সাধের আসন

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২১ জুলাই, ২০১৮ at ৭:০২ পূর্বাহ্ণ
24

সরাসরি কেউ বললেন, নারী মনোনয়ন দিয়ে হারবো নাকি? নারীরা ঠাণ্ডা মাথায় সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, নির্বাচনী পদ্ধতির পরিবর্তন চাই। সৎ, নীতিবান মানুষেরা মনোনয়ন পেলে নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের ইমেজের জোরেই নির্বাচিত হন। নারীদের ক্ষেত্রে তেমনটিই হবে। শেষ পর্যন্ত নারীআন্দোলন কর্মীদের কোনও দাবিই ধোপে টেকেনি। বরং হাওয়ায় হাওয়ায় তখন প্রচুর তামাশা ভেসে বেড়ায়। আসন সংখ্যা তো খুব বড় সমস্যা নয়, কিন্তু সংসদে অত চেয়ার কোথায়?

বিহারীলাল চক্রবর্তী ছিলেন বাংলা কবিতার ‘ভোরের পাখি’। একদা ঠাকুর বাড়ির কোনও এক নারীর হাতে বোনা একখানা আসন তাঁর প্রাণে গীতিকবিতার জোয়ার এনেছিল। তিনি রচনা করেছিলেন ‘সাধের আসন’ শিরোনামের কবিতা এবং সেই সূত্রে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘সাধের আসন’। আমাদের আজকের গল্পের সঙ্গে বিহারী লাল চক্রবর্তী বা তাঁর সাধের আসনের কোনও সম্পর্ক নেই। তবু এ গল্প (গল্প তো নয়ই) এদেশের নারীর সাধের আসনেরই গল্প। অবশ্য এ আসন কারও মস্তিষ্কপ্রসূত বা কোনও শিল্পীর হাতে বোনা আসন নয়। এ আসন কারও দান বা উপহারও নয়। এ আমাদের অধিকার।

৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের নারীর অংশগ্রহণের ঐতিহাসিক মূল্যের স্বীকৃতি হিসেবে সংবিধানে ১৫টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল তাদের জন্য। শুধু ভোটাধিকারে নারীর সে ত্যাগ, সাহস ও সংগ্রামশীলতার প্রমাণ হয় না বলেই হয়তো তা করা হয়েছিল। সেই ১৫টি আসন ৩ দশকেরও কিছু বেশি সময়ে দফায় দফায় বেড়ে শেষ পর্যন্ত ৫০ এ উন্নীত হয়। না, গোনাগুনতিতে আমরা গরুছাগলের মতো বাড়ি নি বটে তবে নারী সমাজের দাবির ধারেকাছেও তা পৌঁছায় নি। আসলে জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বকে অর্থবহ ও গণতান্ত্রিক করার জন্য আসন সংখ্যা বাড়ানোর দাবি তো ছিলই কিন্তু পাশাপাশি তার চেয়েও জোরালো দাবিটি ছিল (আছে এখনও) সরাসরি নির্বাচনের। কিন্তু আসন সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের তৎপরতা থাকলেও সরাসরি নির্বাচনের দাবিটি কেউই আমলে নেননি। এ জন্য কোনও আইন বা সাংবিধানিক সংশোধনীও আসে নি। সংরক্ষিত আসনে নারী প্রার্থীর সদস্য হবার একমাত্র যোগ্যতা ছিল দলগত মনোনয়ন। এ মনোনয়ন পদ্ধতির ব্যবস্থাটি বারবার নবায়ন করার কাজে আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত দলগুলো ইতোমধ্যে বেশ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

নারীর জন্য আসন সংরক্ষণের দাবির পাশাপাশি সরাসরি নির্বাচনের দাবিটা চলতি শতকের গোড়ার দিককার কথা। তার আগে ২০০০ সালে বেইজিং প্লাস ফাইভ রিভিউ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি (এনসিবিপি) দেশের অগ্রগণ্য দৈনিকের সম্পাদক এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক করেছিল। সে বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ছিল জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন। এ লক্ষ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টির গুরুত্ব নিয়েও কথা হয়। ততদিনে অবশ্য ইউপি নির্বাচনে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়ে গেছে। উপজেলায়ও একই ব্যবস্থা হয়েছে। অথচ সংসদের এ কাজটি করার উৎসাহ আওয়ামী লীগেরও ছিল না। তাঁরা তখন বলেছিলেন, যেহেতু বিএনপি সংসদে যাচ্ছে না তাই আগের বিধান আরও ১০১৫ বছরের জন্য নবায়নের বিল সংসদে আনা হবে। তখন প্রশ্ন উঠেছিল নবায়নের জন্যও তো বিএনপি’র দরকার। বিএনপি তখন জোর গলায় বলেছে তারা সংসদ বর্জন করেনি। সংসদে কথা বলতে দেওয়া হয় না বলে তারা সংসদে যাচ্ছে না। অবশ্যই বিশেষ কোনও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রয়োজন হলে বিএনপি বসে থাকবে না। হাতে সময় তখন খুব বেশি ছিল না। ২০০১ এ সংরক্ষিত ৩০টি আসনে পরোক্ষ নির্বাচনের মেয়াদ শেষ পর্যন্ত শেষ হয়ে গেল। অথচ নারীআন্দোলনের নেত্রীদের দাবিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল যে মাত্র দুটো মেয়াদের জন্য আসনগুলো সংরক্ষিত থাকুক এবং নির্বাচনটা সরাসরি হোক। এতে নারীরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা ঠিক করে ভবিষ্যতে সাধারণ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিতে পারবেন। আসলে সংরক্ষিত আসন তখন আর মূল বিষয় নয় তাঁদের। মূল দাবিটা ছিল সাধারণ আসনে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল থেকে ১০ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হোক। সেক্ষেত্রে নারীই হবেন নারীর প্রতিদ্বন্দ্বী। অর্থাৎ একদল অন্যদলের। রাজনৈতিক দলগুলো তখন নানা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অনেকেই চিন্তামগ্ন হয়েছেন এই ভেবে যে মহিলারা টাকা কোথায় পাবেন। রেখে ঢেকে বা ঘুরিয়ে বলা হলো যে সন্ত্রাসী ক্ষমতা তাদের কোথায়? সরাসরি কেউ বললেন, নারী মনোনয়ন দিয়ে হারবো নাকি? নারীরা ঠাণ্ডা মাথায় সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, নির্বাচনী পদ্ধতির পরিবর্তন চাই। সৎ, নীতিবান মানুষেরা মনোনয়ন পেলে নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের ইমেজের জোরেই নির্বাচিত হন। নারীদের ক্ষেত্রে তেমনটিই হবে। শেষ পর্যন্ত নারীআন্দোলন কর্মীদের কোনও দাবিই ধোপে টেকেনি। বরং হাওয়ায় হাওয়ায় তখন প্রচুর তামাশা ভেসে বেড়ায়। আসন সংখ্যা তো খুব বড় সমস্যা নয়, কিন্তু সংসদে অত চেয়ার কোথায়? (প্রিয় পাঠক, সাধের আসন কেন বলেছি, বুঝে নিন।)

২০০৪এ ৪র্থ সংশোধনী বিলের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদে মোট আসন হবে ৩৪৫টি; ৪৫টি সংরক্ষিত আসন। পরবর্তী ১০ বছরের জন্য এটি বহাল থাকবে। সঙ্গে যোগ হবে চলমান সংসদের বাকি মেয়াদ। (এর আগে তৎকালীন আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, ৮ম সংসদ নারী সমাজের দাবি মানলেও এটা কার্যকর হবে নবম সংসদে অথচ ৮ম সংসদের মেয়াদ শেষ হতে তখনও আরও ৩ বছর বাকি ছিল।) সুবাতাস যেটুকু বইলো তাতে জানা গেল সংসদে রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে ভোটের মাধ্যমে নারী প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ বিষয়টা সংসদের ভেতরেই থাকবে। বাইরে যাবে না। একদিক থেকে নারীর অধিকার হরণের জন্য খোদ সংবিধানে ধারা ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। তখন বিক্ষুব্ধ নারী নেত্রীদের মুখের উপর বলা হলো যে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সংরক্ষিত আসন তাঁরা তো আবার ফিরিয়ে দিলেন এবং সংখ্যাও বাড়ালেন; সেই কি যথেষ্ট নয়? সেদিনের বিরোধী দলীয় নেত্রী (আজকের সরকারপ্রধান) তাঁর চমৎকার জবাবে বলেছিলেন, চেয়েছিলাম ১০০ আসন, তিনি বা তাঁরা দিলেন মাত্র ৪৫টি। নারী তো ভিক্ষা চায় নি। ….কিন্তু শেষ যে কথাটি শোনার জন্য উৎকর্ণ হয়েছিল নারীসমাজ সে কথাটি তিনিও বললেন না। সরাসরি নির্বাচনের প্রসঙ্গ এলোই না।

এভাবেই দিন কাটছিল। আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০ করা হলো ২০১১য়। হঠাৎ চলতি বছরের গোড়ার দিকে (৩০ জানুয়ারি, ২০১৮) পত্রপত্রিকার পাতায় ঘটা করে প্রচারিত হলো যে নারী আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বহাল থাকছে। মেয়াদ শেষ হবার আগেই সরকার আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ সংবাদ প্রচারের ৫ দিনের মাথায় (৫ ফেব্রুয়ারি১৮) ৭০টি নারী আন্দোলন, উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংগঠনের জোট, ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি’ রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সুফিয়া কামাল ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানমের সঞ্চালনায় সেখানে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন আইন সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক রওশন জাহান পারভীন। বলা হয় গত ৩ দশক ধরে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন, আসন সংখ্যা মোট আসনের এক তৃতীয়াংশ করা এবং সংরক্ষিত নারী আসনগুলোর নির্বাচনী এলাকা সুনির্দিষ্ট করার যে দাবি তারা সকলে মিলে করে আসছিলেন তা একটি রাজনৈতিক প্রতারণার শিকার হলো।

বলা হলো ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশের নারী সংগঠনগুলোর কাছে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তো বটেই জাতিসংঘ সিডও সনদ ও এসডিজির সঙ্গেও তা সাংঘর্ষিক। অথচ ২০০৯ সালের ৮ মার্চে (আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে) প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা হবে এবং সরাসরি ভোটের মাধ্যমে তারা নির্বাচিত হবেন।’ সেদিনের নারী পাতায় (১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮) আমরা বলেছিলাম, বিদ্যুৎ বেগে এখন যখন দুনিয়া ঘুরছে তখন কলমের এক খোঁচায় আরও ২৫ বছর বা অনন্তকালের জন্য সংসদে ৫০ জন নারী বসবেন শুধু ‘হ্যাঁ’ বলার জন্য?

প্রিয় পাঠক, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই। গত ৪ জুলাই জাতীয় সংসদে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছরের জন্য বাড়ানো হলো। আসনসংখ্যা বাড়ানো হয়নি। নারী আসন ৫০টিই বহাল থাকছে। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটের পাশাপাশি বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সংবিধানের বিলটি পাস হয়। বিল পাসের পক্ষে ভোট দেন ২৯৮ জন সাংসদ; বিপক্ষে কেউ ভোট দেন নি।

অতঃপর সংরক্ষিত আসন নিশ্চয়ই আর আমাদের ‘সাধের আসন’ থাকছে না। দুই বিঘা জমির উপেনের কথা মনে পড়ছে। ‘মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহ গর্তে। তাই লিখে দিল বিশ্বনিখিল দু’বিঘার পরিবর্তে।’ আমরা কি অতঃপর নতুন করে নতুন উদ্যমে সে ‘বিশ্বনিখিল’ জয়ের সংগ্রামে নামবো না?

x