সহিংসতা থেকে শিশুদের রক্ষায় আইনের আশ্রয় নেয়া জরুরি

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
56

শিশুরা যে হারে সহিংসতার শিকার হচ্ছে তাতে করে শিশুদের সহিংসতার হাত থেকে বিশেষভাবে সুরক্ষা দিতে সচেতনতার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট আইনের আশ্রয় নেওয়া জরুরি। একইভাবে সেসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি- ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যার মতো ঘটনায় রাষ্ট্রকে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখাতে হবে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সারা দেশে একের পর এক ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটছেই। এরই মাঝে গত ১৯ জানুয়ারি পত্রিকায় পড়লাম- পাঁচ বছরে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা আর ধর্ষণজনিত হত্যার মূল শিকার সবচেয়ে বেশি হয়েছে শিশু অথবা সদ্য প্রাপ্তবয়স্ক তরুণীরা। …এর প্রায় ৮৬ শতাংশই শিশু-কিশোরী। ধর্ষণজনিত হত্যার শিকার নারীরও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এই বয়সী। এদের বড় অংশটিরই বয়স ১২ বছরের মধ্যে। এই বয়সীদের মধ্যে গণধর্ষণের শিকারও আছে (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ১৯ জানুয়ারি)।
পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযাীয়- গত পাঁচ বছরে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার নারীর সংখ্যা মোট চার হাজারের মতো।…তবে ধর্ষণ বিষয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের মতে ঘটনা অনেক বেশি। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে পাঁচ বছরে ১৯ হাজারের বেশি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে ১১টি মামলা হচ্ছে।
তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে- ধর্ষণের কিছু ঘটনা প্রকাশিত হলেও বেশিরভাগ ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায় লোকলজ্জার কারণে। এসব ঘটনায় নির্যাতিতদের আইনি সুবিধার্থে ২০০০ সালে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তৈরি করে। সে আইনকে ২০১৩ সালে সংশোধন করে আরো কঠোর করা হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- সে সম্পর্কে কিছু জানেন-ই না অনেকে। তাই আপনাদের সামনে আজ হাজির করা হলো শিশু আদালত সম্পর্কে। কোনো শিশু কীভাবে আইনি সুবিধা পাবেন তা বিস্তারিত এখানে তুলে ধরা হলো:
যেসব অপরাধ নারী ও শিশু নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত
বাংলাদেশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সংশোধিত ২০১৩ অনুযায়ী যেসব অপরাধ এ আইনের অন্তর্ভুক্ত তা হলো- দহনকারী বা ক্ষয়কারী, নারী পাচার, শিশু পাচার, নারী ও শিশু অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ, ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু, নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচণা, যৌন নিপীড়ন, যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানো, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদির উদ্দেশ্যে শিশুকে অঙ্গহানি ও ধর্ষণের ফলে জন্মলাভকারী শিশু সংক্রান্ত বিধান ইত্যাদি।
শিশুর বয়স
বিদ্যমান অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যা কিছুই থাকুক না কেন, শিশু আইন অনুযায়ী অনুর্ধ্ব ১৮ (আঠার) বছর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসাবে গণ্য হবে।
শিশু আদালত
শিশু আইনের অধীন অপরাধ বিচারের জন্য প্রত্যেক জেলা সদরে এবং, ক্ষেত্রমত, মেট্রোপলিটন এলাকায় কমপক্ষে একটি আদালত থাকবে, যা শিশু-আদালত নামে অভিহিত হবে। ফৌজদারী কার্যবিধিতে যা কিছুই থাকুক না কেন, আইন ও বিচার বিভাগ, সুপ্রিমকোর্ট’ এর সঙ্গে পরামর্শক্রমে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, প্রত্যেক জেলা এবং ক্ষেত্রমত মেট্রোপলিটন এলাকার এক বা একাধিক অতিরিক্ত দায়রা জজ এর আদালতকে শিশু-আদালত হিসাবে নির্ধারণ করা যাবে এবং একাধিক আদালত নির্ধারণ করা হলে এদের প্রত্যেকটির আঞ্চলিক এখতিয়ার নির্দিষ্ট করবে। তবে শর্ত থাকে যে, কোন জেলায় অতিরিক্ত দায়রা জজ না থাকলে উক্ত জেলা’র জেলা ও দায়রা জজ তার নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে শিশু-আদালতের দায়িত্ব পালন করবেন।
শিশু আদালতের অধিবেশন ও ক্ষমতা
(১) আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত শিশু বা আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু কোন মামলায় জড়িত থাকলে, যেকোন আইনের অধীনেই হোক না কেন, উক্ত মামলা বিচারের এখতিয়ার কেবল শিশু-আদালতের থাকবে।
(২) কোন মামলায় কোন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সাথে কোন শিশু জড়িত থাকলে, ধারা ১৫ এর অধীন পৃথক চার্জশিটের ভিত্তিতে, শিশু-আদালতকে উক্ত প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট শিশুর সাক্ষ্য গ্রহণ পর্ব, একই দিবসে পৃথকভাবে পৃথক অধিবেশনে সম্পন্ন করতে হবে এবং সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তা একই নিয়মে পরবর্তী কর্মদিবসে বিরতিহীনভাবে অব্যাহত থাকবে।
(৩) শিশু-আদালত ধারা ১৮ এর বিধানের সামগ্রিকতাকে ক্ষুণ্ন না করে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত স্থান, দিন এবং পদ্ধতিতে, উপ-ধারা (২) এর বিধান অনুসারে, এর অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
তবে শর্ত থাকে যে, বিধি প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত শিশু-আদালতের বিচারক তাঁর স্বীয় বিবেচনায় বিচারের দিন, ক্ষণ, স্থান নির্ধারণক্রমে, উপ-ধারা (২) এর বিধান অনুসারে, ওই অধিবেশন আরম্ভ এবং সমাপ্ত করবেন।
(৪)সাধারণতঃ যে সকল দালান বা কামরায় এবং যে সকল দিবস ও সময়ে প্রচলিত আদালতের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় তা ব্যতীত, যতদূর সম্ভব, অন্য কোন দালান বা কামরায়, প্রচলিত আদালতের ন্যায় কাঠগড়া ও লালসালু ঘেরা আদালতকক্ষের পরিবর্তে একটি সাধারণ কক্ষে এবং অন্য কোন দিবস ও সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ব্যতীত শুধুমাত্র শিশুর ক্ষেত্রে শিশু-আদালতের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে হবে।
শিশু আদালতের এখতিয়ার
১৮। শিশু-আদালতের এখতিয়ার হবে নিম্নরূপ, যথা:
(ক) ফৌজদারী কার্যবিধির অধীন দায়রা আদালতের ক্ষমতাসমূহ;
(খ) সমন জারি , সাক্ষী তলব ও উপস্থিতি, কোন দলিলাদি বা বস্তু উপস্থাপন এবং শপথ গ্রহণপূর্বক সাক্ষ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ারসমূহ।
শিশু আদালতের পরিবেশ ও সুবিধাসমূহ
(১) আদালতকক্ষের ধরন, সাজসজ্জা ও আসন বিন্যাস বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে।
(২) শিশু-আদালতের আসন বিন্যাস এমনভাবে করতে হবে যেন সকল শিশু বিচারপ্রক্রিয়ায় তার মাতা-পিতা বা তাদের উভয়ের অবর্তমানে তত্ত্বাবধানকারী অভিভাবক বা কর্তৃপক্ষ বা আইনানুগ বা বৈধ অভিভাবক বা বর্ধিত পরিবারের সদস্য এবং প্রবেশন কর্মকর্তা ও আইনজীবী, যতদূর সম্ভব, সন্নিকটে বসতে পারে।
(৩) উপ-বিধি (১) এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে আদালতকক্ষে শিশুর জন্য উপযুক্ত আসনসহ প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য, প্রয়োজনে, বিশেষ ধরনের আসন প্রদানের বিষয়টি শিশু-আদালত নিশ্চিত করবে।
(৪) অন্য কোন আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, শিশু-আদালত কর্তৃক শিশুর বিচার চলাকালীন, আইনজীবী, পুলিশ বা আদালতের কোন কর্মচারি আদালতকক্ষে তাদের পেশাগত বা দাপ্তরিক ইউনিফরম পরিধান করতে পারবেন না।
সুতরাং, আমি বলবো- শিশুরা যে হারে সহিংসতার শিকার হচ্ছে তাতে করে শিশুদের সহিংসতার হাত থেকে বিশেষভাবে সুরক্ষা দিতে সচেতনতার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট আইনের আশ্রয় নেওয়া জরুরি। একইভাবে সেসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি- ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যার মতো ঘটনায় রাষ্ট্রকে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখাতে হবে। তবেই ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনার অবসান ঘটতে পারে একদিন।

x