সাত দিনের সাতকাহন

আনোয়ার হোসেন পিন্টু

মঙ্গলবার , ১২ মার্চ, ২০১৯ at ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ
11

(দ্বিতীয় এবং শেষ পর্ব)
এবার ঢোকা যাক সাতকাহনের আসল কথায়। গোসল ও সকালের নাস্তা সেরে তিনজন এসে পৌঁছলাম হোটেলের অদূরে চাম্বল ফিল্ম ফেস্টিব্যালের মূল মিলনায়তনে। ঢোকার মুখে অষ্টাদশী দুই রূপসী নারী কপালে লাগিয়ে দিলেন চন্দনের তিলক ও হাতে ধরিয়ে দিলেন একগুচ্ছ গোলাপ। বহু বছর পর নাকে পেলাম গোলাপ ফুলের প্রকৃত সুগন্ধ। মনে হলো হাইব্রিডের প্রচলন বা ব্যবহার কোটা শহরকে বুঝি এখনও স্পর্শ করতে পারেনি। তাই এত সুগন্ধ।
শুরু হল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। নাচ, গান ও নানাজনের বক্তৃতাপর্বের পর শুনতে পেলাম প্রতিযোগিতায় নমিশনপ্রাপ্ত ছবি প্রদর্শনীর ঘোষণা। পর্দায় ফুটে উঠল প্রথমেই এ অধমের নির্মিত ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’। খুশিতে সুকুমার রায়ের কবিতার মত আনন্দে ‘আটখানা’ হলাম বটে, কিন্তু নিম্নমানের প্রজেকশনের কারণে মনটা হয়ে উঠলো খারাপে আধখানা। পুরো ছবিজুড়ে মেজেন্টা রঙের প্রাদুর্ভাব দেখে হারিয়ে ফেললাম পুরস্কার প্রাপ্তির আশাবাদ। একবার ভাবলাম মিলনায়তন ছেড়ে ফিরে যাই হোটেলে। মনের ভেতর লুকানো আরেক মন বলল আবার – যেও না পিন্টু, সবুরে মেওয়া ফলে। সবুরে সবুরে কেটে গেলো পুরো একটা দিন। সেই একদিনের দেখাতেই মনে হলো, এ পর্যন্ত যতগুলো ছবি দেখেছি, বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের দিক থেকে আমার ছবি এখনো আছে এগিয়ে। এটা আমার অহঙ্কার নয়, সত্য কথন। কারণ, সত্যিকারের সিনেমা বলতে যা বুঝায় তার কোন ছিটেফোঁটা চিহ্ন বা হদিস সেদিনের দেখা ছবিগুলোতে ছিল না, প্রত্যেক ছবির গায়ে লেপা ছিল বিষয়বস্তুর দৈন্য ও মেলোড্রামার ছায়া।
মিলনায়তন থেকে ফিরে এলাম আমরা। সময় তখন সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। মনে এলো হঠাৎ সেলিম ভাই ও ভাগ্নে আদনানের কথা। আমার নাক ডাকার যন্ত্রণায় দুই রাত তাদের ঘুম হয়নি ভালো। তারা কিছু না বললেও দুই মুখে ছায়া ফেলেছে স্বল্প ঘুমের ক্লান্তি। নেয়া হলো আরেকটি সিঙ্গেল রুম। সিঙ্গেল রুম বটে কিন্তু খাটটা বিশাল। এ রুমের ভাড়া কেন যে এক হাজার রুপি কম বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বুঝলাম পরদিন, সকালে প্রকৃতির ডাক সারতে গিয়ে। কাজ সেরে হ্যান্ডওয়াশে চাপ দিতে দেখি, পানির দেখা নেই। ভাগ্যিস রুমে ঢুকে কেন জানি খালি বালতিটা পানি ভর্তি করে রেখেছিলাম। সেই বিপর্যয়ের মুহূর্তে সেই পানিই উদ্ধার করলো আমায়। মগ কেটে কাজ সেরে দরজা লক করে হোটেল থেকে বেরিয়ে এলাম বাইরে। সবে তখন ভোর সাড়ে ছয়টা প্রায়। জনশূন্য রিসেপশান, দু’জন বেয়ারা লেপমুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে ঘোর কেটে। নাইট গার্ড টুলে বসে আছে আধো ঘুম আধো জাগরণে। ভুলভাল হিন্দিতে তাকে বললাম, গেট খুলে দিতে। ভেবেছিলাম, শীতের চাবুকে কাবু হয়ে পড়বো। বাইরে এসে দেখি, ঠাণ্ডার মাত্রা বাংলাদেশের মত। অথচ যাত্রার দু’দিন আগে জহুর হকার্স মার্কেটে গিয়ে হাত পায়ের উলের মোজা, মাংকি টুপি, মাফলার, ফুল হাতা টি-শার্ট কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম ঠাণ্ডার ভয়ে। দু’বছর আগে কেনা চামড়ার জ্যাকেটটি পরা হয়নি একদিনও। গায়ে পরেছি কোটা শহরে সেদিন (১৩ জানুয়ারি) ভোরে প্রথম। কিন্তু হিতে হল বিপরীত। হোটেলের বাইরে পা রাখতেই বুঝতে দেরি হয়নি নিষ্প্রয়োজন জ্যাকেটের। অগত্যা গা থেকে সেটি খুলে তুলে দিলাম নাইট গার্ডের হাতে। আবারও ভুলভাল হিন্দিতে বললাম, ‘জ্যাকেটটা আপনার কাছে থাক, ফিরে এসে নেবো।’ গার্ড সাহেব কি বুঝলেন জানি না, ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে নিরুত্তরে। মনে মনে হয়ত ভেবেছেন, ‘লোকটা পাগল নাকি’?
পাগল না ছাগল জানি না, তবে ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’ আমাকে পাগল করে ছেড়েছিল এ কথা সত্যি। নির্ঘুম সারারাত জেগে চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে কোটা শহরে শেষ দিন মিলনায়তনে ফলাফল ঘোষণার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমি হয়ে উঠেছিলাম যেন এক পাগলা বাবা। আমার ধূমপানের ব্রান্ড সাদা বেনসন। কতবার যে ভুল করে সাদা ফিল্টারে আগুন ধরিয়ে বারো টাকার সিগারেট নষ্ট করেছি মনে এলে এখনও হাসি পায়।
হোটেলের ঠিক সামনেই রাস্তার মাঝখানে বিকট এক অপরূপ ভাস্কর্যের পাশেই সেদিনের ভোরে প্রথম চোখ পড়তেই দেখি, ছেঁড়া বিবর্ণ চট মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে আমার ছবির আলীর মতো সর্বহারা শ্রেণীর এক পাগল সাদৃশ্য মানুষ। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে এগিয়ে গেলাম তার দিকে। একে তো শীতের ভোর, তার উপর রবিবার। সরকারী ছুটির দিন। পুরো শহরজুড়ে সুনশান নীরবতা। হঠাৎ আমার কাশির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় লোকটির। শোয়া থেকে উঠে বসে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকলো আমার দিকে। ভয় পেলাম, হঠাৎ যদি তেড়ে আসে আমার দিকে? সরে যাওয়ার মুহূর্তে শুনতে পেলাম, ভারি সুন্দর ইংরেজি উচ্চারণে-‘প্লিজ গিভ মি এ সিগারেট?’ একটার বদলে দুটি সিগারেট তার হাতে তুলে দিয়ে সটকে পড়লাম দ্রুত। শুনতে পেলাম-‘থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ’।
হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর এগিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। মনে এলো হঠাৎ, আলীর পায়ে-চলা পথে কোন একটি দৃশ্যে যদি পথে পড়ে থাকা অর্ধাংশ সিগারেট কুড়িয়ে তাকে দিয়ে ফুঁকাতাম, আলী হতো আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ ভাবনার মাঝে দেখতে পেলাম আবার দুটি নেড়ী কুকুরের ঝগড়া। তৎক্ষণাৎ খুশিতে নেচে উঠল আমার মন। মনে পড়ে গেলো, ছবির প্রথম দৃশ্যের কাক ভোরে রাস্তার আইল্যান্ডে ঘুমিয়ে থাকা আলীর দু’পাশেও ঘুমিয়ে ছিল দুটি নেড়ী কুকুর। ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’ তাহলে সব দেশেই বুঝি এক ও অভিন্ন।
ইতিমধ্যে বেজে উঠলো মোবাইল ফোনের রিং। শার্টের পকেট থেকে বের করে দেখি- সেলিম ভাইয়ের কল। একটু অবাক হলাম এই ভেবে, এতো ভোরে তো সেলিম ভাইয়ের ঘুম ভাঙার কথা নয়। বললাম, ‘আপনি কি উঠে পড়েছেন? আজ রাতে তো আর আমার নাকের বাঁশি আপনাদের জ্বালাতন করেনি। এত ভোরে উঠলেন কি করে?’
মোবাইলে এলার্ম দিয়ে রেখেছিলাম।
কেন?
মনে নেই, আজকের অনুষ্ঠান তো সকাল আটটা থেকে শুরু।
সরি সরি, ভুলে গিয়েছিলাম।
আপনি কোথায়? কুকুরের ডাক শুনছি?
একটু ঘুরতে বেরিয়েছি ভোরে।
ইস্‌, আপনি না পিন্টু ভাই….! তাড়াতাড়ি চলে আসুন। আবার কোন্‌ বিপদ ডেকে নিয়ে আসেন কে জানে?
ফিরে এলাম হোটেলে। গোসল, নাস্তা সারতে সারতেই ন’টা বেজে গেল। ইতিমধ্যে প্রদর্শিত হয়ে গেছে পাঁচটি ছবি। সেলিম ভাই সিটে বসে পাশের এক দর্শকের কাছে জানতে চাইলেন উক্ত পাঁচটি ছবির খবর। প্রতি উত্তরে ভদ্রলোক জানালেন, মন্দের ভালো। শুনে একটু স্বস্তি পেলাম মনে। এরপর দু’টোর দিকে লাঞ্চের জন্যে আধঘন্টা বিরতি দিয়ে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত চললো প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর ইতি পড়লো সুইজারল্যান্ডের ছবি ‘The Radicalization of Jeff Boyd’ এর মধ্য দিয়ে। প্রেমের ছবি, বিষয়বস্তু তেমন একটা জোরালো না হলেও কারিগরী মান ছিল অনেক উন্নত। প্রদর্শনীর পরে ছবির পরিচালকের মুখে জানলাম, ছবিটি তিনি নির্মাণ করেছেন আড়াই বছর ধরে। সত্যি কথা বলতে, ছবিটি দেখে বুঝে নিয়েছিলাম ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’ নিয়ে কিছু আশা করা দুরাশা। প্রদর্শনীর পর শুরু হলো আবার জনে জনে বক্তৃতার মালাগাঁথা। বক্তৃতার পর শুরু হলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরস্কারপ্রাপ্তির নাম ঘোষণা। ঘোষণার শেষ পর্যায়ে আসন ছেড়ে হতাশ মনে উঠে যাওয়ার মুহূর্তে কানে এসে বাজে শেষ ঘোষণা : শ্রেষ্ঠ অভিনেতারূপে জয়লাভ করেছেন ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’ ছবির অলক ঘোষ। ভুল শুনলাম কি?
না, ঠিকই শুনেছি। দ্বিতীয়বার কানে এলো আবারও ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’ ছবির উচ্চারণ। অলকদার হয়ে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে মঞ্চে উঠলাম। অনেক অনেক ক্যামেরার ফ্ল্যাশ উঠলো জ্বলে। জুরি মেম্বার, পুরস্কৃত শিল্পী ও চাম্বল ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিব্যালের সদস্যবৃন্দের গ্রুপ ছবি তোলা হল। ট্রফি, সার্টিফিকেট হাতে দ্রুত নেমে এলাম মঞ্চ ছেড়ে। শুরুতেই ফোন করলাম অলকদাকে চট্টগ্রামে। অলকদা খবর শুনে প্রায় আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা। জানতে চাইলেন, ‘তুমি কি পেলে?’ বললাম, এ পাওয়া কি আমারও পাওয়া নয়? আপনি তো আমার তৈরি আলী। গল্পকার স্বর্ণময় চক্রবর্তীর ১৪ লাইন চিত্রায়নের সময় সীমা ছিল দু’মিনিট। বাকি আঠার মিনিট সময় তো পুরোটাই আমার। তাছাড়া ক্যামেরাম্যান, সহকারী পরিচালক, সম্পাদক, আবহ সঙ্গীতকার সবাই ভাগীদার এ পুরস্কারের। একটি ইউনিটের সকলেই সমান। ইকুয়ালিটি না থাকলে অভিনেতার অভিনয়ে হারমনি তৈরি হয় না। সুতরাং এ পুরস্কারের ভাগীদার কম-বেশি সবাই।
মনে পড়ছে, অলকদাকে আলী চরিত্র নির্বাচনের সময় অনেক পরিচিত নাট্যজন অসন্তুষ্ট ছিলেন। নাটকের সাথে জড়িত এক বন্ধু বলেছিলেন, অলক ঘোষের পরিবর্তে অমুককে (নাম উল্লেখ থেকে বিরত থাকলাম) নিলে তুমি ভালো করবে। প্রতি উত্তরে বলেছিলাম, হয়তো ভালো করবো, কিন্তু আমার দরকার গ্ল্যামারশূন্য ও দাড়ি সমেত মুখ। সেটি খুঁজে পেয়েছি আমি একমাত্র অলকদার কাছে। তাছাড়া, চলচ্চিত্রের অভিনয় মোটেও নাটকের অভিনয় নয়। সময় বিশেষে অনেক সময় ক্যামেরা, পরিবেশ, প্রতীকও হয়ে উঠে অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রতিরূপ।
পরদিন, ১৪ জানুয়ারি দুপুর দু’টায় কোটা থেকে কারযোগে রওনা হলাম আমরা জয়পুরে। জয়পুর পৌঁছলাম সন্ধ্যা ছ’টায়। হাতে সময় আছে মাত্র এক ঘন্টা। সাতটায় ফ্লাইটের রিপোর্টিং সময়। জার্নির ধকল, উদ্বেগ আর ক্ষুধা মিলে তিনজনের অবস্থা তখন বড়ই কাহিল। তারপরও সেলিম ভাই ও ভাগ্নে আদনান ঢুকলো এক দুবাই শপিং মল-এ। আলো ঝলমল ও চোখ ধাঁধানো রূপে নিমিষেই হারিয়ে গেলো আমাদের ক্লান্তি ও ভোগান্তি। পাঁচ মিনিটের জন্য এক দোকানে ঢুকে ঝটপট কিনে নিলাম দুটি ভারি সুন্দর ডবল খাটের বিশাল আকারের চাদর। পনের’শ রুপির চাদর দুটি এখানে কিনতে গেলে দাম পড়বে ছয় হাজার টাকার বেশি। ইচ্ছে হচ্ছিল আরও দুটি কিনতে। কিন্তু বাধ সাধলেন সেলিম ভাই। বললেন : ‘আপনার বইয়ের লিস্টে দেখেছি নব্বইটি বইয়ের নাম। সব মিলে কত ওজন হতে পারে একবার ভাবুন তো?’
মন বললো, তাই তো। পরক্ষণেই ছুটলাম মার্কেটের এক রেস্টুরেন্টে। তিনজন ভরপেট তিনটি দোসা খেয়ে ছুটলাম জয়পুর এয়ারপোর্টে। রাত ন’টার ফ্লাইটে জয়পুর থেকে কোলকাতা এসে পৌঁছলাম রাত সাড়ে এগারোটায়। টেক্সিতে উঠার পরপরই কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি কিছুই জানি না। সেলিম ভাইয়ের হাতের জোরালো স্পর্শে ঘুম ভাঙতেই শুনি : ‘পিন্টু ভাই আমরা এসে গেছি উঠুন।’
উঠবো তো বটে, কিন্তু নব্বই কেজি ওজনের ভারি শরীরটাকে তোলা কি এত সহজ? বসা যত সহজ, উঠা তার চেয়ে বড় কঠিন। তার উপর দুই হাঁটুর মধ্যস্থলে ব্যথার অনুভূতি। উঠতে বসতে ডাকতে হয় ‘ও মা’ বলে মা জননীকে। গত দু’বছরে দিনে দিনে এত বেশি মোটা হয়ে পড়েছি রেডিমেড শার্ট, প্যান্ট কিনতে গেলে কিছুতেই মেলে না সাইজ। যাই হোক, হেলেদুলে গাড়ি থেকে নেমে ঢুকলাম, হোটেল রুমে। প্যান্ট পাল্টে লুঙ্গি পরতে যাবো, সাথে সাথে ভাগ্নে আদনান বলে উঠে, ‘লুঙ্গি পরছেন কেন? খেতে যাবেন না মামা?’ কথা শুনে আমি অবাক! সন্ধ্যা ছ’টায় এত বড় দোসা খেয়ে এখন বলে কিনা আবার খাবারের কথা? অনিচ্ছা বা ক্ষুধা নেই বলেও ফল হলো না। প্রায় জোর করে নিয়ে গেলো নিউমার্কেটের কাছে মার্কুস্টেট থেকে ‘বাইপাস ধাবা’ নামের এক রেস্টুরেন্টে। ‘রাতের কোলকাতা’ নামে একটি নিবন্ধ পড়েছিলাম ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রায় বিশ বছর আগে। রেস্টুরেন্টে ঢুকে দেখি এলাহীকাণ্ড। বসার জায়গা নেই। সবকিছু মিলে যাচ্ছে উক্ত লেখাটার সাথে। বাইরে সারি সারি প্রাইভেট কার, অল্প বয়সী তরুণ তরুণী, প্রৌঢ় ও বৃদ্ধ বয়সের মানুষ অকাতরে খেয়ে চলেছে কোর্মা পোলাও, বিরিয়ানি এবং নানা সব দামী খাবার। হাতের ঘড়িতে চোখ পড়তে দেখি রাত প্রায় দু’টা।
এর মধ্যে হোটেলে ফেরার পথে আদনান নেমে গেলো লাগেজ নিয়ে তার নিজের বাসায়। ঘুমে তখন আমার চোখ ঢুলু ঢুলু প্রায়। কখন ঘুমিয়ে পড়লাম গাড়িতে জানি না। হোটেলের সামনে এসে গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে ভারসাম্যহীন নব্বই কেজি ওজনের শরীর নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম ফুটপাতের গায়ে। বাম হাঁটুতে আঘাত পেলাম খুব বেশি। ভাগ্যিস! ধকলটা যদি যেতো মুখের উপর, তাহলে পুরু লেন্সের চশমা ভেঙে ঢুকে পড়তো চোখের ভেতর। কি যে হতো তখন! প্রিয় পাঠক, ভেবে দেখুন তো একবার? এর একদিন আগেও ঘটেছে এমন একটি ঘটনা কোটা শহরে অনুষ্ঠানের ডিনার পার্টিতে। যাওয়ার আগে ভেবেছিলাম পার্টি হবে কোন থ্রি-স্টার বা ফাইভ-স্টার হোটেলে। গিয়ে দেখি, শহর থেকে খানিকটা দূরে শহরতলি সাদৃশ্য একটি খোলা মাঠের চারপাশে পর্দার ঘেরাও ও উপরে চাঁদোয়া চাম্বল ফিল্ম ফেস্টিবেলের অধিকর্তারা ডিনার পার্টির আয়োজন করেছেন। ডিনার সেরে চোখে পড়লো প্যান্ডেলের খানিকটা দূরে দু’চারজন গরীবগোছের মানুষ ঝরাপাতায় আগুন জ্বালিয়ে উত্তাপ নিচ্ছে। সে রাতে ঠাণ্ডার মাত্রাটাও ছিল বেশি। এগিয়ে গেলাম সেদিকে আমরা তিনজন। দুু্থটো খালি প্লাস্টিকের চেয়ার দেখে বসে পড়লাম আমি এবং সেলিম ভাই। এখানে বলে রাখা ভালো, আমার আছে একটা বদভ্যাস। ঘরে কিংবা বাইরে যে কোন অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা মাত্রই সামনে-পিছনে দুলতে থাকি। মনে থাকে না চেয়ারটা নড়বড়ে না শক্ত। বসামাত্র একটা সিগারেট ধরিয়ে ফুঁকতে শুরু করি। সেই সাথে অলক্ষ্যে শুরু করে দিয়েছি বদভ্যাসের বিপজ্জজনক খেলা। চেয়ারটা যে নড়বড়ে সেটা বোঝার আগেই চিৎপটাং হয়ে সজোরে ছিটকে পড়লাম পিছনের দিকে। সে যাত্রায়ও বেঁচে গিয়েছিলাম মাথায় কোন আঘাত না পেয়ে।
১৫ ও ১৬ জানুয়ারি দু’দিন অবস্থান করলাম কোলকাতা। বেড়াতে নয়, একমাত্র বই কেনার জন্যই দু’দিন থাকা। পাক্ষিক ‘দেশ’ এবং ত্রৈমাসিক‘বইয়ের দেশ’ ম্যাগাজিন থেকে নানাবিধ বিষয়ের বই ও লেখকের নাম লিখে একটি তালিকা তৈরি করেছিলাম। সংখ্যা ছিল একশ’র কাছাকাছি। ১৫ তারিখ মঙ্গলবার দুপুর বারোটার মধ্যে সেলিম ভাইসহ উপস্থিত হলাম কলেজ স্ট্রিটে। কোলকাতার এই একটিমাত্র জায়গা, যার অলি-গলি এবং তস্যগলি আমার নখদর্পণে। ঢুকতেই চোখে পড়ল একটি টাঙানো ব্যানার। লেখা আছে – মান্না দে’র গাওয়া বিখ্যাত গানের একটি কলি, ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’। উপরে মান্না দে’র ছবি সমেত ব্যানারটি দেখে প্রথমে মনে হলো কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যানার। পরে খেয়াল করে দেখি, কফি হাউজে রক্তদান অনুষ্ঠানের আহ্বানের ব্যানার। শত শত মানুষে ঠাসা কলেজ স্ট্রিটের প্রধান গলিটি। দোকানে বই কিনতে হয় লাইন ধরে। ১৯৭৯ সালে প্রথম দেখা প্রায় অবিকল রয়ে গেছে সেই কলেজ স্ট্রিট। পার্থক্য শুধু এইটুকু, দোকানের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। ভেবেছিলাম, ইন্টারনেট বা ডিজিটাল যুগের কারণে বই পড়া কমেছে মানুষ বা পাঠকের। হয়তো কমেছে, কিন্তু কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ার অবস্থা দেখে কিছুতেই বিশ্বাস হলো না মানুষ হয়ে পড়েছে বই-বিমুখ।
প্রথমেই ভাবলাম, বইয়ের তালিকাটা নিয়ে দেজ্‌ পাবলিশিং এ ঢুকবো কিনা। কারণ, কলেজ স্ট্রিটে এ দোকানেই পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি নানা বিষয়ের বই। কিন্তু বই কেনার লাইন দেখে ভড়কে গেলাম। আন্দাজ করলাম, দোকানের কাউন্টারে পৌঁছতে সময় লাগবে দু’ঘণ্টার বেশি। সব বই তো আর দেজ্‌ এ পাব না! না পাওয়া বই খুঁজতে গেলে সময় লাগবে দু’দিনের বেশি। মাথায় বিকল্প পথের সন্ধান খুঁজতে দেজ্‌ এর পাশে লাগানো সিঁড়ি ধরে উঠে এলাম দোতলা কফি হাউজে। যাহ্‌্‌ বাবা, সেখানেও দেখি একই অবস্থা। ক্যামেরার মত চোখকে চারপাশে প্যান করে দেখা মিলল না একখানা শূন্য চেয়ার। রেস্টুরেন্ট তো নয় যেন সিনেমার হল ঘর। পুরো হলজুড়ে মানুষের কোলাহল আর সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। আবার নেমে এলাম নিচে। সাথে সেলিম ভাই। একবার জানতে চাইলাম, বিরক্ত হচ্ছেন না তো? স্মিত হেসে বড় কাতর সুরে কানে কানে বললেন ‘সুচিত্রা সেনের শহর! দু’ঘন্টার মধ্যে যদি একজন সুচিত্রা সেনের দেখা না মিলে, বিরক্ত তো হবোই।’ প্রতি উত্তরে আমিও রসিকতা করে বললাম: ‘ ভুলে যাচ্ছেন কেন, রূপের রাণীর চির বিদায়ের সাথে সাথে কোলকাতার সব রূপসী তাঁর শোকে গা ঢাকা দিয়েছেন।’
বিরক্তি আর রসিকতার শরবত গিলে অবশেষে এসে দাঁড়ালাম ‘ধ্যানবিন্দু’ নামের ছোট্ট এক বইয়ের দোকানে। দোকানদার সুব্রত বাবু আগে থেকেই চেনা। আমাকে দেখে একগাল হেসে জানতে চাইলেন, কেমন আছেন পিন্টু দা, কবে এলেন? বললাম : ঘণ্টা দুয়েক আগে পর্যন্ত ভাল ছিলাম। কিন্তু বইয়ের মার্কেট যে দুর্গা পূজার বাজারে পরিণত হয়েছে কে জানতো? দেজ্‌ এ বই কেনার লাইন দেখে ফিট হবার যোগাড়। শেষে এলাম আপনার কাছে। যদি পারেন একটু উদ্ধার করুন।’ কথা শেষের পর এগিয়ে দিলাম বইয়ের লিস্ট তাঁর দিকে। এক ঝলক চোখ বুলিয়ে বললেন : ক’দিন আছেন? বললাম, কাল আছি। পরশু সকালের ফ্লাইটে ফিরে যাব চট্টগ্রাম।
‘চট্টগ্রাম’ শুনে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এককাটের পাঞ্জাবীপরা গাল ভাঙা মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক বলে উঠলেন সাথে সাথে, আপনি মাস্টারদার শহরের লোক? বললাম – শহরের নয়, গ্রামের লোক। রাউজানস্থ তাঁর গ্রামের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে মাইল চারেক দূরে। কথা শেষের আগে সদ্য কেনা দুটো বই দোকানে রেখে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন অনেকক্ষণ বুকে। মনে হলো- আমি তার কত না পরম আত্মীয়। মাস্টারদা প্রসঙ্গ ধরে উঠে এলো প্রীতিলতার কথা। আমার মনের আগুনে এসে পড়লো যেন কেজি খানেক ঘি। ২০০১ সালে ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেনের ‘ভালোবাসা প্রীতিলতা’ পড়ে চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন নিয়ে প্রায় পাঁচ বছর বুঁদ হয়ে পড়েছিলাম। নানা বই-পত্তর পড়ে যত না প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলাম, মাস্টারদার প্রতি তার চেয়ে শত গুণে জ্বলে উঠেছিলাম, প্রীতিলতার আবেশ ও আবহে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দু’জন কথা বলে গেলাম প্রায় ঘণ্টাখানেক উক্ত বিষয়ে। সেলিম ভাইকে দেখলাম, এবার স্ববিশেষ বিরক্ত। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সুব্রতদার দিকে এগিয়ে এলাম আবার। বললাম, ‘বইগুলো একটু কষ্ট করে যোগাড় করে রাখলে খুশি হবো। কাল বিকেলের দিকে এসে নিয়ে যাবো।’
মন বলছিলো, লিস্টের সিংহভাগ বই এবার পাবোই পাবো। তাই, সেদিন সকালে কোলকাতা নিউমার্কেটের ফুটপাত থেকে একটি বড় আকারের চটের ব্যাগ কিনে রেখেছিলাম। কাঁধের ব্যাগে সেটি ভরে বিকেলে ‘ধ্যানবিন্দু’ দোকানে এসে দেখলাম আমার কেনা চটের ব্যাগ থেকে আরও দুই সাইজ বড় একটি ব্যাগে কেনা বইগুলো ভরে রেখেছেন সুব্রতদা। বললেন, “লিস্টের প্রায় আশিটা বই পাওয়া গেছে। বাকীগুলো পাওয়া যাবে কোলকাতার বই মেলায়।”
ওজন আন্দাজ করতে গিয়ে এক হাতে তোলা গেল না ব্যাগটা। সুব্রতদা সাহায্য করে জানালেন, পঁচিশ কেজির কাছাকাছি হবে বইগুলোর ওজন। জানতে চাইলেন, এত বই নেবেন কি করে? সেলিম ভাই ফোঁড়ন কাটলেন! “উনি তো তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিসিয়ান, তাঁর মন্ত্রের গুণে বইগুলো উড়তে উড়তে পৌঁছে যাবে চট্টগ্রাম শহরে।” ভাগ্নে আদনান বললো : “এত কষ্টের দরকার কি মামা? পার্সেল করে পাঠিয়ে দিলেই তো চলে।” বললাম, “পার্সেল করার আর সময় কোথায় মামা। পাঁচটা বাজতে চললো। কাল সকাল আটটায় ছুটতে হবে এয়ারপোর্টে। কষ্ট হলেও সাথে নিয়ে যাওয়াই ভালো।”
সুব্রতদাকে বললাম, বিলটা দেন। দেখি কত টাকা হলো? সুব্রতদা বিস্ময়ের সুরে বললেন, “বিল করার সময় কোথায় পেলাম দাদা! একটু বসুন, আধ ঘন্টার মধ্যে হয়ে যাবে।” সেই আধ ঘন্টার জায়গায় সব মিলে লাগলো দেড় ঘন্টার কাছাকাছি। শীতের দিন। সূর্য মামা চকিতে পালিয়ে গিয়ে আঁধার দিলো ছড়িয়ে। ২৫% কমিশন বাদ দিয়ে সর্বসাকুল্যে ৮০টা বইয়ের দাম এলো প্রায় আট হাজার রুপি। চিন্তা কি? পকেট তো টাকায় ভর্তি। কিন্তু, কী আমার সৌভাগ্য এক টাকাও দিতে হলো না বইকেনার বিপরীতে।
কথায় বলে-‘আল্লায় যারে দেয়, তারে ছাপ্পর ফাইরা দেয়’। সেটাও যেন এক রকম ম্যাজিক। ইতোমধ্যে গত একবছরে তারা (ধ্যানবিন্দু) বিক্রি করেছেন আমার সম্পাদিত ৬০ কপি সত্যজিৎচর্চা। মূল্য : পাঁচ’শ রুপি। ৩৫% কমিশন বাদ দিয়ে ৬০ কপির মূল্য দাঁড়ায় ১৯৫০০ টাকা। তাঁদের কাছ থেকে বই কিনেছি প্রায় আট হাজার টাকা। সেই হিসেবে তাঁদের কাছে আমি আরো ৯৫০০ টাকা পাবো। সেই টাকার হিসাবপত্তর আমার মাথা থেকে মুছে গেছে সমূলে এক বছরে। বইকেনার টাকা দিতে গিয়ে দেখি সুব্রতাদার চোখ উঠে পড়েছে যেন কপালে। বললেন, দাদা আপনি কি ভুলে গেছেন আপনার দেয়া ৬০ কপি সত্যজিৎচর্চার কথা? মিনিট দু’য়েক পর মনে পড়লো-তাই তো। মনে মনে বললাম, ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’ আসলেই পাগল করে ছেড়েছে আমায়। না হয় এমন হবে কেনো? শেষে আত্মহারা হয়ে বইয়ের ঝাঁপি নিয়ে পৌঁছলাম হোটেলে।
এদিকে, সেদিন আবার সেলিম ভাইয়ের ভাগ্নি জামাই শমসের ভাই, বেগবাগানস্থ তাঁর রেস্টুরেন্ট ‘জমজম’-এ ডিনারের দাওয়াত দিয়ে রেখেছেন। ব্যাগ ঘুছিয়ে রাত দশটা নাগাদ পৌঁছলাম ‘জমজম’-এ। হরেক রকম উপাদেয় খাবার দেখে অবাক! প্রথমে খেলাম বাসমতি চালের অসাধারণ কাচ্চি বিরিয়ানি। তারপর খেলাম তন্দুরি রুটি ও কাবাব। একে একে ক্ষুৃধার্ত পেটে এসে পড়লো কয়েক পদের মিষ্টি ও পায়েস। হোটেলে ফিরলাম রাত প্রায় একটায়। ফেরার পথে আবার তিনজনের হাতে ধরিয়ে দিলেন প্যাক করা তিনটি লাচ্ছি। এ লাচ্ছি আবার অন্য রকম লাচ্ছি, খেতে হয় চামচ কেটে, স্ট্র দিয়ে নয়। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসার মুহূর্তে চোখে পড়লো দেয়ালজুড়ে বাঁধানো আছে অমিতাভ বচ্চনের একটি ছবি। ছবির কাছে গিয়ে দেখি, এ হোটেলের বিরিয়ানি সম্পর্কে তাঁর উচ্চতর প্রশংসাবাণী। আর, বড় সাহেবের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের ভাগ্নি জামাই শমসের আলম।
সকাল সাড়ে আটটায় শমসের ভাইয়ের মাইক্রোবাস যোগে পৌঁছলাম নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এয়ারপোর্টে। দু’জনের কাঁধের ব্যাগ ছাড়া চারটি লাগেজ। তিনটি আমার, একটি সেলিম ভাইয়ের। একটি লাগেজ ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ৮০টা বইয়ে ভরা। পরিমাপ যন্ত্রের উপর দেয়ার সাথে সাথে কাঁটা এসে দাঁড়াল প্রায় ৯০ কেজির ঘরে। নিয়ম মতে রিজেন্ট এয়ারলাইন্সে ফেরার পথে লাগেজের নির্ধারিত ওজন প্রতিজনে ৩০ কেজি। সেই হিসাবে আমাদের চারটি লাগেজের ওজন ৩০ কেজি বেশি। স্টেশন ইনচার্জ লাগেজগুলোর গায়ে হাত দিয়ে জানতে চাইলেন, এত কি নিলেন বলুন তো? উত্তরে জানালাম, কিছু কাপড়-চোপড়, আর বাকি সবটাই বই। লেখাপড়ার একটু বাতিক আছে তো তাই………। বাতিকের কথা শুনে তাঁর অভিব্যক্তির মধ্যে একটু যেন পরিবর্তন খুঁজে পেলাম। বললেন, ঠিক আছে, দশ কেজি ছাড় দিলাম, কিন্তু বিশ কেজির বাড়তি ওজন স্বরূপ আপনাদের দিতে হবে দু হাজার পঞ্চাশ রুপি। টাকাটা পরিশোধ করে ঢুকে পড়লাম ইমিগ্রেশন সেরে ভিতরে।
ছবির পুরস্কার, প্রিয় বইয়ের সন্ধান, বিচিত্র খাওয়া-দাওয়া, সাত দিনের মাতামাতি সব মিলে এত আনন্দের পরও কোথায় যেন একটা অতৃপ্তির আভাস পাচ্ছিলাম মনে। ইমিগ্রেশনে ঢোকার পর জানা হলো, প্রায় দু’ঘণ্টা দেরী হবে ফ্লাইটের। তারপর থেকে কখনো হেঁটে, কখনো বসে, কখনো-বা আবার ধূমপান করে সময় কাটাচ্ছিলাম। তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গেলো আমার অপূর্ণতার কথা। কোলকাতায় প্রথম যাওয়া হয়, আমার ভার্সিটিতে ঢোকার পর ১৯৭৯ সনে। এরপর কতবার যাওয়া আসা হলো আর মনে নেই। কোলকাতা বলতে এখনও বুঝি, কলেজ স্ট্রিট, রবীন্দ্র সদন, ‘নন্দন’ সিনে কমপ্লেক্স এবং বিশপ লেফ্রয় রোডস্থ সত্যজিৎ রায়ের বাসা। যে বাসা আমার কাছে বিস্ময় ও শিল্পের তাজমহল। যদিও সেই তাজমহলের মধ্যমণি সত্যজিৎকে জীবদ্দশায় কখনো দেখিনি। কিন্তু, তাঁর চিরবিদায়ের পর কি করে যেন খুলে গেল তাঁর বাড়ির সদর দরজা। অবাধ যাতায়াতের মিললো অনুমতি। কিন্তু কেন জানি এবার ছেদ পড়লো হঠাৎ, জানি না।
এসব ভাবতে ভাবতে আনমনে সেলিম ভাইসহ ঢুকলাম ‘বিশ্ব বাংলা’ নামের একটি দোকানে। মূলত হ্যান্ডি ক্রাফটসের দোকান। চোখ পড়লো, ভারি সুন্দর কাঠের তৈরি উজ্জ্বল রঙের লক্ষ্মী পেঁচার দিকে। মূল্য মাত্র দেড়শ রুপি। সেটা কিনে বিরস মনে কাউন্টারে বসা ভদ্রলোককে বললাম, এত কিছু রাখলেন দোকানে, ‘সত্যজিৎ’ বাদ পড়লো কেন বলুন তো? আমার দিকে স্মিত হেসে চেয়ার ছেড়ে উঠে এগিয়ে গেলেন তিনি তাঁতে তৈরি কাপড়ের পাঞ্জাবির আলনার দিকে। ভিতর থেকে বের করে আনলেন, একটি ক্রিম কালারের কটি। যার সারা গায়ে আঁকা সত্যজিতের নানা সৃষ্টির ব্যঞ্জনাবহুল অলঙ্কার।
মূল্য তালিকার কাগজে দেখলাম, চার হাজার ছয়’শ রুপি। সত্যজিৎ আমার কাছে অমূল্য ধন। সেটি হাতে পেয়ে আনন্দে ভরে উঠলো মন ষোল আনা। একটু পর কানে ভেসে এলো, আমাদের গন্তব্যের উড়োজাহাজ এসে পৌঁছলো বিমান বন্দরে। সেলিম ভাই বললেন, এটা পরেই চলুন।
বললাম, এটা কি আর গায়ে পরার জন্য কিনেছি?
সেলিম ভাই বললেন, তাহলে?
উত্তরে জানালাম, গুরুর জিনিস গায়েপরা এক রকম পাপ। এটা আমার সত্যজিৎ সংগ্রহশালার নতুন পবিত্র পণ্য।

- Advertistment -