সিনিয়র নেতাদের সাথে দূরত্ব ঘুচানোর চেষ্টা নাছিরের

কড়া নাড়ছে চসিক নির্বাচন

হাসান আকবর

বৃহস্পতিবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ
766

দুয়ারে কড়া নাড়ছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। আগামী বছরের মার্চের পরে যেকোনো দিন হতে পারে ভোটের দিনক্ষণ। এর আগে প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে তফসিল ঘোষণাসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। তবে ইতোমধ্যেই চসিক নির্বাচন নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে। চলছে হিসাব নিকাশও। আসন্ন নির্বাচন ঘিরে নানা ধরনের সমীকরণ মেলানো হচ্ছে। রাজনীতিবিদদের সতর্ক পদচারণাও নির্বাচনী আবহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন দলের সিনিয়র এবং প্রভাবশালী নেতাদের সাথে দূরত্ব ঘুচানোর চেষ্টা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন অনুযায়ী, মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিন আগে যেকোনো সময়ে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচিত পরিষদের প্রথম বৈঠক (সাধারণ সভা) থেকে মেয়াদ গণনা শুরু হয়। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে বিজয়ী মেয়র শপথ নিয়েছিলেন ওই বছরের ৬ মে। কিন্তু আইনি কিছু জটিলতা থাকায় সাথে সাথে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে ২৬ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর পর্যদের প্রথম সভা হয়েছিল ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট। ফলে ১৮০ দিনের আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন আগামী বছরের (২০২০ সাল) ৬ মার্চ থেকে ৬ আগস্টের মধ্যে হতে হবে। অর্থাৎ আগামী ৬ মার্চের পরে যেকোনো দিন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল। তবে ঢাকা উত্তর সিটির প্রথম সাধারণ সভা হয়েছিল একই বছরের ১৪ মে এবং ঢাকা দক্ষিণে হয় ১৭ মে। আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, আগামী ১৪ ডিসেম্বর থেকে ১৪ মে (২০২০) এর মধ্যে ঢাকা উত্তর এবং আগামী ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ১৭ মে এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। বিশ্লেষকদের মধ্যে আগামী ৬ মার্চের পরে সরকার চাইলে তিন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠিত করার পদক্ষেপ নিতে পারে।
ঢাকা এবং চট্টগ্রামের তিন সিটি কর্পোরেশন নিয়ে সরকার কী করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে চট্টগ্রামে নির্বাচনী হিসাব নিকাশ শুরু হয়েছে বেশ আগে। গত নির্বাচনে নগরবাসীকে সারপ্রাইজ দেয়ার মতো বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে মনোনয়ন দিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আ জ ম নাছির উদ্দীন ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬১ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। বিগত মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নগর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে বিরোধ চাঙা হয়ে উঠেছিল। মনোনয়ন থেকে শুরু করে নির্বাচন পর্যন্ত নানাভাবে দেখা গেছে বিরোধ। তৎকালীন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাবেক সিটি মেয়র আলহাজ্ব এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীদের অনেকেই ওই মনোনয়ন মেনে নিতে পারেননি। আ জ ম নাছির উদ্দীন নির্বাচিত হওয়ার পর বিরোধ কিছুটা কমলেও পরবর্তীতে দলীয় কোন্দল আবারো চাঙা হয়ে উঠে। সরকারের সাথেও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সম্পর্কের কিছুটা অবনতি পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের টাকা চাওয়ার ব্যাপারে মেয়রের এক অভিযোগকে ঘিরে বেশ তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। অভিযোগের জের ধরে মন্ত্রণালয়ের সাথে সিটি মেয়রের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
অপরদিকে জাতিসংঘ পার্ক এবং কর্ণফুলী পার্ক নিয়ে তৎকালীন গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সাথেও বিরোধ তীব্র হয়ে উঠে সিটি মেয়রের। নোটিশ পাল্টা নোটিশ কিংবা মামলা মোকাদ্দমার মতো ঘটনাও ঘটে।
চট্টগ্রামের আওয়ামী রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা আক্তারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর সাথে আ জ ম নাছির উদ্দীনের এক সময় ঘনিষ্ঠতা থাকলেও পরবর্তীতে বিরোধ তুঙ্গে উঠে। এই বিরোধ অমিমাংসিত রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন বিশ্লেষকেরা।
পটিয়া থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর সাথেও সিটি মেয়রের বিরোধ দৃশ্যমান হয়ে উঠে। বন্দর কেন্দ্রিক কার্যক্রমের পাশাপাশি খেলার জগত নিয়ে এই বিরোধ বলেও মনে করেন অনেকে। সিটি মেয়রের সাম্প্রতিক জুয়া বিরোধী অবস্থান হুইপ সামশুল হক চৌধুরী সাথে বিরোধ বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠে। সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে শেখ কামাল ইন্টারন্যাশনাল কাপ ক্লাব ফুটবল টুর্নামেন্টের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ায় বিরোধের সৃষ্টি হয় বলেও জানিয়েছিলেন হুইপ সামশুল হক চৌধুরী।
বন্দর পতেঙ্গা আসনের সংসদ সদস্য এম এ লতিফের সাথে সিটি মেয়রের ঘনিষ্টতা থাকলেও বন্দর কেন্দ্রিক বনিবনার অভাবে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
প্রভাবশালী নেতাদের বিভিন্ন জনের সাথে বিরোধের জের ধরে সিটি মেয়র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও মনে করছেন অনেকেই। তাদের মতে, দলীয় বিরোধের কারণেই সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সরকারের গুডবুক থেকে বাদ পড়েছেন। দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর মর্যাদা দেয়া হলেও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে এসব কিছুই দেয়া হয়নি। বিগত বছর জুড়ে বিষয়টি নানাভাবে আলোচিত হয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও বিষয়টি নিয়ে অনেকেই অনুরোধ করেছেন। কিন্তু সরকার প্রধানের অনাগ্রহে চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে ‘মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী’র মর্যাদা ছাড়াই পুরো সময় পার করে দিতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সব বিরোধ মিটিয়ে নিতে উদ্যোগী হয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় সবুজ উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাবেক গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবং সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দিন একই মঞ্চে চট্টগ্রামের উন্নয়ন নিয়ে চমৎকার কিছু কথা বলেছেন। বক্তব্যে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সিটি মেয়রকে ‘নগরপিতা’ বলে আখ্যায়িত করে ‘আমার নেতা’ হিসেবেও সম্বোধন করেন। পাল্টা বক্তব্যে সিটি মেয়র ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে ‘আমার অভিভাবক’ বলে সম্বোধন করেন। জাতিসংঘ পার্ক নিয়েও দুজনের চমৎকার কথা হয়। যাতে গণপূর্ত বিভাগ পার্কটি তৈরি করে সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করার কথা বলা হয়। সিটি কর্পোরেশনই পার্কটি পরিচালনা করবে বলেও উল্লেখ করা হয়। দুপক্ষের আলাপচারিতা নগরবাসীকে উদ্বুদ্ধ করে। তারা মনে করেন, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় নেতাদের সাথে সিটি মেয়র বিরোধ মিটিয়ে একই মঞ্চে আসছেন। এই ধারা চট্টগ্রামের উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ।
বিষয়টি নিয়ে গতকাল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি মোটেই এরূপ নয়। নির্বাচনের আগে বা পরের কোনো বিষয় নয়। আমি আমার ‘এথিকস’ নিয়ে রাজনীতি করছি। আমি আমার মতোই আছি। আমি সবাইকে সম্মান করি। আবার দলীয় এবং কর্পোরেশনের স্বার্থকেও সমুন্নত রাখি। এতে আমার আচরণে কেউ মনক্ষুণ্ন হতে পারেন। আবার আমার অবস্থান সঠিক ছিল মনে করে নিজে থেকে ফিরেও আসতে পারেন। আমি আমার মতোই আছি। আমি কারো সাথে কোনো বিরোধে জড়ানো যেমন পছন্দ করি না, তেমনি সততা এবং স্বচ্ছতাকেও জলাঞ্জলি দিতে পারি না। তিনি বলেন, জাতিসংঘ পার্কটির মালিকানা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের। এটির ট্যাঙ সিটি কর্পোরেশন দেয়। নামজারি থেকে সবকিছু সিটি কর্পোরেশনের নামে। তাই সিটি মেয়র হিসেবে এই জায়গা কাউকে দিয়ে দেয়ার সুযোগ আমার নেই। দিলেও আইনি প্রক্রিয়ায় দিতে হবে।
আবার দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলকে সংগঠিত করে দলের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্বের অনেকখানিই আমার উপর বর্তায়। আমি শুধু সেই কাজটি করেছি। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে চাই, সিটি কর্পোরেশন পরিচালনায় আমি শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি। সততার সাথে পালন করেছি। কোনো ধরনের অন্যায়ের সাথে কোনো রকমের কম্প্রোমাইজ করিনি। জাতিসংঘ পার্কের স্থাপনা আমার আগের মেয়রের সময়কার। কর্ণফুলী পার্ক নিয়ে মামলা করেছিলেন মহিউদ্দিন ভাই। আমি উত্তারাধিকার সূত্রে এসব পেয়েছি। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, লতিফ ভাইয়ের সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই। কেন এই বিরোধ তা উনি জানেন, উনার খোদা জানেন। আমি কিছু জানি না। ওনার সাথে আমার কোনো ব্যবসায়ীক সম্পর্ক নেই। কোনো কালেই ছিল না। আমি বহুবছর ধরে বন্দরে বার্থ অপারেটরের কাজ করি। সেখানে লতিফ ভাইর সাথে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সামশুল হক চৌধুরীর সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই। শেখ কামাল ইন্টারন্যাশনাল ক্লাব কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট কমিটি নিয়েও আমার কোনো বিশেষ দুর্বলতা নেই। গতবারও তারা শুধু নামেই আমাকে চেয়ারম্যান রেখেছিলেন। এবার রাখেননি। আমার কোনো লাভ-ক্ষতি নেই। তা নিয়ে আমার বিশেষ কোনো আগ্রহও নেই। আমি আমার মতো চলি। নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকি। এতে কেউ কাছে আসলে বুকে টেনে নিই। দূরে সরে গেলেও মন খারাপ করি না। তবে যতক্ষণ দায়িত্বে আছি শতভাগ সততা এবং স্বচ্ছতার সাথে তা পালন করার চেষ্টা করি।

x