সাংস্কৃতিক নাকি ধর্মীয় ঘৃণা

শাফিনূর শাফিন

শনিবার , ২৪ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
123

সমপ্রতি আমার এক বন্ধুর সাথে একটা ছবি ফেসবুকে মাই স্টোরিতে আপলোড দেয়ার পরে বেশ একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা হলো। বন্ধু হিজাব নিকাব এবং বোরকা পরা ছিল। ছবি আপ দেয়ার কিছুক্ষণ পরে প্রথম কমেন্ট আসলো, ‘এই মেয়ে কে?’ বললাম বন্ধু। সাথে সাথে, ‘কীভাবে সম্ভব! তোমার সাথে কিছুতেই মিলে না!’ আমি এবার কৌতুক নিয়ে জানতে চাইলাম, ‘কি হলে আমার সাথে মিলতো?’ উত্তর এলো, ‘তুমি উদারমনা। মুক্ত। এমন পিছিয়ে পড়া মানুষের সাথে কি করে তোমার বন্ধুত্ব হয়?’ আমি বললাম, ‘বন্ধুত্ব পোশাকের সাথে হয় না যতদূর জানি। আর সে আমার ভালো বন্ধু। সুতরাং আর কোন কথা শুনতে চাই না।’ যাই হোক, অবাক করা ব্যাপার হলো, এরপরে আরও অনেক মেসেজ আসলো আমার কাছে যার সারমর্ম নেকাব বা হিজাব পরা মেয়েরা মানুষের পর্যায়ে পড়ে না। তাদের সাথে বন্ধুত্ব একজন সেক্যুলারের কখনো সম্ভব না। যেদিনের ঘটনা এসব, সেদিন বিকেলে ঢাকা থেকে আসা এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিলো। কথা প্রসঙ্গে সে বললো, ‘ধর্মীয় মৌলবাদী আর অতি প্রগতিশীল দুইই ভয়ংকর।’ কারণ জিজ্ঞেস করাতে বললো, ‘এক মহা প্রগতিশীলকে দেখেছি রোজা শব্দটা উচ্চারণ করতে কি আপত্তি তাঁর। আর যেকোনো ধার্মিক মানুষ বিশেষত মুসলিম নিয়ে কথা বলতে গেলে বিবমিষা টের পাওয়া যায়!’ এসব ঘটনায় হয়তো ব্যক্তি পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ধ্যানধারণা বা মতামতের হয়ে থাকে। কিন্তু সার্বিকভাবে দেখতে গেলে, এসব অসহনশীল আচরণে এক ধরনের সুপ্ত ঘৃণা টের পাওয়া যায়। মুসলিম নারী যিনি হিজাব করেন না, তাকে হয়তো বহু মুসলিম নারী এবং পুরুষের অযাচিত মন্তব্যের শিকার হতে হয়। তাকে শুনতে হয়, ‘তুমি স্লিভলেস বা টপস জিন্স পরো বা মাথায় কাপড় দাও না মানে তুমি ভালো ভদ্র মেয়ে না।’ আবার যিনি হিজাব বা নিকাব করেন তাকে হয়তো একই আচরণের ভিন্ন রূপের দেখা পেতে হয় এভাবে, ‘হিজাবি হয়ে এত সাজগোজ কিসের? হিজাবি হয়ে এত প্রতিবাদ কিসের? হিজাবি মানে অনাধুনিক। পর্দার নিচে বেপর্দা’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার এক সময় হয়তো হিজাব করেনি, এখন করছে; কিংবা এক সময় হিজাব বোরকা পরতো এখন পরে না, তাতেও মন্তব্য নতুনরূপে অতীত টেনে এনে করা হয়। তাদের চরিত্র নিয়ে টানাহেঁচড়া চলতে থাকে।
তো এসব প্রসঙ্গ দুইদিন পরপরই প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। যেমন ঈদের দুইদিন আগেই দেখলাম প্রগতিশীল অপ্রগতিশীল অনেকেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন এক সংবাদ উপস্থাপিকার স্লিভলেস ব্লাউজ পরে সংবাদ পরিবেশনা নিয়ে। কেউ বলছেন দেখানোপনা, আবার কেউ যুক্তি দিচ্ছেন, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ক্লিভেজ শো করে উপস্থাপনা আমাদের চোখে সয়, কিন্তু দেশের সাংবাদিকের পোশাক উনিশ বিশ হতেই পারবে না এ-কেমন দ্বিচারিতা! অন্যপক্ষ ‘এ আমাদের সংস্কৃতি নয়’ বলে সংস্কৃতির ধোঁয়া তুললেন। সংস্কৃতি তো আমরাই তৈরি করি নাকি সংস্কৃতি আমাদের তৈরি করে? আবার পুরনো উপলব্ধিটাই নতুন করে মনে হলো, নারী বলেই তাঁর পোশাক নিয়ে এত টানাটানি, তার জায়গায় পুরুষ হলে- পুরুষের শরীর দেখানো পোশাক নিয়ে কবেই বা মাতামাতি হয়েছে!
এখন এই যে হিজাবি এবং না-হিজাবি/না-নিকাবি উভয় ধরনের মেয়েকে যেসব মানুষ শুধুমাত্র পোশাকের কারণে ট্রল করেন, বাজে মন্তব্য করেন, মীম বানিয়ে সাইবার-বুলিং (নঁষষুরহম) করেন- যারা নিজেদের আধুনিক, সেক্যুলার এবং সুশীল দাবী করেন আর যারা ধর্মীয় মৌলবাদী, তাদের আচরণের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য কি আছে? ট্রান্সন্যাশনাল নারীবাদে ‘আমার শরীর আমার ইচ্ছা’ স্লোগানকে ঘুরিয়ে অনেকেই এমন পোশাক নিয়ে ট্রলের শিকার হলে বলেন, ‘আমার হিজাব, আমার ইচ্ছা’ বা ‘আমার পোশাক, আমার ইচ্ছা’। এই স্লোগানগুলো বারবার দেয়ার প্রয়োজন পড়ে কারণ নারীর ক্ষেত্রেই পোশাক নিয়ে নৈতিকতার বাড়াবাড়ি চলে। নারী কি পরবে না পরবে তা সবসময় অন্যের ইচ্ছাধীন হয় বলেই নারী স্বাধীনতা পোশাকে না মননে এমন আরও অনেক প্রসঙ্গই চলে আসে অবধারিতভাবে। নারীবাদীদের কাছে পোশাক হয়তো মুখ্য হতো না, যদি না এটাকে কেন্দ্র করেই তার উপর বাকি সব সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় আগ্রাসন নারীর উপর চালানো না হতো। তর্ক-বিতর্ক চলুক। এসব না চললে পরিবর্তন আসবে না।

x