সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হবে

বুধবার , ১৫ মে, ২০১৯ at ৫:১৮ পূর্বাহ্ণ
32

দেশে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশবাসী উৎকণ্ঠিত। এক একটা ঘটনা অবিশ্বাস্য, লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক। ঘটনাগুলো সমাজের সার্বিক অবক্ষয়েরই উদাহরণ। এসব কেন ঘটছে, তা সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়। তবে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সমাজে মূল্যবোধও ফিরিয়ে আনতে হবে। গত ১৪ মে দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায় ‘কেন এই নৃশংসতা, একের পর এক খুন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘মনুষ্যত্ব লোপ পেয়েছে’ কিংবা ‘পশুর মতো কাজ করেছে’- কথাগুলো এক সময় ‘কথার কথা’ বলে মনে হলেও সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক খুন ও খুনের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, কথাগুলো যেন খাঁটি করুণ বাস্তবতা থেকে নেয়া। উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় কাটছে দিন। একের পর এক খুন হচ্ছে মানুষ। পারিবারিক কলহে স্বামীর হাতে স্ত্রী, স্ত্রীর হাতে খুন হচ্ছেন স্বামী। ব্যক্তি স্বার্থ ও দ্বন্দ্বে সহোদর আর নিকট আত্মীয়-বন্ধু-বান্ধবকেও খুন হতে হচ্ছে। রাজনৈতিক কারণ কিংবা সন্ত্রাসী ঘটনায় খুন তো আছেই। পত্রিকার পাতা খুললেই খুনের সংবাদ পাওয়া যায় না এমন কোনো দিন নেই! নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাবে পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার কারণে জীবনে বাড়ছে হতাশা, মানসিক বিষন্নতা, আর্থিক দীনতা। ফলে সমাজে বেড়েই চলছে অপরাধ। নৃশংস এসব হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে শিশুরাও।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা, পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হওয়া ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণেই ঘটছে এসব খুনের ঘটনা। সমাজে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। দিন দিন পাল্টাচ্ছে খুনের ধরন। মানুষ কেন জানি দিন দিন আরো বেশি পাশবিক হয়ে উঠছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এসবই ঘটছে ভিনদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন ও নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে। পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে যে গবেষণা রয়েছে, তাতে দেখা গেছে, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নষ্ট সংস্কৃতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার মানুষকে বিপথগামী করছে। বিশেষ করে ক্ষতিকর চ্যানেলগুলো দেখে মানুষ উচ্ছন্নে যাচ্ছে। খারাপ কাজে মানুষ উৎসাহ পাচ্ছে। এ থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে আমরা শেষ হয়ে যাবো। তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটে থাকলে, আইনের শাসন না থাকলে, প্রলম্বিত বিচার ব্যবস্থা থাকলে এরূপ ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
একসময় মূল্যবোধের চর্চা হতো। এখন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কোথাও মূল্যবোধের চর্চা নেই বললে চলে। মূল্যবোধ সৃষ্টি শক্তি প্রয়োগ করে সম্ভব নয়। সেটা চর্চার দরকার। আর সেটা সম্ভব হলেই এই নৃশংসতা কমবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অপরাধ বিজ্ঞানের এক অধ্যাপক বলেন, ‘আমরা এমন একটা সময় পার করছি যখন কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পভিত্তিক সমাজে যাচ্ছি। তাই নারী-পুরুষ, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে পরিবর্তন আসছে। পুরুষের আগে থেকেই সুযোগ ছিল। নারীরও এখন সুযোগ হয়েছে। প্রযুক্তি মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পর্কের ধারণা পরিবর্তন করছে। সম্পর্কের নানা দিক দেখিয়ে দিচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে আচরণে। পারিবারিক কলহ বাড়ছে। আর বাড়ছে পারিবারিক কলহ ও দ্বন্দ্বের কারণে হত্যা। বিশ্বায়নেরও প্রভাব আছে। আর সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব তো নতুন কিছু নয়। তবে এসব কারণে হত্যাকাণ্ড এখন বাড়ছে। বাড়ছে নৃশংসতা। আমরা পরিবর্তনের সাথে মূল্যবোধ ও মানবিকতাকে সমানভাবে ধরে রাখতে পারছি না।’ তিনি বলেন, ‘আর এর ফলে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে। নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন এখন। কিন্তু সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে, রাষ্ট্রকে সুশৃঙ্খল রাখতে হলে, বাসযোগ্য করতে হলে, আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে শক্ত করতে হবে। এর চর্চা করতে হবে। শুধু আইন দিয়ে সব কিছু হবে না।
এই সামাজিক অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি দিনে দিনে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে এখনই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজকে নিরাপদ করা যাবে না। সহিংসতা রোধে তাই সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। অপরাধীচক্রকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

x