সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম ও দৈনন্দিন টুকিটাকি

সাখওয়াত হোসেন মজনু

সোমবার , ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫৪ পূর্বাহ্ণ
42

প্রস্তাব এসেছে বীর মুক্তিযোদ্ধা মৌলভী সৈয়দ আহমদ এর নামে শহর চট্টগ্রামে একটি রাস্তার নামকরণের জন্য। যাঁরা প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁরা একাত্তরের রণাঙ্গনের সৈনিক। প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। কারণ মৌলভী সৈয়দ কে-তাঁকে এ প্রজন্মতো চেনেন না, জানেন না। আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে তাঁকে স্মৃতি ও ত্যাগের পাতায় বাঁচিয়ে রাখা এবং তারপর আগামী প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করা।
: কে তিনি, কেন তাঁর নামে রাস্তার নামকরণ হতে হবে?
: অতি সংক্ষেপে যদি বলতে হয় তাহলে বলতে হবে, তিনি প্রথমে স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং পরে বীর মুক্তিযোদ্ধা। একেবারে তৃণমূলের যোদ্ধা এবং চট্টগ্রাম শহর রণাঙ্গনের গেরিলা কমান্ডার। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর তিনি প্রতিবাদী এবং সেনাবাহিনীর নির্যাতনে শহীদ হয়েছিলেন। এখানে তাঁর জীবনের দুটি অধ্যায়। একটি বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান, দ্বিতীয় অধ্যায়টি ছিলো বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ ও প্রতিরোধ। এখানে বলা প্রয়োজন যে, তিনি ওঠে এসেছেন ছাত্র রাজনীতির তৃণমূল থেকে। রাজপথের মিছিল, মিটিং, স্লোগান থেকে বাঙালির স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার জন্য একেবারে অস্ত্র হাতে গেরিলা যোদ্ধা। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে তিনি স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছিলেন শহর চট্টগ্রামের যৌথ কমান্ডের কমান্ডার হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি ভারতে গেছেন, নির্দেশনা এনেছিলেন এবং সহযোদ্ধাদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তৃণমূলের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাজ করতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন অবস্থানে ছিলেন এ নগরে। তবে বেশির ভাগ সময় তিনি ছিলেন উত্তর আগ্রাবাদ ও দক্ষিণ আগ্রাবাদের বিভিন্ন গোপন ও নিরাপদ আশ্রয়ে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, স্বাধীনতার পূর্বে উত্তর ও দক্ষিণ আগ্রাবাদ ভাগ ছিলো না। বলা হতো আগ্রাবাদ অঞ্চল। আরো বলা জরুরি যে, ব্রিটিশ যুগ থেকে পাকিস্তানি যুগেও উন্নয়নের ধারায় বৃহত্তর আগ্রাবাদ অঞ্চলটি নগরীর বিশেষ মর্যাদা পায়নি। এই অঞ্চলটি ছিলো চেয়ারম্যান শাসিত গ্রামীণ জনপদ। বেশির ভাগ রাস্তা ছিলো মাটির, ছিলো না ওয়াসার পানির লাইন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ছিলো সড়ক নির্ভর। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও পাড়ায় পাড়ায় হাতেগোনা কয়েকটি প্রভাবশালীর বাড়ি ছাড়া বিদ্যুতের ব্যবস্থা ছিলো না। আগ্রাবাদের এই অঞ্চলগুলো বা পাড়া মহল্লাগুলো যেহেতু পিছিয়ে ছিলো সেজন্য মহান একাত্তরে স্থানগুলো ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আশীর্বাদ এবং ঘাতক বাহিনীর জন্য ছিলো মরণ কেন্দ্র। গ্রামীণ এই জনপদটি ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গণহারে বিচরণ কেন্দ্র। যেমন ধরুন মুহুরীপাড়া, দাইয়াপাড়া, রঙ্গীপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, মৌলভীপাড়া, পানওয়ালাপাড়া, আশকারাবাদ, মনসুরাবাদ, বেপারীপাড়া, হাজীপাড়া, বড়পুল, ছোটপুল, আবিদরপাড়া, বলীরপাড়া, গোসাইলডাঙা, আনন্দিপুর, মোগলটুলী, পাঠানটুলী, দেওয়ানহাটসহ এ অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধা সহজে বিচরণ করতে পারতেন। সন্ধ্যার পর তো এলাকাগুলোতে গেরিলা যোদ্ধারা সহজে চিরণ সময় বাড়িয়ে দিতেন। একেবারে গ্রামীণ জনপদ, তার ওপর রাস্তাঘাট ছিলো দুর্বল মানের। ফলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গ্রামের গভীরে প্রবেশের চেষ্টা কম করতো। গবেষণায় দেখা গেছে শহর চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের অসংখ্য আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে ওঠেছিলো এসব এলাকায়। তাছাড়া গেরিলা নেতৃবৃন্দের অবস্থানও ছিলো এ অঞ্চলে বেশি। মৌলভী সৈয়দ এ অঞ্চলেই ছিলেন দীর্ঘ নয় মাসের বিভিন্ন সময়ে। স্বাধীনতার পরও তিনি ছিলেন উত্তর আগ্রাবাদের মুহুরীপাড়ায়। জীবন বিপ্লবী এই মানুষটি চেতনায় ছিলো সংগ্রামী এবং মৃত্যুতেও ছিলেন বিপ্লবী। মৃত্যু তাঁকে তাড়া করলেও তিনি তো মৃত্যুকে পরাজিত করছেন সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামের মাধ্যমে।
: এখন বলুন-এই বিপ্ল্লবী বীরের জন্য স্মরণীয় কোন কাজ করা যায় কিনা?
: মানুষতো বেঁচে থাকেন তাঁর কর্মের মধ্যে। মৌলভী সৈয়দ-এর মহান সতীর্থরা তাঁকে খুঁজছেন, জীবন কর্মে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন। কেন বলুনতো? কারণ সেই যে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো বাংলা ভাষার সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্নে। সে ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে মৌলভী সৈয়দ আহমেদ ছিলেন তাঁর সময়ে নিরলস পরিশ্রমী। রাজপথ থেকে রাজপথে বিরাম বিশ্রাম নেয়ার সময়তো তিনি পাননি। কারণ বিপ্ল্লবীরা কি বেঁচে থাকেন শুধু বিনোদনে? সে সময় তাদের কোথায়? এসেছিলো স্বাধীনতার পর কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরতো সে সময়টাও হাতছাড়া হয়ে গেলো। সেনা শাসকদের নির্মমতায় চলে গেলেন চির বিশ্রামে। তাইতো তাঁকে বলেছি চির বিপ্লবী। সতীর্থরা তাইতো তাঁকে স্মরণীয় ও বরণীয় করে রাখতে চাইছেন একটি স্থাপনার নামকরণের মাধ্যমে। এই দাবিটা কিন্তু খুব বড় কোন দাবি নয়। আরো ব্যাপক সম্মান প্রয়োজন এই মহান বীরের। একই সাথে প্রয়োজন একাত্তরকে জানা।
: কেমন করে জানবো একাত্তর ও সে সময়ের বীরদের?
: বীরের নামকরণ একটি প্রক্রিয়া হতে পারে। তবে প্রয়োজন প্রচুর গবেষণা। কোন প্রেক্ষিতে দেশে মুক্তিযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হলো, কেন বাঙালিরা জীবনবাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধা হলেন, কেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটলো? এগুলো চর্চা ও গবেষণার বিষয়। এই গবেষণা কর্মগুলোকে যদি ইতিহাসের আলোকে বের করে আনা যায় তাহলেই জানা যাবে প্রকৃত একাত্তরকে। তখনই বেরিয়ে আসবে স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বাধীনতা সংগ্রামী, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধারা। স্বাধীনতার পর প্রকৃত গবেষণা হয়নি এমন বলা যাবে না, তবে দলীয় প্রভাবকে বাঙালির ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার ফলে প্রকৃত গবেষণা কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধারা কথিত সার্টিফিকেটধারীদের ধাক্কায় পিছিয়ে পড়ে হয়েছেন নীরব। শহীদের আত্মা এখন আমাদের অভিসম্পাত দিচ্ছেন। এমন সমাজতো শহীদরা চাননি। মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির যৌথ নেতৃত্বের ফসল। এখানে আমি যদি বলি সবই আমি করেছি তাহলে মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এবং সার্বজনীনতা লোপ পায়। মুক্তিযুদ্ধে তৃণমূলে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, জেনেছি, কষ্ট পেয়েছি তথাকথিত সার্টিফিকেটধারী কিছু সংখ্যক যোদ্ধার আচরণে। তিনিই এককভাবে করেছেন বিভিন্ন অপারেশন। অন্যরা লুকিয়ে ছিলেন বা…এমন একক আধিপত্য মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষাকে ম্লান করেছে এবং জন্ম নিয়েছে অবিশ্বাসের। ফলে মানুষ চলে গেছে বিভ্রান্তির পথে। অসত্য তথ্য বা অন্যকে ছোট করার কথাগুলো যতোই চর্চা হবে ততোই একাত্তর যাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে। মনে রাখতে হবে যে, গবেষণা বড়ই নির্মম, ইতিহাস কাউকে ছেড়ে কথা বলে না, গবেষণায় সত্য বেরিয়ে আসবেই এবং ছিটকে যাবে কথিত সার্টিফিকেটধারীরা। সত্যের মানুষগুলো, একাত্তরের প্রকৃত মানুষগুলো বেরিয়ে আসবেই। যেমন করে স্বাধীনতার এতো বছর পরেও বেরিয়ে এসেছে বীর বিপ্ল্লবী মৌলভী সৈয়দ আহমদের মতো যোদ্ধারা। তাঁর আসতে শুরু করেছেন মুক্তির প্রকৃত বার্তা নিয়ে।
: শেষ নিবেদন…।
: একাত্তর নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, স্বাধীনতা নিয়ে নিজেকে একক আসনে বসানোর চেষ্টা থেকে দূরে থাকুন। কারণ এই বাঙালি জাতি পেয়েছে দেশটি দীর্ঘ সংগ্রামের পর। দেশটি এসেছে ৩০ লক্ষ মানুষের রক্ত ঋণে, এই দেশটি এসেছে মা-বোনদের ত্যাগের বিনিময়ে। তাই অন্য মুক্তিযোদ্ধাকে ছোট করার চেষ্টার আগে আয়নায় নিজের মুখটি দেখে নিন এবং বিবেককে প্রশ্ন করুন কে আমি…।
ইতিহাস বড়ই নির্মম। এটা কাউকে ক্ষমা করে না। তাইতো প্রয়োজন শহীদ স্মরণে এগুলো এবং জানা বাংলা নামের দেশটাকে। মৌলভী সৈয়দ-এর আত্মার শান্তি কামনা করে বলছি তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নামকরণের প্রস্তাবটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে জরুরিভাবেই ভাবা উচিত।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

x