সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম ও দৈনন্দিন টুকিটাকি

সাখাওয়াত হোসেন মজনু

সোমবার , ১৪ মে, ২০১৮ at ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ
58

(গত সোমবার এই কলামে মাননীয় মেয়র সমীপে আবেদন করেছিলাম শহর চট্টগ্রামকে বাংলাবান্ধব শহর করার জন্য। নগরীর প্রতিটি সাইন বোর্ডকে বাংলায় লেখার জন্য। এটা ছিলো হাইকোর্টের নির্দেশ। লেখা প্রকাশের পর এবং নগরীর কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি এ প্রসঙ্গে উদ্যোগী হলে মাননীয় মেয়র প্রতিটি ব্যবসা ও সংশ্লিষ্ট সাইনবোর্ডের মালিকদের নির্দেশ দিয়েছেন আগামী ৬ মাসের মধ্যে নগরীর প্রতিটি সাইনবোর্ড বাংলায় করার জন্য। এই নির্দেশ অমান্য করলে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সিটি করপোরেশন ব্যবস্থা নেবেন। এমন নির্দেশনার জন্য মাননীয় মেয়রকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।)
: নগরীর অনিয়ন্ত্রিত কুকুর ও শিশু মুকতাবির রাবিয়ান আবির।
: নয় বছরের শিশু আবির। পথ চলছিলো। হঠাৎ ২টি কুকুর শিশুটিকে কামড়াতে শুরু করলো। সকাল তখন ৯টা। শিশুটির অবস্থাতো বুঝতেই পারছেন। আহত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করা হলো। ইতিমধ্যে শিশুর পায়ের অবস্থা গুরুতর। প্রাথমিক চিকিৎসার পর পিতা-মাতার চিন্তা এলো উন্নত চিকিৎসার। নানাজনের পরামর্শ। জলাতঙ্ক রোধ করার জন্য প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা। পিতা আবদুর রহমান উচ্চশিক্ষিত মানুষ। তিনি জানতেন এই চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন হচ্ছে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ছেলের অবস্থা দেখে তিনি ছুটলেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে। এরি মধ্যে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করে তথ্য নিয়ে তিন ব্যর্থ হয়েছেন। অনেকেই জানেন না যে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে কুকুরে কামড়ালে রোগীর চিকিৎসা আছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিনা মূল্যে ইনজেকশনগুলো রোগীকে প্রদান করেন এবং তারাই ইনজেকশন পুশ করেন। সেদিন আবদুর রহমান জানালেন হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়োজিত ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীরা খুব ভালো আচরণ করেছেন। সর্বোচ্চ সেবা দিয়েছেন। একই সময় কুকুরে কামড়ানো অন্ততঃ ১৫ জন রোগী তখন চিকিৎসা নেওয়ার জন্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন। যে স্থান থেকে কুকুর শিশু আবিরকে কামড়েছিলো সেখানে কুকুর দুটি আরো দুজন মানুষকে কামড়েছে। স্থানটি ছিলো দেওয়ানবাজার সংলগ্ন ইউনুস রোড।
: কুকুরের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না কেন?
: আগে বিভিন্ন এলাকায় কুকুর নিধনে নামতেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। তারা বেওয়ারিশ কুকুর নিধন করতেন। পালিত কুকুরের গলায় লাগানো থাকতো বেল্ট। এ ধরনের কুকুর মারা হতো না। পথেঘাটে যেগুলো নগর জীবনের জন্য হুমকি ছিলো সেগুলো ওষুধ প্রয়োগে হত্যা করার নিয়ম ছিলো। এখন নাকি আইন করে কুকুর মারা বন্ধ করা হয়েছে। তাইতো সিটি করপোরেশন এখন পথের কুকুর পর্যন্ত মারতে পারছে না। ফলে প্রতিটি এলাকায় কুকুরের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কুকুর হত্যা না করে নিয়ন্ত্রণের বিকল্প ব্যবস্থা কি? প্রতিদিনই জেনারেল হাসপাতালে অন্ততঃ ১৫/২০ জন আহত রোগী আসছেন। সাধারণ মানুষ আগে জানতেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসে যোগাযোগ করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। এখন সঠিক তথ্যও পাওয়া যায় না (সবাই নয়)। ফলে ডাক্তার, ডিসপেনসারির সাথে যোগাযোগ করে স্থানের নির্দেশনা পায়। এতে করে অনেকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। কোন কোন হাতুড়ে ডাক্তার বা ডিসপেনসারি ভুল চিকিৎসা দিয়ে রোগীদের মৃত্যুর দুয়ারে ঠেলে দিচ্ছেন। এই রোগের যে চিকিৎসা নেই তাতো নয়। বরং বেশির ভাগ সাধারণ মানুষই জানেন না চিকিৎসা নেয়ার সঠিক স্থানটি কোথায়? নগরীতে ৪১টি ওয়ার্ড কাউন্সিলের দপ্তর রয়েছে। সেগুলোতে প্রয়োজনীয় তথ্য থাকা প্রয়োজন।
: চিকিৎসার এই স্থানটুকুর তথ্যের জন্য কি করা প্রয়োজন?
: আমাদের মানুষজন জলাতঙ্ক রোগ সম্বন্ধে সচেতন নয়। তবে সব কুকুরে কামড়ালে জলাতঙ্ক রোগ হয় না। তারপরও মানুষকে সচেতন করতে হবে। কুকুরে কামড়ালে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। হাতুড়ে ডাক্তারের পরামর্শ বা চিকিৎসায় বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ নেই। প্রতিটি ওয়ার্ড কাউন্সিলর, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্থানীয় স্কুল কলেজ, বিভিন্ন ক্লাবগুলোর কাছে তথ্য থাকা প্রয়োজন, যেন কুকুরে কামড়ানো মানুষ সঠিক তথ্য পেয়ে চিকিৎসার জন্য যেতে পারেন। ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা সংশ্লিষ্ট স্থানে সাইনবোর্ড টানিয়ে এমন রোগীদের নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। কথা হচ্ছে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সচেতন করলে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা সম্ভব। এই রোগের সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে। বন্ধের দিনও খোলা থাকে।
: যেহেতু কুকুর মারা যাচ্ছে না তাহলে কুকুর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব কিভাবে?
: প্রশ্নটা নাকি মানবিক। বেশি মানবিকতা দেখাতে গিয়ে পথেঘাটে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। যারা অসচেতন তারাতো মারা যাচ্ছেন জলাতঙ্ক রোগে। তাদের কথাতো সবাইকে ভাবতে হবে। বিশেষ করে প্রশাসনকে। যারা ভুক্তভোগী তাদেরকে যদি বলা হয় কুকুর মারা আইনগতভাবে বেআইনি। তারা কি শুনবে এমন আইনের কথা। হয়তো ঠিক কিন্তু যারা মরছেন বা অসুস্থ হচ্ছেন তারা কি শুনবে এমন বাস্তবতা। কুকুর পথ চলছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কেউতো নেই। শুনেছি কোরিয়ানরা কুকুরের মাংস খায়। অনেকে কৌতুক করে বলেন, কোন কুকুর কোরিয়ান মানুষের পাশ দিয়ে হাঁটে না। কারণ অনেক কোরিয়ান বিশেষ কায়দায় কুকুর ধরে নিয়ে ঝলসিয়ে মজা করে খায়। তাই নাকি ভাগড়া কুকুর তাদের দেখলে দেয় ছুট। এমনকি করা যায় না কুকুর না মেরে ধরে যারা খায় তাদের নিকট পাঠিয়ে দেয়া। যদি তাই হয় তাহলে তো কুকুরের খামার করে লাভজনক ব্যবসা হতে পারে। এখন যেভাবে কুকুর পথে ঘাটে মানুষকে আহত করছে এটাতো চলতে দেয়া ঠিক নয়। এতে তো নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পথ চলতে গিয়ে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ঘাতক যানবাহনের, ছিনতাইকারির। আর এখন নগরীতে কুকুরের যন্ত্রণায় মানুষ অস্থির। আইনের নির্দেশনা ঠিক রেখে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উচিত বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ ভেবে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

x