সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড়ের বন্যপ্রাণী বিপন্ন

লিটন কুমার চৌধুরী : সীতাকুণ্ড

সোমবার , ২১ জানুয়ারি, ২০১৯ at ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ
91

সত্তর দশকে সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড় ছিল অন্য রকম। গভীর অরণ্যের বিশাল বিশাল বৃক্ষের সাথে সমান তালে ছিল হিংস্র জীব-জন্তু, পশু-পাখির অবাধ বিচরণ। হরিণ, বানর, বনবিড়াল, মেছো বাঘ, ভাল্লুক, বনছাগল, শুকর, বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত সাপ, নানা রকমের টিয়া, তোতা, শালিক, মাছরাঙা, দোয়েলসহ নাম না জানা পাখির আশ্রয়স্থল ছিল সীতাকুণ্ড পাহাড়। পাহাড়ে একা যাওয়ার চিন্তা করাটাও ছিল কঠিন। দিনের বেলায় পাহাড়ের পাদদেশে বাঘ নেমে আসত গরু-ছাগল শিকার করার জন্য। শুকর, হরিণ, বনবিড়াল নেমে আসত গ্রামের দিকে। মাঘের শীতে বন থেকে আশেপাশের গ্রামে হানা দিত বাঘ। পাহাড়ের এখন সেসব পশু-পাখি বলতে কিছুই নেই। রূপকথার গল্পের মতো কথাগুলো বললেন সীতাকুণ্ড পৌরসভার শিবপুর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি দেলোয়ার হোসেন।
জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপে ব্যাপকহারে বন-জঙ্গল উজাড়, বন্যপ্রাণী শিকার এবং প্রতিবছর চৈত্র মাসে পাহাড়ে আগুন দেওয়ার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি ধারণা করছেন।
সীতাকুণ্ড বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের জীব বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সুহাস চৌধুরী জানান, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে গত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ের পাদদেশে বনজঙ্গল ধ্বংস করে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ নানা স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। একারণে ওইসব বনজঙ্গলের প্রাণীগুলো আবাসস্থল হারিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এবং মানুষের হাতে নির্মমভাবে মারা পড়ছে। আর এভাবেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী।
সীতাকুণ্ড ইউনিয়ন পরিষদের (বর্তমান পৌরসভা) সাবেক মেম্বার মুক্তিযোদ্ধা মুলকেতুর রহমান জানান, পাহাড়ে ঝোপঝাড় কেটে সাফ করে ফেলার কারণে প্রাণীগুলো আবাসস্থল হারাচ্ছে। এগুলো নিরুপায় হয়েই মাঝেমধ্যে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। আর মানুষ তা মেরে ফেলছে।
সীতাকুণ্ড পৌরসভার মেয়র মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব বদিউল আলম বলেন, উপজেলার বাড়ৈয়াঢালা, সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড়, বাড়বকুণ্ড ও বাঁশবাড়িয়াসহ পার্বত্য এলাকাগুলোতে এক সময় প্রচুর বন্যপ্রাণী ছিল। বর্তমানে অল্পসংখ্যক বানর, হরিণ, বনবিড়াল ছাড়া বেশিরভাগ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলোও লোকজনের হাতে নির্বিচারে মারা পড়ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আইনের আওতায় বন বিভাগের ভুমিকা নেওয়ার কথা থাকলেও তা তারা যথাযথভাবে পালন করছে না। বাড়ৈয়াঢালা বনবিভাগের রেঞ্জ অফিস ও সীতাকুণ্ড পৌরসদরের বিট অফিস থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপজেলার বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যানই জানেন না।
সীতাকুণ্ডের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, সীতাকুণ্ড পাহাড়ে এক সময় অনেক বন-জঙ্গল ছিল। এসব বন-জঙ্গল ভরা ছিল স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীতে। এরই মধ্যে এই পাহাড়ে থেকে বন্যপ্রাণীগুলোও হারিয়ে যাওয়ার পথে। যে হারে বন-জঙ্গল উজাড় ও বন্যপ্রাণী নিধন চলছে তাতে আগামী ১০ বছরের মধ্যে সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকা বন্যপ্রাণী শূণ্য হয়ে পড়বে বলে তারা আশংকা প্রকাশ করেন।
বন বিভাগের সীতাকুণ্ড বিট কর্মকর্তা আব্দুল মজিদ জানান, বর্তমানে সীতাকুণ্ড উপজেলায় বন্যপ্রাণী যা আছে তা উল্লেখ করার মতো নয়। একারণে বন্যপ্রাণী সম্পর্কিত তেমন কোনো কর্মকান্ড বা পরিসংখ্যান উপজেলা বন বিভাগে নেই। তবে মাঝে মধ্যে কোথাও কোনো বন্যপ্রাণী ধরা পড়লে খবর পাওয়া মাত্র সেগুলোর ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
আলাপকালে তিনি জানান, একসময় এ পার্বত্য এলাকাগুলোতে বন-জঙ্গলে প্রচুর বন্যপ্রাণী ছিল। জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণ, এক শ্রেণির মানুষের চৈত্র মাসে পাহাড়ে আগুন দেওয়া এবং জনগণের অসচেতনাতাই বন-জঙ্গল ও বন্যপ্রাণীসমূহ হারিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী। তবে উপজেলায় সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের আওতায় বনভূমি বৃদ্ধির কর্মসূচি চলছে। এতে বন্যপ্রাণীদের জন্য কিছুটা উপকার হলেও হতে পারে বলে তারা জানান।

x