সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ৪ জনের অপরাধ সরাসরি আমলে নিল আদালত

নুরুল আবছার চেয়ারম্যান হত্যা মামলা

সবুর শুভ

মঙ্গলবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৪:২২ পূর্বাহ্ণ
286

সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল আবছার হত্যা মামলায় এবার তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মোনাফসহ চারজনের বিরুদ্ধে সরাসরি অপরাধ আমলে নিলেন আদালত। একইসাথে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যার দেয়ারও আদেশ হয়েছে। দীর্ঘ সাত বছর আগে নিজ বাড়িতেই খুন হয়েছিলেন জনপ্রিয় এ চেয়ারম্যান। অন্য তিন আসামি হচ্ছেন, ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী ওসমান গণি চৌধুরী, আবু তাহের ও সরওয়ার সালাম। অপরাধ আমলে নেয়া থেকে বাদ যাওয়া দুইজন হচ্ছেন, শওকত আলী ও এনামুল হক এনাম।
সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক জয়ন্তী রাণী রায় উল্লেখিত আদেশ দেন। গতকাল সোমবার সেই আদেশ প্রচারিত হয় আদালত থেকে। আদেশে আওয়ামী লীগ নেতা মোনাফসহ ৭ আসামির বিরুদ্ধে ওয়ারেন্টও হয়েছে বলে আদালত থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে। এ আদেশে মামলার বাদী নিহতের বাবা আহমদ হোসেন সন্তোষ জানিয়েছেন এ প্রতিবেদকের কাছে। এর আগে সিআইডি ও সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দেয়া একই ধরনের তদন্ত প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মোনাফসহ ছয় আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করায় অধিকতর তদন্ত চেয়ে আদালতের কাছে নারাজি আবেদন করেছিলেন বাদী। সেই নারাজি আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার পর রিভিশন আবেদন করেছিলেন। রিভিশন আবেদনের শুনানি শেষে গত ৩ মে চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক রিভিশন মঞ্জুর করেন। নিয়ম অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটির নিয়মিত কার্যক্রম চলে আসছে। প্রসঙ্গত: ২০১১ সালের ২৫ ডিসেম্বর দিনগত রাত দেড়টার দিকে নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আবছারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পরদিন ২৭ ডিসেম্বর নুরুল আবছারের বাবা আহমদ হোসেন বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। শুরুতে এসআই মহিউদ্দিন ও পরে সহকারী পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম মামলাটির তদন্ত করেন। পরে সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হ্লা চিং প্রু তদন্তের দায়িত্ব পান। তিনি ২০১৩ সালের ১০ জুলাই এ মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন ১৩ জনকে অভিযুক্ত করে।
আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে ছয় আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ওই ছয়জন হলেন- সাতকানিয়া উপজেলার সেসময়ের চেয়ারম্যান আবদুল মোনাফ, ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী ওসমান গণি চৌধুরী, আবু তাহের, শওকত আলী, এনামুল হক এনাম ও সরওয়ার সালাম। এদিকে নুরুল আবছার হত্যার পর ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ডে আবদুল মোনাফ চেয়ারম্যান জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন বাদী আহমদ হোসেন। ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি এবং স্থানীয় জাফর আহম্মেদ কলেজের শিক্ষক নুরুল আবছার খুনের পর পুলিশ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল।
তাদের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনে অব্যাহতির সুপারিশ করা ওসমান গণি চৌধুরী, আবু তাহের, শওকত আলী, এনামুল হক এনামও ছিলেন। সিআইডির দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে আপত্তি জানিয়ে বাদী নারাজি আবেদন করলে ২০১৪ সালের ২৭ জানুয়ারি তা খারিজ করে দেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান নাসরিন। নারাজি নামঞ্জুর হওয়ার পর অধিকতর তদন্ত চেয়ে রিভিশন আবেদন করেছিলেন মামলার বাদী আহমদ হোসেন। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন, শাহ আলম, মাহমুদুল হক ওরফে কালা মাদু, দিল মোহাম্মদ, মোহাম্মদ ইলিয়াছ, মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, আবদুল জলিল, জাগির ওরফে জাকির হোসেন, লেদু ওরফে জয়নাল আবেদিন, নেজাম উদ্দিন এবং লতিফসহ ১৩ জন। মামলার বাদীপক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর থানা পুলিশ ও সিআইডির তদন্ত শেষে সিআইডির হাত ঘুরে ১৩ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে প্রথম অভিযোগপত্র আসে। এতে উপজেলা চেয়ারম্যান (সাবেক) মোনাফসহ উল্লেখিত ৬ জনকে বাদ দেয়ার সুপারিশ করা হয়। এ অভিযোগপত্রের উপর নারাজি আবেদন দাখিল করেন মামলার বাদী। শুনানি শেষে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নারাজি খারিজ করে দেন। এরপর বাদীপক্ষ উচ্চতর আদালতে এ আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন দায়ের করেন। এতে মামলাটি আবারো তদন্তের আদেশ হয় আদালতের তরফে। মামলাটি তদন্ত করে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনের মতো অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন আদালতে।
এ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আবারো নারাজি আবেদন জমা দেন মামলার বাদী। এ নারাজি আবেদনের উপর শুনানি শেষে সিনিয়র বিচারিক হাকিম মোনাফ চেয়ারম্যানসহ (সাবেক) ৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়ার আদেশ দেন। এ অবস্থায় নুরুল আবছার হত্যা মামলাটির বিচারিক কার্যক্রমে দেরীতে হলেও গতি এসেছে বলে জানিয়ে বাদীর আইনজীবী এডভোকেট শুভাশীষ শর্মা বলেন, বাদীর নারাজি আবেদনের উপর শুনানি শেষে আদালত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মোনাফসহ ৪ আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ সরাসরি আমলে নেয়ার আদেশ দিয়েছেন। একইসাথে তদন্ত কর্মকর্তাকে সশরীরে আদালতে এসে ব্যাখ্যা দিতে হবে আদালতের আদেশ অনুযায়ী। কেন উল্লেখিত আসামিদের (৪ জন) বাদ দেয়া হল। এ আদেশের মধ্য দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মূলহোতারা আইনের আওতায় আসবে।

x