সম্পর্ক: ভোগ-উপভোগ

রিমঝিম আহমেদ

শনিবার , ২২ জুন, ২০১৯ at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ
60

সেদিন এক মেয়ের সাথে কথা হচ্ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। মেয়েটি কবিতা লেখে, চিন্তাভাবনাও ভালো দেখেছি। তার দীর্ঘদিনের প্রেম ভেঙে যাচ্ছে। মানসিকভাবে তাকে খুব বিপর্যস্ত মনে হল। মানসিক চাপ থেকে হালকা হতেই সে শেয়ার করছিল। মনোযোগ দিয়ে শুনলাম তার কথা। কথার এক পর্যায়ে তার অধিক কষ্ট পাওয়ার কারণ বুঝাতে গিয়েই বলল- ছেলেটার সাথে তার শারীরিক সম্পর্ক হয়ে গিয়েছে তাই সরে আসা সম্ভব নয়।
আমি তাজ্জব হলাম। একজন কবি, এত ভালো তার চিন্তা, চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে যার নাড়াচাড়া তার ভেতরেও এমন চিন্তার বীজ প্রোথিত! তাহলে সমাজের প্রান্তিক নারীরা তো এদের থেকে এগিয়ে আছে! কারণ বেঁচে থাকাটাই যাদের কাছে মুখ্য, এসব শারীরের শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা, পাপ-পুণ্যে নজর রাখার অবকাশ তাদের নেই বলেই মনে হল আমার পর্যবেক্ষণে।
রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে অসংখ্য পুরুষের মুখ থেকে উড়ো-কথা কানে আসে। কথাগুলো অনেকটাই নারীর শরীর-কেন্দ্রিক। শারীরিক অঙ্গের আকার-আকৃতি, স্পর্শ কিংবা সেঙ নির্ভর। এক্ষেত্রে যে পুরুষটি উত্যক্ত করবার উদ্দেশ্যে কানের কাছে কথাগুলো ছুঁড়ে দিল সে এক অদ্ভুত বিকৃত আনন্দ পেল আর যে নারীকে লক্ষ্য করে বলা হল সে বিব্রত হল, বিরক্ত হল, অপমানিত হল। পরিস্থিতি নির্ভর করে দুটি লিঙ্গের উপর ভর করে। নারী এবং পুরুষ। সেখানে নারী-পুরুষের সামাজিক অবস্থানটাও গৌণ। যে নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, যে ব্যাংকার কিংবা সাংবাদিক তাকেও এসব পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি এমনটা হলফ করে বলা যায় না। আবার উত্যক্তকারী সমাজের নিম্নবিত্তের, লেখাপড়া না-জানা মানুষ হয়েও পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া নারীকে উত্যক্ত করবার সাহস করে কারণ অবস্থান যা-ই হোক সে নিজে পুরুষ, সমাজ তাকে একটা লৈঙ্গিক ক্ষমতা প্রচ্ছন্নভাবে দিয়ে রেখেছে এবং সমস্ত কিছুর পরও পুরুষকে লজ্জা পেতে নেই উপরন্তু যাকে বলা হচ্ছে- সে নারী। নিজেকে প্রোটেক্ট করতে পারে না। লজ্জায় কাউকে এসব কথা বলতে পারবে না বা বলে না। ফলে পুরুষতন্ত্রের সুবিধা নিয়ে উত্যক্তকারী পুনরায় অন্য কোনো অপরাধের দিকে ধাবিত হয়।
আমাদের সমাজ নারী-বান্ধব নয় সেটা আমরা জানি। কিন্তু এই শহরটাও নারীর নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য এখনো প্রস্তুত নয়। বস্তুত বাংলাদেশের কোনো শহর-গ্রামই প্রস্তুত নয়। ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’ কথাটাই সর্বাঙ্গে সত্য। আলো নিভে যাওয়ার সাথে সাথেই নারীর জন্য বিপদসংকুল হয়ে ওঠে পথঘাট। তবে নারীর দুঃখ তার শরীর এই প্রথা থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে যদি চিন্তাকে প্রসারিত করা যায়। এবং সর্বপ্রথম নারীকেই তা করতে হবে।
চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করে, কবিতা লিখে যে মেয়েটি শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে বলে প্রেমিকের অবহেলা, অপমান আর নির্যাতন সহ্য করছে বছরের পর বছর, এবং তার সাথে সব হয়ে গেছে-এই অজুহাতে পচে যাওয়া সম্পর্কটাকে বিয়ে পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবে তাকে আমার করুণা করতে ইচ্ছে হয়। নিজেকে এঁটো ভাবার মনোভাব যতদিন থাকবে, নারীর উপর পুরুষদের আধিপত্য বজায় থাকবে। রিকশাওয়ালা গলির মোড়ে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে শুধুমাত্র নারী বলেই অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে উত্যক্ত করবে। বাঙালি নারী খাদ্যবস্তু থেকে বের হতে পারেনি একুশ শতাব্দীতে এসেও; সেটা যেমন পুরুষের ভাবনায় তেমনি নারীর নিজের ভাবনায়ও। খাবার এঁটো হয়, শরীরকে খাবার গণ্য করা মানুষ নারীকে তাই এঁটো ভাবে। সেখানে পুরুষ সমাজের চোখে ভোক্তা, নারী পণ্য, বস্তু এবং অবশ্যই খাদ্যবস্তু। যা বাসি হয়, নষ্ট হয় এবং পচে গন্ধ হয়। খাদ্যবস্তুর মধ্যেও কিছু ক্যাটাগরি আছে। নারীদেহ হচ্ছে সেইসব খাদ্য যেমন, যা রসালো, চোষ্য, যেসব খাবারের নাম শুনলে জল আসে জিভে। কিছুদিন আগে সমাজের চোখে মর্যাদা ও সম্মানিত এমন এক ধার্মিক ব্যক্তির মুখেই আমরা নারীকে তেঁতুলের সাথে তুলনা করতে দেখেছি। যারা শিক্ষিত নয়, প্রান্তিক, ধরি- রিকশাঅলা, ট্রাক ড্রাইভার, গাড়ির হেলপার এবং অন্যান্য যারা সেভাবে স্কুল কলেজের পাঠ নেয়নি, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস পড়েনি, সর্বোপরি যাদের সামাজিকীকরণ হয়নি। তাদের কাছে নারী যা, একজন শিক্ষিত, সমাজের চোখে প্রতিষ্ঠিত পুরুষের কাছেও তা। এর ব্যত্যয় হয়নি। এখনো না।
ক্রমশ পুরুষ হয়ে ওঠা যুবকদের দেখি, প্রেমের শুরুতে কে কতজন মেয়েকে বিছানায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে তার আকছার আলোচনা চলে বন্ধু মহলের আড্ডায়। যেখানে বিছানা অব্দি যাওয়াটা সম্পর্কের ও পারস্পরিক সম্মতির ব্যাপার। সমঝোতা ও পারস্পরিক গোপনীয়তার ব্যাপার তা হয়ে ওঠে আত্ম-অহংকার ও যোগ্যাতার মাপকাঠি। নারীকে খাওয়া যায়, নারী মাল- এমন অদ্ভুত চিন্তা থেকেই নারীকে ব্যবহার করা যায় আবেগী ভূমিকায়। যৌনতার মূল্যবোধ আমূল পাল্টে দিতে না পারলে নারীকে ব্যবহৃত হতে হবে আর ব্যবহার করবে পুরুষ।
ভিড়ে, রাস্তায়, বাসে নারীর স্পর্শকাতর অঙ্গে হাত এসে ছুঁয়ে যায়। সে হাত পুরুষের। ব্যতিক্রম আছে যেটুকু তা উদাহরণ হিসেবে চলে না। সেরকম পরিস্থিতিতে যৌন নিপীড়নকারী পুরুষটি মনে করে নারী উপভোগের উপযোগী বস্তু। কাপড়ের আড়াল খসে গেলেই সেটা লোভনীয় হয়ে ওঠে। কাপড়হীন খালি জায়গায় তো বটেই, যেকোন স্থানে তাকে ছোঁয়া যায়, সুযোগ পেলে ধর্ষণও করা যায়। এতে নারী বিব্রত হবে, অপমানিত হবে, গুটিয়ে যাবে কিন্তু রা কাড়বে না ভয়ে, লজ্জায়, সংকোচে। নারীকে বিব্রতবোধ হতে দেখে ব্যাপক আনন্দ! তার উল্টোটা ঘটলে সমাজ তাকে খারাপ মেয়ের তকমা দেবে। ঘটনা জানাজানি হলে পরিবারের সম্মানহানী হবে। পরিবার বলতে বাপ-ভাই-স্বামী। তারা বাইরে মুখ দেখাতে পারবে না। বাড়ি ফিরে হয়তো চাপা গর্জনও শুনতে হবে এই বলে যে- এটা নিয়ে এত কথা বলার কী ছিল!
নারীর শরীরে পুরুষের সমান শক্তি নেই, নিজেকে বাঁচাতে তার অন্যের সাহায্য নিতে হয়। সে রক্ষাকর্তাও অবশ্যই পুরুষ। ফলে নারী নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না। তার বাঁচা-মরা অন্যের হাতে, এটাও একটা চিন্তার কারণ বটে। আত্মরক্ষার কৌশল না জানার চেয়েও আত্মবিশ্বাসহীনতা বড় কারণ। চিৎকারটা দিতে পারলেই ভিত নাড়িয়ে দেয়া যায় অনেকটা সেটা বুঝতে পারাটাও জরুরি। হয়তো সব মেয়েরা গলা তোলে না। কলার চেপে ধরে একটা ঝাঁকি দেয় না সাহস করে। তবুও কিছু কিছু প্রতিবাদ হচ্ছে। বাসে, ভিড়ে অনেক পুরুষ আর ভালো মানুষটির মুখ করে বাড়ি গিয়ে খেয়েদেয়ে বৈধ স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে নিশ্চিত ঘুম দিয়ে বেঁচে যাবে এমনটা আর হচ্ছে না। ফোনের ক্যামেরার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে, নারীর আপোষহীনতা, হীনম্মন্যতা কেটেছে কিছুটা হলেও। ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিওচিত্রগুলো অন্তত তাই বলে।
চেতনার অন্ধকারে আলো না পৌঁছলে এই পাপ-পুণ্যের আধিপত্য বজায় থাকবে। যে পুরুষ নারীকে বিছানায় নিয়ে ‘খেয়েদেয়ে বাসি’ করে দেয়ার তৃপ্তিতে গৌরব করছে, বিপরীত দিক থেকে সে নিজেও যে ব্যবহৃত হল, সেও যে আর কুমারটি নেই এবং সতীত্ব কেবলই একটা পুরুষের বানানো ধারণা তা বুঝতে পারলে ল্যাঠা চুকে যায়। সম্পর্ক বোঝাপড়ার ব্যাপার। পারস্পরিক নির্ভরতার ব্যাপার। সেটা না থাকলে শুধুমাত্র এঁটো (!) হয়ে গেছে ভেবে তাকে বয়ে নিয়ে যাবার বিন্দুমাত্র মানে নেই। নারীর মান-অপমানের বিষয়টা যতটা না পুরুষকে বুঝতে হবে, তার বেশি বুঝতে হবে নারীর নিজেকেই। নইলে এঁটো হওয়া থেকে নারীকে পুরুষেরও সাধ্য নেই বাঁচানোর। নারীর তো নয়ই!

x