সরকারি হাসপাতালগুলোতে নজরদারি জরুরি

দিদার আশরাফী

বৃহস্পতিবার , ৩১ মে, ২০১৮ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ
34

মানুষের মৌলিক অধিকার হচ্ছে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। এ পাঁচটি অধিকার মানুষের জীবনে বাস্তবায়ন করা নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র কী পরিপূর্ণভাবে এ পাঁচটি অধিকার বাস্তবায়ন করতে পেরেছে? না সম্ভব হয়নি। তবে এ ক্ষেত্রে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সরকার আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

প্রসঙ্গত, শিক্ষা খাত নিয়ে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি কারো অজানা নয়। মাথার ওপর একটি ছাদের স্বপ্নও অনেকের জন্য অলীক কল্পনা মাত্র। ন্যূনতম পোশাকের নিশ্চিয়তাও সবার নেই। একইভাবে চিকিৎসা একটি সেবামূলক পেশা হলেও এখন তা বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে স্বাস্থ্যখাত। সরকারি কিংবা বেসরকারি চিকিৎসা খাতের চরম অরাজকতা, অব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাচারিতায় জিম্মি অধিকাংশ মানুষ। মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হয়েও এ বিষয়ে কারো কাছে অভিযোগ করার কোনো উপায় নেই। সামর্থ্যবানরা দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করালেও যাদের সেই সামর্থ্য নেই তাদের বাধ্য হতে হয় এসব চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র মোটা অংকের অর্থ ছাড়া কোনো ধরনের সেবাই দেয় না। এমন কি অর্থের বিনিময়েও অনেক সময় সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যায় না। কারণ যারা এসব তৈরি করেছে তারা চিকিৎসা প্রদানকে নয় বাণিজ্য হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। তবে আশা জাগানিয়া হচ্ছে সরকারিভাবে পরিচালিত মেডিকেল কলেজ হাসপাতাগুলো নানাবিধ সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী ব্যাপক কর্মসূচী নিয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে সরকার সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যলয় রূপে বাস্তবায়ন করেছে। এটি চট্টগ্রামবাসীর জন্য দারুণ সুসংবাদ।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে চিকিৎসাসেবা : সুশাসনের উপায়’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতে বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা প্রকট। বেসরকারি চিকিৎসা সেবায় সরকারের যথাযথ মনোযোগের ঘাটতি রয়েছে। এতে একদিকে এটি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে কিছু ব্যক্তির এ খাত থেকে বিধিবহির্ভূত সুযোগসুবিধা আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। গবেষণায় বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে একটি স্বাধীন কমিশন তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। গবেষণায় দেশের বিভিন্ন জেলায় নিবন্ধিত ১১৬টি (হাসপাতাল ৬৬টি এবং রোগ নির্ণয় কেন্দ্র ৫০ টি) বেসরকারি চিকৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বেসরকারি চিকিৎসা খাতের চিত্র তুলে ধরা হলেও ভুক্তভোগী মাত্র এ বিষয়ে ভালোভাবে ওয়াকিবহাল। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, স্বাস্থ্য কেন্দ্র নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মোটা অংকের অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। এই অর্থের পরিমাণ পাঁচ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলেও প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। নিবন্ধন নবায়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের লেনদেন হয় এমন অভিযোগ রয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা কিংবা আইন না থাকায় রোগীর অবহেলা হলে ও ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ করার কোন জায়গা নেই। বরং এ ধরনের পরিস্থিতিতে রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকদের মধ্যে বাকবিতন্ডা ও হাতাহাতির ঘটনায় আমরা বেশি দেখি। পরবর্তীকালে চিকিৎসকদের ধর্মঘট আরো বিপদগ্রস্ত অবস্থায় ফেলে দেয়। বেসরকারি চিকিৎসা খাত সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতি পর্যালোচনা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, এসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাসেবা, বেসরকারি চিকিৎসাসেবার বিপণন ব্যবস্থা, তথ্যের স্বচ্ছতা, তদারকির বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি এই গবেষণা প্রতিবেদন চিকিৎসা খাতের যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে তা এক কথায় উদ্বেগজনক। এতে রোগীরা যেমন দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে তেমনি তুলনামূলক কম সামর্থ্য বানরা দিনে দিনে আস্থা হারাচ্ছে। সে সঙ্গে দেশীয় অর্থও দেশের বাইরে ব্যয়িত হচ্ছে। এটি নিশ্চয়ই বিবেচনায় রাখা দরকার। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে স্ব্যস্থ্যসেবা পাওয়া যে কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকারকে কোনো মহল ব্যবসায়িক লাভবানের বিষয়ে পরিণত করলে তা রাষ্ট্রের মূলনীতির পরিপন্থী কর্মকান্ড বলেই পরিগণিত হবে বলে মনে করি। সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে আন্তরিক নজরদারি করলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে বাধ্য। এছাড়া সরকারি হাসপাতালগুলো স্বাস্থ্যসেবায় যেসব অপকর্মকারীরা লুটেপুটে খাচ্ছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে বাধা কোথায়? অনুগ্রহপূর্বক এ ব্যাপারে রাষ্ট্রকে গুরুত্বের সাথে সরকারি হাসপাতালগুলো নজরদারিতে আনা জরুরি।

x