সাত দিনের সাতকাহন

আনোয়ার হোসেন পিন্টু

মঙ্গলবার , ৫ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ
22

আমার চরম বিমানভীতির কথা জেনে বন্ধু অনীল প্রায় বলতো ‘আচ্ছা তোর নির্মিত কোনো ছবি যদি বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতার সুযোগ লাভ ঘটে করবিটা কি? তোর কাছে বিমানে উঠা মানে তো একরকম নির্ঘাত মৃত্যু’। তার কথা শুনে প্রতি উত্তরে বলতাম, ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল। আর, তেমন সুযোগ যদি আসেও কোনোদিন, আমার হয়ে তুই না হয় যাবি?’
অনেক বাধা-বিপত্তির ভিতর দিয়ে তৈরি হলো অবশেষে আমার কুড়ি মিনিটের ছবি ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’, ২০১৭ সালের শেষ দিকে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রদর্শনীর সুবাদে কারো পেলাম প্রশংসা, আবার কারো পেলাম নিন্দা। কেউ কেউ আবার একথা বলেও ফেসবুক-এ লিখেছেন-“চলচ্চিত্র নিয়ে এত বছরের হাঁক-ডাক, লেখালেখি, আলোচনার বিপরীতে ষাট বছর বয়সী আনোয়ার হোসেন পিন্টু একি বানালেন?” সত্যি কথা বলতে প্রশংসা কিংবা নিন্দার প্লাবনে বুক যেমন আনন্দে ফুলে উঠেনি তেমনি আবার মুষড়েও পড়েনি। বিশ্বাস ছিলো শুধু এটুকু, দেশ-বিদেশের কোথাও অনুষ্ঠিত চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানো গেলে এ ছবি নমিনেশান পাবেই। শেষে, তাই হলো। বন্ধু সাজেদ সেলিমের ঐকান্তিক চেষ্টা এবং তার তরুণ ভাগ্নে মুম্বাইবাসী আদনান শাকিলের উৎসাহে ছবিটার অবশেষে ঠাঁই মিললো রাজস্থানের কোটা শহরে অনুষ্ঠিত চাম্বল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগ ২০১৯-এ।
উক্ত প্রতিযোগিতা প্রসঙ্গে বলার আগে বলতে চাই, বিমানভীতি ও জয়পুরস্থ শীত নিয়ে দু’চার কথা। জীবনে প্রথম বিমানে উঠা হয় ১৯৯১ সালের মে মাসের শেষ দিকের ভরা বর্ষার এক দিনে। স্ত্রীর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাচ্ছি ব্যাংকক। সাথে ছিলেন আমার এক সিনিয়র বন্ধু ও আত্মীয় শাহেনুর ভাই। ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে থাই এয়ারবাসে উঠে যখন বসলাম, সাথে সাথে বেড়ে গেল বুকের তোলপাড়। একই সাথে আমার স্ত্রীরও। ভীতির তোড়ে বলে বসলো সে আমায়- ‘চলো পিন্টু নেমে যাই, আমার খুব ভয় লাগছে।’ ভয়ে যে আমিও জড়োসড়ো কী করে বলি অসুস্থ স্ত্রীকে। বললে যে ভীতির মাত্রা বেড়ে হয়ে উঠবে আরো মড়োমড়ো। যাই হোক, শেষে দু’জনেরই বিমানে চড়া হলো বটে, কিন্তু ভূতের মুখে রাম নাম জপার মতো অবস্থায় থাই এয়ারবাস ল্যান্ড না হওয়া পর্যন্ত প্রায় দু’ঘণ্টা জুড়ে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ছিলাম প্রায় অর্ধমৃত।
এরপর আরো অনেকবার চট্টগ্রাম-ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম-কলকাতা উড়োজাহাজে যাওয়া-আসা হয়েছে বটে কিন্তু সেই ভীতি কিছুতেই কমেনি এখনো। বলা যায়, দিন দিন যেন বাড়ছে। গত ১০ জানুয়ারি উৎসবে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সেলিম ভাইসহ পাড়ি জমালাম রিজেন্ট এয়ারলাইন্সে কোলকাতা। রাত সাড়ে ন’টায় ভারতীয় বেসরকারি বিমান ইন্ডিগোতে প্রায় চার’শ যাত্রী সমেত দু’ঘন্টা বিশ মিনিটে রাত ১২ টায় জয়পুর বিমানবন্দরে নামলাম। সেদিনও ছিল ভয়ে থরোথরো মন ও চিত্ত। দু’চার বার বাম্পিংকের সময় মনে হলো, এই বুঝি দু’টুকরো হয়ে ভেঙে পড়লো বিমান।
যাত্রার দু’দিন আগে সেলিম ভাইয়ের মুখে শুনেছি, রাজস্থান এখন তুমুল শীতে বা ঠাণ্ডায় জুবুথুবু প্রায়। সুটকেস ভর্তি করে মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীরের নানা অংশের শীত নিবারণের এটা, সেটা নিয়ে যাত্রা করেছিলাম। জয়পুরে পা রাখতে না রাখতেই শীতের দেখা তো মিললই না, বরং ফল হলো উল্টো ঘেমে-টেমে একাকার প্রায়। প্রথমে খুললাম, গায়ের মোটা জ্যাকেট। তারপর খুললাম মাথার ক্যাপ ও নাক-কান জড়ানো মাফলার। উঠলাম, বিমানবন্দর থেকে অদূরে এক হোটেলে। রাত তখন একটা প্রায়। পেটে ক্ষুধার চেয়ে ধূমপানের নেশার ভারে আমার তখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। ছয় প্যাকেট লাইট বেনসন সিগারেট নিয়ে গিয়েছিলাম সাথে করে। শেষ সিগারেট ফুঁকি কোলকাতায়, সন্ধ্যা সাতটায়। ছয় থেকে সাত ঘণ্টা – একজন ধূমপায়ী মানুষের পক্ষে এতটা দীর্ঘ সময়ের বিরতি যে একটা অসহনীয় বিড়ম্বনা, সেটি বুঝতে পারা একমাত্র তাদের পক্ষেই সম্ভব, যারা প্রকৃত ধূম্রসেবী। তারপর, ইমিগ্রেশনের চেকপোস্টে রেখে দেয়া হলো প্যান্টের পকেটে রাখা লাইটার। ইচ্ছা হচ্ছিলো, একটা কষে চড় মারি তার গালে! মারা হয়নি ঠিক, কিন্তু মনে মনে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল ছুঁড়ে দিয়েছিলাম তার সাত গুষ্টির উদ্দেশে।
রাত একটায় দোকানপাট সব বন্ধ। দিয়াশলাই বা লাইটার পাই কোথায়? হোটেলে ঢুকে দেখি, চেয়ারে বসা অভ্যর্থনার লোকটি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাকে জাগিয়ে প্রথমেই চেয়ে বসলাম ভুল- ভাল হিন্দীতে বলা একট ম্যাচ বঙ। তার কাছেও পাওয়া গেল না ম্যাচ। এদিকে পেটে পড়েছে চাপ। সিগারেট না ফুঁকলে আমার আবার টয়লেটের দরজাও খুলে না সহজে। অবশেষে, মিনিট বিশেক পর হাতে পেলাম ম্যাচ বঙ। তারও আবার বড় গরিবি হাল। অর্থাৎ ম্যাচের কাঠি আছে মাত্র পাঁচটি। হাতে পেয়ে ছুটে গেলাম টয়লেটে। তারপরের বর্ণনা নিষপ্রয়োজন। কাজ শেষে বেরিয়ে আসার মুখে সেলিম ভাই হাসতে হাসতে জানতে চাইলেন-‘এখন কেমন বোধ করছেন পিন্টু ভাই?’ উত্তরে জানালাম, এ প্রশান্তির ফিরিস্তি হাস্যরসবিদ গোপাল ভাড়ের মহারাজা ছাড়া কোন জীবন-বিশারদও এ যাবৎ দিতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ!
পরদিন ঘুম ভাঙলো খুব সকালে। সেলিম ভাই ও তার ভাগ্নে আদনান তখন ঘুমে বিভোর। রুমের বারান্দায় এসে জানালা খুলে দেখলাম – ভোরের জয়পুর। প্রথমেই চোখে পড়ে সাইকেল চালিয়ে পিছনে পত্রিকার ঝাঁপি নিয়ে এগিয়ে চলছে এক হকার। ভাবলাম, ডেকে একটা পত্রিকা কিনি। পরক্ষণেই মনে এলো নিজের ভাষা ছাড়া আর কোনো ভাষাই তো লিখতে, পড়তে ও বলতে পারি না। কিনে হবেটা কি? হঠাৎ কানে ভেসে এলো একটা গরুর ডাক। চেয়ে দেখি রাস্তার ডান দিক থেকে একটা নাদুস নুদুস গাভী হেলেদুলে হকারের মতোই সামনে এগিয়ে চলেছে। মনে পড়ে গেল, আমার নিজের শহরের কথা। এনায়েত বাজারস্থ বাটালী রোডে আমার বাসা। ভোরের প্রাতঃভ্রমণে প্রতিদিনই চোখে পড়ে ঠিক এমন দৃশ্য! গোয়াল পাড়ার গাভী- গরুগুলো ঠিক এভাবেই হেলেদুলে মূল রাস্তা ধরে ঠিক এভাবেই ঘুরে বেড়ায়।
বিকেলে ভোরের ফুলের মতো সকালের নাস্তা সারলাম দুপুর বারোটায়। লাঞ্চ সেরে নিলেই ভালো হতো। আমার নব্বই কেজি ওজনের শরীর, তার উপর এত্ত বড় একটা ভুঁড়ি নিয়ে পথ চলা দায় হবে ভেবে সেটি না করে, হাল্কা নাস্তা সেরে রেস্টুরেন্টের অদূরে একটি শপিং মল-এ ঢুকে পড়লাম। উদ্দেশ্য রাজস্থানের ট্রেডিশনাল কাপড়-চোপড় কেনা। কিনেছিও প্রচুর এটা-সেটা। প্রায় সবকিছুতেই আয়না ও অ্যাপলিকের মনকাড়া ডিজাইন ও কাজের ছড়াছড়ি। থ্রি-পিস কিনতে গিয়ে চোখে পড়লো বেডশিটের দিকে, বেডশিট কিনতে চোখে পড়লো শো-পিসের দিকে। এ দোকান ছেড়ে অন্য দোকানে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা আমার। সেলিম ভাই আমার এমন পাগলামি দেখে বলেই বসলেন-‘আপনি কি কেনাকাটার ফ্যাস্টিব্যালে এলেন? না কি ফিল্ম ফেস্টিব্যালে এলেন?’ ফিরে পেলাম সংবিত। তা-ই তো, আমি তো ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিকে’র প্রতিনিধি।
সেদিন (১১ জানুয়ারি) বিকেল পাঁচটা নাগাদ যাত্রা করলাম কোটা শহরের উদ্দেশে আমরা। প্রায় চার ঘণ্টার পথ। দু’চোখ ভরে প্রকৃতি উপভোগের কাছে হার মানল টাকা। পাঁচ হাজার রুপির বিনিময়ে ভাড়া করা কারে করে ছুটছি কোটা শহরে। জয়পুর শহর ছাড়তে না ছাড়তেই চোখে ভেসে উঠলো অন্য দৃশ্য। দূরে দূরে চারপাশে পাহাড় আর পাহাড়, বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে শিরীষ গাছের সারি। খানিক পর চোখে পড়ল একের পর এক খেজুর গাছ। আকারে বেঁটে দেখে মনে পড়লো আমাদের টেকনাফ যাওয়ার পথে দেখা বেঁটে গাছগুলোর কথা। এর কিছু পর শুরু হলো বিস্তৃত প্রান্তরজোড়া সরিষা ফুলের হলুদ রঙের ক্ষেত। মনে উঠে এলো, আমার অত্যন্ত প্রিয় চিত্রশিল্পী ভ্যানগঘের ক্যানভাসের হলুদ পটভূমি। ইতিমধ্যে চায়ের নেশায় তিনজনের মন হয়ে উঠেছে মাতাল। পেলব পীচ ঢালা রাস্তার এক পাশে চোখে পড়ল আমাদের নিজের দেশের মতো গরিবি হালের এক চায়ের দোকান। নেমে গরুর খাঁটি দুধের ঘন সর মেশানো চা খেয়ে ও একটি সিগারেট ফুঁকে উঠে পড়লাম গাড়িতে আবার। ইতিমধ্যে সূর্যমামাও ডুবতে বসেছে পশ্চিম দিকে। মিনিট দুয়েকের মধ্যে রক্তাক্ত প্রান্তর মুুছে গিয়ে নেমে এলো রাত। গাড়িতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতে পারিনি। ঘুম ভাঙলো সামনের সিটে বসা ভাগ্নে আদনানের ডাকে -‘পিন্টু মামা, আর কত ঘুমাবেন, উঠুন। আমরা এসে পড়েছি।’ হাতের ঘড়িতে চোখ রেখে দেখি, রাত প্রায় ন’টা। ভাগ্নে আদনান সম্পর্কে এখানে দু’এক কথা না বললেই নয়। সেলিম ভাইয়ের বড় বোনের পুত্রসন্তান আদনান। বয়স আটাশের কাছাকাছি। রিয়েলিয়ান্স এফ.এম. স্টুডিওতে চাকরির সুবাদে থাকতে হয় মুম্বাই। ফটোগ্রাফি ও সম্পাদনা কাজে সে ইতিমধ্যে কৃতিত্বের স্বাক্ষরও রেখেছে। ভুটান শহরকে নিয়ে মোবাইল ক্যামেরায় তোলা তার চার মিনিটের তথ্যচিত্র ‘ভুটান শর্ট ভারশেন’ ছবিটি চাম্বল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ১৮ এবং ‘অ্যাবুস অফ প্লাস্টিক’ তিন মিনিটের ছবিটি চলতি বছরের (২০১৯) একই উৎসবে বিষয়বস্তুর শৈল্পিক উপস্থাপনার জন্য পুরস্কার লাভ করে।
আগে থেকেই বুককরা ছিলো হোটেল। নাম ‘বন্দনা প্যালেস।’ হোটেলের এক বয় আমাদের তিনটি সুটকেস লিফটযোগে নিয়ে গেলো তিনতলায়। রিসেপসনের ভদ্রলোক, আমাদের দু’জনের বাংলাদেশির পাসপোর্ট দেখে বলে উঠেন, ‘আপনাদের তো হোটেলে থাকা চলবে না।’ ভাগ্নে বললো, কেন? উত্তরে আমাদেরকে কিছু না বলে তিনতলার ইন্টারকমে ফোন করে বললেন: মালপত্তরগুলো নিচে নিয়ে আসতে। কথা শুনে বুকের ঘড়ি প্রায় থেমে গেলো অজানা আশঙ্কায়। কারণটা একটু পরেই জানলাম। কোটা প্রশাসনের নিষেধ আছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশসহ এই তিন দেশের নাগরিকের হোটেলে থাকার। আমাদের পীড়াপীড়িতে রিসেপসনিস্ট প্রথমে ফোন করলেন হোটেলের মালিককে। হোটেল মালিক তাকে জানালেন থানায় জানাতে। তৎক্ষণাৎ তিনি ফোন করলেন থানায়। তারপর বললেন, “আপনারা একটু বসুন। থানা থেকে ওসি সাহেব আসছেন, তিনি যদি অনুমতি দেন, থাকা যাবে। না হলে নয়।”
তিনজন সোফার গদিতে বসে থাকলাম প্রায় এক ঘণ্টা। শরীরজুড়ে ক্লান্তি। ইচ্ছে হচ্ছিল শুয়ে পড়ি। অতঃপর ওসি সাহেব এলেন দু’জন কনস্টেবল নিয়ে। অনেক কথাবার্তার পর জানালাম, কোটা শহরে আমাদের আসার উদ্দেশ্য। দেখালাম ইমেল-এ পাঠানো চাম্বল চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণলিপি, একটু আশ্বস্ত হলেন। পরে, ফোন করে সবিস্তারে তিনি জানালেন কমিশনার সাহেবকে। মিনিট দুয়েক নিরব থেকে তিনি বললেন- ‘ঠিক আছে, আপনারা রুমে যেতে পারেন আপাতত। ঘণ্টা খানেক পর কমিশনার সাহেব এসে আপনাদের লাগেজ চেক করবেন। তিনি যদি অনুমতি দেন তাহলে থাকতে পারবেন। না হলে নয়। আপাতত আপনারা কোন রেস্টুরেন্ট থেকে ডিনার সেরে আসুন।’
হতাশ মনে সিএনজি করে প্রায় এক মাইল দূরে খেতে এলাম এক রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার। পুরো রাজস্থানজুড়ে খাবারের এত বাহার আগে কোথাও দেখিনি। থাইল্যান্ড ছাড়া, যদিও অন্য কোনো দেশের খাবারের স্বাদ পাইনি, তারপরেও বলতে হয় খাবারও যে একরকম শিল্পের প্রতিভাসে প্রস্ফূটিত সেটি বুঝতে পেরেছি উক্ত দেশের, বিশেষ করে নিরামিষ রান্নার নানাবিধ ব্যঞ্জনায়। সে মন খারাপের মুহূর্তেও তন্দুরী রুটি ও আলুর দমের সাথে তিনজনেই খেলাম পাঁচটি করে রুটি। এদ্দিন জানতাম, ক্ষুধা পেলে খাওয়া হয় বেশি। কিন্তু যে ক’দিন জয়পুর ও কোটা শহরে ছিলাম পেট ভরা থাকা সত্ত্বেও খেয়েছি পাগলের মতো। সত্যি,আক্ষরিক অর্থেই পাগল হয়ে উঠেছিলাম আমরা তিনজন ক্ষণে ক্ষণে। কখনও খাবারের আনন্দে. কখনো কেনাকাটায়, কখনও গল্পগাছায়, কখনোবা আবার বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও আদি রসাত্মক কথায়।
খাওয়া-দাওয়া সেরে ফিরে এলাম হোটেলে। রাত তখন এগারোটা প্রায়। তখনও পদার্পণ ঘটেনি হোটেলে কমিশনার সাহেবের। একদিকে ভরপেট খাওয়া, তার উপর জার্নির ধকল ও কমিশনার সাহেবের মতামত বা সিদ্ধান্ত সব মিলে আমাদের মন ও শরীরের কি বিপর্যয় ঘটেছিল সে মুহূর্তে, লিখে বুঝানো এখনও আমার পক্ষে মুশকিল।
অপেক্ষার কাঁটা প্রায় নড়ে না বললেই চলে। চোখেপড়া মাত্রই সাজানো বিছানায় জুতাসহ ঢলে পড়লাম আমি। হায় অভাগা ফিল্ম মেকার! ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’ বানিয়ে নিজেই পড়েছি যেন এক ম্যাজিকের রোষানলে। কোন ফাঁকে ঘুমে জড়িয়ে এলো চোখ জানি না, সেলিম ভাইয়ের হাতের ছোঁয়ায় চোখ মেলে দেখি, লম্বা চওড়া এক প্রশাসন প্রতিনিধি তথা পুলিশ কমিশনার প্রবেশ করলেন আমাদের রুমে। রাঙা চোখে প্রথমে তাকালেন আমাদের মুখের দিকে। তারপর হাতের লাঠির ইশারায় খুলতে বললেন সবার লাগেজ। খোলার পর তছনছ করে ছাড়লেন- আমাদের কাপড়-চোপড় সবকিছু। কোলকাতার বন্ধু রাজীবের জন্য একটা বইয়ের প্যাকেট দিয়েছিলেন প্রয়াত অধ্যাপক রশিদ আল ফারুকী সাহেবের পুত্র ব্যাংকার খসরু ভাই। আমার সুটকেসের প্যাকেটটি দেখে তাঁর অভিব্যক্তি গেলো নিমিষেই পাল্টে। সে সাথে আমিও জড়োসড়ো প্রায়। ভদ্রতার খাতিরে বইয়ের প্যাকেট নিয়েছি ঠিক, কিন্তু আপত্তিজনক কোনো বিষয়ের বই প্যাকেটে যদি থেকে থাকে তাহলে কি হতে পারে ঐ আশঙ্কায় আমার পা কাঁপতে শুরু করে। ভয়ে ভয়ে ছিঁড়লাম সুন্দর প্যাকেটটি। প্রায় চারটি মোটা বই। জানতে চাইলেন বইগুলো কার, বা বিষয়বস্তু কি? উর্দুতে সেলিম ভাই বইগুলির নাম ও বিষয়ের কথা বলার পরেও মনে হলো, তিনি সন্দেহমুক্ত নন। তারপর প্রতিটি বই হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে আরও মিনিট পাঁচেক বসে কী যেন ভাবলেন। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সরি, টু ডিস্টার্ব ইউ। অল দা বেস্ট, গুড নাইট।’
কাপড়-চোপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে গা এলিয়ে দিলাম বিছানায় তিনজন। আকারে বিছানাটা ছোট হওয়ায় তার বাম পাশে রাখা একটা তোশকের উপর চাদর পেতে লুটিয়ে পড়লাম আমি। সেলিম ভাই আর ভাগ্নে আদনান কিছুতেই আমায় নিচে থাকতে দেবে না। এত বলি, “আমার অভ্যেস আছে ফ্লোরে বিছানা পেতে থাকতে। প্লিজ আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে, ঘুমাতে দিন। আর আপনারাও শুয়ে পড়ুন।” কে শোনে কার কথা? মাঝে মাঝে অতি আদর বা সম্মান যে জ্বালাতনের আগুন জ্বালিয়ে ছাড়ে ব্যাপারটা যেন তাই। শেষে বলতে বাধ্য হলাম, আমি চাই না, আমার নাক ডাকাডাকিতে আপনাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটুক। সে কথা শুনে নিমিষে, দু’জন চুপসে গেলেন ফেটে যাওয়া বেলুনের মতো।
যত গভীর রাতেই ঘুমাই না কেন, খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় আমার। শুধু আমার নয় আমাদের আট ভাই বোনের। রক্তের ধারাবাহিকতায় পাওয়া অভ্যাসটি কম বয়সে ভাল লাগলেও ষাট বছরে পড়ে শরীরে বয়ে চলে এখন অল্প-স্বল্প ঘুমের যাতনা। চোখের পাতায় যদি কারো রাত বাকি থেকে যায় – দিনের বেলায় শরীর চলতে চায় না। অনেক সময় বেড়ে যায় ব্লাডপ্রেসার, বুকের পালপিটিশান এবং খিটমিটে মেজাজ। তবু, আমরা ভাইবোনেরা নিরুপায়। ভোরের প্রথম আলো ফোটার সাথে সাথে আমরা পারি না বিছানায় শুয়ে থাকতে আর।
চোখ মেলতেই দেখি, বিছানায় মামা-ভাগ্নে দু’জন গভীর ঘুমে মগ্ন এবং আপাদমস্তক চাদরে ঢাকা। শীতের তোড়ে নয়, ঘুমের ঘোরে আমার নাক ডাকার দাপটে। বালিশের পাশে রাখা হাতঘড়িতে দেখি এখনো ছ’টা বাজাতে পনেরো মিনিট বাকি। অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে আমি ঘুমিয়েছি মাত্র তিন ঘণ্টার কিছু বেশি। এমনই দুর্ভাগ্য, আমাদের রুমে জানালা বলে কিছু ছিল না। খুব ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে মোবাইল ফোনের আলোতে পানি খেলাম দু’গ্লাস। কোলকাতা হলে আস্তে আস্তে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়তাম রাস্তায়। কারণ, কোলকাতা আমার কাছে অনেকটা নিজের শহরের মতো। বেশ কিছু পথ-ঘাট, অলি-গলি আমার বড় বেশি চেনা। এখানে সম্পূর্ণ বিপরীত। জীবনে প্রথম আসা রাজস্থানের জয়পুর বা কোটা শহরে। তার উপর সবাই উর্দু বা হিন্দিভাষী। বের হওয়া যাবে ঠিক, কিন্তু ফিরব কোন্‌্‌ পথে? তার উপর একমাত্র মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষাতেই কথা বলতে পারি না। শেষে মাথায় এলো এক বুদ্ধি। পুলিশের জন্য ছেঁড়া প্যাকেট থেকে ‘চাঁটগাইয়া বচন ও বুলি’ বইটা নিয়ে ঢুকে পড়লাম টয়লেটে। শুভ কাজ সেরে খুব নিরবে হাতমুখ ধুয়ে টয়লেটের টবে বসে লাইট জ্বালিয়ে পড়তে শুরু করলাম রাজীবকে পাঠানো খসরু ভাইয়ের উক্ত বইটি। সত্যি কথা বলতে, খুব মজা পাচ্ছিলাম বইটি পড়তে। প্রায় পঁচিশ পৃষ্ঠা পড়ার পর শুনলাম, দরজায় টোকা পড়ার শব্দ। বোঝা গেল প্রকৃতির ডাক পড়েছে সেলিম ভাই বা ভাগ্নে আদনানের। দরজা খুলে দেখি, সেলিম ভাই রাগত মুখে দাঁড়িয়ে। বুঝতে পারলাম, আমার দুঃসহ নাকের বাঁশি তাদের ঘুমে বেশ ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। (চলবে)

pintu.anwarhossain@gmail.com

- Advertistment -