সাহিত্যে ছোটগল্প

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

শুক্রবার , ৪ অক্টোবর, ২০১৯ at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ
47

“সাহিত্যে ছোটগল্প” নামক উপকারী বইটিতে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় গল্পের বয়স আর মানুষের সভ্যতার বয়স সমান সমান বলে উল্লেখ করেছেন। এ বলাতে কোনো ভুল নেই। ব্যাখ্যা করতে গেলে অবশ্য বলা যায় যে, যেদিন থেকে মানুষের জীবনে অবকাশের শুরু সেদিন থেকেই গল্পের সূচনা। অবকাশ এসেছে জীবন-সংগ্রামের ফাঁকে, বিরূপ প্রকৃতি ও হিংস্র পশুদের সঙ্গে বিপজ্জনক লড়াইয়ের বিরতিতে। সেই সময়টুকু মানুষ ভরে দিতে চেয়েছে গল্প দিয়ে।
গল্প আসে তিনটি ক্ষেত্র থেকে : এক. মানুষের কৌতূহল; দুই. অভিজ্ঞতা; তিন. কল্পনা। কৌতূহলে, অভিজ্ঞতায়, কল্পনায় মেশামেশির ফলে, পারস্পরিক মৈত্রী ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে গল্প বেরিয়ে এসেছে। এবং গল্প আবার আবেদন জানিয়েছে শ্রোতার কৌতূহল, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার কাছেই।
কৌতূহল মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তিগুলোর একটি। এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃত্তিও বটে। ঔপন্যাসিক ই এম ফরস্টার। তাঁর ছোট্ট, চমৎকার বই আসপেক্টস অব দি নভেল-এ কৌতূহলের শক্তি ও মূল্যের বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। সেই যে প্রাচীন “আরব্য রজনী”র এক হাজার এক রাত্রির গল্পগুলো তাদের বর্ণনার কাঠামোটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে ঔপন্যাসিক-সমালোচক বলছেন যে শাহেরজাদীর পক্ষে গল্পের ভেতর দিয়ে ‘রক্তপিপাসু’ শাহজাদার কৌতূহল জাগিয়ে তোলা এবং জাগিয়ে রাখাটা খুবই জরুরি ছিল। আসলে জীবন-মরণ সমস্যা ছিল ব্যাপারটা। রাজপুত্রের নিয়ম ছিল প্রতিদিন একজন করে কুমারীকে বিয়ে করবেন, এবং রাত পোহাবার আগেই হত্যা করবেন সেই স্ত্রীকে। শাহেরজাদীরও নিহত হবার কথা ছিল- রাত পোহালে। বাঁচার জন্য গল্প বলা শুরু করলেন তিনি। গল্প বলতে বলতে রাত পুরিয়ে যায় কিন্তু গল্প শেষ হয় না। তাই গল্পের খাতিরে বাঁচিয়ে রাখতেই হয় ওই কন্যাকে। পরের রাতে আরেক গল্প। রাত পোহায়, গল্পের কিছুটা বাকি থাকে। তারপর? তারপর কি হলো? কি ঘটল? জানবার যে ভীষণ কৌতূহল সৃষ্টি হয় শাহজাদার মনে সেই কৌতূহলই বাঁচিয়ে দেয় শাহেরজাদীকে। কৌতূহল সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হলে জীবন দিয়ে মেটাতে হতো দাম। এমনই কঠিন পরীক্ষা তাঁর। এই পরীক্ষায় সকল গল্পকারকেই নামতে হয়। কৌতূহল সৃষ্টি করতে হয় শ্রোতার মনে। ব্যর্থতা অর্থ মৃত্যু; গল্পকার হিসেবে আর বেঁচেই থাকবেন না যদি-না শ্রোতার মনে আগ্রহ থাকে ওই গল্প শোনার। প্রত্যেক গল্পকারই তাই একজন শাহেরজাদী।
আদিম মানুষেরও কৌতূহল ছিল। সে তার জানা জগৎটাকে দেখেছে। প্রতিদিনের পরিচিত জীবন সম্বন্ধে একটা অভিজ্ঞতা সৃষ্টি হয়েছে তার মনে। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট হয় নি। এর বাইরে কি আছে জানতে চেয়েছে সে। কি আছে ঐ পাহাড়ের ওপাশে? কারা থাকে ঐ সমুদ্র পার হলে যে দিগন্ত সেই দিগন্তের পারে? কেমন তাদের ্‌ আচার-আচরণ, কেমন তাদের ঘর? মরলে পরে মানুষ কোথায় যায় চলে? প্রতিদিন সূর্য ওঠে, প্রতিদিন আবার যায় অস্ত। কোথায় থাকে সে উদয়ের পূর্বে, অস্তের পরে? এসব নানা বিষয়ে নানা রকম জিজ্ঞাসা তার মনে। এসব কৌতূহলের নিবৃত্তি চায় সে।
ওদিকে আবার সব মানুষের সমান কল্পনাশক্তি থাকে না। যাদের কল্পনা করবার শক্তি বেশি তারা এইসব কৌতূহলের পথ ধরে, অভিজ্ঞতার কিছু সঞ্চয় সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যায় অনেক দূর। সৃষ্টি করে গল্পের। একেকটি গল্পের ভেতর ধরা দেয় কৌতূহল, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার একেক রকম সংমিশ্রণ।
শুরুতে মানুষের অভিজ্ঞতা ছিল কম। কৌতূহল ছিল বেশি। কল্পনাও ছিল অধিক শক্তিশালী। তখনো বিজ্ঞান আসে নি। বিজ্ঞানের একটা বড় কাজ বস্তুজগতের ব্যাখ্যা দেওয়া। বিজ্ঞানে যে কল্পনা নেই এমন অলক্ষুণে কথা কেউ বলবেন না। কিন্তু বিজ্ঞানকে চলতে হয় যুক্তির শাসনে। বিজ্ঞান তাই বুদ্ধিজীবী। তাই তার সাহস কম, পদে পদে ধীরে ধীরে চলে, বিচার ও বিশ্লেষণের সমর্থন ছাড়া এগোয় নাই। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কল্পনা বুদ্ধির দ্বারা শাসিত। বিজ্ঞান আসার আগে বিজ্ঞানের কাজটার দায়িত্ব কল্পনাকেই নিতে হয়েছে। বিষয় ও বস্তুর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কল্পনা পরিচয় দিয়েছে দুঃসাহসের। সৃষ্টি করেছে সে অতিকথার (যার ইংরেজি নাম হলো মিথ); চাঁদকে নিয়ে সে সূর্যের বোনের গল্প খাড়া করেছে। অথবা কল্পনা করেছে চাঁদে আছে এক বুড়ি, চাঁদে তার অনেক কাজ। শীত কেন আসে? তার ব্যাখ্যা অতিকথা দিয়েছে। গ্রীষ্মে কেন গরম হয়? তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যাবে অতিকথায়। পৃথিবী কোত্থেকে এলো? স্বর্গ জিনিসটা কেমন? সবকিছুর ব্যাখ্যা অতিকথায় পাওয়া যাবে। অতিকথা অতিশয় সরল। সভ্যতার শৈশবে অভ্যুদয় তার। শৈশবের প্রাণবন্ততা আছে তার ভেতর।
অতিকথার মতোই, কিন্তু কিছুটা ভিন্ন ধরনের গল্প হলো রূপকথা। সেখানেও ভরটা অভিজ্ঞতার জগতের ওপরেই, কিন্তু অভিজ্ঞতার জগৎকে ছাড়িয়ে, কৌতূহলের প্রেরণা নিজের মধ্যে ধরে নিয়ে, গল্প চলে গেছে আকাশে, বন-বাদাড়ে, পাহাড়ের চূড়ায়, সমুদ্রের গভীরে। রূপকথায় ভালো আছে, মন্দ আছে। একদিকে আছে রাজপুত্র ও রাজকন্যা; অন্যদিকে, তাদের বিপরীতে, সর্বদাই হুঙ্কার দিচ্ছে, দাঁত ঘষছে, ফন্দি আঁটছে আরেক দল- দৈত্য তারা, কখনো বা রাক্ষস। দুয়ের মধ্যে ভীষণ লড়াই। হয় বেঁধে গেছে, নয় তো এই বাঁধল বলে। এই লড়াইয়ে জিতবে কে? ভালো জিতবে, মন্দ যাবে হেরে। জিততেই হবে ভালোকে- শেষ পর্যন্ত। আমরা সবাই যে ভালোর পক্ষে। ভালো যে লড়ছে আমাদের সকলের হয়ে, আমাদের শুভেচ্ছা ও উৎকণ্ঠা সঙ্গে আছে তার।
রূপকথার জগৎটা অতিরঞ্জিত, মাধ্যাকর্ষণবিরহিত। কিন্তু তার অন্তর্গত ‘ভালো’র জন্ম মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎ থেকেই। অভিজ্ঞতা কি বলে না একথা যে পৃথিবীতে সুখ কেবলই আক্রান্ত হচ্ছে দুঃখ দ্বারা? সুখ-দুঃখের এই অভিজ্ঞতা থেকেই ভালো বেরিয়ে এল। এল রাজপুত্র, এল রাজকন্যা। তারা অন্য কেউ নয়, প্রতিদিনের দেখা শুভেরই কল্পিত মূর্তি। অন্যদিকে দৈত্য-দানব, রাক্ষস-ক্ষোকস এদের আগমন কোথা থেকে? ঠিকানাটা কি? এরাও এসেছে ওই যে মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎ সেখান থেকেই। ঘৃণা ও ভয় মিলেই উদ্ভব এসব কিম্ভূত, উদ্ভট, উৎকট প্রাণীর। রাজকন্যা বন্দী হয়েছে রাক্ষসের হাতে। এ ঘটনা কিসের কথা বলে? বলে মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কথা, বলে অশুভের নির্মমতার কথা। রাজকন্যাকে এখন উদ্ধার করবে কে? উদ্ধার করবে রাজপুত্র- যে আমাদের ইচ্ছাপূরণ, আমাদের শেষ ভরসা।
গল্প যদিও অতিকথা এবং রূপকথা, উভয়েই, তবু অতিকথা ও রূপকথার ভেতর একটা ব্যবধান আছে। সেটি এইখানে যে, অতিকথা বিষয়ের ও বস্তুর ব্যাখ্যা দেয়, রূপকথার সে দায়িত্বটা নেয় না, রূপকথায় একটা নীতিবোধ থাকে, তাই বলে রূপকথা কিন্তু নীতিকথা নয়। নীতিকথাও এসেছে এক সময়ে। যেমন ধরা যাক, ঈশপের গল্পগুলো। সুন্দর গল্প, পরিচিত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই তৈরি; কিন্তু গল্পের শেষে একটি নীতিকথা আছে যে নীতিকথাটা বাদ দিলে গল্পটা দাঁড়িয়ে থাকে না, ভেঙে পড়ে যায়।
কিন্তু গল্পের জন্যও গল্প আছে। যেসব গল্প রূপকথার মতো দুঃসাহসী নয়, অতিকথার মতো ব্যাখ্যা দেবার দায় নেই যার কাঁধে, নীতিকথার বোঝাও নেয়নি যে আগবেড়ে- এই ধরনের গল্পকে বলা যায় আখ্যান বা উপাখ্যান। আরব্যোপন্যাসের গল্পগুলো যার চমৎকার নিদর্শন।
এভাবে অতিকথা থেকে শুরু করে নানান ধরনের গল্প এল মানুষের কাছে। উৎস ওই কৌতূহল, অভিজ্ঞতা ও কল্পনা। গল্পের ধরনগুলো সবদেশেই প্রায় একই রকম। সভ্যতার বিশেষ বিশেষ স্তরে বিশেষ বিশেষ ধরনের গল্প রচিত হবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এরই মধ্যে যাকে বলে স্থানীয় রঙ সেটা এসে লেগেছে। ফলে এক ধরনের হয়েও গল্পগুলো হুবহু এক রকমের হয়নি। দেশে দেশে তার রকমফের।
ছোটগল্প এসেছে অনেক, অনেক পরে। ছোটগল্প একটি সাহিত্যিক রূপকল্প। সাহিত্যের ব্যাপার সে। মুখে মুখে বলা গল্প থেকে অনেক দিক দিয়েই স্বতন্ত্র। তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ দিন। প্রথমে কবিতা এল, তারপর নাটক, আরো পরে গদ্য, গদ্যের সূত্র ধরে প্রবন্ধ, তারপর উপন্যাস। উপন্যাসেরও পরে এসেছে ছোটগল্প। বলা হয়ে থাকে ছোটগল্প ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্যাপার।
এক দিক দিয়ে ব্যাপারটা বিস্ময়কর। গল্পের শুরু সবার আগে, ছোটগল্পের শুরু সবার পরে। কারণ কি? কারণ আর কিছুই নয়, কারণ হচ্ছে গল্পের সঙ্গে ছোটগল্পের দূরত্ব। সেই দূরত্বটা পার হতে লেগে গেছে কয়েক শতাব্দী। এই দূরত্বটা কয়েকটি উপাদান দিয়ে গঠিত।
প্রথমে ধরা যাক ভাষার কথা। সব গল্পেই ভাষা দরকার। কথক মাত্রেই ভাষা-শিল্পী। কিন্তু ছোটগল্পের ভাষা বিশেষ ধরনের ভাষা। গল্প কিন্তু কবিতাতেও বলা চলে, লেখাও চলে। এককালে কবিতা গল্প বলত বৈকি। কিন্তু কবিতার গল্প কখনোই ছোটগল্প হবে না। ছোটগল্প অবশ্যই গদ্যে লেখা। আর আমরা তো জানিই যে সব দেশের সাহিত্যেই কবিতা এসেছে প্রথমে, গদ্য এসেছে কবিতার কাজ যখন একটা বিশেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে এবং সাহিত্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এমন সব অভিনব সামাজিক দায়িত্ব পালনের দায় কবিতার পক্ষে যা পালন করা আর সম্ভব নয় সেই- অনিবার্যরূপে- আবির্ভাব হয়েছে গদ্যের। গদ্য উন্নততর সামাজিকতার অর্থাৎ সামাজিক আদান-প্রদানের, ভাব ও তথ্য বিনিময়ের ভাষা। মানুষের সভ্যতা যখন একটি বিশেষ স্তরে এসে পৌঁছেছে, তার বুদ্ধিবৃত্তি তীক্ষ্ম হয়ে উঠেছে সামাজিকতার ভিত্তিতে, সমাজের বন্ধন একটা সুস্পষ্ট রূপ নিয়েছে গদ্য তখনকার গণ-মাধ্যম।
গদ্য সামাজিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও প্রতিভূ বটে। বহু বিচিত্র কাজ করে গদ্য। প্রবন্ধ লেখে, লেখে উপন্যাস। প্রবন্ধের গদ্যের সঙ্গে উপন্যাসের গদ্যের ব্যবধান স্বভাবতই বিস্তর। প্রবন্ধের ভাষার মধ্যে প্রবণতা থাকে বৈজ্ঞানিক হয়ে উঠবার। অর্থাৎ একেবারে স্পষ্ট, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয়ে পড়বার। ভাষা যখন বৈজ্ঞানিক হয় তখন তাতে কোনো রহস্যময়তা থাকে না, থাকে না দ্ব্যর্থতার সুযোগ। সেখানে লেখক জানেন কি তিনি বলতে চান, পাঠকও বোঝেন কি বলা হয়েছে। ভাষা সেখানে বক্তব্যের পোশাক মাত্র, বক্তব্যের অংশ নয়। এটি হচ্ছে গদ্যের আদর্শ রূপ, তবে গদ্যের সাহিত্যিক রূপও রয়েছে; যেখানে কিছুটা রহস্য রয়েই যায়।
উপন্যাসের গদ্যে ব্যাপারটা ভিন্ন ধরনের। সে গদ্যও গদ্য বটে, কবিতা নয়; কিন্তু তার মধ্যে কবিতার গুণ কিছু কিছু থেকেই যায়। কবিতার গুণ কি? প্রধান গুণ কল্পনাকে ধারণ করা। বিজ্ঞানের ভাষাতে কল্পনার ব্যবহার ঘটে যদি তবে তা গুণ নয়, বিড়ম্বনাই। অন্যদিকে উপন্যাসের ভাষায় কল্পনা থাকবেই, কেননা উপন্যাসতো কল্পনারই সৃষ্টি। কৌতূহল বিজ্ঞানেও আছে, যেমন আছে উপন্যাসে; কিন্তু বৈজ্ঞানিক কৌতূহলে যুক্তির পথ ধরে চলে, ঔপন্যাসিক কৌতূহল যুক্তিকে অমান্য করে না কিন্তু কল্পনাকে মুরব্বি মানে। উপন্যাসে অভিজ্ঞতা পুনর্নিমিত হয়, পুনর্মূল্যায়িত হয় কল্পনার দ্বারা। চেনা জগত নতুন হয়ে ওঠে। এই যে কল্পনা, ভাষার মধ্যে তাকে চিনব কি করে? চিনব ভাষায় ব্যবহৃত উপমা দিয়ে, উৎপ্রেক্ষার সাহায্যে। কল্পনায়-ধনী ভাষা অবশ্যই চিত্রবহুল। এই চিত্রবহুলতা সৃষ্টি করে বিশেষ ধরনের আবেদন, লেখকের মনের ভাব সে স্পষ্ট করে বটে, কিন্তু সব বলার পরেও কিছুটা না-বলা থেকে যায়। এটা ছবির বৈশিষ্ট্য। একেক সময়ে একেক আলোকে একই ছবি ভিন্ন ভিন্ন হয়। ছবি বদলায় দর্শকের রুচিভেদে, দৃষ্টিশক্তির হ্রাস-বৃদ্ধিতে, অবস্থানের উঁচু বা নীচুতে। এজন্য দেখা যায় যে কবিতার অর্থ কখনো পরিপূর্ণরূপে পাই না আমরা, কবিতাতে ভাষা ভাবের পোশাক নয়, ভাবেরই অংশ সে, কবিতার ভাষায় রহস্যময়তা থাকে, যার দরুন তার অর্থ একই কবিতা ভিন্ন ভিন্ন পাঠে কিছুটা হলেও বদলে যায়। কাব্যভাষার দ্বিতীয় গুণ যাকে বলে সুষমা। গদ্যের ভাষাকে যথাযথ হলেই চলে, কবিতার ভাষাকে সুন্দর হতে হয়। কেননা কবিতা সব সময়েই সাজানো-গোছানা, কিছুটা কৃত্রিম। কল্পনা তাকে প্রাণবন্ত করে, আর সুষমা তাকে সুন্দর, আকর্ষণীয়, মনমোহন করে তোলে।
উপন্যাসের সাহিত্যিক ভাষায় কাব্যভাষার এই দুটো গুণকে রহস্যময়তা ও সৌন্দর্যকে কিছু পরিমাণে হলেও থাকতেই হয়। কেননা উপন্যাসও সৃজনশীল কল্পনারই সৃষ্টি। সে বৈজ্ঞানিক নয়, সাহিত্যিক। উপন্যাসে কল্পনা কাজে লাগে আরো এক ভাবে। বিজ্ঞানের মতো উপন্যাসও আবিষ্কার করে, তার আবিষ্কারের ক্ষেত্রটা হচ্ছে মানুষের মন। মানুষের মনের ভেতর যে একটা অত্যন্ত সুন্দর, ভীষণভাবে রহস্যময়, নানা কারণে দুর্জ্ঞেয় জগৎ আছে সেই সত্যের স্বীকৃতির উপরই কথাসাহিত্যের ভিত্তি। এই বিশেষ জগৎ সম্পর্কে কথা-সাহিত্য এমন সব সত্য আবিষ্কার করে যা অন্যের পক্ষে যা করা সম্ভব নয়, করা সম্ভব নয় বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের পক্ষেও নয়, সম্ভব কেবল কল্পনার পক্ষেই। কল্পনাই পারে রহস্যের এই অস্পষ্টলোকে প্রবেশ করতে, সেখানকার সত্যগুলোকে খুঁজে বার করে আনতে। অর্থাৎ আবিষ্কারেও কল্পনা, প্রকাশেও কল্পনা।
যাকে আমরা উপন্যাসের ভাষা বলছি তারই একটি পরবর্তী ও পরিণত রূপ হচ্ছে ছোটগল্পের ভাষা। কবিতার ভাষা থেকে যেমন উপন্যাসের ভাষা বেরিয়ে এসেছে, উপন্যাসের ভাষা তেমনি জন্ম দিয়েছে ছোটগল্পের ভাষার। এ ভাষার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া তো গত্যন্তর ছিল না।

ছোটগল্পের একটা নিজস্ব কাঠামো আছে, গল্পের কাঠামো থেকে যা ভিন্ন। এই কাঠামোকে ইংরেজিতে বলে প্লট, বাংলায় বলা হয়েছে বৃত্ত। তাহলে কি বলতে হবে যে ছোটগল্পে গল্প নেই? আছে, অবশ্যই আছে। কিন্তু ছোটগল্পে গল্প সাদামাটাভাবে হেলাফেলা করে আসে না, আসে একটি সংগঠিত রূপে। এই ব্যাপারে ই এম ফরস্টারের শরণাপন্ন হওয়া ভালো। তিনি দেখাচ্ছেন যে, গল্পের আবেদন পাঠকের সেই যে আদিম কৌতূহল, তারপরে কি জানবার অদম্য আগ্রহ, তার-ই কাছে। আর প্লটের আবেদন কৌতূহলের সঙ্গে বৃদ্ধির কাছেও বটে। গল্প চলে ঘটমান সময়ের পারম্পর্য রক্ষা করে। প্লট ঘটনা বা সময়ের পারম্পর্যের ওপর জোর দেয় না, জোর দেয় বরঞ্চ কার্যকারণের ওপর।
গল্প ও প্লটে ব্যবধানটা কোথায় তা বোঝাতে যেয়ে ফরস্টার ছোট একটা উদাহরণ দিয়েছেন। মনে করা যাক, “রাজা মারা গেলেন তারপর রাণী মারা গেলেন” এটি একটি গল্প। এখানে ঘটনার একটা বিবরণ আছে, ঘটনার সময়গত পারম্পর্যও রক্ষা করা হয়েছে- প্রথমে রাজার মৃত্যু তারপর রাণীর মৃত্যু। এই গল্প থেকে যদি একটি প্লট তৈরি করা হয় তবে সেটি হতে পারে এই রকম : “রাজা মারা গেলেন, তারপর রাণী মারা গেলেন, মারা গেলেন কেন? না, মারা গেলো রাজার মৃত্যুতে আঘাত পেয়ে।” এখানে ঘটনার সাথে এসে গেছে ঘটনার কার্যকারণ। রাণী মারা গেলেন কেন? তার কারণটা বলে দেওয়া হয়েছে। অথবা প্লটটি এমনও হতে পারে : ‘রাণী মারা গেলেন। কেন মারা গেলেন? না, রাজা যে মারা গিয়েছেন কিছুদিন আগে সেই শোকে।” এখানে ঘটনার সময়গত পারম্পর্যটি রক্ষিত হয় নি, পরের ঘটনা অর্থাৎ রাণীর মৃত্যুর ঘটনা আগে চলে এসেছে, আগের ঘটনা-রাজার মৃত্যুর ঘটনা- চলে গেছে পরে। অর্থাৎ কিনা প্লট হচ্ছে কাহিনীর সংগঠিত রূপ। কথা-সাহিত্যে তাই আমরা গল্পের কথা তত বলি না যত বলি প্লটের কথা। গল্পটিকে অর্থাৎ কাহিনীটিকে লেখক নিজের ইচ্ছামত সাজিয়ে নেন, কার্যকারণ সম্পর্কটাকে ফুটিয়ে তোলেন, গুরুত্ব বণ্টন করেন নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, শুরু করেন কোনো নাটকীয় কিংবা সুবিধাজনক বিন্দুতে, শেষ করেন নিজের প্রয়োজন বুঝে। কাহিনী যদি উপাদান হয় তবে প্লট হচ্ছে উৎপাদিত দ্রব্য। ছোটগল্পের প্লট তার নিজস্ব প্লট। উপন্যাসের সঙ্গে ছোটগল্পের ব্যবধান দেখামাত্রই চোখে পড়ে; উপন্যাস খুব বড় ছোটগল্প একেবারেই ছোট। কিন্তু তাই বলে ছোটগল্প উপন্যাসের একটি টুকরো নয়। প্রতিটি ছোটগল্পই একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সৃষ্টি। তার নিজস্ব জীবন আছে, আছে বিশিষ্ট ও স্বতন্ত্র জগৎ। যেমন করে ছোট স্বপ্নের মধ্যে বড় জীবনকে আমরা ধরে রাখতে পারি কল্পনার সাহায্যে, তেমনি একটি ছোটগল্প জীবন ও সমাজের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিফলন ঘটাতে চায়। একটি ছোটগল্প যেন একটি নাটকীয় উন্মোচন। উদ্ভাবনার ক্ষেত্রে ছোটগল্পের প্লট, বলাই বাহুল্য, উপন্যাসের প্লটের আগে আসতে পারে না, আসে সে পরেই। উপন্যাস জীবন ও সমাজের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে পরিক্রমণ করে, সেই পরিক্রমণ বড় বড় সত্যকে উদঘাটিত করে দেয়; পিছনে পিছনে আসে ছোটগল্প, ঐ এলাকার বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রের উপর, ঘটনা ও চরিত্রের উপর সে আলো ফেলে। অগ্রবর্তী না এলে পরবর্তী আসবে কেমন করে? তাই বলে ছোটগল্প কিন্তু উপন্যাসের বিকল্প নয়, যেমন উপন্যাস বিকল্প নয় কবিতার। এরা আগে-পরে জন্মেছে বটে, কিন্তু কাজ করে যায় পাশাপাশি।
যাকে আমরা প্লট বললাম তার প্রয়োজন নাটকেও আছে। নাটকের প্লট নাটকীয়, নাটকীয় অর্থ দ্বন্দ্বপ্রধান। ছোটগল্পের প্লটে নাটকীয়তা থাকা সম্ভব, কিন্তু তবু তার প্লট নাটকের প্লট নয়। ছোটগল্পের প্লট একেবারেই তার নিজস্ব। একটি উপন্যাসকে অনেকগুলো টুকরো করলে আমরা যেমন অনেক ক’টি ছোটগল্প পাব না, ঠিক তেমনি একটি নাটককে আমরা বিভক্ত করতে পারব না অনেকগুলো ছোটগল্পে।
কিন্তু মানুষ? ছোটগল্পে ঘটনা থাকে, ঘটনাপ্রধান হতে পারে ছোটগল্প, কিন্তু ছোটগল্প মানুষেরই গল্প আসলে; সাহিত্যে প্লট আগে না চরিত্র আগে এ নিয়ে এককালে বিতর্ক হয়েছে। ট্র্যাজেডি সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ্যরিস্টটল তো জোরেশোরে দাবি করেছেন যে, প্লটই প্রধান। বলেছেন চরিত্র ছাড়াও ট্র্যাজেডি থাকতে পারে, কিন্তু প্লট ছাড়া কখনই নয়। এ ধারণা পরে বদলে গিয়েছে। ইউরোপীয় রেনেসাঁর পর থেকে চরিত্রই বড় হয়ে উঠেছে, প্লটকে ছাপিয়ে, ছাড়িয়ে।
অবশ্য বাদ দিয়ে নয়। কেননা চরিত্র ও প্লট পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল; চরিত্রকে যে আমরা পাচ্ছি সে তো সংগঠিত প্লটের ভেতরেই; আবার প্লট নিজেই বা গড়ে উঠে কাকে নিয়ে? চরিত্রকে নিয়েই তো। চরিত্রের কাজে, চিন্তায়, অনুভবে; এক চরিত্রের সঙ্গে অন্য চরিত্রের সম্পর্কে, দ্বন্দ্বে কিংবা প্রীতিতেই তো প্লটের গড়ে-উঠা। নাটকে, উপন্যাসে, ছোটগল্পে আমরা এই মূল্যবান সত্যের স্বীকৃতি পাই যে, মানুষই হচ্ছে সব কিছুর ঊর্ধ্বে; ঊর্ধ্বে নয় কেবল আবার সমস্ত কিছুর মানদণ্ডও বটে। বলা হয়ে থাকে যে, উপন্যাস হচ্ছে আধুনিক কালের মহাকাব্য। কথাটা সত্য ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে যোগ করতে হয় এই প্রয়োজনীয় ব্যাপারটি যে, উপন্যাস মহাকাব্যের তুলনায় অনেক বেশি গণতান্ত্রিক। উপন্যাস বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিচ্ছবি। মহাকাব্যে অনেক মানুষ যে থাকে তাতে কোনো ভুল নেই, কিন্তু তবু মহাকাব্য বীরকেন্দ্রিক, বীরের বীরত্বই তার প্রধান উপজীব্য। বীর উপন্যাসেও আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু ওই বীরের সঙ্গে অন্য মানুষরাও গুরুত্ব পাচ্ছে, তদুপরি বীর বলতে এখন রাজপুত্রকে বোঝাচ্ছে না, মস্ত বড় যোদ্ধাকেও বোঝাচ্ছে না, বীর এখন মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষ, এমনকি নিম্নবিত্ত হলেও অপরাধ নেই।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশের পথ ধরেই উপন্যাস এসেছে আসলে। তারপর এই মূল্যবোধ আরো যখন শক্তিশালী হলো তখন এল ছোটগল্প। ছোটগল্পের নায়ক উপন্যাসের নায়কের চেয়েও সাধারণ হতে পারে। সাহিত্যিক রূপকল্প হিসেবে ছোটগল্প হচ্ছে এই সত্যের স্বীকৃতি যে কোনো মানুষই উপেক্ষণীয় নয়, এবং একজন মানুষের জীবনের আপাত-সামান্য ঘটনাও তার নিজের জন্য তো বটেই অপরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ছোটগল্প বলে কোনো মানুষই তুচ্ছ নয়, ছোট ঘটনাও উপেক্ষার যোগ্য নয়। বলাই বাহুল্য, এই বোধটা একদিনে আসে নি, সময় লেগেছে আসতে, আর সেটাও একটা কারণ যে জন্য ছোটগল্প দেরীতে এল- সাহিত্যের অন্যসব রূপকল্পের তুলনায়।
এইসব নায়কেরা নানা শ্রেণী থেকে আসতে পারে। নানা রকমের মানুষ হতে পারে তারা। চরিত্র হিসেবে কেউ হতে পারে চ্যাপ্টা, কেউবা গোলাকার। চ্যাপ্টা এবং গোলাকার এই বিভাজন জীবনে সত্য, সত্য তাই সাহিত্যেও। কোনো কোনো চরিত্র আছে যারা বদলায় না, যারা একই রকম থাকে, তাদেরকে বলা যায় দ্বিমাত্রিক চরিত্র, অর্থাৎ চ্যাপ্টা চরিত্র। আর যেসব চরিত্র বদলাচ্ছে, ক্রমশ তারা হচ্ছে গোলাকার। কিন্তু চরিত্রই প্রধান।
ছোটগল্পে অস্বাভাবিক, এমনকি অতিপ্রাকৃতিক, ঘটনাও ঘটতে পারে, ঘটেও থাকে, কিন্তু ঘটনা মর্যাদাবান ও মূল্যবান হয় চরিত্রের সাথে তার সম্পর্কের কারণে। মানবিক তাৎপর্যই একমাত্র তাৎপর্য এক্ষেত্রে। সে জন্য বলা হয়, সংলাপই বলি কিংবা নাটকীয় কর্মই বলি ছোটগল্পে, যেমন উপন্যাসেও, তেমনি সব কিছুই চরিত্র থেকে উৎসায়িত। চরিত্রের এই মূল্য ছোটগল্পকে দিতেই হয়, সাধারণ গল্পের পক্ষে দেওয়াটা অত্যাবশ্যকীয় নয়। চরিত্র সম্পর্কে বলতে গেলে এটাও বোধকরি উল্লেখ্য যে, সাহিত্যে চরিত্র জিনিসটা ব্যক্তিত্বের সমার্থক নয়। ব্যক্তিত্ব হচ্ছে বাইরের লোকে ব্যক্তি সম্পর্কে কি ভাবে- আর চরিত্র হচ্ছে মানুষটির অন্তর্গত ও অন্তরঙ্গ পরিচয়। সাহিত্য চরিত্রকেই গুরুত্ব দেয় বেশি, ব্যক্তিত্বের তুলনায়; এবং ব্যক্তিত্বের ভেতরে থাকে যে চরিত্র সাহিত্য তাকেই জানতে ও বুঝতে চায়। আর এই যে মূল্যবোধ, এই যে দৃষ্টিকোণ এটা কার? সন্দেহ নেই লেখকের। লেখকই দেখেন, লেখকই মূল্যনিরূপণ করেন। নির্বাচনও মূল্যায়নই এক প্রকারের। কাজেই কোন চরিত্র বা চরিত্রের কোন দিক, ঘটনার কোন বিশেষ অংশকে লেখক বেছে নিচ্ছেন তাঁর গল্পের জন্য সেসবের মধ্য দিয়ে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকাশিত হচ্ছে। চরিত্র এবং ঘটনার উপস্থাপনাও দৃষ্টিভঙ্গির শাসন মেনে চলে। লেখক অনেকটা ঈশ্বরের মতো- তিনি সৃষ্টি করেন; কিন্তু তিনি আরো একটা কাজ করেন অতিরিক্ত, যেটি ঈশ্বরকে করতে হয় না, সেটি হলো সৃষ্টির বিবরণও তাঁকেই দিতে হয়। উভয় কাজই ঘটে তাঁর রুচি ও ইচ্ছামাফিক। কিন্তু সত্যিই কি তিনি স্বাধীন? লেখকও তো ব্যক্তি একজন, এবং ব্যক্তি হিসেবে তিনিও তাঁর শ্রেণীর লোক, তাঁর সময়ের লোক। সে জন্যই তো দেশে দেশে গল্পের ইতরবিশেষ ঘটে। সাহিত্যের সর্বজনীনতা অত্যন্ত বাস্তবিক ব্যাপার, কিন্তু সাহিত্যের সর্বজনীনতা স্থান ও কালকে অস্বীকার করে না।
ছোটগল্প যেমন আধুনিক তেমনি বৈচিত্র্যপূর্ণ। চরিত্রকে জড়িয়েই সব কিছু- কিন্তু তবু গল্প কোথাও ঘটনাপ্রধান, কোথাও তা অনুভূতি-নির্ভর। কোনো গল্প ব্যঙ্গাত্মক, আবার কোথাও গল্প রহস্যাত্মক। তেমনি বর্ণনার ক্ষেত্রে ভাষা কোথাও কবিতার দিকে চলে যেতে চায়, কোথাও আবার থাকে তা দৃঢ়রূপে গদ্যধর্মী; কোনো গল্প ভঙ্গিটা আত্মজৈবনিক, কোথাও বা তা একেবারে নৈর্ব্যক্তিক। এই বৈচিত্র্য ঘটে লেখকভেদে, এমনকি একই লেখকের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও অনুভব এবং জীবন-সমালোচনার বিবর্তন-পরিবর্তন ভেদেও।

x