সায়াটিকা কি ও তার চিকিৎসা

মো. মুজিবুল হক শ্যামল

শনিবার , ২০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৯:৫৫ পূর্বাহ্ণ
571

সায়াটিকা কি এবং এ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের বিভিন্ন ভুল ধারণা রয়েছে। আমার বডি রিহ্যাব ফিজিওথেরাপিতে বিগত কয়েক বৎসরের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি বেশিরভাগ সায়াটিকার ব্যথা নিয়ে যারা আসছেন তাঁরা প্রায় ভুল টিট্রমেন্টের শিকার।
সাধারণ মানুষের ধারণা শরীরের যে কোন জায়গায় ব্যথা হলেই সেটা সায়াটিকার জন্য- এটা ঠিক নয়। সায়াটিকা কিভাবে হয় তার সম্পর্কেও ধারণা নাই। আবার দেখেছি ব্যথা পায়ের উরুর পেছনের অংশে বা পায়ের আঙ্গুলে, কিন্তু ব্যথার স্থানে চিকিৎসা করাচ্ছেন। আমার মতে এ ধরনের ব্যথার রোগীদের ক্ষেত্রে ডাক্তার বা থেরাপিস্টের চেয়ে রোগীদের কিছু দায়িত্ব আছে, ভালো হবার ক্ষেত্রে। আসুন আমরা জেনে নিই তাহলে সায়াটিকা কি ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে।
সায়াটিকা কি?

আমাদের শরীরে সায়াটিক নামের একটি নার্ভ বা স্নায়ু রয়েছে যার অবস্থান আমাদের মেরুদন্ডের লাম্বার স্পাইনের দিকের কশেরুকা বা ভার্টিরা এল ৩, ৪, ৫ ডিস্ক এবং সেকরাল স্পাইনের এস ১ কশেরুকা বা ভার্টিবা থেকে ঊরুর পিছন দিক দিয়ে হাঁটুর নিচের মাংসপেশির মধ্যে দিয়ে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত। যখন কোনো কারণে এই নার্ভ বা স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে তখন এই নার্ভ বা স্নায়ুর ডিস্ট্রিবিউশন অনুযায়ী ব্যথা কোমর থেকে পায়ের দিকে ছড়িয়ে যায়, এটাকে মেডিকেল পরিভাষায় সায়াটিকা বলা হয়। একে আবার নিতম্ব ব্যথা বা পায়ের ব্যথাও বলে থাকে।
সায়াটিকার লক্ষণ

# প্রথম অবস্থায় কোমর ব্যথা থাকে।
# ব্যথা কোমর থেকে পায়ের দিকে ছড়িয়ে যায়।
# অনেকক্ষেত্রে কোমর ব্যথা না কিন্তু উরুর পেছনের দিক থেকে শুরু করে হাঁটুর নিচের

মাংসপেশির মধ্যে বেশি ব্যথা করে, এমনকি ব্যথা
পায়ের পাতা বা আঙ্গুল পর্যন্ত অবশ হয়ে থাকে।
# বিশ্রামে থাকলে বা শুয়ে থাকলে ব্যথা কম থাকে কিন্তু খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে কিংবা হাঁটলে ব্যথা বেড়ে যায়।
# এমনকি কিছুক্ষণ হাঁটলে তার হ্‌াটার ক্ষমতা থাকে না, কিছুটা বিশ্রাম নিলে আবার কিছুটা হাঁটতে পারে। আক্রান্ত পা ঝিন ঝিন বা অবশ অবশ অনুভূত হয়।
# কখনো আক্রান্ত পায়ে জ্বালাপোড়া অনুভব করে।
রোগ নির্ণয়

রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে রোগের ইতিহাস, উপসর্গ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি লাম্বো-সেকরাল স্পাইনের (মেরুদন্ডের নিচের অংশ) এক্স-রে, এমআরআই করার প্রয়োজন পড়ে। তবে এক্সপার্ট কোন ডাক্তার বা থেরাপিস্ট হলে মাঝে মাঝে হিস্টি শুনে সায়াটিকা ধরে ঔষধ এবং থেরাপি দিয়ে রোগীকে ভালো করা সম্ভব।
চিকিৎসা

পরিপূর্ণ বিশ্রাম, মাসল রিলাক্সান্ট জাতীয় ঔষধ আর সঠিক ফিজিওথেরাপি বা ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। মনে রাখা প্রয়োজন এ জাতীয় রোগে শরীরে ব্যথার জায়গায় মালিশ করা চলবে না, এতে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। শুধুমাত্র গরম বা ঠান্ডা সেঁক দিতে পারেন।
পরামর্শ

এ ধরনের ব্যথার রোগীদের ক্ষেত্রে তাঁদের দায়িত্ব থাকে সবচেয়ে বেশি। আর এ রোগীর ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যথা সহ্য করে ধৈর্য্য ধরতে হবে, রোগীরা তাড়াতাড়ি যদি ভালো হবেন আশায় থাকেন তবে সেটা ভুল ধারনা। এধরনের রোগীদের অবশ্যই কিছুদিন ব্যথা সহ্য করে থেরাপি দিয়ে যেতে হবে। কারণ ডিস্ক (নরম জেলি জাতীয়) নির্দিষ্ট জায়গায় না গেলে ব্যথা কমে আসবে না। আবার অনেকে বলেন যতদিন থেরাপি দিচ্ছি ততদিন ভালো থাকি তারপর আবার ব্যথা দেখা দেয় আমি বলছি ব্যথা অবশ্যই চিরতরে যাবে আপনাকে সময় দিয়ে ভালো কোন থেরাপি সেন্টারে যেতে হবে। এধরনের ব্যথার রোগীদের অনেক সময় ২ থেকে ৩ মাসও লেগে যায়। তবে বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ দিনে ভাল হয়।
# সামনের দিকে ঝুঁকে ভারি কিছু উঠাবেন না। ব্যথা চলাকালীন নামাজ পড়বেন চেয়ারে বসে ইশারায়, কিছুদিন সঠিক ভঙ্গিমায় নামাজ পড়বেন না, লো কমেডের পরিবর্তে হাই কমেড ব্যবহার করবেন।
# শক্ত বিছানায় ঘুমাবেন। কাঠের বা শক্ত টাইপের চেয়ারে বসবেন, নরম জাতীয় কোন সোফা বা ফোমে বসবেন না।
# ভ্রমণ বা কাজ করার সময় কোমরে বেল্ট (কার্ভ/ বাঁকা জাতীয় বেল্ট/ অবশ্যই টাইট করে বাধা থাকবে) ব্যবহার করবেন, (নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী)। আর এ ব্যথা যতদিন থাকবে রিক্সাতে চড়া যাবে না। সামনে ঝুঁকে কোন কাজ একেবারে করা যাবে না।
# ব্যথার ওষুধ এবং মাসল রিলাক্স্যান্ট জাতীয় ঔষধ ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী সেবন করবেন, সাথে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেতে ভুল করবেন না। তবে এ ধরনের ব্যথায় অবশ্যই ফিজিওথেরাপি বিহীন ভালো হবে না, এ জন্য অবশ্যই ফিজিওথেরাপি ১৫ থেকে ২৫ নিতে হবে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে আরো তাড়াতাড়ি আরোগ্য হয়ে থাকে।
# ফিজিওথেরাপিস্টের নির্দেশিত ব্যায়াম সমূহ অনুশীলন করবেন এবং নির্দেশিত ডেলি একটিভিটি লিভিং এর নির্দেশিতগুলো অনুসরণ করতে হবে।

x