সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় কমাতে দুর্নীতি ও অপচয় পুরো বন্ধ করতে হবে

শুক্রবার , ১ জুন, ২০১৮ at ৪:২৩ পূর্বাহ্ণ
51

বাংলাদেশে সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কিলোওয়াট প্রতি নির্মাণ ব্যয় বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও বেশি। একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়ার আগে পর্যন্ত সব খরচকেই মূলধনি ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়। ভূমি অধিগ্রহণ, অনুমোদন, আইনি বিভিন্ন প্রক্রিয়া, যন্ত্রপাতি ক্রয়, নির্মাণ কাজ ও কমিশনিং অর্থাৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা পর্যন্ত সব ধরনের ব্যয়ই এর মধ্যে পড়ে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র খোঁজার চেষ্টা করেছেন যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন গবেষক। তুলনামূলক বিশ্লেষণে তারা দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কিলোওয়াট প্রতি মূলধনি ব্যয়ের উল্লিখিত হিসেবই। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সর্বনিম্ন মূলধনি ব্যয় চীনে কিলোওয়াট প্রতি ৫৬৮ ডলার। একই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কিলোওয়াট প্রতি বৈশ্বিক গড় ব্যয় ৯৭৪ ডলার। যদিও বাংলাদেশে সরকারিভাবে একই প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কিলোওয়াট প্রতি মূলধনি ব্যয় হচ্ছে ৫৪৫ থেকে ৩ হাজার ৫ ডলার বা গড়ে ১ হাজার ১৬৪ ডলার। অর্থাৎ কম্বাইন্ড সাইকেল প্রযুক্তির সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ব্যয়ের মধ্যে যে ফারাক, তা দিয়ে চীনে একই প্রযুক্তির দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সম্ভব। গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বৈশ্বিক মূলধনি ব্যয় কিলোওয়াট প্রতি গড়ে ৫৫১ ডলার। আর বাংলাদেশে সরকারিভাবে এ প্রযুক্তির গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কিলোওয়াট প্রতি ব্যয় গড়ে ১ হাজার ১৭৭ ডলার। সরকারিভাবে নির্মাণ করতে গিয়েই বেশি ব্যয় হচ্ছে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। এছাড়া সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কিলোওয়াট প্রতি বৈশ্বিক মূলধনি ব্যয় হচ্ছে গড়ে ১ হাজার ৬০০ ডলার। একই প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশ কিলোওয়াট প্রতি গড়ে ৩ হাজার ৩৪৩ ডলার ব্যয় হচ্ছে।
আমরা ভেবে অবাক হই, যখন দেখা যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে কমে এলেও বাংলাদেশে বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মূলধনি ব্যয় বাড়ছে। বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, মূলধনি বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বাংলাদেশে বেশি। এজন্য সরকারকে বিদ্যুতে বড় ধরনের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বছরের পর বছর। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কিলোওয়াট প্রতি গড় মূলধনি ব্যয় বাংলাদেশে বেশি কেন, তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা সরকারের তরফ থেকে পাওয়া যায় নি, বরং ব্যয় বেশির অভিযোগ অস্বীকার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। আমরা চাই যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন গবেষকের গবেষণাটি আমলে নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয়ের বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পর্যালোচনা করবে। ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে অনেকে প্রায়শ দুর্নীতির অভিযোগ করে থাকেন, কেউ কেউ আবার দক্ষতা ও সক্ষমতার ঘাটতির কথাও তোলেন। কোন কারণ বা কারণগুলো আসলে দায়ী, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এটাই জরুরি। মূলধনি ব্যয় কমে এলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে সরকারকে ঘন ঘন ব্যয় বৃদ্ধি করে জনগণের কাছে অপ্রিয় হতে হবে না।
বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় বেশি হওয়ার পেছনে সমঝোতার মাধ্যমে বিনা টেন্ডারে নির্মাণ কাজ দেয়ার মতো ঘটনা প্রভাবিত করেছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা দরকার। এক্ষেত্রে কারো যোগসাজশ থাকলে তা বন্ধ হওয়া খুবই প্রয়োজন। তাছাড়া টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গলদের কারণেও ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। আবার এটাও স্বীকৃত যে, সময়ক্ষেপণের কারণেও বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে মূলধনি ব্যয় বেড়ে যায়। জমি অধিগ্রহণে দুর্বল অবকাঠামো, অর্থ ছাড়ে ধীরগতি ও জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক মার-প্যাঁচ ইত্যাদি কারণেও যন্ত্রপাতি আমদানি থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। অনেক সময় টেন্ডারেই ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ করে দেয়া হয় বলে জানা যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বিলাসবহুল গাড়ি, আবাসস্থল নির্মাণ, আপ্যায়ন ও মিটিং ভাতা প্রদানেও ব্যাপক অর্থ অপচয় হয়; যা বেসরকারি খাতে হয় না।
বিদ্যুতের মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী চলতি বছর থেকেই এর দাম কমিয়ে আনার কথা। কিন্তু সে আশা শীঘ্রই পূরণ হবে বলে মনে হচ্ছে না। কোন বড় প্রকল্প দ্রুততম সময়ের মধ্যে উৎপাদনে আসার সম্ভাবনা নেই। একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। এতে ব্যয় আরো বেড়ে উঠছে। সংশ্লিষ্ট গবেষণাটি ২০১৫ সালে করা হয়েছে। এরই মধ্যে তিন বছর চলে গেছে। স্বভাবতই প্রকল্প ব্যয় আরো বেড়েছে। কথা হলো, যে দেশে শ্রমের দাম সস্তা, সে দেশে প্রকল্প ব্যয় বেশি কেন? বস্তুতঃ দুর্নীতি ও অনিয়ম এজন্য দায়ী। দরপত্রে প্রতিযোগিতা নেই বলেই খরচ বেশি হয়। এটি দুর্নীতিরই একটি অংশ। কোন প্রকল্প নেয়ার সময় বাস্তব অবস্থা, প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ভালোভাবে বিবেচনায় না নিয়ে অত্যধিক ব্যয়বহুল প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া উচিত নয়। কিছু প্রকল্পে গভীর মনিটরিং ছাড়া চাওয়া মাত্রই ব্যয় ও সময়সীমা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে কিছু অসাধু ব্যক্তি তাদের পকেট ভারি করার চেষ্টা করে। সুষম উন্নয়নের স্বার্থে প্রকল্পের মেয়াদ ও অর্থের সীমার ব্যাপারে কঠোর হওয়া অপরিহার্য। বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নের জন্য প্রণীত মহাপরিকল্পনায় সরকার স্বল্প দামে সব মানুষের কাছে বিদ্যুতের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় বেশি হওয়ায় সে অঙ্গীকার রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় কমিয়ে আনতে দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে। এতে বিদ্যুৎ খাত টেকসই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।

x