সীমাবদ্ধতার মাঝেও নগরবাসীর জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি মেয়রের

চসিকের বাজেট

আজাদী প্রতিবেদন

বুধবার , ১১ জুলাই, ২০১৮ at ৭:০০ পূর্বাহ্ণ
110

সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নগরবাসীর সুখস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিরলসভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ..ম নাছির উদ্দীন। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্তে ও জনকল্যাণকর যেকোনো উদ্যোগে শামিল হতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সদা প্রস্তুত আছে। এসময় তিনি নগর উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উন্নয়ন কাজগুলো সম্পন্ন হলে চট্টগ্রামের পরিবেশ বদলে যাবে। দৃষ্টিনন্দন হবে আমাদের প্রিয় চট্টগ্রাম’। মেয়র মনে করেন, ‘সঠিক উন্নয়ন অবকাঠামো, সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান এবং অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ ও সমাপ্তির মাধ্যমে উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।’

তিনি গতকাল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ২০১৮২০১৯ অর্থ বছরের বাজেট বক্তব্যে এসব কথা বলেন। মেয়র তার বক্তব্যে নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ, ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সৃষ্ট জনভোগান্তি নিয়েও মন্তব্য করেন।

জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত ৩ বছরে নগরীর প্রতিটি সড়কের পাশে পরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ হাজার ৬ শ’ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প সি.ডি..-কে অনুমোদন দিয়েছেন। যার বাস্তবায়ন সেনা বাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এ ছাড়াও পানি উন্নয়ন বোর্ড ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সরকারের প্রকল্প সহায়তায় জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে।’

এসময় তিনি বলেন, যেহেতু মেগা প্রকল্প তাই প্রতিটি খালের মাটি উত্তোলন সিডিএ’র কাজ। সিটি কর্পোরেশনের সেই সুযোগ নেই। তারপরও নগরবাসীর ভোগান্তির কথা বিবেচনায় রেখে আবর্জনা উত্তোলন অব্যাহত রেখেছি। এ সময় তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন মানে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন না। এ ধরনের কাজগুলোতে ধারাবাহিকতা থাকা জরুরি। যেসব জায়গায় তারা (সিডিএ) কাজ করছে সেখানে আমরা দু’ চারদিন আবর্জনা উত্তোলন না করলে কি অবস্থা হয় গিয়ে দেখবেন। এর দু’টি কারণ। বৃষ্টিতে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালি এবং খালনালায় আবর্জনা নিক্ষেপ। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহরে পর্যাপ্ত ড্রেন নেই। পর্যাপ্ত ড্রেন থাকলে নগরবাসী আরো সুফল পাবেন। আমরা ড্রেন নির্মাণ করছি। পোর্ট কানেকটিং রোডে আগে ড্রেন ছিল না বললেই চলে। এখন আমরা বড় করে ড্রেন নির্মাণ করছি। তিনি ধারাবাহিক পরিকল্পনার অভাব এবং নগরীর মূল সড়কের এক চতুর্থাংশের পাশেই ড্রেন না থাকা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ বলেও মন্তব্য করেন।

বিভিন্ন সংস্থার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ‘বিভিন্ন সংস্থা তাদের প্রকল্পের কাজ করছে। এজন্য তারা রাস্তা কাটছে। এতে নগরবাসীর ভোগান্তি হচ্ছে। আমরাও সমালোচিত হচ্ছি। কয়েকদিন আমাদের এক কাউন্সিলর একজন ঠিকাদারকে ধরে নিয়ে আসেন, যে রাতে রাস্তা কাটছিল, যেটি এর ক’দিন আগেই আমরা সংস্কার করেছিলাম। এখন উপায়ও নাই। ওয়াসা নগরবসীকে সুপেয় পানি নিশ্চিতে রাস্তা কাটছে। তবু চেষ্টা থাকবে এগুলো যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে।

মেয়রের ১৫ পরিকল্পনা :

চট্টগ্রাম শহরকে ঘিরে ১৫টি ভবিষ্যত পরিকল্পনা তুলে ধরেন মেয়র। এগুলো হচ্ছেনগর ভবন নির্মাণ, আই. টি. ভিলেজ নির্মাণ, মাস্টার প্ল্যানের সুপারিশমতে প্রস্তাবিত নতুন সড়ক নির্মাণ, ফিরিঙ্গি বাজার হতে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ, মুরাদপুর, ঝাউতলা, অঙিজেন ও আকবর শাহ রেলক্রসিংয়ের উপর ওভারপাস নির্মাণ, ঢাকামুখী ও হাটহাজারীমুখী বাস টার্মিনাল নির্মাণ, টোল রোডের পাশে কন্টেনার ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ, নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ওভারপাস/আন্ডারপাস নির্মাণ, চান্দগাঁও ও লালচান্দ রোডে সিটি কর্পোরেশনের জায়গায় বহুমুখী ভবন নির্মাণ, নগরীর কাঁচা বাজারগুলোকে আধুনিকায়ন, বাকলিয়া সিটি কর্পোরেশনের জায়গায় স্পোর্টস কমপ্লেঙ নির্মাণ, ওয়ার্ডভিত্তিক খেলার মাঠ, শিশু পার্ক, কমিউনিটি সেন্টার, মিলনায়তন, ব্যায়ামাগার, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ, চট্টগ্রাম মহানগরীতে একটি আধুনিক কনভেনশন হল নির্মাণ, নগরীতে জোনভিত্তিক থিয়েটার ইনস্টিটিউট নির্মাণ এবং সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাকর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ।

মেয়র বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে একনেকে অনুমোদনের জন্য ১ হাজার ২শ’ ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং বাস/ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্প এবং ২শ’ ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আওতাধীন পরিচ্ছন্নকর্মী নিবাস শীর্ষক প্রকল্প প্রেরণ করা হয়েছে বলেও জানান।

এসময় মেয়র বলেন, ২০১৭১৮ অর্থ বছরের নিজস্ব তহবিল হতে গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১৩০ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। একই অর্থ বছরে এডিপি খাতে গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২শ’ ৯০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। জাইকা সি.জি.পি. প্রকল্পের আওতায় ব্যাচ ১এ প্রায় ২০০ কোটি টাকার রাস্তা, ব্রিজ ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। ব্যাচ ২এ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা, নর্দমা, ব্রিজ, রিটেইনিং ওয়াল, স্কুল ভবন নির্মাণকাজ চলমান আছে।

নিয়মিত কর পরিশোধের আহ্বান :

নিয়মিত কর পরিশোধ করে চট্টগ্রাম শহরকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, সুন্দর, জলজটমুক্ত ও বাসযোগ্য নগর গড়তে নগরবাসীর সহায়তা কামনা করেন মেয়র। এসময় তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের নিকট নগরবাসীর প্রত্যাশা অনেক। প্রত্যাশিত সেবা এবং অবশ্যকরণীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসমূহ নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ও সময়ের সমন্বয়ের প্রয়োজন। আমাদের সম্পদ সীমিত। নগর উন্নয়ন ও নাগরিক জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনার লক্ষ্যে কর্পোরেশনের বকেয়া কর আদায়, সুষ্ঠু কর নির্ধারণ এবং নির্ধারিত কর আদায়ের সাথে মহানগরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

এসময় কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে থাকা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অনুদানের ওপর ভর করে বিশাল বাজেট ঘোষণার পর এর বাস্তবায়ন যোগ্যতা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ে আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর পরিশোধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরাও যোগাযোগ করেছি। আর ব্যক্তিগত খাতের বকেয়া কর আদায়ে আমি উদ্যোগ নিয়ে ফলও পেয়েছি। আশা করি কর আদায় বাড়বে।

তিনি বলেন, রাজস্ব বিভাগে ব্যাপক যুগোপযোগী সংস্কারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পৌরকর অর্থাৎ (হোল্ডিং, কনজার্ভেন্সি ও লাইটিং ট্যাঙ) সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যাদি নিয়মিত হালনাগাদকরণসহ সম্মানিত হোল্ডিং মালিকগণের কর প্রদানে সহজলভ্য ও সেবা জনগণের দৌরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে সফটওয়্যারের মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগ ও এস্টেট শাখার আওতাধীন হোল্ডিং ট্যাঙ, ট্রেড লাইসেন্স ফি, মার্কেটএর দোকানভাড়া, উন্নয়ন চার্জ, ইজারাকৃত সম্পত্তির যাবতীয় কর/ফি ভাড়া ইত্যাদি এই ২০১৮১৯ আর্থিক সনে ‘অনলাইন ব্যাংকিং’এর মাধ্যমে আদায়ের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গ :

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চসিকের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে মেয়র বলেন, ‘নগরীর পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতার কাজের মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৪১টি ওয়ার্ডকে ২ ভাগে অর্থাৎ উত্তর ও দক্ষিণ জোনে বিভক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়াও আবর্জনা অপসারণকাজে পূর্বে নিয়োজিত পেলোডার, ডাম্প ট্রাক, কন্টেনার মুভার ইত্যাদি গাড়িবহরে আরো নতুন গাড়ি সংযোজন করা হয়েছে। বর্র্তমানে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ডোরটুডোর বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ কাজ চলছে। জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে সকল ওয়ার্ড হতে ৫০০ জন নর্দমা পরিষ্কার/শ্রমিক উঠিয়ে এনে নালানর্দমা পরিষ্কারের বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করা হয়েছে। প্রতিদিন ৫টি করে ওয়ার্ডে ৩/৪ দিন করে এ প্রোগ্রাম চলছে। স্বল্প ব্যয়ে নগরবাসীর নিজস্ব দালান/বাণিজ্যিক ভবন/শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান/ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেপ্‌টিক ট্যাঙ্কের ময়লা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিষ্কারের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বর্তমানে একটি বিদেশি এন.জি.. সংস্থা কর্তৃক ২টি আধুনিক মানববর্জ্যবাহী গাড়ি সিটি কর্পোরেশনকে বিনামূল্যে সরবরাহ করায় উক্ত গাড়ি ২টি পরিচালনার জন্য একটি দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘চট্টগ্রাম সেবা সংস্থা (ইউনিট)কে সমাঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এসময় তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে মহানগরকে সার্বিকভাবে পরিস্কারপরিচ্ছন্ন, মশক ও দূষণমুক্ত রাখা কর্পোরেশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

শিক্ষা প্রসঙ্গে :

সিটি মেয়র বলেন, শিক্ষা অতীত সংস্কৃতির বাহক, বর্তমান সভ্যতার পৃষ্ঠপোষক এবং ভবিষ্যৎ প্রগতির ধারক। মানুষের ভিতরে যে সুপ্ত প্রতিভা, সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে তা শক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যম হচ্ছে শিক্ষা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে শিক্ষা কার্যক্রম একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ। বহুকাল পূর্ব থেকে এ শিক্ষাব্যবস্থা চলমান ছিল। বর্তমানে দেশেবিদেশে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সুখ্যাতি অর্জনের পেছনে রয়েছে শিক্ষা বিভাগের কর্মযজ্ঞ। বর্তমান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী যারা আগামীদিনে এ বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তর করার স্বপ্নে বিভোর।

অন্যান্য :

মেয়র নিজের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি দিয়ে বলেন, নাগরিকদের দোরগোড়ায় আলোসেবা পৌঁছনোর জন্য ১ হাজার ৫৫৬টি সুইচিং পয়েন্টের মাধ্যমে ৫১ হাজার এনার্জি, টিউব, হাইপ্রেসার সোডিয়াম, এলইডি ও অন্যান্য বাতি দ্বারা সড়ক আলোকায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। নগরীকে ক্লিন ও গ্রিন সিটিতে পরিণত করার প্রয়াসে নগরীর রাস্তায় আইল্যান্ড, গোলচত্বর, ফুটপাথ ও সড়কে এলইডি আলোকায়নে সৌন্দর্যবর্ধন করে দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় স্থানে যাত্রী ছাউনি আধুনিক পরিবেশে স্থাপন করে জনগণের বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসকল স্থাপনায় পরিকল্পিতভাবে পণ্যের বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক সরকারি নির্দেশনাসমূহ প্রচারের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

x