সাতকানিয়া চকরিয়া ও বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

খাবার-পানি সংকটে সাড়ে চার লাখ মানুষ

আজাদী ডেস্ক

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ৭:১৮ পূর্বাহ্ণ
124

ছয়দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, চকরিয়া এবং বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলায় সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দী রয়েছে।
আমাদের সাতকানিয়া প্রতিনিধি জানান, অব্যাহত বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি সাতকানিয়া উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন ভাবে আরো কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আড়াই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এছাড়া কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের সাতকানিয়া অংশের বাজালিয়ার বড়দুয়ারা এলাকায় সড়কের উপর পানি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সাথে টানা তিনদিন ধরে সারাদেশের সড়ক বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে শঙ্খ ও ডলু নদীর পানি বেড়ে অনেক এলাকায় প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে তীব্র আকার ধারণ করেছে শঙ্খ নদের ভাঙন। গত তিনদিনে আমিলাইষ ও দ্বীপচরতি এলাকার ২৫টি বসতঘর বিলীন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। আমিলাইষ ইউপি চেয়ারম্যান এইচ এম হানিফ জানান, বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। পুরো এলাকায় বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানির স্রোতে অনেক বসতঘর ও আবাদি জমি ভাঙনের মুখে পড়েছে। তিনি বন্যাদুর্গতদের মাঝে শুকনো খাবার ও চাল বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান।
বাজালিয়া ইউপি চেয়ারম্যান তাপস কান্তি দত্ত জানান, মাহালিয়া, বড়দুয়ারা ও কাটাখালীর কূল এলাকায় বেশির ভাগ বসত ঘরে বন্যার পানি ঢুকেছে। রাস্তা-ঘাটা কয়েক ফুট পানির নিচে। লোকজনকে নৌকা নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। কেঁওচিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মনির আহমদ জানান, কেঁওচিয়া, তেমুহনী ও জনার কেঁওচিয়ার ৯০ ভাগ মানুষ এখন পানিবন্দী। এর মধ্যে তিন শতাধিক বসতঘরে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। বন্যা কবলিত এলাকার সব রাস্তা-ঘাটা এখন পানির নিচে। আজ শুক্রবার বন্যা কবলিতদের মাঝে চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হবে।
সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্র্তা ডা. নুর উদ্দিন জানান, হাসপাতালের সামনে হাঁটু সামন পানি। এখনো হাসপাতালে প্রবেশ করেনি। তিনি জানান, সাপে কাটা, পানিতে ডোবা ও পাহাড় ধসসহ দুর্যোগকালীন যেকোনো চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আলাদা টিম রয়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবারক হোসেন জানান, ইতোমধ্যে ২৫ মেট্রিক টন চাল ও ৪শ’ বস্তা শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। গতকাল আমি নিজে উপস্থিত থেকে বাজালিয়া ও আমিলাইষসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করেছি। এছাড়া পুরো উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি ও শঙ্খনদের ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছি।
চকরিয়ায় দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী :
আমাদের চকরিয়া প্রতিনিধি জানান, অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো পানিতে ডুবে যাওয়ায় উপজেলায় সদরের সাথে অন্যান্য এলাকার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সড়ক ও বেড়িবাঁধ ভেঙে কোনো কোনো ইউনিয়নে নতুন করে প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অঘোষিতভাবে বন্ধ হয়ে গেছে উপজেলার শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভেসে গেছে বিভিন্ন পুকুরের মাছ। তলিয়ে গেছে প্রায় ২০ হাজার একর জমির সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত।
কাকারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. শওকত ওসমান জানান, ভারী বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি ছিকলঘাট-কাকারা-মানিকপুর ও কাকারা-মেনিবাজার মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম ছিদ্দিকী সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো ধরনের ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়নি।
সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম বলেন, বুধবার রাতের ভারী বর্ষণের কারণে আমার ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো ৫ থেকে ৬ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষ।
লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের গোলাম মোস্তফা কাইছার, কৈয়ারবিলের মক্কী ইকবাল, বরইতলীর জালাল আহমদ সিকদার, হারবাংয়ের মিরানুল ইসলাম মিরান জানান, মাতামুহুরী নদী ও বিভিন্ন ছড়াখালের পানিতে তাদের ইউনিয়নের অন্তত অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। তারা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছে।

বরইতলীর চেয়ারম্যান জানান, ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় রসুলাবাদ, ডেইঙ্গাকাটা, পহরচাঁদাসহ ১০টি গ্রামের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছে।
চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরী জানান, পৌরসভার দিগরপানখালী ও কোচপাড়া পয়েন্টে মাতামুহরী নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি। ওই এলাকার এক নম্বর গাইড বাঁধটি হুমকির মুখে পড়ায় নদী তীরের মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পাগলির বিলের বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ছে। এতে বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
চকরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদী বলেন, বন্যাসহ যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।
চকরিয়ার ইউএনও নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান জানান, বন্যাকবলিত মানুষগুলোকে নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়ার জন্য সিপিপির সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন।
এ ব্যাপারে কঙবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম দৈনিক আজাদীকে বলেন, চকরিয়া ও পেকুয়ার বন্যাদুর্গতদের যাতে অভুক্ত থাকতে না হয় সেজন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
বান্দরবানে এখনো সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন :
আমাদের বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বান্দরবান সদরে নতুন করে আরো ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় খোলা ১২৬টি আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে সাত শতাধিকেরও বেশি লোকজন।
শৈলসভা পরিবহন মালিক শ্রমিকের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, টানা ভারী বর্ষণে বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় ছোট ছোট পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সদরের ইসলামপুর, কালাঘাটা, লেম্বছুড়িসহ লামা, রুমা, থানচি, আলীকদম এবং নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়। তবে বড়ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো থেকে লোকজনদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।
মৃত্তিকা পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, বান্দরবানে গতকাল সকাল নয়টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘন্টায় ১৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে সকাল থেকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারী বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসের শঙ্কা বাড়ছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. দাউদুল ইসলাম বলেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় সবধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ মওজুদ আছে।
লামায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী :
আমাদের লামা প্রতিনিধি জানান, টানা বর্ষণে লামা পৌর এলাকাসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে কয়েকটি গ্রাম। মাতামুহুরী নদীসহ বিভিন্ন খালে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। আলীকদম-লামা-চকরিয়া সড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আলীকদমের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
লামা পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হাবিল মিয়া জানান, আলীকদম-লামা-চকরিয়া সড়কের লাইনঝিরি ও শিলেরতুয়া পয়েন্ট পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আলীকদমের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
লামা পৌরসভার মেয়র মো. জহিরুল ইসলাম জানান, বন্যার পানিতে প্লাবিত এলাকাগুলো থেকে লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে এনে পৌরএলাকার বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে। সেখানে তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ-জান্নাত রুমি জানিয়েছেন, দুর্যোগকালীন সময়ে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ৫৫টি বিদ্যালয়কে অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র ঘোষণা করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

x