সমৃদ্ধি’র বৈকালিক শিক্ষা কেন্দ্র

মুহাম্মদ মনির হুসাইন

শনিবার , ২৫ মে, ২০১৯ at ১১:০০ পূর্বাহ্ণ
110

শ্রাবন্তি ও তপন দুজন একে অপরের খুব ভালো বন্ধু। দুজনেই চন্দনাইশ বরকল ইউনিয়নের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। পাশাপাশি বাড়িতে থাকায় তারা একই সাথে স্কুলে যায় এবং সেখান থেকে ফিরেও একসাথে। দুজনেরই বাবা রিকশা চালিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে সংসার চালান। তবে সহপাঠী ও শিক্ষকদের নিকট দুজনেই স্কুলে ভালো ও মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি পরীক্ষায় তারা যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আসছে। আর্থিকভাবে পারিবারিক টানাপোড়েন থাকা অবস্থায় তারা কিভাবে পড়াশুনায় এতোটা ভালো করছে তা জানতে চাওয়া হলে, তপনের বাবা শংকর কান্তি জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি তপন ও শ্রাবন্তি মমতার সমৃদ্ধির বৈকালিক শিক্ষাকেন্দ্রে পড়ে। সেখানেই স্কুলের পড়াকে শেখানো হয়। স্কুলের দেয়া বাড়ির কাজ এখানেই করিয়ে দেওয়া হয়। তাই তাদেরকে নিয়ে আমাদের বাড়তি চিন্তা করতে হয় না। সন্তানদের ভালো ফলাফলের জন্য পিতামাতারা প্রাইভেট গৃহশিক্ষক রেখে থাকেন তারই উন্নত বিকল্প হিসেবে কাজ করছে সমৃদ্ধি’র এসব বৈকালিক শিক্ষা কেন্দ্র।
সরকারের পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় ও জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবায় এগার বার পুরষ্কার প্রাপ্ত সংস্থা মমতা’র বাস্তবায়নাধীন ‘দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে দরিদ্র পরিবারসমূহের সম্পদ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি (সমৃদ্ধি)’ কর্মসূচির আওতায় এই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণি হতে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে মমতা। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বরকল ইউনিয়নে ২৩ টি, হাটহাজারী উপজেলার উত্তর মাদার্শায় ১৭টি এবং গড়দুয়ারা ইউনিয়নে ১৪টি বৈকালিক শিক্ষা কেন্দ্রসহ ৫৪টি বৈকালিক শিক্ষা কেন্দ্র মমতার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি শিক্ষাকেন্দ্রে ২৫-৩০ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানো হয়। পড়াশুনার পাশাপাশি এসব শিক্ষা কেন্দ্রে নৈতিকতা, খেলাধুলা, শুদ্ধভাবে জাতীয় সংগীত চর্চা, যথাযোগ্য মর্যাদায় বিভিন্ন দিবস উদযাপনসহ আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস সম্পর্কে তাদের শেখানো হয়ে থাকে। শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রমের প্রধান উদ্দেশ্য হল মূলধারা থেকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধকরণ এবং গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতকরণ।
এসব শিক্ষা কেন্দ্র সমূহে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে এসএসসি পাশ রয়েছে এমন ছাত্রী/মহিলাদেরকে শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। শুক্রবার, সরকারি ছুটির দিন ও সংস্থাসমূহের কার্যালয়-ছুটির দিনসমূহ ব্যতীত অন্যান্য সব দিনে শিক্ষাকেন্দ্রসমূহ খোলা থাকে। শিক্ষাকেন্দ্রের পাঠদান ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা তত্ত্বাবধানের জন্য প্রতিটি শিক্ষাকেন্দ্রের জন্য পৃথক পৃথক অভিভাবক কমিটি রয়েছে যারা মূলত শিক্ষা কার্যক্রমের মান ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে নিজেদের অভিমত ব্যক্ত করে থাকেন। অভিভাবক কমিটি মাসে অন্তত একবার সভায় মিলিত হয়। তারা কেন্দ্রের বিভিন্ন দিক এবং উন্নয়নের বিষয়ে মতবিনিময় করেন থাকেন। সমৃদ্ধি কর্মসূচির শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়ে মমতার প্রধান নির্বাহী ও সাবেক লায়ন্স গভর্নর রফিক আহমদ বলেন, পিকেএসএফ এর সহায়তায় মমতা সমৃদ্ধির বৈকালিক শিক্ষা কেন্দ্র উল্লেখিত ইউনিয়ন সমুহে পরিচালনা করছে। এসব শিক্ষা কেন্দ্রের দ্বারা সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সন্তানরাই বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। এতে করে তাদের শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং তাদের আদর্শ চরিত্র গঠনে নৈতিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, সমৃদ্ধির শিক্ষা কার্যক্রমের এসব বৈকালিক শিক্ষা কেন্দ্র হতে পাঠগ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশুনায় আরও বেশি মনোযোগী হচ্ছে যার ফলে, সেই প্রভাব তাদের বার্ষিক পরীক্ষা বা মূল্যায়ন পরীক্ষাগুলোতে তারা বেশ ভালো ফলাফল করছে। সমৃদ্ধির এসব শিক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনার পাশাপাশি আনন্দ ও খেলাধুলার সুযোগ পেয়ে থাকে। এতে করে শিক্ষার্থীরা শারিরীক ও মানসিকভাবে গড়ে উঠার সুযোগ পায়। সমৃদ্ধি’র শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়ে বরকল ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মো. হাবিবুর রহমান জানান, মমতার শিক্ষিকারা যথেষ্ট আন্তরিকভাবে পাঠদানের কার্যক্রম করে থাকে, সমৃদ্ধির বৈকালিক শিক্ষা কেন্দ্র সমূহের মাধ্যমে শিক্ষা হতে ঝরে পড়া রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটা নি:সন্দেহে পিকেএসএফ ও মমতার প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বিশেষত; গ্রামীণ এলাকায় আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারে যাদের পক্ষে গৃহশিক্ষক রেখে সন্তানকে পড়াশুনা করানো সম্ভব নয় তাদের জন্য এটি বেশ ফলপ্রসূ বলে আমি মনে করি।

x