সম্মতিকাহন

জান্নাতুল ফেরদৌস ফেন্সি

শনিবার , ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪৯ পূর্বাহ্ণ
153

প্রায়শই পত্রিকায় দেখি অমুকের ‘অসম্মতি’ সত্ত্বেও…, এই সময় ‘সম্মতি’ নেওয়া হয়নি…, অমুকের ‘অনিচ্ছা’ সত্ত্বেও…ইত্যাদি বাক্য সংবলিত খবর বেরোয়। প্রাথমিকভাবে বোঝা যায় এটি অর্থাৎ এই সম্মতি না নেওয়া একটি গর্হিত কাজ, তারপরেই আসছে লৈঙ্গিক বিষয়টি। মানে এর ভিকটিম কারা? উত্তরটি অনুমেয়, ভুক্তভোগীর লৈঙ্গিক পরিচয় নারী। অবশ্য তর্কের খাতিরে এ-ও হলফ করে বলে রাখতে চাই, একমাত্র নারীরাই ভিকটিম নন, হাতেগোনা দুয়েকজন পুরুষও তালিকায় থাকবেন। কিন্তু সমস্যাটি যাদের জন্য বিষফোঁড়া পুরোভাগে তাদেরকেই তো চিন্তায় স্থান দিতে হবে।
সাধারণ অর্থে সম্মতি শব্দটি কোন একজনের প্রস্তাব বা মতের সাথে একমত পোষণ করাকে বোঝানো হয়। তবে বিভিন্ন বিষয় ও প্রেক্ষাপট ভেদে সম্মতি শব্দের অর্থ ভিন্ন অর্থ হতে পারে। আইন, চিকিৎসা এবং যৌন সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ভেদে সম্মতি শব্দের ব্যবহার ভিন্ন। সম্মতির বিভিন্ন প্রকারভেদের মধ্যে রয়েছে- পরোক্ষ সম্মতি, প্রত্যক্ষ সম্মতি, জ্ঞাত সম্মতি এবং সাধারণ সম্মতি। আইনত, মানসিক পরিপক্কতা ও সুস্থতা সম্মতি প্রদানের অন্যতম শর্ত। দেশ ও রাষ্ট্রভেদে সম্মতি প্রদানের আইনগত বয়সও ভিন্ন হয়ে থাকে। প্রসঙ্গক্রমেই সম্মতির প্রকারভেদগুলো আমরা বিশদে জেনে নিতে পারি –
হ পরোক্ষ সম্মতি ব্যক্তির আচরণ কিংবা কার্যক্রম দিয়ে ফুটে উঠে। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে একজনের নিশ্চুপ থাকা কিংবা কোন প্রতিবাদ না করা দিয়ে প্রায়ঃশই মৌন সম্মতি বা পরোক্ষ সম্মতিকে ইঙ্গিত করে। উদাহরণ হিসেবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন মেনে চলা সেই নিয়মকানুনের প্রতি শিক্ষার্থীদের পরোক্ষ বা মৌন সম্মতি বোঝায়।
হ প্রত্যক্ষ সম্মতি পরিষ্কারভাবে মুখ ফুটে বলা হয় কিংবা দলিলে লিখে প্রকাশ করা হয়। এতে ভুল বোঝার কোন অবকাশ নেই। কোন ক্ষেত্রে মৌনভাবে শারিরীক অংগভঙ্গির মাধ্যমেও অলিখিতভাবে প্রত্যক্ষ সম্মতি প্রয়োগ সম্ভব। যেমন মাথা নেড়ে সম্মতি জ্ঞাপন। অলিখিত প্রত্যক্ষ সম্মতি কোন ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং প্রমাণ ছাড়া গৃহিত হলে ব্যক্তি পরবর্তীতে তা অস্বীকার করতে পারেন।
হ জ্ঞাত সম্মতি চিকিৎসাক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত। একজন রোগী সবকিছু জেনেবুঝে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ফলাফল মাথায় রেখেই চিকিৎসার জন্য সম্মতি প্রদান করেন। অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই সম্মতির ব্যবহার হয়।
হ সাধারণ সম্মতি সাধারণত অন্যান্য সকল দল একটি নির্দিষ্ট নতুন দলকে দিয়ে থাকে।
হ একজন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বা অপারগতায় আরেকজন তার হয়ে সম্মতি প্রদান করাকে বিকল্প সম্মতি বলে।
এ-তো গেলো সম্মতি বিষয়ক প্রাককথন যাতে আমরা সম্মতির প্রয়োজন এবং উপযোগীতাসমূহ বুঝতে পারি। এবারে একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। আদ্যিকালের একটি গল্প পড়ুন। আজ থেকে প্রায় ১৩০ বছর আগে এই বাংলার মাটিতে একটি অতি সামান্য ঘটনা ঘটেছিল৷ এগারো বছর বয়সের একটি মেয়ে, নাম ফুলমণি, মারা যায়। কারণ তার পঁয়ত্রিশ বছরের স্বামী হরিমোহন মাইতি এমন বালিকাবধূকে পেয়ে নিজেকে আর সামলাতে পারেনি, ফলে তার স্বামীত্বের অধিকার ফলাতে গিয়েছিল গায়ের জোরে। ফলস্বরূপ ওই মৃত্যু। তা এমন তো প্রায়ই ঘটত সে সময়ে, আজও ঘটে রেখেঢেকে। কিন্তু এই সামান্য ঘটনাটি এতটাই প্রচারে আসে, নেতিবাচক প্রচারে, যে সে-সময়কার ব্রিটিশরাজ নড়ে চড়ে বসে। তাদের উদ্যোগে ১৮৯১ সালে পাশ হল ‘এজ অফ কনসেন্ট’ বিল, যৌন সম্পর্কে মেয়েদের সম্মতির বয়স করা হল বারো। ব্রিটিশরা এই আইন পাশ করায় রেগে গেল হিন্দু নেতারা। বলল, হিন্দু সংস্কৃতির উপর আঘাত হানছে এই আইন। ব্যাপারটা আর যাই হোক নেহায়েত পারিবারিক!
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ‘এজ অফ কনসেন্ট বা সম্মতির বয়স’ নামের একটা আইন এই ভূখণ্ডে ১২৮ বছর ধ’রে বিদ্যমান! কী এই এজ অব কনসেন্ট? এইজ অব কনসেন্ট মূলত যৌন মিলনে সম্মতি প্রদানের নূন্যতম বয়সকে বোঝায়। আইনগতভাবে যৌন মিলনে সম্মতির ন্যূনতম বয়স দেশ, কাল ও সমাজ ভেদে ভিন্ন। শিশু ধর্ষণ ও শিশু পর্নোগ্রাফি রোধে একবিংশ শতাব্দীতে প্রায় সকল আধুনিক দেশেই এজ অব কনসেন্ট নির্ধারিত আছে। যৌন মিলনে সম্মতি যেকোন যৌন সম্পর্কে গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেকোন ধরনের যৌন কার্যক্রম সম্মতি ব্যাতিরকে যৌন অপরাধ ক্ষেত্রেবিশেষে ধর্ষণ বলে গণ্য হয়। ১৯৮০ সালের শেষের দিকে লুইস পিনেউ যৌন সম্মতির ক্ষেত্রে যোগাযোগের প্রাধান্যতায় জোর দেন। তিনি সর্বপ্রথম ‘হ্যাঁ মানে হ্যাঁ এবং না মানে না’ মডেলের প্রবর্তন ঘটান।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের আইনে ‘এইজ অব কনসেন্ট’-এর সুস্পষ্টতভাবে কোনো উল্লেখ নেই। তবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ২ (ট) ধারায় শিশুর সংজ্ঞায় “শিশু” অর্থ অনধিক ষোল (১৬) বৎসর বয়সের কোন ব্যক্তি উল্লেখ করা হয়েছে। আবার, ভিন্ন একটি আইনে (বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭) – ‘শিশু’ শব্দটির বদলে ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এবং সংজ্ঞায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘অপ্রাপ্ত বয়স্ক’ অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ (আঠারো) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনো নারী এবং ‘প্রাপ্ত বয়স্ক’ অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর পূর্ণ করিয়াছেন এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ (আঠারো) বৎসর পূর্ণ করিয়াছেন এমন কোনো নারী। অন্যদিকে শিশু আইন ২০১৩ এর ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী ‘অনুর্ধ্ব ১৮ (আঠার) বৎসর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসাবে গণ্য হইবে’। অবশ্য আইনে বিশেষ ক্ষেত্রে কমবয়েসী শিশুর বিবাহকে আইনত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে! দেখুন সেই ফ্যাকরাটি কিরকম। আমরা জানি ‘বাল্যবিবাহ’ মানে এমন বিবাহ যার কোন এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ অপ্রাপ্ত বয়স্ক। অর্থাৎ সাধারণভাবে বিয়ের জন্য ধার্য্যকৃত বয়েসী নয়। কিন্তু নতুন এই আইনটিতে বিশেষ বিধান নামে একটি ধারা (ধারা ১৯) যুক্ত করে আরো কমবয়েসী শিশুদের বিয়ের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। ধারা ১৯ অনুযায়ী, ‘এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, বিধি দ্বারা নির্ধারিত কোন বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্ত বয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিক্রমে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে, বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না।’ শুভঙ্করের ফাঁকি মনে হচ্ছে পাঠক? এহেন আইনী ভিন্নতার জন্য, বাংলাদেশে এজ অব কনসেন্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুযায়ী ১৬ বছর কিন্তু নতুন বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭[৮] অনুযায়ী, বিশেষক্ষেত্রে ১৩ বছরের বেশি বয়সী শিশুকে বিবাহ করা ও যৌন সম্পর্ক স্থাপন করায় কোন আইনী বাঁধা নেই।
পাঠক খেয়াল করলে দেখবেন ‘সম্মতি’ বিষয়ে এই লেখাটি শুরু হলেও আমরা ‘বাল্যবিয়ে’ বিষয়েই মুখর হচ্ছি। হবো না কেনো? এইবিষয়ক আইনটিই যে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো টনটন করছে। কেননা সমাজে বৈধ যৌনতা এবং পারিবারিক শোষন-নিপীড়নের গ্রীণ সিগন্যাল তো জ্বালিয়ে রাখছে এমন বিব্রতকর আর ভুলেভরা আইন-ই। যেখানে আইনী বৈধতাই মিলছে সেখানে সম্মতির মতো কাগুজে বিষয়কে পরোয়া করে কোন পুরুষ? একটি স্বাধীনদেশে এতোবছরেও একটি পূর্ণাঙ্গ এবং স্বকীয় ‘এজ আব কনসেন্ট’ অনুপস্থিত কেনো?
ভিতরের কথা হল, পুরুষ যা চাইবে তা-ই হবে। যৌনতায় মেয়েদের সম্মতি, সেটা আবার কী? ফুলমণিকে হত্যায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল হরিমোহন। কিন্তু ধর্ষণের অভিযোগ তার ক্ষেত্রে খাটেনি। কারণ দাম্পত্যে ধর্ষণ বলে কি কিছু হয় ? ওই ঘটনার ১৩০ বছর পরে এই ২০১৯ সালেও এই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক। দাম্পত্যে ধর্ষণ বলে কিছু হয় কি ? স্বামীকে কি ধর্ষণে অভিযুক্ত করা যায়? যৌনতায় মেয়েদের সম্মতির তাৎপর্য কী? সহবাসে? বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি কেউ সহবাস করে কোনও নারীর সঙ্গে এবং পরে যদি সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়, তা হলে তাকে ধর্ষণ বলা যায় কি? যদি না যায়, তা হলে সে সম্মতির মূল্য কী ? ‘সম্মতি’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হল অনুমতি দেওয়া বা সমর্থন করা। কিন্তু অনুমতি দেওয়া এবং সমর্থন করা বিষয় দু’টি পরস্পরের বিপ্রতীপে অবস্থান করে৷ যদি ধরে নেওয়া হয়, যৌনতার ক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষ, এই দু্‌ই পক্ষের মধ্যে সম্মতি এবং অনুমতির সম্পর্কটি বর্তমান তাহলে কাউকে হতে হয় কর্তা, কাউকে কর্ম। ধরে নিই, অনুমতি বিষয়টির মধ্যে যে কর্তৃত্বের বোধ নিহিত রয়েছে, সমর্থনের মধ্যে তা নেই। সুতরাং দু’টি পক্ষের মধ্যে আধিপত্যের রাজনীতিটি নির্ণীত হয়, কে অনুমতি দিচ্ছে, কে তাতে সমর্থন করছে তা দিয়েই। যদি ধরে নেওয়া যায়ং, যৌনতার ক্ষেত্রে শরীর নামক ক্ষেত্রটি এই অনুমতি ও সমর্থনের ক্রিয়াস্থল, তাহলে প্রশ্ন ওঠে নিজের শরীরের উপর কার কতোটা অধিকার এবং অপর তথা অন্য শরীরটির উপরেও। পুরুষের শরীরের উপর তার নিজের ও নারীর এবং নারীর শরীরের উপরে তার নিজের ও পুরুষের অধিকারের তুল্যমূল্য বিচার করলে সূক্ষ্মতম রায় অবধি অপেক্ষা করার প্রয়োজন পড়বে না৷ উত্তরটা জানা। এত সহজে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কারণ হল, যৌনতায় সম্মতির প্রশ্নটি যখন ওঠে তখন ধরে নেওয়া হয়, আমরা মেয়েটির সম্মতির কথাই বলছি। সাধারণ ধারণায় যৌনতার ক্রিয়াটি কার্যত একটি পুরুষবাচক ক্রিয়া…কে প্রত্যক্ষ আর কে পরোক্ষ, কে সক্রিয় আর কে নিষ্ক্রিয়, কে দাতা আর কে গ্রহীতা, এই হিসেব দিয়েই তা নির্ণীত।
এ-তো গেলো সম্মতির একদিক। এর বাইরেও নারীর সম্মতি বহুধা বিস্তৃত। পারিবারিক সিদ্ধান্তে, সামাজিক যোগাযোগে, আচার-অনুষ্ঠানে, অফিসপাড়ায় এবং এমতন বহুক্ষেত্রে নারীর সম্মতি নেওয়ার বিষয়টি বেমালুম ভুলে যাওয়া হয়। যেন এটি কোনো জিজ্ঞাস্য ব্যাপারই নয়। সমাজের সর্বস্তরে এই এড়িয়ে যাওয়ার, বিষয়টিকে অবজ্ঞা করার লক্ষণ পরিষ্কার। হয়তো এ-বিষয়ক একটি সুনির্দিষ্ট আইন থাকলে হালে কিছুটা হাওয়া লাগতো। তর্কের খাতিরে কেউ বলতেই পারেন, যা হয়নি শত বছরে তা হবে এক আইনে! হ্যাঁ, আইন হয়তো মানুষের শতবছরের গোঁড়ামি আর অপসংস্কার বদলাবে না কিন্তু নীপিড়িত-নিগৃহিত নারীরা এতে এমন একটি শক্তি পাবে যা তাদের আগামীর পথচলাকে সুসংহত করবে। দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের কি সময় হবে এদিকে দৃষ্টি ফেরাবার?

x