সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হোক

সব নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালুর পরিকল্পনা

বৃহস্পতিবার , ১৮ জুলাই, ২০১৯ at ৩:৫৯ পূর্বাহ্ণ
35

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার স্বাস্থ্যবীমা চালু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে এরই মধ্যে টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল এবং কালিহাতী উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে স্বাস্থ্যবীমা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। গত ১৯ জুন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজীর তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের উত্তরে সংসদকে এ কথা জানান তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ‘হেলথ কেয়ার ফিন্যান্সিং স্ট্রাটেজি ২০১২-২০৩২’ প্রণয়ন করেছে। এর অধীনে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে টাঙ্গাইলের তিনটি উপজেলায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি (এসএসকে) শীর্ষক পাইলট কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এসএসকে পাইলটিং সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। এসএসকের স্কিল অপারেটর হিসেবে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডকে (জিডিআই) নিয়োগ করা হয়েছে জানিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, জিডিআই তিনটি উপজেলায় ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে রোগীদের এসএসকে কার্ড প্রদান, ‘ক্লেইম’ প্রস্তুতকরণ এবং ‘ক্লেইম সেটেলমেন্ট’ কার্যক্রম ব্যস্তবায়নে এসএসকে সেলকে সহায়তা প্রদান করবে। দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় এ খবর প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশের মানুষকে নির্ধারিত আয়ের বড় অংশ ব্যবহার করতে হয় চিকিৎসার পেছনে। অনেক সময় সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার খরচ জোগানের জন্যে ফসলের জমি, গৃহপালিত পশু, জরুরি ব্যবহার্য জিনিষপত্র বিক্রি কিংবা ধার-দেনা করতে হয়; এমনকি কোন কোন সময় কারো কারো শেষ সম্বল সাত পুরুষের ভিটে মাটিও বিক্রি করা ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকে না। অথচ স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া মানুষের পাঁচ মৌলিক অধিকারের একটা, যা প্রদানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায় নি। স্বাস্থ্যের পেছনে যে ব্যয় হয় তা ৬৭ শতাংশ বহন করতে হয় রোগী বা তার পরিবারকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোগীর সুরক্ষায় স্বাস্থ্য বীমা চালু থাকলেও বাংলাদেশে এখনও এ সেবা সফলভাবে চালু করা সম্ভব হয় নি। ভারতও এরই মধ্যে বেশ কিছু স্বাস্থ্যবীমা চালু করেছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বীমা শুরু হলেও তা দেশের মাত্র একটি জেলার তিনটি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু রয়েছে। ভারতে চালু করা স্বাস্থ্য বীমাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো, রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবীমা ‘যোজনা’। সরকারের সদিচ্ছা ও আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনের কারণে ‘যোজনা’ প্রকল্পটি দরিদ্র মানুষের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। অন্য স্বাস্থ্য বীমায় যার নামে বীমা করা থাকে, তার প্রিমিয়াম দেওয়ার কথা, কিন্তু সরকার এ বীমায় সেই প্রিমিয়াম দিয়ে দেয়। গরিব মানুষ বিনামূল্যে একটা নির্দিষ্ট অংকের টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেই পেতে পারে।
স্বাস্থ্য অর্থ ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী দেশের ১ শতাংশেরও কম মানুষ স্বাস্থ্য বীমার আওতায় এসেছে। অর্থাৎ ৯৯ শতাংশেরও বেশি মানুষ এখনও স্বাস্থ্য বীমার বাইরে। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, করপোরেট হাউজ ও বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু রাখলেও এসব বীমা সব ধরনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে পারছে না। আয় অনুপাতে এবং পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী বীমার প্রিমিয়াম নির্ধারণ করতে হবে। আর দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেও বীমার আওতায় আনতে হবে। তবে তা হতে হবে খুবই স্বল্প মূল্যে বা বিনামূল্যে। অর্থাৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠী বীমার আওতায় থাকবে কিন্তু তার প্রিমিয়াম সরকারিভাবে দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। গতানুগতিক বীমার মতো সেবা পেতে যেন দেরি না হয়। স্বাস্থ্য বিষয়টি সবসময়ই স্পর্শকাতর। যে মানুষটি বিপদের শংকায় বছরব্যাপী বীমার প্রিমিয়াম দিয়ে গেলেন তাকে তার প্রয়োজনের সময় পাওনা অর্থ দিতে গড়িমসি করা হয়, তবে সেটা হয় অমানুষকিতা। তাই তার এ দুঃসময়ে যত দ্রুত সম্ভব তার প্রাপ্যটা দেওয়ার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে।
বীমা সেবা বা খরচের হিসাবকে যথাযথ করতে সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও বেসরকারি হাসপাতালে বীমা গ্রহণ ও সেবা প্রদানের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এমনকি বীমা ব্যবহারকারীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রোগ অনুযায়ী সাধারণ প্যাকেজভিত্তিক সেবা চালু করা যেতে পারে। এ কথা ঠিক যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বীমা চালু করা খুবই কঠিন কাজ, এবং তার বাস্তবায়ন আরও কঠিন। তবে সরকার যদি এটাকে বাধ্যতামূলক করে, তাহলে কাজটি এগিয়ে নেওয়া অসম্ভব হবে না বলে আমাদের বিশ্বাস।

x