সাহসী দুই নারী সাংবাদিককে স্যালুট…!

মাধব দীপ

শনিবার , ৪ আগস্ট, ২০১৮ at ৯:০২ পূর্বাহ্ণ
24

সাংবাদিকতা পেশায় একজন সাংবাদিক আগে খবর সংগ্রহ করবেন নাকি ছবি তুলবেন নাকি ঝুঁকি আক্রান্ত কাউকে বাঁচাবেন? অর্থাৎ সাংবাদিকতা পেশা, সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতা আর মানবিকতার দ্বন্দ্ব অনেক পুরনো। তবে কোনোকোনো সময় খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিক নিজেই যে ‘খবর হয়ে ওঠেন’ তাও কিন্তু পুরনো। তেমনটাই ঘটেছে আমাদের দেশের চলমান ছাত্রআন্দোলনে।

শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে রাস্তায় ‘পিষে মারার’ ঘটনার প্রতিবাদে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সড়কে কয়েকদিন ধরেই বিক্ষোভ ও অবরোধ করছে স্কুলকলেজের শিক্ষার্থীরা। ঢাকার শিক্ষার্থীদের অবরোধ ছত্রভঙ্গ করার একটি ভিডিও গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।

ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন পুলিশ একজন ছাত্রকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। পাশে থাকা দু’জন নারী ফটোসাংবাদিক পুলিশ সদস্যদেরকে বাধা দেন। এবং শেষপর্যন্ত ছাত্রকে তাদের (পুলিশের) হাতে আটক হতে দেননি। কাজটি তাঁরা (দুই নারী সাংবাদিক) বেশ সাহসিকতার সাথে করেছেনভিডিওটিতে এটা বেশ স্পষ্ট।

ওই দুই নারীসাংবাদিকের সহযোদ্ধা সাংবাদিক বাঁধন ধ্রুব ভিডিওটি ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, ‘প্রত্যেক সাংবাদিক সহকর্মীসহযোদ্ধাদের অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। এই কিশোররাই আগুনের স্ফুলিঙ্গ। ওদের গায়ে হাত তোলার অধিকার সরকার কিংবা প্রশাসনের নেই। এভাবেই তাদের পাশে থেকে ওদের ন্যায্য দাবির সাথে সংহতি জানান।’

তাসমিত আফিয়াত অর্ণি নামের আরেকজন লিখেছেন, ‘এই না হলে বাংলাদেশের সাংবাদিক। গো এহেড…!’ মাহরিয়া আজমিরি নামের অন্য একজন লিখেছেন, ‘হ্যাটস অফ দোজ জার্নালিস্ট!’ মাহমুদুল হাসান নামের আরেকজন লিখেছেন, ‘সাব্বাস সাংবাদিক বন্ধুরা। স্পেশাল ধন্যবাদ নারী সাংবাদিক দু’জনকে। আপনার সন্তানকে অহিংস আন্দোলনে উৎসাহিত করুন, পুলিশ অবৈধভাবে বন্দি করলে ছুটিয়ে নিতে সবাই এগিয়ে আসুন।’

মোটকথা, এভাবে ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার হচ্ছে দেদারছে। দেশবিদেশের লক্ষলক্ষ মানুষ সেটি দেখছেশেয়ার করছে। আর বাহবা দিচ্ছেওই সাংবাদিকদের। স্যালুট জানাচ্ছে তাঁদের। সত্যিই, সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ব পালনেও তাঁরা ভুলেননি। এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সাংবাদিকদের মানবিক আচরণ যে কতোটা জনঘনিষ্ঠ হওয়া উচিতএতে এটাই প্রমাণিত হয়েছে।

ভিডিওটি চোখে পড়তেই মনে পড়ে গেলো গত বছরের সিরিয়ার সেই আলোকচিত্র সাংবাদিক আলবাকার হাবাকএর কথা। আপনাদের কি মনে আছেতিনি গত বছরের এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে সিরিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে তাঁর ক্যামেরা ফেলে বোমা হামলায় আহত শিশুকে দু’হাতে জড়িয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

ঠিক একইভাবে এর পরের সপ্তাহে কাশ্মীরের সংঘর্ষে গুরুতর আহত এক নারী শিক্ষার্থীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন বার্তা সংস্থা এপির চিত্র সাংবাদিক দার ইয়াসিন। কাশ্মীরে জনতাপুলিশের সংঘর্ষের বিক্ষোভ চলার সময় নিজের দায়িত্ব পালন করছিলেন ইয়াসিন। ঠিক সে সময়ে তিনি দেখতে পান এক স্কুল শিক্ষার্থী পুলিশের আঘাতে গুরুতর জখম অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। এইরকম সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে নিজের কর্মদায়িত্ব ভুলে মানবতার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ছবি তোলা বাদ দিয়ে দুই হাতে ওই নারী শিক্ষার্থীকে তুলে নেন দার ইয়াসিন। পরে গাড়িতে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। খুশবু নামের আহত ওই শিক্ষার্থীকে বাঁচানোর পর তিনি বলেছিলেন, ‘মানবতাই আগে প্রাধান্য পাওয়া উচিত। আমি তার ভয়াবহ অবস্থা সহ্য করতে পারিনি।’ এ সময় তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘একজন পিতা হিসেবে কি করে আমি এই দৃশ্য দেখতে পারি? মেয়েটি আমার সন্তানও হতে পারতো!’

আরও একটি ঘটনার কথা শেয়ার করা যেতে পারে এই অবসরে। ঘটনাটি ২০১৬ সালের মে মাসে চীন দেশের এক টেলিভিশন সাংবাদিকের। তিনি হঠাৎ দেখতে পানগাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খালে পড়ে যায় একটি গাড়ি। ভিতর থেকে একজন নারী হাতে ফোন নিয়ে ফোন করার চেষ্টা করছেন ও একইসাথে বেরোনোর পথ খুঁজে চলেছেন। কিন্তু, গাড়ির লক খুলতে পারছেন না। কোনভাবেই গাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। তিনিই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তিনি ভিতর থেকে ছটফট করছিলেন। কিন্তু, কেউই তাঁর চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলেন না। গাড়িটিও ডুবার পথে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির কাচের ভিতরে চলছে জীবনমরণের লড়াই। মুহূর্তেই গিয়ে টেলিভিশন সাংবাদিক উদ্ধার করলেন তাঁকে। এই ভিডিওটা ইউটিউবে রয়েছে।

যাই হোক, বলছিলাম দুই নারী সাংবাদিকের কথা। বলতে গেলেএদেশের নারীরা সাংবাদিকতার শুরু থেকেই কাজ করছেন। কিন্তু নারী সাংবাদিকদের প্রতি এখনো সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তেমনভাবে হয়নি। এখনো নারী বলে রিপোর্টিংয়ে তাঁদের অংশগ্রহণ কম। আলোকচিত্রী হিসেবেও নেওয়া হয় না। অথচ গত বুধবার যেভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন দুই নারীসাংবাদিকতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এর আগেও আমরা দেখেছিনাদিয়া শারমিন নামের একুশের টিভি’র এক তৎকালীন সাংবাদিক কীভাবে সাহসিকতার সাথে হেফাজতে ইসলামের মিছিল কাভার করেছিলেন। তিনি পরবর্তিতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রবর্তিত আন্তর্জাতিক পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

লেখাটি শেষ করার আগেআবার ফিরে যাই কাশ্মীর সংঘর্ষে খুশবু নামের মেয়েটিকে বাঁচানো দার ইয়াসিনের কথায়। আমরা পত্রপত্রিকায় পরে পড়ে জেনেছিসাংবাদিকতা পেশায় দার ইয়াসিনের জীবনে এমন ঘটনা প্রথম নয়। এর আগে ২০০৫ সালে ভারতের লালচকে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার গ্রেনেডে আহত এক মা ও তাঁর মেয়েকে বাঁচিয়েছিলেন দার ইয়াসিন। একজন পিতা হিসেবে দার ইয়াসিন যখন বলেন, ‘…কি করে আমি এই দৃশ্য দেখতে পারি। মেয়েটি আমার সন্তানও হতে পারতো।’ তখনশহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে রাস্তায় পিষে ‘হত্যা’ করার প্রতিবাদে যারা রাস্তায় বেরিয়ে এসে সিস্টেমের সংস্কারে আওয়াজ তুলছে তাদের সঙ্গে শামিল হওয়া আমরা প্রত্যেক নাগরিকেরই তো উচিত। কে জানে, নইলে হয়তো আমার রক্তের কেউও হতে পারে এর পরবর্তী বলী। আমরা ভেবে দেখছি কি?

x