সিনেমাটোগ্রাফি ও একজন নেস্তর আলমেন্দ্রোস

দেবাশীষ মজুমদার

মঙ্গলবার , ৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ
52

কেবলই বাংলাদেশ নয়, ভারতীয়দেরও একই অবস্থা! ধরে নিচ্ছি বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডস্ট্রি তেমন বড় নয়, কিন্তু ভারতে সেটা বিরাট শিল্প। বিভিন্ন সিনেমার এওয়ার্ড অনুষ্ঠানগুলোতে দেখা যায় গান, নাচ, কৌতুক ইত্যাদি দিয়ে টইটুম্বুর আর এর ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে পুরস্কার প্রদান, অর্থাৎ অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু একটা বিষয় খুব লক্ষণীয় যে এই অনুষ্ঠানগুলোতে সিনেমার অভিনেতা, পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক যতটা গুরুত্ব পায়, ঠিক ততটাই উপেক্ষিত থাকে কলাকুশলীরা। এমনকি পুরস্কার গ্রহণকালে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তাদেরকে কিছু বলবার সুযোগ দেয়া হয় না।
অথচ এই লোকগুলোই দিনের পর দিন মুখ গুঁজে কাজ করে যাচ্ছেন। একে শুধু পেটের দায় বললে তাদেরকে খুব অপমান করা হবে, যে মায়া থেকে তাঁরা কাজগুলো করেন তার সঠিক মূল্যায়ন এই উপমহাদেশে তাঁরা কখনোই পান না। এ সপ্তাহে চিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন চলে গেলেন। সূর্যদীঘল বাড়ি (১৯৭৯), এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০), পুরস্কার (১৯৮৩), অন্য জীবন (১৯৯৫) ও লালসালু (২০০১) সিনেমায় শ্রেষ্ট চিত্রগ্রাহক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। অথচ আলাদা করে তার এই কাজগুলো নিয়েও এদেশে খুব একটা বেশী আলোচনা হয়েছে বলে মনে পড়ে না। আচ্ছা আনোয়ার হোসেন ছাড়া আর ক’জন বাংলাদেশী সিনেমাটোগ্রাফারের নাম এ দেশের সিনেমাপ্রেমীরা জানেন?
সিনেমার কারিগরি দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম সিনেমাটোগ্রাফি। সিনেমাটোগ্রাফি নিজেকে জাহির করবার শিল্প নয়, নিজেকে লুকিয়ে রাখবার কৌশল। যে কোনো গল্পকে ফুটিয়ে তুলতে এবং তার একটি অর্থবহ রূপ দিতে সিনেমাটোগ্রাফাররা কাজ করেন। যেখানে শুটিং হবে সেই লোকেশানে গল্প অনুযায়ী ছবি ক্যামেরায় ধারণ করেন তাঁরা। দুপুরবেলাকে কি করে ভোরের আবহ দিতে হবে সেই কারিকুরিও তাদেরকেই করতে হয়। যেন একটা তুলির আঁচড়ে পুরো পরিবেশটাকে বদলে দেন, তবু তাঁদের শিল্পীর মর্যাদা দিতে আমাদের বহু দ্বিধা। এই লোকগুলোই নিজেকে লুকিয়ে রেখে নায়ক নায়িকাদের উজাড় করে অভিনয় করবার সুযোগটা করে দেন।
ক্রেমার ভার্সাস ক্রেমার সিনেমায় ডাস্টিন হফম্যান-এর অভিনয় নিশ্চয়ই ভুলেননি অনেকে, কিংবা সোফি’স চয়েজ এর মেরিল স্ট্রিপকে। এই সিনেমাগুলোতে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে ছিলেন নিস্তোর আলমেন্দ্রোস। তাঁর পরিচালিত ‘ডেজ অফ হ্যাভেন’ সিনেমাটি সুন্দর সিনেমাটোগ্রাফির জন্য আজও বিশ্বজুড়ে সমাদ্রিত হয়।
শন শিরাভিরাত্নেকে দেয়া একটা সাক্ষাৎকার-এ তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি ভাবনা নিয়ে বলেছিলেন। তাঁর মতে, যা কিছু প্রাকৃতিক, তা-ই সুন্দর, প্রাকৃতিক আলোই সুন্দর। তিনি চেষ্টা করতেন সব সময় লাইটিং যাতে নান্দনিক হবার চাইতেও অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়। শ্যুটিং সেট-এ যে প্রাকৃতিক আলো পাওয়া যেত সেটাই তিনি ব্যবহার করবার চেষ্টা করতেন, প্রয়োজনে বাড়িয়ে বা কমিয়ে নিতেন লাইট সেট করে, তখন তিনি কল্পনা করতেন, বাইরে সূর্য ঠিক কোন অবস্থানে থেকে আলো ছড়াচ্ছে এবং সেটা যদি জানালা গলে আসে তবে কেমন করে আসবে, এরপর বাকিটা সহজ হয়ে যেত।
তিনি সিনেমাটোগ্রাফি-র নিয়ম কানুন নিয়ে পড়তে বা জানতে কাউকে বারণ করেননি। কিন্তু বলেছেন, কাজের সময় এসব নিয়ম সম্পূর্ণ মাথা থেকে ফেলে দিতে। নইলে কাজের গল্প থেকে স্বাভাবিকতা হারিয়ে যাবে। ১৯৬৭ সালে তিনি ‘দ্য কালেক্টর’ সিনেমায়, তখন তিনি একদমই নবীন। সে সিনেমায় সূর্যাস্তের সময় নেয়া একটা দৃশ্য ছিল, যাতে স্বাভাবিকভাবেই কমলা রং এর প্রাধান্য ছিল। ল্যাবে যখন এডিটিং এর কাজ চলছিল তখন টেকনিশিয়ান সেই রঙ বাদ দিতে চাইছিলেন। সে-সময়ে অতোটা উষ্ণ রং সিনেমাতে ব্যবহৃত হতো না। তাই তাঁকে বেশ জোরাজুরি করতে হয়েছিল সেই শুটিং দৃশ্য অবিকল রাখতে। আর এর পরতো এই উষ্ণ রঙ-এর ব্যবহার সিনেমায় নিয়মিত হয়েছে। বলেছিলেন, নবীনদের সব চাইতে বড় বাঁধা হল, প্রথাগত টেকনিশিয়ানরা সবসময় তাদের উপর কর্তৃত্ব ফলাতে চাইবে। তারা কখনই নান্দনিক সৃষ্টিকে সামনে এগুতে দিতে চাইবে না, সবসময় প্রথার ভেতরে থাকতে চাইবে। তাই কোনো নবীন যদি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে একটা কাজ করে থাকে, তবে অবশ্যই তাঁর সেই অবস্থানে অনড় থাকা উচিৎ।
স্টেডিক্যামের প্যানাভিশন ভার্সান প্যানাগ্লাইড তখন নতুন বাজারে এসেছে। এই ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছিল ‘ডেজ অফ হ্যাভেন’ সিনেমায়। প্রথমে পরিচালক টেরি মালিক চেয়েছিলেন পুরো সিনেমাটাই এই ক্যামেরায় শ্যুট করতে, কিন্তু এক পর্যায়ে তাঁরা দেখতে পেলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওটাকে অতটা কার্যকর মনে হচ্ছে না। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বলেছিলেন, নতুন প্রযুক্তি ভাল, তবে সারল্য তাঁর চাইতেও ভাল।
দ্যা কালেক্টর সিনেমাটা তাঁর জন্য একটা আশীর্বাদ। স্বল্প বাজেটে কী করে সীমাবদ্ধতার ভেতরে থেকে ভাল কাজ বের করে নিয়ে আসতে হয় সে-শিক্ষা তিনি এই সিনেমায় পেয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, স্বল্প বাজটের সিনেমা দ্রুত কাজ করতে এবং যে-কোনো সমস্যার সমাধান বের করে নিয়ে আসতে বাধ্য করে।
তিনি প্রথাগত টেকনিকের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে একজন সহকারী সবসময় কারিগরী দিকগুলো, যেমন লাইট ঠিক করা, ফোকাস মেজার করা এসব সামলে নেবে। কিন্তু একজন ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি আরও গভীরে যাবে, এবং গল্প কি চাইছে তা একটা নিরেট সাংস্কৃতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ক্যামেরায় ধারণ করবে। একবার বেসিক কৌশলগুলো সব কিছু জানা হয়ে গেলে কাজটা তেমন জটিল কিছু নয়। আর শেখার সব চাইতে সহজ উপায় হল, সমস্ত কিছুই শুট করে ফেলা আর এরপর ভুল থেকেই শেখা হবে। আর অসংখ্য ভাল সিনেমা দেখতে হবে।

x