সীতাকুণ্ড মীরসরাই শিল্পাঞ্চলে পানি সরবরাহ প্রসঙ্গে

শনিবার , ৬ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ
134

গত অর্ধদশক ধরে সীতাকুণ্ড মীরসরাই শিল্পাঞ্চলে পানির সংকট তীব্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর জন্য অনেক বিনিয়োগকারী হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে মহাসংকটে পড়েছে, অনেকে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান ব্যাহত হচ্ছে, সরকার রাজস্ব হারাচ্ছেন। এ বিষয়ে গণমাধ্যম বিশেষ করে জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়, সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এমপি চিটাগাং চেম্বারের সাথে মতবিনিময় সভা করে গেলেন। এটি অভিনন্দনযোগ্য।
চট্টগ্রামস্থ সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলে প্রধানত ইস্পাত, সিমেন্ট, এলপিজি ও গার্মেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্প স্থাপন করেছে। এই শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৪০০ শিল্পের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ, লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব জাতীয় কোষাগারে জমা হয়। কিন্তু ঐ এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আয়রণ থাকা এবং পানির স্তর অনেক গভীরে নেমে যাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এসব শিল্প কারখানা অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে এবং নতুন করে শিল্প স্থাপন সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্প স্থাপনের লক্ষ্যে মীরসরাইয়ে প্রায় ৩০ হাজার একর জায়গা নিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে, সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই শিল্পাঞ্চলে স্থাপিত লাইন স্থাপিত শোধনাগার ও লাইন স্থাপনের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা অতীব জরুরি। চট্টগ্রাম ওয়াসা বর্তমানে শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার, কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প ও মদুনাঘাট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে যার মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৩৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করছে।
সুখের বিষয় এই যে, ৪র্থ বারের মত নির্বাচিত চিটাগং চেম্বার সভাপতি মাহাবুবুল আলম আমন্ত্রনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এমপি গত শুক্রবার ২৮ জুন মেয়র, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, ওয়াসার চেয়ারম্যান ও এমডি, বেজা প্রতিনিধি ও স্টেকহোল্ডারদের সাথে এই স্পেসিফিক বিষয় নিয়ে এক মতবিনিময় সভা করেছেন। বর্তমানে ভাটিয়ারী পর্যন্ত ওয়াসার পানির লাইন সম্প্রসারিত হয়েছে। সীতাকুণ্ড মীরসরাই লাইন সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই প্রকল্প প্রণয়ন বাস্তবায়নে, একনেক পাস করার জন্য ন্যূনতম ৪ বছর সময় লাগবে। কিন্তু এই মুহূর্তেই অনেক শিল্পে পানি দরকার। এক্ষেত্রে শর্ট-মিড লংটার্ম প্রজেক্ট নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী পরবর্তী প্রজন্মের ব্যবহারের জন্য সারফেস ওয়াটার সংরক্ষণ, ভূমিকম্প ও ভূমিধস থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য অধিক গুরুত্ব আরোপ করছে। এই ব্যাপারে উদাহরণস্বরূপ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড অস্ট্রিয়ার প্রাইমেটাল টেকনোলোজিস্‌ জিএম বিএইচ এর সাথে যৌথভাবে বাস্তবায়নাধীন অত্যাধুনিক বিশ্বমানের প্রযুক্তি কোয়ান্টাম আর্ক ফার্ণেস সম্বলিত ইস্পাত প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। তাদের দৈনিক ৬০ লক্ষ লিটার পানির দরকার। শীঘ্রই এর উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হবে। এই ব্যাপারে ২০১৭ শুরুর দিকে তৎকালীন পানি সম্পদ মন্ত্রীর সমীপে জিপিএইচ ইস্পাত কর্তৃক পানির ব্যবহারের জন্য আবেদন করা হয়। তার পরামর্শে দেশে ও বিদেশে স্বীকৃত ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং এক ফিজিবেলিটি স্টাডি প্রণয়ন করেন। একই সাথে মহাপরিচালক পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বোর্ডের স্থানীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জ্ঞাত করা হয়। তাছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য দিদারুল আলম এমপি অতীত থেকে এই পর্যন্ত পানি সম্পদ মন্ত্রী, জেলা প্রশাসক সমীপে ডিও লেটার ইস্যু করেন। সর্বশেষ ১/০৪/২০১৯ তারিখে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী সমীপে ডিও লেটার ইস্যু করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১/০৪/২০১৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে পানি উন্নয়ন বোর্ড “চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় পাহাড়ি ছড়ার অব্যবহৃত বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারে পরিবেশ বান্ধব জলাধার নির্মাণ” শীর্ষক প্রকল্প প্রণয়নের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনপূর্বক হালনাগাদ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সম্ভাব্যতা যাচাই করে সুপারিশমালাসহ কারিগরি প্রতিবেদন প্রণয়নের জন্য বহিঃসদস্যসহ ৭ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিম্নবর্ণিত কর্মকর্তাগণের সমন্বয়ে সুনির্দিষ্ট কার্যপরিধিসহ একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হলো মর্মে একটি দপ্তরাদেশ ইস্যু করেন।
তাছাড়া বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ছড়ার পানি সংরক্ষণপূর্বক সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদের সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসক সমীপে প্রেরণ করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে ২৫/০৩/২০১৮ তারিখে জেলা প্রশাসককে অফিস আদেশ অনুযায়ী সাত সদস্য বিশিষ্ট সীতাকুণ্ড উপজেলাভিত্তিক আন্তঃবিভাগীয় কমিটি গঠন করা হয়। ইতিমধ্যে আমরা অবহিত হয়েছি যে সীতাকুণ্ড ইউএনও রিপোর্ট দাখিল করেছেন। উপায়ান্তর না দেখে জরুরি ভিত্তিতে চট্টগ্রাম ওয়াসা থেকে ভাটিয়ারী থেকে ভাউজারে করে পানি সরবরাহ, মহামায়া থেকে উত্তোলনপূর্বক সরবরাহের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে, জেলা প্রশাসকের নিকট পানি সরবরাহের পত্র দিয়েছে।
মূলত আমরা মনে করি এক্ষেত্রে সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলকে রক্ষার খাতিরে পাহাড়ের খাল-খন্দক-নালা ছড়াগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে উক্ত অঞ্চলের সকলের পানির চাহিদা যোগান দেওয়া সম্ভব হবে। এইভাবে জলাধার নির্মিত হলে শিল্পায়নের জন্য পানি সরবরাহ ছাড়াও নিকটবর্তী অন্যান্য শিল্পসমূহ উপরন্তু কৃষিজ জমিতে পানি সরবরাহ করে ফসলাদি উৎপাদন সম্ভব হয়ে উঠবে। সংশ্লিষ্ট গ্রাম সমূহে এলাকাবাসীর সুপেয় পানির সুলভতা পাবে। তদুপরি উক্ত এলাকায় ভূ-প্রাকৃতিক ভারসাম্যসহ সবুজ সহায়ক, জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশ গড়ে উঠবে। কুমিরার দুইটি স্লুইসগেইট সংস্কার করে এর মূল উদ্দেশ্য কার্যকর করতে হবে। এতে সরকার ও জনস্বর্াথের কোনো ক্ষতি হবে না বরং তিল তিল করে গড়ে ওঠা সীতাকুণ্ডস্থ অন্যান্য শিল্পাঞ্চলসমূহ নতুন প্রাণ পাবে। এ ক্ষেত্রে বন, পরিবেশ, পানি সম্পদ বোর্ডকে এখন এগিয়ে আসতে হবে।

x