সরগরম চট্টগ্রামের চলচ্চিত্র অঙ্গন

ইফতেখার আহমদ সায়মন

মঙ্গলবার , ৮ জানুয়ারি, ২০১৯ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
22

২০১৮ সালে বেশ জমজমাট সময় কাটছে চট্টগ্রামের চলচ্চিত্র অঙ্গনে। চট্টগ্রামের তরুণ চলচ্চিত্র প্রজন্ম ডিজিটাল প্রযুক্তির আশীর্বাদে বর্তমানে অনেক বেশি নির্মাণ তৎপর সময় পার করছে। এই বছরের শুরুতেই ছিল ‘চিটাগাং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ এর তৃতীয় আসর। এই আসরের সেরা ছবি হিসেবে এনামুল হক খান পরিচালিত ও ফুয়াদ নাসের প্রযোজিত শর্ট ফিল্ম ‘বাঁকা হাওয়া’ পুরস্কৃত হয়। আরও পুরস্কৃত হয় ফেব্রিস বারাখ পরিচালিত ও ফেব্রিস প্রিয়েল ক্লিস প্রযোজিত শর্ট ফিল্ম ‘এ হোল ওয়ার্ল্ড ফর এ লিটল ওয়ার্ল্ড’, সেরা অভিনেতা ফাহিম আরিয়ান (কাম ফ্রম বিদেশ) , অভিনেত্রী উংনি প্রু মারমা (লেটার টু গড) পরিচালক নাহিদা পারভিন (কন্তেমপ্লেশন)। গত তিন বছর ধরে চট্টগ্রামে নিয়মিত এই আয়োজন বেশ সাড়া জাগাতে সক্ষম হচ্ছে। এছাড়াও ‘চিটাগাং শর্ট’ তাদের সিনে বিষয়ক প্রকাশনা ‘আই’ প্রকাশ করছে নিয়মিত বিরতিতে। এই বছরে প্রথম আয়োজনেই সাড়া জাগায় ‘দৃশ্যছায়া’ আয়োজিত চট্টগ্রাম ইনডি ফিল্ম ফেস্ট’। গত ১৯ এপ্রিল সারাদিনব্যাপী আয়োজনে শর্ট ফিল্ম দেখানোর পাশাপাশি দেশভাগের উপর এদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত আলোচিত প্রামাণ্য চিত্র ‘সীমান্তরেখা’ এর চট্টগ্রামে প্রিমিয়ার শো প্রদর্শিত হয়। এইদিন বিশ্ব গণহত্যা ও সামপ্রতিক রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে তরুণ নির্মাতা ইফতেখার আহমদ সায়মন নির্দেশিত নিরীক্ষাধর্মী ডকু ফিকশন প্রদর্শিত হয়। আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে ছিল অ্যাওয়ার্ড নাইট। বারোটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কৃত হয় ‘বিবর্তন’ ( সেরা চিত্রনাট্য, শিল্প নির্দেশনা, সেরা চলচ্চিত্র) ‘আংটি’ ( সেরা আবহ, সেরা অভিনেত্রী), ‘গরল অমৃত’ ( সেরা চিত্রগ্রহণ, সেরা সম্পাদনা), সেরা পরিচালক (আই এম হাংরি’), সেরা অভিনেতা (এডভেঞ্ছারার)। দৃশ্যছায়া থেকে অভিনয় শিল্পী শাহিনুর সরওয়ারকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। এছাড়াও গত ২ জুন দৃশ্যছায়া- এর আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে ‘জীবনের চলমান চিত্র’ শীর্ষক শর্ট ফিল্ম প্রদর্শনী ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। ১৬-১৮ অগাস্ট তিন দিন ব্যাপী দক্ষিণ এশীয় প্রামাণ্য চিত্র উৎসব- এর তৃতীয় আসর বিদগ্ধ চলচ্চিত্র অনুরাগীদের প্রশংসা কুড়ায়। বিস্তার চিটাগাং আর্টস কমপ্লেঙ- এর দ্বিবার্ষিক এই আয়োজনটিতে এবার তরুণ প্রজন্মের চলচ্চিত্র কর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। ‘ছবিকথা’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রকাশনা দিয়ে নিজেদের আবির্ভাব প্রকাশ করলো নাগরিক চলচ্চিত্র সংসদ। এছাড়াও গত ১৩ অক্টোবর বিশিষ্ট চলচ্চিত্র চিন্তক-শিক্ষক-নির্মাতা রফিকুল আনোয়ার রাসেল এর পরিচালনায় ‘সিনেমায় গল্প বলা ও চিত্রনাট্য রচনা’ শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করে এই চলচ্চিত্র সংগঠনটি। গত ১০-১৬ আগস্ট এস এম সুলতান পাঠ চক্র নগরীর চারুকলা ইন্সিটিউট- এ আয়োজন করে তারেক মাসুদ চলচ্চিত্র সপ্তাহ। এই আয়োজনে তারেক মাসুদ নির্মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ছাড়াও ছিল তাকে নিয়ে আলোচনা, স্মারক বক্তৃতা ও প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনী। ‘চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ বছর ব্যাপী সক্রিয় ছিল তাদের কার্যক্রম দিয়ে। তন্মদ্ধে অক্টোবর মাসে বরেণ্য চলচ্চিত্রকার ইঙ্গমার বার্গম্যান- এর স্মরণে আঁলিয়স ফ্রঁসেস চট্টগ্রামের সাথে যৌথ আয়োজনটি উল্লেখযোগ্য। গত ১৬ নভেম্বর এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি ফিল্ম ক্লাবের আয়োজনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবটি বেশ উৎসব মুখর পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিসেফ এর উদ্যোগে গত ২৮ নভেম্বর থেকে গত ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের আয়োজনে ক্ষুদে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য বিশেষ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া এই বছরটি চট্টগ্রামের দুই অগ্রজ চলচ্চিত্র কর্মী এর জীবনে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। কারণ ২০১৮ সালেই শৈবাল চৌধূরী নির্মিত প্রথম কাহিনীচিত্র ‘ভূমিকম্পের পরে’ এবং সত্যজিৎ গবেষক আনোয়ার হোসেন পিন্টু নির্মিত প্রথম কাহিনীচিত্র ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’ মুক্তি পায়। তরুণ প্রজন্মের নির্মাণ যজ্ঞের সাথে অগ্রজ এই দুই গুণী চলচ্চিত্র কর্মীর নব উদ্যমে সম্পৃক্ততা প্রশংসার দাবীদার। নির্মাতা ওয়াহিদ তারেক নির্মিত চলচ্চিত্র ‘আলগা নোঙ্গর’ এবং আব্দুল গফুর হালি এর রচনা অবলম্বনে পংকজ চৌধুরী রনি নির্মিত চলচ্চিত্র ‘গুলবাহার’ এর শুটিং পর্ব ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এবং বছরের একেবারে শেষে এসে আমরা দেখতে পেলাম গুণী শিল্পী দিলারা বেগম জলির নির্মাণে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘জঠরলীনা’। বিস্তারের শিল্পোৎসবে এটি প্রথমবার প্রদর্শিত হয়। এবং এর নির্মাণশৈলী সুধীমহলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিস্তার সিনে ক্লাব তাদের নিয়মিত পাক্ষিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী অব্যাহত রাখার মাধ্যমে কিছু চমকপ্রদ বিশ্ব চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ করে দিয়ে যাচ্ছে। ফিনলে স্কয়ারের টপ ফ্লোরে চট্টগ্রামের প্রথম সিনেপ্লেঙ হিসেবে সিলভার স্ক্রিন সিনেপ্লেঙ ২০১৮ সালের ঈদ থেকে যাত্রা শুরু করে। চট্টগ্রামে ভালো পরিবেশে সিনেমা উপভোগ করার জন্য এটা প্রথম প্রয়াস হিসেবে সাধুবাদ পেতেই পারে। এর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন সিনেমা হল আরও নির্মাণ করা হলে আখেরে সেটা চট্টগ্রামে চলচ্চিত্র চর্চার ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করবে বলেই মনে হয়।

x