সর্বজনীন শিক্ষা

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ৩০ মার্চ, ২০১৯ at ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ
47

শিক্ষা জীবনের শুরুটাই প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে, প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডি পার হয়ে মাধ্যমিক তারপর উচ্চ-মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা। উচ্চ শিক্ষা নেয়ার সামর্থ ও সুযোগ সকলের জুটে না, আবার কেউ কেউ প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের শেষ মুহূর্তে আর্থিক ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতার জন্যে পড়ালেখা করতে পারে না। শিক্ষা লাভের অধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার। এই অধিকার প্রতিটি শিশুর ও নাগরিকের জন্য সমভাবে লাভ করার সুযোগ সৃষ্টি এবং এর ক্ষেত্রটা তৈরি করার দায়িত্ব সরকারের। শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের যে অধিকার তা দিতে হবে। এই ধারণাকে সামনে রেখে পাশ্চাত্যের দেশসমূহে ঊনিশ শতকের শেষভাগে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে জাপান ঊনিশ শতকেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভের নানা উদ্যোগ হাতে নেয়। এবং তা কার্যকর করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক যে সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা এবং ১৯৫৯ সালে যে শিশু অধিকারের ঘোষণা গৃহীত হয় তাতে প্রতিটি শিশুর শিক্ষা লাভের অধিকার এবং তা যথাযথ বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করা হয়। এই দুইটি ঘোষণাতেই প্রাথমিক শিক্ষাকে সার্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
বুনিয়াদি শিক্ষা একটি দেশের উন্নতি, অগ্রগতির জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন, শুধুমাত্র প্রতিটি শিশুর মানবিক গুণাবলীকে পরিশুদ্ধ করার ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজনীয় শুধু নয়, প্রাথমিক শিক্ষা একজন শিশুকে শুধুমাত্র যোগ-বিয়োগ, ভাষাজ্ঞান নয় বরং শিশুর মানসিক বিকাশ বুদ্ধি বিচারের ক্ষমতা, মাঠে-ময়দানে, কল-কারখানায় দক্ষকর্মী বাহিনীতে পরিণত করার ক্ষেত্রেও প্রাথমিক শিক্ষা নানাভাবে সহযোগিতা এবং দক্ষতার জন্ম দেয়। আবার মানুষের উদ্যমশীলতা আনয়ন এবং মৌলিক চাহিদা-পুষ্টি, আশ্রয়, পোশাক, স্বাস্থ্যসেবা এইসব কিছু মেটাতেও প্রাথমিক শিক্ষা মানুষকে সহযোগিতা করে। যার কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক যে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা হয় তাতে শিক্ষাকে শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক এবং প্রতিটি নাগরিকের অধিকার হিসাবে ঘোষণা করা হয়। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭২ সালে গৃহীত বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে ঘোষণা করা হয়েছে- একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে সমাজের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ রেখে সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের সৃষ্টি সুযোগ করবে সরকার। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই কাজটি করা হয়নি সুন্দরভাবে। সার্বজনীন শিশু শিক্ষার কথা বলা হলেও একই দেশে বসবাসরত একই ভাষাভাষী, স্বাধীন দেশের নাগরিকরা আজ নানামুখী শিশু শিক্ষা গ্রহণ করে বড় হচ্ছে। এতে নানামুখী চিন্তার প্রসারের কারণে দেশে বৈষম্য তৈরী হচ্ছে। যা কোন ক্রমেই একটি দেশের জন্য শ্রেয় নয়। দেশে সার্বজনীন শিশুশিক্ষা বা প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের জন্য মাঝে মাঝে দারুণ মায়াকান্না আমরা প্রত্যক্ষ করেছি বটে, তবে তা কতটুকু ফলপ্রসু এবং কার্যকরি হয়েছে তা বলার সময় এসে গেছে। স্বাধীন দেশের মানুষ দেশের মধ্যে যে পরাধীন আছে। স্বাধীনতার কথাই ছিল বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। এটা আদৌ কার্যকরী হয়েছে কিনা? এই প্রশ্নের উত্তর এখন আমাদের জানতে হবে। জানার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের যেমন আছে যে কোন সরকার তা জানাতেও বাধ্য।
বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাকে আধুনিক করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার অঙ্গিকার করেছেন, সেই অনুযায়ী কিছু কিছু পদক্ষেপও নিয়েছেন। যার পথ ধরে প্রণীত হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯। এটি ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষানীতির আদলে রচিত তবে আধুনিক ও আজকের সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রণীত শিক্ষানীতি। অতীতে প্রত্যেক সরকার শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্যে একটি কমিটি করেছে এবং যথারীতি ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে এর ফল প্রকাশ করেছে, কিন্তু বর্তমান সরকার এমনটি করেনি। শিক্ষা কমিশন করেছেন, তাদের নীতি প্রকাশিত হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা পদক্ষেপও নিয়েছে। তার ধারাবাহিকতায় দেশে শুরু হয়েছে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) নামক পরীক্ষা। গত ৪ নভেম্বর থেকে দেশে এই পরীক্ষা প্রথমবারের মত চালু হয়েছে এবং কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থী এতে অংশগ্রহণ করেছে। এই পরীক্ষার বিষয়ে আলোচনার পূর্বে আমি মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে চাই-আমি কয়েকটি বিষয় নিয়ে এবার ধারাবাহিক আলোচনায় যেতে চাই। প্রাথমিক শিক্ষা হল শিক্ষার মূল ভিত্তি। একটি উর্বর মাঠ হল প্রাথমিক স্তর এখানে যদি সঠিক বীজ বুনতে না পারি তবে কোন অবস্থাতেই আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষার মান আজ নিম্নে এই অবস্থা বুঝার জন্য অনেক দূর চিন্তার প্রয়োজন নাই। একটি বিষয় স্পষ্ট যে, জিপিএ ৫ প্রাপ্তির এই মহোৎসবের মধ্যেও অধিকাংশ জিপিএ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় টিকে উঠতে পারছে না।
শিক্ষার মূল স্থানটি হল শ্রেণি কক্ষ অথচ শ্রেণি কক্ষের অবস্থা আজ তেমন ভাল নয়। মেধাবীরা সেখানে আজ আসছে না। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও বাংলাদেশে শিক্ষার অগ্রগতি হয়েছে, তবে তা টেকসই নয়। কারও সহায়তা বা সমর্থনের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের মেধা, সম্পদ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়নে চেষ্টা করতে হবে। এই কথা গুলো বলেছেন শিক্ষা বিষয়ক একটি সেমিনারে বক্তারা। বক্তারা আরো বলেন, শিক্ষার গুণগত মানউন্নয়নে সরকার, দাতা সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে অন্যথায় শিক্ষার আজকের অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছি সক্ষমতাগুলো কোন অজানা কারণে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ব্যয় এবং বিনিয়োগের তুলনায় আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রটা অনেক পিছিয়ে আছে একথা নিঃসন্দেহে স্বীকার করতে হবে। কেন এই অবস্থা তাও নির্ণয় করা জরুরি। উর্বর মাঠে বীজ বুনতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন পরিকল্পনা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা। জিপিএ ৫ প্রাপ্তির যে হার সেই হার অনুযায়ী গুনগত শিক্ষার প্রসার হয়নি। শিক্ষার মানের অবস্থা বোঝার জন্য এটি একটি দৃষ্টান্ত। শ্রেণি কক্ষ গুলোকে শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসাবে প্রস্তুত করতে হবে এবং এই কাজটি খুব জরুরিও বটে। ভিড়ে ঠাসা শ্রেণিকক্ষগুলোতে আজ শিক্ষার সাধারণ পরিবেশও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। শিক্ষার্থী সিলেবাস শেষ করল কিনা সেটি অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর কাছে প্রধান। কি শিখল আর কি পারল তা বিবেচ্ছ নয়। এই অবস্থার কারণে আজ বর্ণমালা না শিখেও শ্রেণি টপকানোতে বেশি মনোযোগ সকলের।
এই অবস্থার জন্য আমাদের শিক্ষার সার্বিক কাঠামো দায়ী। তাই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে তৈরি করতে হবে এক সুসস্পর্ক। অন্যথায় মনে রাখবেন কোন মতেই আধুনিক শিক্ষার যে চিন্তা তা ফলপ্রসূ হতে পারে না। গুণগত শিক্ষার ধারে কাছেও আজ আমরা নাই। আমাদের সকলের কাছে এখন প্রতিযোগিতা কতভাগ পাস ও কতজন জিপিএ ৫। শিক্ষার মানের সাথে ভৌগোলিক অঞ্চল, শিক্ষকের বয়স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানের দিকটি বিবেচনায় আনতে হবে। ধনী গরীবের ব্যবধান কমিয়ে এনে শিক্ষার একটি সার্বিক অবস্থা তৈরী করা দরকার। জাতি হিসেবে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় স্থান করার জন্য শিক্ষার চিত্রের মানের পরিবর্তন সর্বাগ্রে, এই কথাটুকু সকলকে মনে ধারণ করতে হবে।

লেখক : ফাউন্ডার প্রিন্সিপাল, রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ

x