সীমান্তের শেষ জনপদ অপরূপ ঠেগামুখ

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

সোমবার , ২৮ মে, ২০১৮ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ
211

ঠেগামুখ বা থেগামুখ বাংলাদেশের সীমান্তের শেষ জনপদ। ঠেগামুখ থেকে কয়েক’শ গজ সামনেই ভারতের মিজোরাম। ভারতের সেভেন সিস্টারস এর একটি মিজোরাম। মিজোরামের সীমান্তে চোখে পড়ে উন্নয়ন অবকাঠামো । ঠেগামুখের লাগায়ো শিলচর ভারতীয় বাজার। তবে বিনা বাধায় স্থানীয় আদিবাসীরা চাইলে ওপার থেকে বাজার সদাই করে নিয়ে আসতে পারে। ভারতীয়রাও এপার থেকে মালামাল কিনে নিয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এটি দু’দেশের সম্প্রীতির সীমান্ত হিসেবে খ্যাত ঠেগামুখ। দু্‌ই পাড়ের মানুষের মাঝে রয়েছে আত্মীয়তার বন্ধন। ঠেগামুখ জনপদ বলতেই কেবল একটি বাজার। পাহাড় থেকে বয়ে আসা ঠেগা ছড়া। ছড়া এসে পড়েছে কর্ণফুলীতে। ছড়ার নামেই ‘ঠেগা’র নামকরণ। মিজোরামের ব্লু মাউন্টেইন বা নীল পাহাড়ের (লুসাই পাহাড়) স্রোতধারা এসে মিশেছে বাংলাদেশের ঠেগামুখ সীমান্তে। নদীর দুপাশে সীমান্তে দু্‌ই দেশেই চাকমাদের বসতি। দুই পাড়ে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফ পারস্পরিক বন্ধুত্ব রয়েছে। ছোট হরিণা থেকে ঠেগামুখ পেরিয়ে বিস্তৃত সীমান্ত পাহারায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজিবি অধিনায়ক লে.কর্ণেল মো.আতিক চৌধুরী । তাঁর নেতৃত্ব চলছে সীমান্ত সুরক্ষা। দুই বছরে আগের থেকে ছোট হরিণা ক্যাম্পও এখন বদলে গেছে। ক্যাম্পজুড়ে নান্দনিকতার প্রতিচ্ছবি। ক্যাম্পের অতিথিশালা সাজিয়েন বাঁশের কারুকাজে। এত দুর্গম জনপদে এমন পরিপাটি আয়োজন সত্যিই মুগ্ধ করে। আধুনিকতার সকল উপকরণেই রয়েছে এই ক্যাম্পে। জোন অধিনায়কের সহযোগিতা ও আন্তরিকতায় মিলল ঠেগামুখ দেখার সুযোগ। ছোট হরিণার সাধারণ পাহাড়ি বাঙালিদের মুখে মুখে জোন অধিনায়কের প্রশংসা।

রাঙামাটির বরকল উপজেলার ছোটহরিণা থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে ঠেগামুখ সীমান্ত। সীমান্তের পাশেই ঠেগামুখ বাজার এবং ঠেগামুখ বিওপি। পরিপাটি ঠেগামুখ ক্যাম্প।গত জুনের ভয়াল স্‌্েরাতে ভেসে গিয়েছিল ঠেগা মুখ ক্যাম্পের গোলঘর। পরে তা সংস্কার করা হয়। ক্যাম্পের গোলঘর থেকে বসেই চোখে পড়ে মিজোরামের নীল পাহাড়, মিজো গ্রাম আর সবুজ ল্যান্ডস্কেপ।

বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় নৌ বন্দরের তালিকায় রয়েছে ঠেগামুখ। রয়েছে ঠেগামুখের বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা । হৃদ আর ছোট পাহাড়ের ঘেষা রাঙামাটি। যার বেশ বড় অংশজুড়ে সংরক্ষিত বন, অনাবিস্কৃত ঝরনা, অদেখা পাহাড় এবং নৃতাত্ত্বিক মানুষের বসবাস। ঠেগামুখের গন্তব্য এবারের রৌদ্র ঝলমল দিনের হাত ধরে। কান্ট্রি বোটের ইঞ্জিনের খটখট শব্দে নিরন্তর চলা। জলের দ’ুপাশে সাজানো ল্যান্ডস্কেপ এর চেয়ে বেশি কিছু। হৃদের সুবজাভ জলের রঙ আগের দিনের বৃষ্টিতে কিছুটা ম্লান হয়েছে । বড়হরিণা, মরা থেগা, থেগাসহ একাধিক সীমান্ত চৌকিতে বিজিবি জোয়ানদের উপস্থিতি। দিন রাত টহল চলে এখানকার সীমান্ত পাহারা। কর্ণফুলীর উজান নদীর মাঝ বরাবর জিরো লাইন। ভারত বাংলাদেশের পতাকাবাহী নৌকা চলছে নদীর পথে। বছরের পর বছর ধরে এখানে দু’দেশের মানুষ সীমান্তের বসবাস করছে। তবে ছোট হরিণার পর নিরাপত্তা জনিত কারণে বাঙালিদের চলাচল করার অনুমতি নেই।

বরকল বাজার থেকে ছোটহরিণা’র পথে রওনা দিতে বিকেল প্রায় ছুঁই ছুঁই। এর আগে লংগদু হয়ে আমাদের যাত্রা হত শুভলং বাজার। সেখান থেকে দুপুর আড়াইটায় বরকলের শেষ লঞ্চ ধরতে হত। বরকল হয়ে হরিণা যেতে সময় লাগবে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা।এবার লেকের পানি কমে যাওয়ায় রাঙামাটি থেকেই সরাসরি কান্ট্রি বোটে বরকল ।

প্রায় সারা দিন ক্লান্তিবিহীন প্রায় ১০ ঘণ্টার ভ্রমণ। কাপ্তাই লেকের কোল ঘেঁষে থাকা পাহাড়, দলছুট বাড়ি, নীল জলরাশির ভিড়ে কোথাও কোথাও পাখির ঝাঁক। বরকলের পাহাড়চূড়োয় সূযর্টা কত সুন্দর হতে পারে! সেই সঙ্গে শেষ বিকেলের মায়াবী আলোয় । বরকল বাজার পাড়ি দিতে না দিতেই চোখ ধাঁধানো সব দৃশ্যপট। পাহাড়ের কোলে জুমঘর। মেঘের ছায়ায় ঢেকে আছে গ্রামগুলো। কাশবন ঘেঁষা পাহাড়ের কোলজুড়ে রংধনুর রেখা, সবুজ পাহাড়কে যেন আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। শেষ বিকেলের শান্ত জলপথ। সন্ধ্যার সোনালী উজ্জ্বল আকাশ! এ যেন পূর্ণিমার আলোয় ডুবে থাকা নীরবনিঝুম পাহাড়। কর্ণফুলির দুধারে এমন নিরবিচ্ছিন্ন পাহাড়ের সারি আর কোথাও বোধহয় পাওয়া যাবে না। তবে লেকের পানি কম হওয়ায় কোথাও কোথাও আটকে যায় বোটের তলানি। পরে অগত্যই নদীর অল্পজলে নেমে নৌকা ঠেলে আবার যাত্রাপথে। শেষ বিকেলে ছোটহরিণার আগেই ভূষণছড়ায় নামতে হল। পানি কম হওয়ায় ওদিকটায় যাওয়া সম্ভব হবে না। ভূষণছড়ায় নেমে ভাড়া চালিত বাইকে ছোট হরিণা ঘাট। তারপর নৌকায় পার হলেই ছোটহরিণা বাজার। নেমেই ক্যাম্পে ছোট হরিণা বিজিবি জোন অধিনায়ক স্যারে আমন্ত্রণে চায়ের আর ঝাল খাবারে আয়োজন সামিল হয়েছি। ক্যাম্পের ভিতরে বাঁশ দিয়ে সাজানো দারুন শৈলির বৈঠকখানা। সেই দীর্ঘ নৌযাত্রার পর অসাধারণ সন্ধ্যার ভোজ । এত দুর্গমেও শহুরে খাবারের স্বাদ। ক্যাম্প থেকে বিদায় নিয়ে বাজার দিকে রওনা হলাম আমাদের রাতের থাকার জায়গা। পাহাড় আর নদী ঘেষা ছোট হরিণা বাজার। ধবধবে জোৎস্নায় আলোকিত পুরো সীমান্ত। নদীর জল জোৎস্নায় আলোয় জল্নান। কি মুগ্ধ করা রাত! পাহাড় ঘেঁষে থাকা চাঁেদর আলোয় রূপালি জলের ধারা।তীব্র স্রোতে ভেসে যাওয়ার এই তো সময়।

পরদিন সকাল হতেই ঠেগামুখে যাওয়ার প্রস্তুতি। যাত্রার সঙ্গী বিশেষ ইঞ্জিন চালিত বার্মিজ বোট। দেশি বোটের চেয়ে এর গতি অনেক বেশি। তীব্র স্রোতের বিপরীতে ছুটে চলে বার্মিজ বোট। সামনে যেতেই সুউচ্চ টারশিয়ান যুগের পাহাড়। শান্ত জলের ধারায় ছুটে চলা বার্মিজ বোটে। পাহাড়ে ভাজে ভাজে পাহাড়িদের বসতি। বড়হরিণা ক্যাম্পে ণিকের বিরতি । ক্যাম্পের উল্টোদিকে জিরা’র খামার। প্রায় এক ঘন্টা পথ চলার পর দেখা মিলে মিজোরামে সীমান্ত। সীমান্তে বিএসএফ এর নিরাপত্তা চৌকি। সুদূরে উঁচু পাহাড়ের সীমানা। পথে পথে মিজোদের যাতায়াত। কর্ণফুলীর পাড় ঘেষে অচেনা মিজো গ্রামের নান্দনিক বসত বাড়ি। ওপারে সীমান্তে মেলে নাগরিক জীবনের সকল সুবিধা।মিজোরামে পাকা সড়ক, বিদ্যুৎ সবই আছে। কোথাও কোথাও ভারতীয় পতাকাবাহী নৌকায় মিজোদের যাতায়াত। শনিবার মিজোরামের সীমান্ত ঘেষা শিলচর বাজার হওয়ায় বাজার থেকে সদাই করে ফিরছে ওরা। শুধু মিজোরায় নয় শিলচর হাটে বাংলাদেশ থেকে পাহাড়িরাও যায় । আবার বাজার শেষ করে ঠেগামুখে ফিরে আসে। ওপার থেকে মিজোগ্রামের বাসিন্দারাও এপার(ঠেগামুখ ) থেকে বাজার করে নিয়ে যায়। মাঝখানে কেবল একটি নদীর দুরত্ব। ঠেগামুখ বাজারে পৌছাতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘন্টা। বাজারটা সরকারিকরণ হয় ২০০৩ সালে।বাজারে ১৫ ২০ টি দোকান। সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার বাজার বসে । বাজারের দিন দূরদূরান্তের বাসিন্দারা বাজারে এসে মিলিত হয়। দুই দেশের মানুষের উপস্থিতিতে জমজমাট হয়। বাজার ব্যবসায়ীর জানান,‘ দীর্ঘদিন ধরে এখানে দোকান করছি। ভালোই বেচাকেনা হয়।সীমান্ত কাছের হওয়ায় বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য এখানে বেচাকেনা হয়। তিনি আরো বলেন,দুই পাড়ের মানুষের সাথে আত্মীয়তার সর্ম্পক রয়েছে। ঠেগামুখ বাজারে নিত্য পন্য কিনে আবার ফিরে যাচ্ছে মিজোরামে নাগরিকেরা। বছরে পর বছর এখানে এভাবে চলে লেনদেন। দীর্ঘ সময় ঠেগামুখ বাজারে কাটিয়ে আবার রওনা হলাম ছোট হরিণার পথে। অন্যদিকে পূর্বাকাশে পাহাড়ে হেলান দিয়েছে পূর্ণিমার ঝকঝকে বড় চাঁদ। চাঁদের আলোয় ডুবে থাকে চিত্রপটের মতই সুন্দর হরিণা,শ্রীনগর,নীলকণ্ঠ,মিজোরামের পাহাড় এবং ঠেগামুখ চিরভাস্বর হয়ে থাকুক। ঠেগামুখকে ঘিরে রয়েছে পর্যটনের হাতছানি। জলপথে দীর্ঘ ভ্রমণের সুখকর অভিজ্ঞতা নিতে পারবে অভিযাত্রীর দল। সীমান্তে শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে মিজোরামের সবুজ পাহাড়ে হাতছানি ।

x