সাইবার অপতৎপরতা : আইনের সঙ্গে অনলাইন ব্যবহারকারীদেরও সতর্ক থাকতে হবে

সোমবার , ১ জুলাই, ২০১৯ at ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ
54

ইন্টারনেট যেমন মানুষের সামনে খুলে দিয়েছে অবারিত দুনিয়া, তেমনি এই ইন্টারনেটের মাধ্যমেই সাইবার জগতে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে নানা অপরাধ। ইন্টারনেট প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে অপরাধ সংঘটনের প্রবণতাও বেড়ে চলেছে। বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর ক্ষেত্রে উগ্রপন্থী জঙ্গিদের প্রযুক্তি ব্যবহারে পারঙ্গমতা। জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের নিত্যনতুন কৌশলের কাছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও কখনো কখনো হিমশিম খাচ্ছেন বলেই জানা যায়।
দৈনিক আজাদীতে গতকাল ‘ফেসবুক হ্যাক করে যত অপরাধ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নগরীতে ফেসবুক ভিত্তিক হ্যাকিংসহ নানা সাইবার ক্রাইমের কবলে পড়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ, সম্মান খোয়ানোর ঘটনা ঘটছে। তবে ওইসব সাইবার ক্রাইম দমনে কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধীদের গ্রেপ্তারপূর্বক আইনি আওতায় আনার ঘটনাও কম। এতে সাইবার অপরাধীদের তৎপরতা সহজেই বন্ধ হচ্ছে না।
বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের প্রধান আধেয় হলো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সাইবার হেল্প ডেস্ক-এর তথ্য অনুযায়ী, শতকরা ৭০ ভাগ অভিযোগই আসে নারীদের থেকে। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, নারীদের অভিযোগের ৬০ ভাগেরও বেশি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক সংক্রান্ত। এর মধ্যে ১০ ভাগ অভিযোগ খুবই ভয়াবহ। এই ১০ ভাগের মধ্যে রয়েছে অন্যের ছবিতে ছবি জুড়ে দেওয়া এবং পর্নোগ্রাফি। তাছাড়া ইউটিউব ও বিভিন্ন সাইটে এ সব পর্নোগ্রাফি ও ছবি ‘আপ’ করার হারও বেড়েছে। আইসিটি-বিভাগের দেয়া তথ্য মতে, ফেসবুকের চ্যাট বা ভিডিও চ্যাটের ছবি একটু এদিক-ওদিক করে বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিডিও-চিত্র দ্রুত ইউটিউব-এ বা বিভিন্ন পর্নো সাইটে শেয়ার করা হচ্ছে।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা প্রতিদিনই বিভিন্ন ওয়েবসাইটে কিছু না কিছু তথ্য যোগ করেন। স্মার্টফোনের বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনগুলোও ব্যবহারকারীদের ধারণার চেয়ে বেশি তথ্য নিয়ে থাকে। অভিযোগ আসার দু-একদিনের মধ্যে রিপোর্ট করতে গিয়ে দেখা যায় যে, তা কয়েক হাজারবার শেয়ার হয়ে গেছে। এ সব ঘটনা ফেসবুকে রিপোর্ট করেও কাজ হয় না। ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে আরো আছে ফেসবুক আইডি হ্যাক, ই-মেল আইডি হ্যাক, বিভিন্ন ধরনের পর্নোসাইট বা ব্যক্তিগত ছবি পর্নোসাইটে ছেড়ে দেওয়া। এর বাইরে অনলাইনে প্রতারণা বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের বড় একটি জায়গা দখল করে রয়েছে। সাইবার অপরাধের মধ্যে নারীদের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে হয়রানির ঘটনাই প্রধান। সাধারণত তাদের বিকৃত ছবি অথবা তাদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ পোস্ট দিয়ে হয়রানি করা হয়। এর বাইরে প্রতারণা, আইডি হ্যাক, হুমকিসহ নানা অপরাধও আছে। তরুণরাও এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
আমরা জানি, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে আইসিটি অ্যাক্ট এবং পর্নোগ্রাফি আইন আছে। তবে অনেকেই, বিশেষ করে নারীরা অভিযোগ করলেও আইনি প্রতিকারে যেতে চান না, করতে চান না মামলা। এ জন্য সামাজিক কারণই প্রধানত দায়ী। তাই আইনের সঙ্গে অনলাইন ব্যবহারকারীদেরও সতর্ক হতে হবে। নিজের ফেসবুক, ই-মেল আইডি সুরক্ষিত রাখতে হবে। এগুলো বা এ সবের পাসওয়ার্ড কারুর সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।
প্রযুক্তিজ্ঞানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতীতের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। সাইবার অপরাধী ধরার কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলতাও দেখিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারে পেশাদার অপরাধীরা পুলিশের চেয়ে এগিয়ে। তাই প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে সাইবার অপরাধের ধরন ও কৌশল। আমাদের দেশে প্রচলিত সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রচলিত আইন রুখতে পারছে না অপরাধীদের। অপরাধ দমনকারীদের উপযুক্ত প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি সাইবার অপরাধ দমন বিষয়ক আইনি ব্যবস্থা আরও কঠোর করা দরকার। অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, সাইবার অপতৎপরতার বিরুদ্ধে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। দেশে ডিজিটালাইজেশনের কারণে সাইবার নিরাপত্তাজনিত যে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়ে সব পক্ষের সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে।

x