সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে

বুধবার , ১০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:০৮ পূর্বাহ্ণ
26

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উদযাপিত হয়েছে গত ৭ এপ্রিল। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সমতা ও সংহতি নির্ভর সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় একশ’ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে এবং তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে চার কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে এবং প্রতি বছর শারীরিক অসুস্থতার কারণে ৬৪ লাখ মানুষ দরিদ্রতার শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টের হিসাব অনুযায়ী, যে কোনো পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য ৬৭ শতাংশ ব্যয় ব্যবহারকারীর নিজেরই বহন করতে হয়। সরকার ২৬ শতাংশ এবং এনজিও, প্রাইভেট সেক্টর ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি অবশিষ্ট ব্যয় বহন করে।
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই নিজ নিজ নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার নিমিত্তে বিভিন্ন রকম নীতিমালা ও কর্মপদ্ধতি বিরাজমান। এটি প্রধানত ওই নির্দিষ্ট রাষ্ট্রটির অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো বিদ্যমান। সামগ্রিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের অনেক রকম কার্যকর ও ফলপ্রসূ কাঠামো প্রতিষ্ঠিত আছে। কিন্তু উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক কাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। সারা পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পেতে ব্যর্থ। কিন্তু এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রত্যেক মানুষেরই তার প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার আছে এবং কোনো বিবেচনাতেই এর ব্যত্যয় ঘটানোর সুযোগ নেই। কোনো কোনো দেশে বিত্তবানদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নাগালের মধ্যে থাকলেও তা সাধারণের নাগালের বাইরে। যারা স্বাস্থ্যসেবা কিনতে পারছে, তারাই আদর্শ মানের স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষ অনেক সময়ই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পেতে ব্যর্থ হয়।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে অভিযোগ করা হয় যে, স্বাস্থ্য অবকাঠামো তুলনামূলক ভালো হওয়া সত্ত্বেও দেশের সব মানুষের জন্য এখনও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে পারছে না সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিনামূল্যে চিকিৎসাপ্রাপ্তিতে নানামুখী সংকট রয়েছে সরকারি হাসপাতালে। এ কারণে মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ স্বাস্থ্য সুরক্ষার বাইরে রয়েছে। এ অবস্থায় দরিদ্র থেকে বিত্তবান সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য ন্যূনতম মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্থাৎ ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের সব নাগরিকের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আরো তৎপর হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ডব্লিউএইচও-এর স্বাস্থ্যবিষয়ক এসডিজি অর্জনে বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকার সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং এক বছরের কম বয়সী শিশু ও ৬৫ বছরের অধিক বয়সের লোকদের জন্য বিনা খরচে স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করেছে।’ তিনি বলেন, ‘ইবোলা, কলেরা ও যক্ষ্মার মতো সংক্রামক রোগ পুনরায় বিশ্বব্যাপী দেখা দিয়েছে, ফলে বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পরিবর্তন প্রয়োজন’। শেখ হাসিনা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। এ কারণেই এটিতে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে আমরা আমাদের জনগণের জন্য যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছি না। অথচ এসডিজি-৩-তে স্বাস্থ্যের অধিকারকে মৌলিক অঙ্গীকার হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।’ স্বাস্থ্য খাতে তার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা উন্নয়নে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সেক্টরেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেছে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বলতে সব মানুষের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বোঝায়, যাতে করে তাকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে না হয়। সেই লক্ষ্যে আমাদের অগ্রসর হতে হবে।

x