সর্বজনীন রবীন্দ্রনাথ

ড. মাহবুবুল হক

শুক্রবার , ১০ মে, ২০১৯ at ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ
18

বহুমুখী প্রতিভায় অনন্য রবীন্দ্রনাথ। মহামহিমাময় সাহিত্য-স্রষ্টা তিনি। বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যাতে তিনি স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেন নি, অসামান্য অবদান রাখেন নি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর সৃষ্টির ব্যাপ্তি ও গুণমান বিস্ময়কর। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখাকে নবযৌবনের আলোয় ভাস্বর করেছেন তিনি।
আট বছর বয়সে তাঁর কবিতা লেখার হাতেখড়ি। তেরো বছর বয়স থেকে লেখা প্রকাশের শুরু। প্রথম কবিতা গ্রন্থ কবি কাহিনী থেকে শুরু করে শেষ বই শেষ লেখা (মৃত্যুর পরে প্রকাশিত) পর্যন্ত ষাট বছরের মতো কবিজীবনে গান ও কাব্যনাট্য ছাড়াই ৫৬টি কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন তিনি। তাতে কবিতার সংখ্যা এক হাজারের ওপরে। গানের কথা-অংশ ধরলে তা হবে আরও অনেক বেশি। হিসেব করে দেখা গেছে, রবীন্দ্রনাথ কবিতার পংক্তি লিখেছেন দেড় লাখেরও ওপরে। আর তাঁর গদ্য পংক্তি সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি। তিনি কাব্যনাট্য লিখেছেন ১৯টি, নাটক ২৯টি, ছোটগল্প ১১৯টি, উপন্যাস ১২টি, এবং ভ্রমণ কাহিনি ৯টি। তাঁর চিঠিপত্র সংকলিত হয়েছে ১১টি গ্রন্থে। জীবনে যে কয়েক হাজার চিঠি তিনি লিখেছেন তার সাহিত্যিক ও তথ্যগত মূল্য অপরিসীম। এ ছাড়াও ছোটদের জন্যে লেখা গল্প, কবিতা ও ছড়ার বই রয়েছে ৮টি। পৃথিবীর অনেক ভাষাতেই তাঁর রচনার অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকটি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে রচনাবলি।
বাংলা কবিতা সবচেয়ে বেশি ঐশ্বর্যমণ্ডিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের হাতে। ভাব ও রূপের দিক থেকে তিনি বাংলা কাব্যধারায় অকল্পনীয় উৎকর্ষ ও বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন। একদিকে সৌন্দর্যবোধ, অন্যদিকে গীতিকাব্যের সুমধুর মূর্ছনা, সব মিলিয়ে মানবতার প্রতি সংবেদনশীল হৃদয়ানুভূতি – রবীন্দ্রনাথের কবিতার এই হল সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
বাংলা সাহিত্যে প্রথম ছোটগল্পের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ। তাঁর হাতেই বাংলা উপন্যাস ইতিহাস-আশ্রয়ী রোমান্সের জগৎ থেকে বাস্তবের মাটিতে পা ফেলেছে। তাঁর হাতেই বাংলা কথাসাহিত্য প্রবেশ করেছে সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্নার সমস্যা-জটিল জীবনে। কল্পনার বিচিত্র বিন্যাসের জায়গায় এসেছে মানবধর্মী মনোবিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গি।
বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ধারাতেও রবীন্দ্রনাথ বৈপ্লবিক রূপান্তর সাধন করেছেন। তাঁর মননশীলতার অসামান্য সম্পদে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য বৈচিত্র্য ও মানের দিক থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে উঠেছে। সাহিত্যতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন, শিক্ষা, সমাজ, ইতিহাস, বিজ্ঞান ইত্যাদি নানা বিষয়ে লেখা প্রবন্ধে তাঁর চিন্তাশীল দার্শনিক মনের সাথে কবিমনের অপূর্ব মিলন ঘটেছে।
রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভার প্রকাশে কেবল সাহিত্য নয়, অন্যান্য মাধ্যমগুলোও বিবেচ্য। সুরকার, গীতিকার, গায়ক, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা, অনুষ্ঠান-সংগঠক হিসেবে তিনি শিল্পরুচির বিকাশ ঘটিয়েছেন। কথা ও সুরের অনবদ্য সম্মিলন ঘটিয়ে রবীন্দ্র সংগীতের যে ধারা ও ঐতিহ্য তিনি সৃষ্টি করেছেন তা বিরলদৃষ্ট। তাঁর গান সংখ্যায় যেমন বিপুল, তেমনি বৈচিত্র্যময়। দেশাত্মবোধক গান রচনায় তাঁর দান অবিস্মরণীয়। তাঁর দেশাত্মবোধক গানের আবেদন বাঙালিকে আন্দোলন-সংগ্রামে প্রণোদিত করেছে ও করছে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সেই সব গান বাঙালি জাতিকে সংগ্রামের পথে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। তাঁর একটি গান বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, আর একটি গান ভারতের।
আবৃত্তি ও অভিনয়েও তিনি দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর প্রতিভার আরও অসাধারণ পরিচয় রয়েছে শেষ জীবনে আঁকা ছবিগুলিতে। প্রায় হাজার দুয়েক ছবি তিনি এঁকেছেন। সেসব ছবিতে চারপাশের জগৎ ও নিজের অনুভূতিকে তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা অপূর্ব।

নৃত্যকলা, সংগীত, সাহিত্য ও চিত্রকলা – সৃজনশীল শিল্পের এই চারটি শাখায় যেমন তাঁর অসামান্য অবদান তেমনি অসামান্য অবদান তিনি রেখে গেছেন কর্মী হিসেবেও। ভাবের সঙ্গে কর্মের যোগে রবীন্দ্রনাথের জীবন বিশিষ্টতায় উজ্জ্বল। জমিদারির সূত্রে তিনি কৃষি উন্নয়নে ব্রতী হয়েছিলেন। কুটির শিল্পের উন্নয়ন সহ গ্রামীণ জীবনের পুনর্গঠনে সক্রিয় হয়েছিলেন। দেশীয় শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে চটকল ও কাপড়ের কল প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষিত সমাজকে সে পথে আগ্রহী করতে চেয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দেশ, জাতি ও সমাজ-সচেতন কবি। তাঁর সাহিত্যে স্বাধীনতা, শান্তি ও সুখের জন্য মানুষের সংগ্রাম এবং সেই সঙ্গে মানবতাবাদ বাণীরূপ লাভ করেছে। সামাজিক অসাম্য, নারীর অধিকারহীনতা, বর্ণবৈষম্য, পরাধীনতা ও বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন। জালিওয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস গণহত্যার (১৩ এপ্রিল ১৯১৯) ঘটনায় তিনি শুধু প্রতিবাদ করেন নি, ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া স্যার উপাধিও বর্জন করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৯১৮) উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তি ও মানবতার পক্ষে অটল ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে ফরাসী মনীষী রমা রোঁলা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়কদের স্বাক্ষরযুক্ত যে বিখ্যাত ইস্তাহারটি প্রকাশ করেছিলেন তাতে রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরও ছিল। বিশ্বমানবিকতার ইতিহাসে সে এক শ্রেষ্ঠ দলিল।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিশ্বপথিক। প্রায় সারা পৃথিবী ঘুরেছেন তিনি। বিশ্বের যেখানেই তিনি গেছেন সেখানেই বাংলা ও বাঙালির আত্মাকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, ভারতবর্ষকে তুলে ধরেছেন বিশ্বের কাছে। ১৯১৩-য় নোবেল পুরস্কারের মতো আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সংস্কৃতির সকল গণ্ডি অতিক্রম করে সর্বমানবিক সত্তায় পরিণত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
বিদেশি শিক্ষার প্রভাব থেকে জাতীয় শিক্ষাকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ গঠন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বসংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ার সংকল্প তাঁর মনে জেগেছিল। শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বভারতী’ বিশ্ববিদ্যালয় তারই বাস্তব রূপ এবং তা শিক্ষাব্রতী রবীন্দ্রনাথের জীবনে এক মহাকীর্তি। ১৯২০ সালে এটি স্থাপিত হয়েছিল। আর পরের বছরেই বিখ্যাত পৌষ উৎসবের দিনে তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানটিকে সর্বসাধারণের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাঁর সর্বজন-অভিমুখী এই উদারতা অতুলনীয়।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একাধারে কবি ও কর্মী, ভাবুক ও দার্শনিক, শিক্ষানায়ক ও দেশহিতৈষী। তাঁর চিন্তা ও কর্ম, স্বপ্ন ও সৃষ্টি বাঙালির মানস বিকাশের চিরায়ত প্রেরণা। একই সঙ্গে তা মানব সংস্কৃতির মূল্যবান সম্পদ। তাঁর অবদান সর্বজনীন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে তিনি আমাদের মানুষ।
দৈনন্দিন জীবনে সহজ দৃঢ়তা নিয়ে দুঃখ ও গ্লানি, শোক ও সংকট, ব্যর্থতা ও হতাশার মুখোমুখি হবার জন্যে যে চেতনা সবার দরকার তার অনেক কিছুই পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের জীবন ও কর্ম, সাহিত্য ও শিল্প থেকে। অতীতের সমস্ত মহৎ অর্জন, বর্তমানের সমস্ত কল্যাণ, ভবিষ্যতের সমস্ত শুভ সম্ভাবনাকে তিনি সকল মানুষের সামনে তুলে ধরায় প্রয়াসী হয়েছেন।
বিশ্বজনীন আদর্শে বিকশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের মন ও মনন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সব মানুষের সঙ্গেই কবি পরম আত্মীয়তা অনুভব করেছেন। উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থের ‘প্রবাসী’ কবিতায় বাণীরূপ পেয়েছে সর্বজনীন মানববোধ :
সব ঠাঁই মোর ঘর আছে
আমি সেই ঘর মরি খুঁজিয়া
দেশে দেশে মোর দেশ আছে,
আমি সেই দেশ লব যুঝিয়া।…
ঘরে ঘরে আছে পরমাত্মীয়
তারে আমি ফিরি খুঁজিয়া।
কিন্তু কবির এই সর্বজনীন বিশ্বমানবিক মনোভঙ্গি গড়ে উঠেছিল স্বদেশবোধের ভিত্তিতে। তাই দেখা যায়, বিশ্বের ভাবসংস্কৃতির সমস্ত উপাদান আহরণ করে সেগুলিকে স্বদেশের কল্যাণে নিয়োজিত করায় ব্রতী হয়েছিলেন তিনি। সচেষ্ট হয়েছিলেন রাষ্ট্রিক পরাধীনতা, সামাজিক অনৈক্য ও চিন্তার দৈন্য থেকে দেশকে মুক্ত করতে, দীনতা, মূঢ়তা ও পশ্চাদ্‌পদতার হাত থেকে সমাজজীবনের পরিত্রাণ ঘটাতে, সামাজিক ভেদাভেদ দূর করে নতুন সমাজ গঠন করতে। এসব ক্ষেত্রে তিনি সংস্কারে ব্রতী হয়েছিলেন যুক্তিবাদী মন নিয়ে, উদ্বোধন করেছিলেন সর্বমানবিক জাতীয়তাবোধের।
রবীন্দ্রনাথের ধর্মবোধও ছিল সর্বজনীন তথা সর্বমানবিক। আচারহীন, মন্ত্রহীন এমন এক ধর্মবোধ দ্বারা তিনি চালিত হয়েছেন যা সব ধরনের ধর্মান্ধতা মুক্ত, যা জাতি-বর্ণ-গোত্র ইত্যাদির ভেদাভেদ মানে না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সর্বজনীন ধর্মবোধের কথা প্রাঞ্জলভাবে ব্যক্ত করেছেন ‘মানুষের ধর্ম’ রচনায়। জানিয়েছেন – তাঁর ধর্ম ঐশ্বরিক নয়, তা একান্তই মানবীয়। রবীন্দ্রনাথের এই সর্বজনীন ধর্মবোধের জন্যই তাঁর প্রার্থনাসংগীতগুলি সর্ব ধর্ম-সমপ্রদায়ের অনুসারীরা নিজেদের প্রার্থনা সংগীত হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষে মানবমৈত্রীর পুরোধা প্রবক্তা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পররাজ্যগ্রাসী লিপ্সার বিরুদ্ধে তিনি মুখর হয়েছেন। বিজ্ঞানকে যারা মানব হত্যার হাতিয়ার করেছে তাদের ধিক্কার জানিয়েছেন। রাশিয়া সফর শেষে মানব কল্যাণে সোভিয়েত রাশিয়ার অবদানকে তিনি অকুণ্ঠভাবে ও পরম সম্মানে স্বীকৃতি দিয়েছেন। নতুন সমাজ বিনির্মাণে সেখানকার শ্রমজীবী মানুষের অবদানকে মহীয়ান করেছেন। আগ্রহী হয়েছেন সেখানকার অভিজ্ঞতার আলোয় দেশের পুনর্গঠনে।
আপন ঐশ্ব্বর্যের আলোয় রবীন্দ্রনাথ সদা দীপ্যমান। তিনি শুধু বাংলার নন, ভারতবর্ষের নন, তিনি সকল দেশের, সকল মানুষের গৌরব। তাঁর সমকালের এবং অনাগত কালের সকল মানুষের কাছে তিনি এক মহিমান্বিত পুরুষ। তাঁর চিন্তা, তাঁর সৃষ্টি ও তাঁর কর্ম বিশ্বের মানব জাতির পরম সম্পদ। তাঁর সাহিত্য ও শিল্প, মনন ও কর্ম সকল স্তরের মানুষের কাছে সর্বজনীন আকাশের মতোই উদার ও উন্মুক্ত। যেমন করে দান্তে ও শেকসপিয়র, কালিদাস ও বাল্মিকী, গ্যেটে ও তলস্তয় বিশ্ববাসীর অন্তরে চিরদিনের আসন পেয়েছেন, তেমনি করে রবীন্দ্রনাথও চিরদিন অমর হয়ে থাকবেন। বিশ্বসংস্কৃতি ও মানবতার জন্যে তাঁর দানের তুলনা নেই।
সেঁজুতি কাব্যগ্রন্থের ‘পরিচয়’ কবিতায় আপন পরিচয় দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন :
মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক,
আমি তোমাদেরই লোক,
আর কিছু নয়,
এই হোক শেষ পরিচয়।
সত্যিই রবীন্দ্রনাথ আমাদের সবার – সকল বাঙালির, সকল বিশ্ববাসীর।

x