিনি জানান, এখনো বাজারে একেক দিন একেক দামে পুদিনা বিক্রি হচ্ছে।
দোহাজারী এলাকার কৃষক আবদুস ছবুর জানান, তিনি শঙ্খনদীর চরে ১ কানি ১৩ গন্ডা জমিতে পুদিনার চাষ করেছেন। ফলনও বেশ ভাল হয়েছে। পুরো খেত সাতকানিয়ার পুরানগড় ও দোহাজারী এলাকার কিছু যুবক মিলে কিনে নিয়েছেন। মোট এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা দিয়ে তাদের বিক্রি করেছি। তারা নিজেরা খেত থেকে পুদিনা তুলে দোহাজারীতে পাইকারী বাজারে বিক্রি করছেন। তিনি জানান, বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকসহ সব মিলে ৬৫-৭০ হাজার টাকা উৎপাদন খরচ যাবে। আর এক লাখ টাকার মতো লাভ হবে। তিনি জানান, পুদিনা খেতের জন্য আমার আলাদা করে জমির খাজনা দিতে হয়নি। সারা বছরের জন্য খাজনা দিয়ে জমি নিয়ে সেখানে অন্যান্য খেতও করেছি। আমাদের এখানে জমি অবসর থাকে না। সারা বছরই কোন না কোন সবজি খেত হয়। এখন পুদিনা শেষ হলে একই জমিতে অন্যান্য সবজির চাষ করবো।
দোহাজারী রেলওয়ে মাঠের পাইকারী বাজারে পুদিনা বিক্রি করতে আসা পুরানগড়ের নুরুল আলম ও সাইফুল ইসলাম জানান, আমরা নিজেরা খেত করিনা। কৃষকদের কাছ থেকে পুরো খেত কিনে নিয়ে বাজারে পাইকারী হারে বিক্রি করি। তারা জানান, এবছর ৯০ হাজার টাকা দিয়ে এক কানি জমির পুদিনা খেত কিনে নিয়েছেন। পাইকারী বাজারে শুরুর দিকে প্রতি কেজি পুদিনা ১’শ ২০ থেকে ১ শ’ ৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এখন আবার দাম কিছুটা পড়ে গেছে। বাজারে দাম বৃদ্ধি পেলে লাভ বেশি হবে। আর দাম না বাড়লে লাভ কিছুটা কম হবে। তবে লোকসান হবে না।
চন্দনাইশের বাগিচা হাট এলাকার মোঃ জাহেদ জানান, আমার নিজের খেত নেই। পুরো খেত কেনার মতো টাকাও নেই। দোহাজারী পাইকারী বাজার থেকে প্রতিদিন ৪-৫ কেজি পুদিনা কিনে নিয়ে ছোট ছোট আঁটি বেঁধে বাজারে বিক্রি করি। তিনি জানান, পুদিনার মান ভেদে একেক দিন একেক দরে কিনতে হয়। আর আমি আঁটি হিসেবে বিক্রি করি। পুদিনা বিক্রি করে প্রতিদিন ৩-৪ শত টাকা আয় হয়। আর রমজান মাস চলে গেলে অন্যান্য কাজ করি।
চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী সরকার জানান, পুদিনা সুগন্ধিযুক্ত মুখরোচক গাছ। তরি-তরকারিসহ বিভিন্ন খাদ্যে পুদিনার ব্যবহারের ফলে বাড়তি স্বাদ যুক্ত হয়। রমজান মাসে পুদিনার ব্যবহার বাড়ে। ইফতার সামগ্রীতে পুদিনার ব্যবহার রয়েছে। এছাড়া পুদিনার রয়েছে নানা ওষুধী গুণ। তিনি জানান, চন্দনাইশের দোহাজারী, ধোপাছড়ি, হাশিমপুর, গাছবাড়িয়া ও কাঞ্চননগরসহ পুরো উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পুদিনার আবাদ হয়। তবে দোহাজারী, ধোপাছড়ি ও হাশিমপুরে পুদিনা চাষ তুলনামুলক বেশি হয়। এখানকার কৃষকরা শুধুমাত্র রমজান মাসকে টার্গেট করে পুদিনা আবাদ করেন। অন্যান্য খেত শেষ হওয়ার পর পুদিনার চাষ করেন। আবার নতুন ভাবে অন্য কিছু রোপণের আগে পুদিনার খেত শেষ হয়ে যায়। অনেকটা জমি খালি পড়ে থাকা অবস্থায় স্বল্প সময়ের মধ্যে পুদিনা চাষ করে কৃষকরা বেশ লাভবান হচ্ছেন। তিনি জানান, আরো ব্যাপক ভাবে এবং সারা বছর পুদিনা চাষ করা গেলে কৃষকরা আরো অধিক লাভবান হবেন। এজন্য আমরা কৃষকদের নানা ভাবে পরামর্শ দিচ্ছি।

x