সিজিএস কমিউনিটি স্কুল ও একটি ‘স্বপ্ন’

আনোয়ারা অালম

শনিবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ
175

ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল তিনটা। আমার সামনে প্রায় দুইশত শিশুপাশে আছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান জনাব তহসিন খান। একজন শিশুর সুললিত কণ্ঠস্বর ও সুরের মাধুর্যে আয়াতের মাধ্যমে অ্যাসেম্বলির সূচনা। গভীর মুগ্ধতায় শুনছি ওর আয়াত পড়া এবং দেখছি অনেক শিশু ঠোঁট মিলাচ্ছে তার মানে তাদেরও এ সুদীর্ঘ আয়াত মুখস্ত। শিক্ষার্থী শিশুদের পরনে পরিচ্ছন্ন স্কুল ড্রেসঅনেকের দৃষ্টি মেধাদীপ্ততবে গভীর পর্যবেক্ষণে কারো কারো অবয়বে কিছুটা অপুষ্টি ও কিছুটা ছায়া ছায়া মলিনতা।

ড্রিল শেষে শপথ বাক্যের পরে জাতীয় সঙ্গীতছন্দে লয়ে এবং উচ্চারণে দারুণ! ভুল নেই কোথাও। আমার সাথে প্রশ্নোত্তরে প্রায় সবার সঠিক উত্তরে আমি আশান্বিত। আমি সিজিএস কমিউনিটি স্কুলের কথা বলছি। চট্টগ্রাম শহরে ‘চিটাগাং গ্রামার স্কুল’-(ন্যাশনাল ও ব্রিটিশ কারিকুলাম) সুপ্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় দেশের অবহেলিত ও অনাদরে বেড়ে ওঠা শিশুদের সুশিক্ষিত করে তাদের স্বপ্ন পূরণের পথকে সহজ করার প্রত্যয়ে ‘সিজিএস কমিউনিটি স্কুল’ নামে আধুনিক সুযোগ সুবিধার আলোকে সম্পূর্ণ অবৈতনিক শিক্ষা প্রকল্প রাজধানীসহ চট্টগ্রামে চালু আছেযার পেছনে মুখ্য ভূমিকায় চিটাগাং গ্রামার স্কুলের সম্মানিত পরিচালক প্রয়াত বিলকিস ইকবাল দাদা, বেগম ফরহাত খান ও বেগম শিরীন ইস্পাহানী।

এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সাথে এলাকার সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানেরা। শুরুটা ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। একজন শিক্ষকের নিবিড় পরিচর্যায় ১৮ জন শিক্ষার্থী এবং শিশু শ্রেণি এবং স্থানসিজিএস এনসি (ন্যাশনাল কারিকুলাম) এর পাঁচলাইশ ক্যাম্পাস। মাত্র ছয় বছর তথা ২০১৮ সালে এ পরিধির বিস্তৃতিপাঁচলাইশ ক্যাম্পাসের সহ বিভিন্ন সুপরিসর ক্যাম্পাসে তথা চট্টেশ্বরী রোডের সার্সন ভ্যালি, নাসিরাবাদ সিজিএস এনসি যা বর্তমানে ফিনলে জারানে সিজিএস এনসি ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিতপিছিয়ে নেই ঢাকা ক্যাম্পাসও। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে বেগম ফারহান খান ও প্রয়াত বিলকিস দাদা পরিচালিত ‘মিলন স্কুল নামে’ আরো একটি কমিউনিটি স্কুল সিজিএস সিনিয়র স্কুলের তত্ত্বাবধানে আনা হয়েছে। শিশু শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এ কার্যক্রমে ঢাকা শহর ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ৭৬০ জনশিক্ষক ও শিক্ষিকার সংখ্যা মোট ৫২ জন।

আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্ত আয়োজনের পাশাপাশি তাদের জন্য রয়েছে প্রশিক্ষিত শিক্ষক, প্রশস্ত শ্রেণিকক্ষ, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও খেলাধুলার আয়োজন। বিনামূল্যে বই পত্র শুধু নয়খাতাপেনসিল, ছবি আঁকার উপকরণ এবং স্কুল ড্রেসএকই সাথে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত টিফিনের ব্যবস্থা যা শ্রেণিকক্ষেই পরিবেশিত হয়। মহতি এ উদ্যোগের বিষয়টি কথা প্রসঙ্গে বলেছিলোচিটাগাং গ্রামার স্কুল (ন্যাশনাল কারিকুলাম) এর শিক্ষক আমার পুত্রবধূ নুসরাত জাহান। ভারি ইচ্ছে হলোঅনানুষ্ঠানিকভাবে একদিন যাবোকিন্তু তহসিন খান (যার সাথে প্রথম আলো বন্ধুসভা, চট্টগ্রাম এর সূত্রে বহু আগে থেকে আমার পরিচয় ও সখ্য)- সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন আমাকে। দিনটি আট আগস্ট, ২০১৮।

আমার শিক্ষকতা জীবনে (কিন্ডারগার্টেন ও কলেজে)। তৃতীয় ও বিশেষত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সন্তানদের শিক্ষা গ্রহণে প্রথম ও প্রধান প্রতিকূলতা ছিল আর্থিক সংকট। দেখেছি প্রয়াত আয়া কলেজের মর্জিনার মাকে। ওর মেধাবী ছোট ছেলে রিকশা চালিয়ে স্কুলে পড়াশোনা করেছে। তবে এসএসসিতে ভালো ফলাফল করায় পরবর্তীতে সরকারি কমার্স কলেজেআর এখন সে নিজের চেষ্টায় ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত। দেখেছি আয়া মনোয়ারা বা গোলাপ নাহার বা দারোয়ান লতিফের মেয়েরা শুধুমাত্র আর্থিক কারণে স্কুলে প্রবেশ করেও শেষ পর্যন্ত পরিণতি বাল্যবিবাহে। ওদের বেদনা ও ব্যর্থতায় ভেতরে এক ধরনের গ্লানিবোধের কষ্ট পরিবারের একজন হয়েও এক্ষেত্রে কিছু করতে পারি নি।

আমরা জানিদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমান সরকার বিনামূল্যে বই বিতরণের সাথে বিনা বেতনে অধ্যয়ন, উপবৃত্তি সহ নানা সুযোগ দিচ্ছেযা প্রসারিত শুধু শহরে নয়, সমগ্র দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। যে কারণে বিশেষতঃ মেয়ে শিক্ষার্থীদের বাল্যবিবাহের হার কমছেশিশু শ্রমের ক্ষেত্রেও কিছুটা হলেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এও জানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে মেধা বিবেচনায় কোন প্রকার ঘাটতির অবকাশ নেই।

যদিও সংকট আছেশিক্ষক স্বল্পতাঅবকাঠামোগত সুবিধাচরাঞ্চলে নানা সংকটযাতায়াতে নিরাপত্তার অভাবযে কারণে ঝরে পড়ার সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।

টিআইবি সনাক, চট্টগ্রামের একজন সদস্য হিসেবে এক্ষেত্রে বাকলিয়ার ঘাটকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এলেও কোতোয়ালী থানার বান্ডেল এস কলোনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সার্বিক সুবিধাপর্যাপ্ত মেধাবী শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও ঝরে পড়ার হার এবং অনুপস্থিতির বিষয়ে সংকট কাটেনি। এর পেছনে অন্যতম কারণ আর্থসামাজিক সমস্যা। এদের মা ও বাবা কর্মস্থলে যাওয়ার সময়ে সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে ঘরের কাজে নিয়োজিত রাখেনআর অনেকে টিফিনের সময়ে বাড়ি গেলে স্কুলে আসে না। এখানেই সমস্যাযদি এদের বিনামূল্যে টিফিনের ব্যবস্থা থাকতো, যদি স্কুলের সময়সূচি পরিবর্তন করা যেতো, যদি স্কুল ড্রেসসহ অন্যান্য উপকরণ বিতরণের সুবিধা থাকতোতাহলে হয়তো বা অনেক সমস্যার সমাধান করা যেতো। এক্ষেত্রে তো ব্যবস্থাপনা কমিটির হৃদয়বান এবং বিত্তশালীদের ভূমিকা রয়েছেকিন্তু কতজন এ বিষয় নিয়ে ভাবেন?

এর বিপরীতে যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন নিজের পরিবারের মতো বিশেষত চতুর্থ শ্রেণির সন্তানদের অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের দায়িত্ব নেন তখনি আমার জাগানিয়া বার্তা মনে দোলা দিয়ে যায়। সিজিএস কমিউনিটি স্কুলের সময়সূচি বিকেল তিনটে থেকেঅর্থাৎ দুপুর দুইটা পর্যন্ত যে শ্রেণিকক্ষতে শহরের বিত্তবান ও সচ্ছল পরিবারের সন্তানেরা পড়েসেই শ্রেণিকক্ষে তথা সার্বিক সুবিধার আলোকে। শিক্ষার্থীশিক্ষক অনুপাতও যৌক্তিকএকই সাথে মাঝে মাঝে স্কুলের সিনিয়র শিক্ষার্থীরা পাঠদানে সহায়তা দিচ্ছে। শ্রেণি কক্ষগুলো পরিপাটিসুন্দর এবং একটা শ্রেণিকক্ষের শিশুদের সাথে টিফিনও করেছি। একটা ডিম, একটি কলা ও এক কাপ দুধএ পুষ্টিমানে সমৃদ্ধ খাবার। তবে তহসিন খান জানালেন এরপরেও উপস্থিতি ও ঝরে পড়ার সমস্যা একেবারে কাটানো যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে মনস্তাত্বিক একটা বিষয় কাজ করেযেমন এ শিক্ষা অর্জনের পরে আরো কত দূর অভিভাবকেরা নিয়ে যেতে পারবেন বা এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে কর্মক্ষেত্রে তাদের অনীহা আসবে কিনাইত্যাদি নানা অনুষঙ্গ প্রাধান্য পায় কিন্তু।এরপরেও এ শহরের একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা চিটাগাং গ্রামার স্কুল যে উদ্যোগ নিয়েছেতা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। অবশ্যই হয়তো এ শহরে বা ঢাকায় অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত আছেযারাই এ মহৎ কাজে সম্পৃক্ত তাদের প্রতি অবশ্যই অভিনন্দন ও শুভ কামনা।

তবে আমি মনে করি, তাদের সবার কার্যক্রম প্রচারে আসা দরকারযাতে আরো অনেকে এ ব্যাপারে আগ্রহী হয়। আমার জানামতেকিছু দেশপ্রেমিক ও মহৎ প্রাণের তরুণেরাও এ ধরনের কাজে সম্পৃক্ত।

যেমন ‘অঙ্গীকার’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান যারা একেবারে ব্যক্তি উদ্যোগে এ কাজে নিবেদিত এভাবে আরো অনেকে এ কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসবেন এ প্রত্যাশা অবশ্যই থাকবে।‘স্বপ্ন দেখিয়ে চলে যাওয়া সাহস নয়, স্বপ্ন বাস্তবায়নে ভূমিকা পালন করার নামই সাহস’আমরা তো স্বপ্ন দেখিযদিও অনেক স্বপ্ন কেবলি কল্পনার জগতে, অনেক স্বপ্নের অকাল মৃত্যু।

সিজিএস কমিউনিটি স্কুলের আলোর শিখা ক্রমশ দীপ্যমান হচ্ছে সেই সাহসকে সারথি করে।

অভিনন্দন চিটাগাং গ্রামার স্কুল কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন এবং হৃদয়ের গভীরতম শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত পরিচালক প্রয়াত বিলকিস ইকবাল দাদা, বেগম ফারহাত খান ও বেগম শিরীণ ইস্পাহানীকে।

x